
প্রথম পরিচ্ছেদ: ধুলোবালি ও একটি পুরনো বাড়ি
গল্পের নায়ক অর্ণব, একজন সফল কিন্তু যান্ত্রিক স্থপতি। তার জীবনে গতির অভাব নেই, কিন্তু শান্তির বড় অভাব। দীর্ঘ ২০ বছর পর সে তার পৈতৃক গ্রামে ফিরে আসে একটি পুরনো জমিদারি বাড়ি সংস্কার করার জন্য। বাড়ির ধুলোবালি আর স্যাঁতসেঁতে গন্ধের মাঝে সে খুঁজে পায় একটি অদ্ভুত আয়না। আয়নাটি ব্রোঞ্জের কারুকাজ করা, কিন্তু তার কাঁচটা কেমন যেন ঝাপসা।
অর্ণব যখন আয়নার সামনে দাঁড়াল, তার রক্ত হিম হয়ে গেল। আয়নায় পেছনের দেয়াল দেখা যাচ্ছে, ঘরের আসবাবপত্র দেখা যাচ্ছে, এমনকি তার পাশে থাকা বিড়ালটিও দেখা যাচ্ছে—কিন্তু অর্ণবের নিজের কোনো প্রতিচ্ছবি নেই!
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: অস্তিত্বের সংকট
অর্ণব প্রথমে ভাবল এটা কোনো চোখের ভুল বা আলোর কারসাজি। কিন্তু বারবার চেষ্টা করেও সে আয়নায় নিজেকে খুঁজে পেল না। সে আয়না স্পর্শ করতে পারে, তার শীতলতা অনুভব করতে পারে, কিন্তু সেখানে সে অদৃশ্য। এই অতিপ্রাকৃত ঘটনা অর্ণবকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। সে ভাবতে শুরু করে—"আমি কি তবে হারিয়ে গেছি? নাকি আমার কোনো অস্তিত্বই নেই?"
সে গ্রামের এক বৃদ্ধ লাইব্রেরিয়ানের কাছে যায়। বৃদ্ধ তাকে এক অদ্ভুত কথা বলেন, "বেটা, আয়না তো কেবল চামড়া আর হাড়গোড় দেখায়। কিন্তু মানুষের আসল পরিচয় যদি তার কর্ম আর তার ভেতরের মমতা হয়, তবে সেই আয়না তাকে দেখাবে কেন, যে নিজের আসল সত্তাকে ভুলে গেছে?"
তৃতীয় পরিচ্ছেদ: স্মৃতির যাত্রা ও আবেগ
গল্পে ইমোশনাল টার্ন আসে যখন অর্ণব বুঝতে পারে, সে গত দশ বছরে তার মা, তার ছোটবেলার বন্ধু এমনকি নিজের স্বপ্নের সাথেও বেইমানি করেছে। সে কেবল টাকার পেছনে ছুটেছে। সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের পুরনো ভুলের কথা মনে করে কাঁদতে শুরু করে।
সেদিন রাতে সে স্বপ্নে দেখে তার ছোটবেলাকে। সে দেখল সেই ছোট্ট অর্ণবকে, যে ছবি আঁকতে ভালোবাসত, যে মানুষের বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়ত। বর্তমানের এই "সফল" অর্ণবের সাথে সেই "সত্তা"র কোনো মিল নেই।
চতুর্থ পরিচ্ছেদ: নিজেকে ফিরে পাওয়া
অর্ণব সিদ্ধান্ত নেয় সে এই গ্রাম ছাড়বে না। সে গ্রামের ভাঙা স্কুলটি ঠিক করার দায়িত্ব নেয়। নিঃস্বার্থভাবে কাজ করতে শুরু করে সে। গ্রামের ছোট ছোট বাচ্চাদের সাথে মিশে সে দীর্ঘদিনের হারানো আনন্দ খুঁজে পায়। তার ভেতরের অহংকার আর যান্ত্রিকতা ধুয়ে মুছে যায়।
একদিন অনেক পরিশ্রম শেষে ঘর্মাক্ত শরীরে সে সেই ধুলো জমা আয়নাটির সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। সে এবারও প্রতিচ্ছবি দেখার আশা করেনি। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, আয়নায় একটা আবছা অবয়ব ফুটে উঠতে শুরু করেছে। সেটা কোনো দামি স্যুট পরা অর্ণব নয়, বরং এক শান্ত চোখের প্রশান্ত মানুষ।
শেষ পরিচ্ছেদ: প্রকৃত আয়না
গল্পের শেষে অর্ণব বুঝতে পারে, আমাদের চারপাশের মানুষগুলোই আসলে আমাদের আসল আয়না। যখন সে মানুষের জন্য কিছু করতে শুরু করল, তখন তাদের চোখের ভালোবাসায় সে নিজের অস্তিত্ব খুঁজে পেল। আয়নায় প্রতিচ্ছবি দেখা যাওয়ার চেয়েও বড় প্রাপ্তি হলো নিজের আত্মার দেখা পাওয়া।