Posts

গল্প

ধুলো জমা স্মৃতির ব্যাকস্পেস

January 12, 2026

শহুরে যাযাবর

22
View

                                                                 

যান্ত্রিক বর্তমানের একঘেয়েমি

গল্পের মূল চরিত্র নীল। বয়স ত্রিশ, পেশায় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। তার জীবন কাটে কোডিংয়ের জটিল লজিক আর ল্যাপটপের কিবোর্ডে। নীলের জীবনে এখন কোনো 'ব্যাকস্পেস' নেই, যা কিছু ভুল হয় তা সারা জীবন রয়ে যায়। তার বর্তমান সম্পর্কগুলোও যেন যান্ত্রিক—হোয়াটসঅ্যাপের মেসেজ আর ইমোজিতে সীমাবদ্ধ। একদিন অফিস থেকে ফেরার পথে ল্যাপটপের ব্যাগে হাত দিয়ে সে অনুভব করে পুরনো একটি ডায়েরির কোনা। সেটি তার স্কুল জীবনের।

 

ধুলো মাখা ডায়েরি ও স্মৃতির জানালা

বাসায় ফিরে নীল ডায়েরিটি খোলে। ভেতরে জমে আছে এক যুগ আগের ধুলো। ডায়েরির পাতায় পাতায় লেগে আছে সেই সময়কার গন্ধ। সে দেখতে পায় নীল কালিতে লেখা একটি নাম—'রাইসা'। রাইসা ছিল তার স্কুলের সবচেয়ে ভালো বন্ধু, যার সাথে বিকেলের ছাদে ঘুড়ি ওড়ানো থেকে শুরু করে পরীক্ষার আগের রাতে নোট শেয়ার করার হাজারো স্মৃতি। নীল ভাবতে থাকে, আধুনিক জীবনের এই ইঁদুর দৌড়ে সে কখন যেন সেই নিঃস্বার্থ ভালোবাসার মানুষগুলোকে 'ব্যাকস্পেস' চেপে মুছে দিয়েছে।

 

অতীতে ফিরে যাওয়ার ব্যাকস্পেস

নীল সিদ্ধান্ত নেয় সে তার ছোটবেলার শহরে ফিরবে। যান্ত্রিক শহর ছেড়ে সে যখন তার পুরনো পাড়ায় পৌঁছায়, দেখে অনেক কিছুই বদলে গেছে। কিন্তু সেই মেহগনি গাছটা আর পুরনো লাইব্রেরিটা এখনো একই রকম আছে। সে লাইব্রেরিতে গিয়ে পুরনো খাতাগুলো ঘাঁটতে থাকে। হঠাৎ তার চোখে পড়ে একটি বুকমার্ক, যাতে লেখা ছিল—"জীবন তো আর কিবোর্ড নয় যে ভুল করলে ব্যাকস্পেস চেপে ঠিক করে নেবে, তবে স্মৃতিগুলো তো চিরকাল রিফ্রেশ করা যায়।"

 

রাইসার সাথে সেই আকস্মিক দেখা

নীল যখন পুরনো মাঠের ধারে বসে সূর্যাস্ত দেখছিল, ঠিক তখনই তার পাশে এসে দাঁড়ায় একজন। রাইসা। রাইসা এখন সেই স্কুলেরই শিক্ষিকা। দুজনেই নীরব। আধুনিক যুগে যেখানে মানুষ মিনিটে দশটি মেসেজ পাঠায়, সেখানে তারা দশ মিনিট চুপচাপ বসে থাকল। নীল বুঝতে পারল, পুরনো স্মৃতিগুলো আসলে ধুলো জমা ল্যাপটপের মতো, একটু ঘষা দিলেই ঝকঝক করে ওঠে। তারা একে অপরের বর্তমান নিয়ে কথা বলল না, বরং ফিরে গেল সেই সময়ে যখন বৃষ্টির দুপুরে কাগজের নৌকা ভাসানোই ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কাজ।

 

আনন্দ ও প্রাপ্তি

রাইসা নীলকে একটি পুরনো ক্যাসেট প্লেয়ার দেয়। তাতে রেকর্ড করা ছিল তাদের ছোটবেলার আড্ডা। নীল যখন সেই আওয়াজগুলো শোনে, তার চোখে জল এলেও মুখে হাসি ফুটে ওঠে। সে অনুভব করে, মানুষ অতীতে ফিরে যেতে চায় কেবল দুঃখ পেতে নয়, বরং বর্তমানের রুক্ষ জীবনে কিছুটা স্নিগ্ধতা খুঁজে পেতে। সে বুঝতে পারে, তার জীবনের সবচেয়ে দামী 'ব্যাকস্পেস' হলো এই স্মৃতিগুলো, যা তাকে বারবার মনে করিয়ে দেয় সে আসলে কে ছিল।

 

উপসংহার: ডিলিট নয়, বরং সেভ করা স্মৃতি

নীল শহরে ফিরে আসে, কিন্তু এবার সে অন্য এক মানুষ। সে এখন ল্যাপটপের ব্যাকস্পেস চাপার আগে একবার ভাবে। সে বুঝতে পারে, আধুনিক জীবনের গতি আমাদের কাছ থেকে অনেক কিছু কেড়ে নেয়, কিন্তু স্মৃতির আলমারিতে তালা দিয়ে রাখলে সেই সম্পদ কেউ নিতে পারে না। গল্পটি শেষ হয় নীলের একটি ডায়েরি লেখা দিয়ে, যার নাম সে দেয়—"ধুলো জমা স্মৃতির ব্যাকস্পেস"

Comments

    Please login to post comment. Login