Posts

চিন্তা

যুক্তিবাদ ও প্রশ্ন করার সংস্কৃতি জারি রাখা জরুরি

January 12, 2026

ফারদিন ফেরদৌস

57
View

পারস্য একসময় বিশ্বের জ্ঞান, বিজ্ঞান, দর্শন ও শিল্পচর্চার এক অবিস্মরণীয় কেন্দ্রস্থল হয়ে উঠেছিল। যেখানে মিলিত হয়েছিল পূর্ব ও পশ্চিমের বুদ্ধিবৃত্তিক ধারা।

প্রথমত, ভৌগোলিক অবস্থান। পারস্য ছিল সিল্ক রোডের কেন্দ্রস্থল। চীন, ভারত, গ্রিস, রোম ও আরব বিশ্বের মধ্যে বাণিজ্য শুধু পণ্যের নয় -জ্ঞান, দর্শন ও বৈজ্ঞানিক ধারণারও আদান-প্রদান ঘটিয়েছে। ভারতীয় গণিত, গ্রিক দর্শন, ব্যাবিলনীয় জ্যোতির্বিজ্ঞান; সবকিছু পারস্যে এসে মিশেছে, পরিশীলিত হয়েছে, তারপর নতুন রূপে বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে।

দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রশাসনিক বুদ্ধিবৃত্তিকতা। আকাশেমেনিদ, সাসানীয়, আব্বাসীয়, সেলজুক ও সাফাভি আমলে শাসকেরা জ্ঞানকে রাষ্ট্রের শক্তি হিসেবে দেখেছেন। বাগদাদের বায়তুল হিকমা, মারাঘার মানমন্দির, নিশাপুর ও বুখারার শিক্ষাকেন্দ্র; এসব ছিল মধ্যযুগের অক্সফোর্ড–হার্ভার্ডের সমতুল্য। আল-খোয়ারিজমি, আল-রাজী, ইবনে সিনা বা নাসিরুদ্দিন তুসির মতো মনীষীরা নিজেদের হিকমার সাথে সাথে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতাও পেয়েছিলেন।

তৃতীয়ত, পারস্য ভাষা ও সাহিত্যিক ঐতিহ্য। তৎকালে ফারসি শুধু কবিতার ভাষা ছিল না; দর্শন, ইতিহাস, রাষ্ট্রচিন্তা ও বিজ্ঞানচর্চার ভাষাও ছিল এটি। ফিরদৌসীর শাহনামা, হাফিজ ও সাদির কবিতা মানবিকতা ও নৈতিকতাকে জনপ্রিয় ভাষায় প্রকাশ করেছে। ফলে জ্ঞান শুধু অভিজাতদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, সমাজে ছড়িয়ে পড়েছে।

চতুর্থত, যুক্তিবাদ ও প্রশ্ন করার সংস্কৃতি। পারসিয়ান বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যে প্রশ্ন করা নিষিদ্ধ ছিল না। আল-রাজী ধর্মতত্ত্বের বাইরে গিয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানকে পরীক্ষণভিত্তিক করেন, ইবনে সিনা দর্শন ও বিজ্ঞানের মধ্যে সেতুবন্ধন গড়েন, আল-বেরুনী অন্য সংস্কৃতিকে পক্ষপাতহীনভাবে বোঝার চেষ্টা করেন। এই মনোভাবই পারস্যকে ডগমার বাইরে নিয়ে গেছে।

পঞ্চমত, আধ্যাত্মিকতা ও মানবতাবাদ। রুমি, আততার, হাফিজ, বায়েজিদ বোস্তামির মতো সুফি চিন্তাবিদরা ধর্মকে কেবল বিধিনিষেধে আটকে রাখেননি; তারা প্রেম, মানবিকতা ও আত্মঅন্বেষণের দর্শন গড়ে তুলেছিলেন। এর ফলে পারস্য চিন্তা কঠোর ধর্মীয় কাঠামোর বদলে মানবকেন্দ্রিক হয়েছে; যা সৃজনশীল চিন্তার জন্য অত্যন্ত জরুরি।

ইবনে সিনা (Avicenna) মেডিসিন ও দর্শনে এমন অবদান রেখেছেন যে ইউরোপের মেডিকেল শিক্ষার ভিত্তি তাঁর কানুন ফি আল-তিব্ব-এর উপর দাঁড়িয়েছিল ছয় শতাব্দী ধরে। আল-রাজী (Rhazes) গুটিবসন্ত ও হামকে আলাদা রোগ হিসেবে চিহ্নিত করে পরীক্ষানির্ভর চিকিৎসাবিজ্ঞান ও ক্লিনিক্যাল অবজার্ভেশনের ধারণা প্রতিষ্ঠা করেন। আল-বেরুনী ভারতীয় গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির সঙ্গে পশ্চিমের জ্ঞান মিলিয়ে তুলনামূলক নৃতত্ত্বের পথ তৈরি করেছিলেন। ওমর খৈয়াম শুধু কবি নন, তৃতীয় ঘাতের সমীকরণ সমাধানে যুগান্তকারী গণিতবিদ, পাশাপাশি জ্যোতির্বিদ হিসেবে জালালি ক্যালেন্ডার প্রণয়ন করেছিলেন। আল-খোয়ারিজমি রসায়ন ও বীজগণিতের পথিকৃৎ, যার গ্রন্থ আল-জাবর থেকে জন্ম নেয় আধুনিক আলজেবরা, এবং Algorithm শব্দের উৎসও তিনি।

পারস্যের এই জ্ঞানী ও সৃজনশীল মনীষীরা শুধু মধ্যযুগের পারস্যে নয়, বিশ্ব সভ্যতায় স্থায়ী ছাপ রেখেছেন। তারা বিজ্ঞানকে ধর্মের বাইরে দাঁড় করাতে জানতেন, দর্শনকে জীবন ও বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করতেন, কবিতাকে মানবতার ভাষা বানাতেন। পরীক্ষণভিত্তিক চিন্তা, যুক্তি, গবেষণা এবং মানবিক মূল্যবোধের এই ঐতিহ্যই পরবর্তী শতকে ভারত, মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে।

মুসলিম শাসকদের চাপে পড়ে ভারতে পালিয়ে আসতে বাধ্য হওয়া জরথুষ্ট্রবাদি পারসিয়ানরা শুধু সেখানকার অভিবাসী ছিলেন না; তারা আধুনিক ভারত গঠনের সক্রিয় অংশীদার। দাদাভাই নওরোজি ব্রিটিশ অর্থনৈতিক শোষণ বিশ্লেষণ করেন, ফিরোজশাহ মেহতা নগর প্রশাসন ও নাগরিক রাজনীতিতে আধুনিকতার ধারণা প্রতিষ্ঠা করেন। ভিখাজি কামা আন্তর্জাতিক জনমত গড়ে ভারতীয় স্বাধীনতার পক্ষে কাজ করেন। জামশেদজি টাটা ভারতীয় শিল্পায়ন ও শিক্ষা ও জনকল্যাণের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। হোমি জে. ভাভা ভারতের পারমাণবিক কর্মসূচির রূপকার, যা আধুনিক রাষ্ট্রগঠনে গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি ফ্রেডি মার্কারির শিকড়ও গুজরাটের পারসি সমাজে; যা ভারত-পরবর্তী সংস্কৃতিতে আন্তর্জাতিক মাত্রা যোগ করে।

মোগলরা, যদিও মধ্য এশিয়ার তুর্কো–মঙ্গোল বংশের, তবু ভারতীয় শাসন ও সংস্কৃতিতে তারাও গভীরভাবে পারস্য প্রভাবিত। দরবারে ফারসি ভাষা, প্রশাসনিক রীতি, স্থাপত্য ও শিল্প ভারতীয় সমাজকে নতুন রূপ দেয়।

আমির খসরু, আবুল ফজল, অন্যান্য মধ্যযুগীয় পারসিক বুদ্ধিজীবী ভারতীয় সাহিত্য, সংগীত ও রাষ্ট্রচিন্তায় নতুন ধারার সূচনা করেন।

কিন্তু আজকের ইরানের দিকে তাকালে অতীতের সেই জ্ঞান ও প্রজ্ঞাময় ইতিহাসের সাথে বর্তমানের বিরাট ফারাক চোখে পড়ে। একসময় স্বাধীন গবেষণা, প্রশ্ন করার সাহস, সংস্কৃতির বৈচিত্র্য ও আন্তর্জাতিক সংযোগ পারস্যকে জ্ঞানচর্চার স্বর্ণযুগে পৌঁছে দিয়েছিল। এখন সেই দেশ ধর্মীয় গোঁড়ামির যাঁতাকলে পিষ্ট, আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন, অর্থনীতি তলানিতে, এবং জনতা বিপ্লবের আ'গুনে ফুঁসে উঠেছে।

অতীত থেকে শিক্ষা নেওয়া যায়; যেখানে রাষ্ট্র ও ধর্ম স্বাধীন, গবেষণা উৎসাহ প্রবহমান এবং প্রশ্ন করার স্বাধীনতা সামাজিকভাবে স্বীকৃত, সেই পরিবেশেই দেখতে পাওয়া যায় বিজ্ঞান, দর্শন, শিল্প ও মানবিকতার সেরা নিদর্শন।

পারস্যের পুরনো সেই ঐতিহ্য শুধু ইতিহাস নয় -এটি আমাদের স্মরণ করায়, জ্ঞান ও স্বাধীন চিন্তা রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য কত গুরুত্বপূর্ণ। জনমতকে পাত্তা না দেয়া শাসকের একগুঁয়েমি ও স্বেচ্ছাচারিতা নিজের ভূখণ্ডে পরদেশি ভূস্বামীর বিপদসঙ্কুল শৃঙ্খল বা পরাধীনতা ডেকে আনতে পারে। ইম্পেরিয়ালিস্টদের নাক গলানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে। অথচ স্বাধীন পারস্যের অতীত এখনকার মতো এমন ছিল না। মানুষ বেড়াজাল পছন্দ করে না। যুক্তিবোধসম্পন্ন গণমানুষ তার চিন্তা ও কর্মে স্বাধীন থাকলে দেশের সার্বভৌমত্ব অক্ষুন্ন থাকে।

লেখক: সাংবাদিক 
১২ জানুয়ারি ২০২৫

Comments

    Please login to post comment. Login