আমাদের এই ভ্রমণের সময়টি ছিল অক্টোবর মাস। তখন সবে মাত্র বাংলাদেশে শীত শীত ভাব শুরু হয়েছে। ঠিক হলো কাঞ্চনজঙ্ঘার খোঁজে বাংলাদেশের সর্ব উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ে যাব।
যেমন কথা, তেমনি কাজ ঠিক হলো পরিবারের সকলেই মিলে পঞ্চগড়ের উদ্দেশ্যে ৫ অক্টোবর রওনা দিব।
রাত সাড়ে এগারোটার মধ্যে সকলেই আত্রাই স্টেশনে হাজির হলাম, পঞ্চগড় এক্সপ্রেস এর অপেক্ষায়।
দেখলাম বারোটা পাঁচ মিনিটে চারপাশ আলোকিত করে এগিয়ে আসছে পঞ্চগড় এক্সপ্রেস। ট্রেনটি এসে স্টেশনে থামলো। আমরা সকলে ট্রেনে উঠে নিজ নিজ সিটে বসে পড়লাম। আমার সিট পড়েছিল জানালার পাশে। ট্রেন বারোটা দশ মিনিটে ছেড়ে দিল। চারিপাশ অন্ধকার, সেই অন্ধকারকে ভেদ করে ট্রেন ধীরে ধীরে গতি বাড়াতে থাকলো। উপলব্ধি করলাম, দিনে ট্রেনভ্রমণের একরকম সৌন্দর্য এবং রাতে এক অন্যরকম সৌন্দর্য। রাতে ট্রেন ভ্রমণ আমার প্রথম হওয়ায় আমার খুব আনন্দ লাগছিল। মনে হতে থাকলো আমি এক এডভেঞ্চারে যাচ্ছি। জানালা দিয়ে বাইরের শুক্লপক্ষে চাঁদ এবং অসংখ্য তারা দেখতে দেখতে, কখন যে ঘুমিয়ে গেছি নিজেও জানিনা।
পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি ভোর ছয়টা বাজে। জানালা দিয়ে বাহিরে তাকিয়ে দেখি চারপাশ কুয়াশায় ঢাকা। কিছুক্ষণের মধ্যে দেখলাম বৃষ্টি পরতেও শুরু করল। আমরা ট্রেন থেকে স্টেশনে নামলাম ছয়টা দশ মিনিটে। স্টেসনে নেমে বৃষ্টির জন্য আটকে গেলাম।
আমরা সকলে স্টেশনে প্লাটফর্মে বসে আছি, সাথে অনেক লোকজনও বসেছিল আমাদের সাথে। চারিপাশ মেঘে ঢাকা এবং বৃষ্টি পড়তেই থাকলো। আমাদের মন একটু খারাপ হতে থাকলো কারণ, মেঘ থাকলে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা পাওয়া যাবে না। আমাদের সাথে দুইজন অচেনা মানুষ বসে ছিল। তারা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করতে থাকলো; নয়টার ট্রেনে চড়ে আবার বাসায় ফিরে যাবেন। তারাও কাঞ্চনজঙ্ঘার দেখতে এসেছিল কিন্তু তারা হাল ছেড়ে দিয়ে চলে যাবে। কিন্তু আমরা হাল ছেড়ে দিলাম না।
বৃষ্টি থামলো সকাল আটটা সময়। আমরা স্টেশনে বাইরে এসে রিকশায় করে পঞ্চগড় বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছলাম। সেখান থেকে বাসে করে তেঁতুলিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। সেখানে হালকা নাস্তা করে ঠিক হলো অটোয় করে পঞ্চগড় এর অন্যান্য দর্শনীয় স্থানগুলো আগে ঘুরে দেখব। আমাদের ভ্রমণটি ছিল একদিনের অর্থাৎ সেই রাতে আবার রওনা দিতে হবে। তাই একদিনের মধ্যেই যথাসাধ্য সকল জায়গায় ঘুরে দেখতে হবে।
অটোয় করে আমরা প্রথমে পৌঁছালাম একটা চা বাগানে। বাগানে নামার কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। আমরা একটি লোকাল চা দোকানে আশ্রয় নিলাম। দোকানে দেখলাম হরেক রকম চা, আগে কখনো এসব চা দেখিনি। আমরা সেই চা বাগানের একটি চা তৈরি করতে বললাম।
চা খেতে খেতে চারপাশের দৃশ্যগুলোকে উপলব্ধি করছি। বৃষ্টির কারণে চায়ের গাছগুলো আরো সবুজ হয়ে গেছে। চারপাশ সবুজে ভরে উঠেছে এ যেনো প্রকৃতির একটি খেলা। কিছু দূরেই দেখা যাচ্ছে ভারত বাংলাদেশ বর্ডার। বৃষ্টি কমলে আমরা সেখান থেকে অন্য স্পটে রওনা দিলাম।
এবার পৌঁছালাম আমরা ডাকবাংলো। সেখানকার লোকাল মানুষরা বলছিল এখান থেকেই নাকি কাঞ্চনজঙ্ঘা সবচেয়ে ভালো দেখা যায়। কিন্তু বৃষ্টি এবং মেঘের কারণে এখনো দেখা যায়নি। তারা আমাদের বললো গতকাল এই বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভালো দেখা গিয়েছিল কাঞ্চনজঙ্ঘা। একটু মনে আফসোস সৃষ্টি হলো। তারা বলল আজকে বৃষ্টির কারণে নাও দেখা যেতে পারে। তাও আমরা হাল ছাড়লাম না।
এরপর আমরা বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্টে গিয়ে পৌঁছালাম। এটি হলো বাংলাদেশের সর্ব উত্তরের সীমান্ত স্থান। আমি ভারত সীমান্তের খুব কাছে গিয়ে পৌঁছেছিলাম। আর দুই ধাপ এগুলোই ভারত। আর এগোনো যাবে না, কারণ সেখানে বিজিবি পাহারা দিচ্ছে। আমি সেখানে একটি আশ্চর্য জিনিস লক্ষ্য করলাম। দেখলাম, আমি যেখানে অবস্থান করছি, সেখানে থেকে ঢাকা অনেক দূরে কিন্তু নেপাল অনেক কাছে!
দেখলাম ভারত থেকে ট্রাক বাংলাদেশে আসছে, বাংলাদেশ থেকে ট্রাক ভারতে যাচ্ছে। আরো একটি জিনিস খেয়াল করলাম, দেখলাম দূরে অনেক বড় বড় ঝাপসা পাহাড়ের মত কি সব দাঁড়িয়ে আছে!
ভাইয়াকে জিজ্ঞেস করলাম বললো ওগুলো নাকি দার্জিলিং পাহাড়!
সেখান থেকে ফিরে এলাম দুপুরে খাওয়ার জন্য একটি হোটেলে। খাওয়া-দাওয়া শেষ করে একটু বিশ্রাম নিয়ে আবারও বেড়িয়ে পড়লাম। এবার গন্তব্য কাজী এন্ড কাজী চা বাগান। সেখানে প্রবেশ করে দেখি অনেক বড় চা বাগান। বাগানের চারিপাশে কিছু বাংলো বাড়ি এবং একটি ভাঙ্গা ব্রিজ খেয়াল করলাম। জায়গাটা আমার অনেক ভালো লাগলো।
সেখানে কিছুক্ষণ কাটিয়ে আবার অটোয় উঠলাম। ডাকবাংলোর লোকাল লোকেরা বলেছিল বিকেলে একবার আবার ডাকবাংলা আসতে। অটোয় যেতে-যেতে, মনে-মনে ভাবছিলাম,"আজ অনেক নতুন কিছু দেখেছি। কাঞ্চনজঙ্ঘা যদি নাও দেখা মিলে তবেও আমার কোন আফসোস নেই। কারণ নতুন অনেক কিছু দেখতে এবং শিখতে পেরেছি।" চারিপাশে দৃশ্য দেখতে দেখতে এসব কোথায় ভাবছি। চলন্ত অটো ছুটে চলেছে ডাকবাংলোর উদ্দেশ্যে। শেষ চেষ্টা!
হঠাৎই দেখলাম দূরে মাথা উঁচু করে কি একটা সাদা জিনিস দেখা যাচ্ছে। ভালো করে তাকিয়ে দেখি আরে! এটাতো কাঞ্চনজঙ্ঘা। নিজেকে সামলে রাখতে পারলাম না; চিৎকার করে উঠলাম কাঞ্চনজঙ্ঘা বলে! আমিও সবাইকে সেদিকে তাকাতে বললাম। সবাই দেখে বিস্মৃত। ডাকবাংলো আর যেতে হলো না। অটো থামিয়ে মাঝ রাস্তায় সবাই নেমে পড়েছি। সবারই নজর কাঞ্চনজঙ্ঘার দিকে।
প্রথমবার কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার মুহূর্তে বুকের ভেতরটা হঠাৎ নীরব হয়ে গেলো।
মেঘের ফাঁক দিয়ে সাদা বরফে ঢাকা শৃঙ্গ যেন চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে।
কথা হারিয়ে যায়, শুধু মনটা বিস্ময়ে ভরে ওঠে।
মনে হয় প্রকৃতি নিজেই আজ সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
সে দৃশ্য আজীবন হৃদয়ের পাতায় লেখা হয়ে থাকবে।
প্রথম দেখা কাঞ্চনজঙ্ঘা,
বরফে মোড়া নীরব গান—
চোখে নামে পাহাড়,
মনে জাগে অসীম টান।
যতক্ষণ দেখা গিয়েছিলে ততক্ষণই আমরা এক নজরে দেখেছিলাম। ধীরে ধীরে সূর্য ডুবে গেল এবং কাঞ্চনজঙ্ঘা সোনালী আভা নিভে যেতে শুরু করল। ধীরে ধীরে রাত হয়ে আসলো, আমরাও সেখান থেকে চলে গেলাম।
আমরা সবাই এসে পৌছালাম তেঁতুলিয়া বাসস্ট্যান্ডে। সেখান থেকে বাসে করে পঞ্চগড়ে উদ্দেশ্যে। রাতের হালকা নাস্তা করে সবাই মিলে পঞ্চগড় রেলস্টেশনে পৌঁছালাম। আমাদের ট্রেনটি আসলো ৯ টা ৫ মিনিটে। ট্রেনে ওঠে নিজ নিজ সিটে সকলে বসলাম।
ট্রেন চলা শুরু হল।
ট্রেন এ বসে ভাবছিলাম, কত কিছুই না আজ জানতে পারলাম ; দেখতে পারলাম। আসলে মানুষ এর স্বভাবই হলো অদেখাকে দেখা,অজানাকে জানার।
এইসবই ভাবছিলাম। জানালা দিয়ে ট্রেনের ঝাপটা হাওয়া এসে মুখে লাগছে। সারাদিনের ক্লান্তি ভরা শরীরে ঘুমিয়ে পড়লাম।
..........................সমাপ্ত...................……