Posts

ভ্রমণ

রামপুর বোয়ালিয়া থেকে রাজশাহী: মধুমতি এক্সপ্রেসে ভ্রমণ”

January 12, 2026

ইবনুল কল্পনা

71
View

ঠিক সন্ধ্যার সময় ট্রেন ছাড়ে। ধীরে ধীরে রাজবাড়ী পিছনে পড়ে যায়। জানালার বাইরে অন্ধকার গ্রাম, মাঝে মাঝে স্টেশনের আলো, ট্রেনের ছন্দময় শব্দ—সব মিলিয়ে এক মোহময় রাতের যাত্রা।
মধুমতি এক্সপ্রেস রাজশাহীর দিকে এগোয়। কখনো ঠিক সময়ে, কখনো একটু দেরি—আজও তাই। রাত সাড়ে দশটার দিকে ট্রেন ঢোকে রাজশাহী স্টেশনে। যদি দেরি হতো, এগারোটা কিংবা বারোটাও অচেনা কিছু নয়—এই ট্রেনের নিজস্ব এক চরিত্র আছে।
রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশন | রাত
ট্রেন থেকে নামতেই আলাদা এক আবহ টের পাওয়া যায়। শান্ত, পরিপাটি, পরিচ্ছন্ন। আগেই প্রস্তুত ছিল এশিয়ান ট্যুর। তাদের নিজস্ব গাড়িতে ব্যাগ আর লাগেজ তোলা হয়ে গেছে।
ভ্রমণ গাইড হিসেবে সঙ্গে আছেন আসাদুজ্জামান—রাজশাহীর স্থায়ী বাসিন্দা, এই মাটির ইতিহাস যিনি নিজের গল্পের মতো করে বলতে পারেন। এশিয়ান ট্যুরের মালিকও তিনি—মোঃ আসাদুজ্জামান, যিনি দীর্ঘদিন ধরে রাজশাহীর পর্যটন বিকাশে কাজ করে যাচ্ছেন, উত্তরবঙ্গের ইতিহাস ও ঐতিহ্য মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন।
গাড়ি ছুটে চলে লক্ষ্মীপুরের কাজিহাটার দিকে। মাত্র ১৫ মিনিটের পথ। জানালার বাইরে ঝকঝকে রাস্তা, নিরিবিলি শহর—রাতের রাজশাহী যেন আরও সুন্দর।
গ্র্যান্ড রিভার ভিউ হোটেল | রাত
গাড়ি থামে গ্র্যান্ড রিভার ভিউ হোটেলে। পদ্মার কাছাকাছি অবস্থিত এই হোটেলটি যেন নদীর দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকা এক নীরব অভিজাত প্রহরী। হোটেলের মালিক ওমর ফারুক—বড় ব্যবসায়ী উদ্যোক্তা ও রাজনীতিবিদ।
রুমের জানালা দিয়ে দেখা যায় রাজশাহীর নানা চেনা দৃশ্য—
৩৬ শে জুলাই চত্বর, টি-বাঁধ, আই-বাঁধ, রাজশাহী কোর্ট, সিএন্ডবি মোড়—সব যেন আলোয় আঁকা ছবির মতো।
শীতের রাতে লম্বা যাত্রার পর ক্লান্ত শরীর বিশ্রামে যায়। রাজশাহী যেন নীরবে স্বাগত জানায়।
২৯ ডিসেম্বর | সকাল — টি-বাঁধ
শীতের সকাল। হালকা কুয়াশা, নির্মল বাতাস। মাত্র ৩০ টাকা ভাড়া দিয়ে সাদমান আর নিশাত রওনা দেয় শ্রীরামপুর এলাকার টি-বাঁধে।
টি-বাঁধ—পদ্মার বিশালতা এখানে এসে ধরা দেয় পুরোপুরি। এই বাঁধটি ১৯৮০-এর দশকে নির্মিত হয়েছিল রাজশাহী শহরকে পদ্মার ভাঙন থেকে রক্ষা করার জন্য।
শীতকালে টি-বাঁধের সকাল অন্যরকম। নদীর ধারে বসে মাছের বাজার, জেলেদের হাঁকডাক, নদীর উপর দিয়ে বয়ে আসা ঠান্ডা বাতাস—সব মিলিয়ে এক প্রাণবন্ত দৃশ্য। সূর্য ধীরে ধীরে কুয়াশা ভেদ করে উঠে আসে, পদ্মার বুকে আলো ঝিলমিল করে।
এখানে দেখা হয় স্থানীয় মানুষদের সঙ্গে—
আসাদুজ্জামান ভাই, আবরার, হালিমা, সাজ্জাদ, আব্দুর রহিম চাচা—তাদের মুখেই শোনা যায় নদী, বাঁধ আর জীবনের গল্প।
চর খিদিরপুর (চরখানপুর) | দুপুর
সকাল দশটার দিকে এশিয়ান ট্যুরের গাড়িতে করে আবার টি-বাঁধে ফেরা। সেখান থেকে ইঞ্জিনচালিত নৌকা (শালোতি/ট্রলার)।
নৌকা ছাড়ে। ৩০ মিনিটের পথ, ভাড়া ৩০০–৬০০ টাকা। ধীরে ধীরে শহর পেছনে পড়ে যায়। সামনে বিস্তৃত বালুময় চর—চর খিদিরপুর।
বই, উইকিপিডিয়া আর স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী জানা যায়—
এক সময় এখানে প্রায় ১২ হাজার মানুষের বসতি ছিল। পদ্মার অব্যাহত ভাঙনে সেই জনপদের বড় অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। আজ এটি বাংলাদেশের অন্যতম শুষ্ক ও বালুময় এলাকা—অনেকের চোখে যেন এক টুকরো মরুভূমি।
চরের মানুষদের সঙ্গে কথা হয়—
নিলুফা চাচী, হাসান, রাকিব—তাদের জীবন নদীর সঙ্গে লড়াই করেই এগিয়ে চলেছে।
এই চরে সাদমান, নিশাত, ট্যুর গাইড ও এশিয়ান ট্যুরের মালিক আসাদুজ্জামান, আর চরবাসীদের নিয়ে হয় এক বনভোজন। হাসি, গল্প, উপহার—সব মিলিয়ে মানবিক এক দুপুর।
সন্ধ্যার আলো নামলে তারা আবার শহরের পথে ফেরে।
সিএন্ডবি মোড় | বিকেল থেকে রাত
এরপর গন্তব্য সিএন্ডবি মোড়। এখানে ইতিহাস যেন পায়ে পায়ে।
ব্রিটিশ আমলে ১৭৮১ সালে গঠিত হয়েছিল Construction & Building Directorate।
১৯৬২ সালে আইয়ুব খানের সময় এটি ভেঙে তৈরি হয়—
Roads & Highways
Public Works Department
এখানেই দাঁড়িয়ে আছে দেশের সবচেয়ে বড় ৩৬ শে জুলাই ম্যুরাল—
উচ্চতা প্রায় ৫৮ ফুট, মূল ছবি ৫০ ফুট। বাউন্ডারি দেয়ালে ২৪-এর আন্দোলনের ইতিহাস টেরাকাটায় খোদাই করা।
এখনকার সিএন্ডবি মোড় রাজশাহীর তরুণদের আড্ডার প্রাণকেন্দ্র। চায়ের দোকানে গল্প, আলোঝলমলে পরিবেশ, পরিচ্ছন্ন রাস্তা—রাজশাহীর সৌন্দর্য যেন চোখে পড়ে।
৩–৪ ঘণ্টা এখানে কাটিয়ে তারা আবার হোটেলে ফেরে।
শেষ কথা
গ্র্যান্ড রিভার ভিউ হোটেলের জানালায় দাঁড়িয়ে দিবা সাদমান আর নিশাত তাকিয়ে থাকে শহরের আলোয়। মনে হয়—
“এই যাত্রা চোখের নয়, হৃদয়ের অনুভূতি।”

Comments

    Please login to post comment. Login