গ্রামের শেষ মাথায় একটা পুরোনো বাড়ি। বাড়িটার জানালা দিয়ে সন্ধ্যা নামলেই একটা ম্লান আলো দেখা যেত। কেউ জানত না সেই আলো কার জন্য জ্বলে থাকে, শুধু সবাই বলত—ওখানে থাকে রহমান চাচা, একজন নীরব মানুষ।
রহমান চাচা এক সময় শহরের বড় স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। তার হাতের লেখা ছিল অসম্ভব সুন্দর, আর গল্প বলার ভঙ্গি এমন যে ছাত্ররা নিশ্বাস ফেলতেও ভুলে যেত। কিন্তু আজ থেকে বিশ বছর আগে হঠাৎ করেই তিনি গ্রামে ফিরে আসেন। শহর, স্কুল, সব ছেড়ে।
গ্রামে ফিরে তিনি কারও সঙ্গে তেমন কথা বলতেন না। প্রতিদিন ফজরের নামাজের পর তিনি বাড়ির উঠোনে বসে কাগজ-কলম নিয়ে কিছু লিখতেন। তারপর সেগুলো ভাঁজ করে একটা কাঠের বাক্সে রেখে দিতেন। কেউ কখনও সেই বাক্স খুলে দেখেনি।
গ্রামের ছোট ছেলে রাশেদ প্রতিদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে রহমান চাচার বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকত। তার খুব কৌতূহল হতো—চাচা কী লেখেন? একদিন সাহস করে সে জিজ্ঞেস করল,
—চাচা, আপনি এত চিঠি লেখেন, কাকে দেন?
রহমান চাচা মৃদু হাসলেন। বললেন,
—যাদের ঠিকানা নেই, তাদের জন্য।
রাশেদ কিছু বুঝল না।
এক রাতে প্রচণ্ড ঝড় উঠল। বৃষ্টির পানিতে রহমান চাচার বাড়ির এক পাশ ধসে পড়ল। গ্রামবাসী ছুটে এলো। সেই ভাঙা ঘরের ভেতরেই পাওয়া গেল কাঠের বাক্সটা। বাক্স খুলতেই সবাই স্তব্ধ।
ভেতরে শত শত চিঠি। প্রতিটা চিঠির শুরু একই—
“প্রিয় সন্তান…”
চিঠিগুলোতে লেখা ছিল শেখানো কথা, ভালো মানুষ হওয়ার উপদেশ, জীবনে হার না মানার গল্প। তখনই জানা গেল সত্যিটা—রহমান চাচার একমাত্র ছেলে শহরে এক দুর্ঘটনায় মারা যায়। সেই দুঃখ তিনি কাউকে বলতে পারেননি। তাই প্রতিদিন ছেলেকে চিঠি লিখতেন, নিজের বেঁচে থাকার শক্তি খুঁজে নিতে।
গ্রামবাসীরা সিদ্ধান্ত নিল—এই চিঠিগুলো নষ্ট হতে দেওয়া যাবে না। তারা চিঠিগুলো দিয়ে একটা ছোট লাইব্রেরি বানাল। নাম দিল
“নীরব চিঠির ঘর”।
আজও সেই ঘরে অনেক শিশু আসে, পড়ে, শেখে। আর রহমান চাচা?
তিনি এখনো উঠোনে বসে লেখেন। তবে এখন তার চিঠিগুলোর ঠিকানা আছে—
গ্রামের প্রতিটি সন্তান।
28
View
Comments
-
Nahid Bappy 1 month ago
Translated by Nahid Bappy
-
Nahid Bappy 1 month ago
Translated by Nahid Bappy