ইট পাথরের শহরে
ইট আর পাথরের শহর। চারপাশে উঁচু দেওয়াল, সরু রাস্তা, এবং অদ্ভুত এক ধূসর আকাশ। শহরটা শান্ত, কিন্তু এই শান্তি শান্তির নয়—এটি এক বিষণ্নতার শান্তি, যেন দীর্ঘশ্বাসের মতো। মানুষগুলোও শান্ত। তারা তাদের নিজস্ব খেয়ালে ডুবে থাকে, কেউ কারো দিকে তাকায় না, কেউ কারো সঙ্গে কথা বলে না। তারা যেন নিজেদের মধ্যে হারিয়ে গেছে, নিজেদের বিষণ্নতা এবং দুঃখের মধ্যেই।
রাস্তার কোণায় দাঁড়িয়ে থাকা বৃদ্ধ, তার চোখে অদ্ভুত এক গম্ভীর বিষণ্নতা। বছরের পর বছর ধরে দেখেছে, এই শহরের মানুষগুলো কেবল তাদের কাজ করছে, কিন্তু তাদের চোখে কোনো আশা নেই। কেবল এক দীর্ঘশ্বাস, এক অদৃশ্য ঘৃণা যা জীবনের প্রতি তাদের আস্থা শেষ করে দিয়েছে।
একজন তরুণ মেয়ে বাজারের দিকে যাচ্ছে। তার হাত ভর্তি ব্যাগ, কিন্তু চোখে কোনো আনন্দ নেই। সে দেখে, দোকানদারও আগের মতোই মৃদু কণ্ঠে নম্র, কিন্তু মুখে কোনো তৃপ্তি নেই। চারপাশে সবাই ব্যস্ত, কিন্তু ব্যস্ততা কোনো জীবনযাপন নয়—এটি শুধু সময় কাটানোর একটি যান্ত্রিক প্রক্রিয়া।
পাহাড়ের মতো উঁচু ভবনের ছায়ায়, এক ছেলে পার্কের বেঞ্চে বসে আছে। সে চায় কিছু লেখা, কিছু ভাবতে, কিন্তু তার মন তার নিজের বিষণ্নতায় আটকে। সে লক্ষ্য করে, চারপাশের মানুষগুলো নিজেদের মধ্যে ডুবে আছে। তারা কারো দিকে তাকায় না, কারো খোঁজ নেয় না। এই শহরে আর কোনো আনন্দ নেই। আনন্দ হারিয়ে গেছে।
দিন শেষে শহরটি আরও নিস্তব্ধ হয়ে যায়। গাছগুলোও যেন কাঁদছে, পাখিরা গাঢ় নীরবতার মধ্যে হারিয়ে গেছে। মানুষগুলো একে অপরকে দেখে না, শুধুই তাদের নিজের কষ্টে এবং ঘৃণায় ডুবে থাকে। কেউ কখনো জানতে চায় না—“তুমি কেমন আছ?” কারণ তারা জানে, এই শহরে কেউ সত্যিই শোনার ইচ্ছা রাখে না।
শহরের এক প্রান্তে ছোট একটি ছাদ, যেখানে একটি বাচ্চা বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। তার চোখে এক অদ্ভুত প্রশ্ন—“কেন সবাই এত দুঃখী?” সে হাসে, কিন্তু সেই হাসিও অচল। শহরের নীরবতার কাছে শিশুটির হাসি অশ্রু হয়ে যায়।
মানুষগুলো একে অপরকে দেখতে চায় না, কারণ তারা জানে একবার চোখ মিললেই তাদের মধ্যে লুকানো বিষণ্নতা প্রকাশ পাবে। তারা জানে একবার কেউ তাদের দুঃখ বুঝলে, তখন তারা আর স্বস্তিতে থাকতে পারবে না। এই শহরে মানুষ জন্মায়, বড় হয়, বয়স পায়, কিন্তু কখনো হাসতে শিখে না। তারা কেবল বেঁচে থাকে, সময়ের বোঝা বইতে বইতে।
কিন্তু কোথাও, এক কোণে, এক অল্প আলো আছে। হয়তো একদিন সেই ছোট বাচ্চার চোখে দেখা এক ঝিলিক, এক অপ্রত্যাশিত হাসি, শহরের মানুষের হৃদয় নড়বড়ে করবে। হয়তো তারা আবার একে অপরের দিকে তাকাবে, হয়তো তারা শিখবে সুখের ছায়া খুঁজতে।
এখন তা হয়নি। এখন শহরটি শান্ত। মানুষগুলো বিষণ্ন। আনন্দ শেষ। ইট আর পাথরের শহরে, শুধুই নীরবতার রাজত্ব। ঘৃণা, দুঃখ, একাকিত্ব—এই তিনটি জিনিসই মানুষের চোখে জমে আছে। তারা জানে না কিভাবে আনন্দ ফিরবে, জানে না কিভাবে একে অপরের দিকে মন খোলে। তারা শুধু চলতে থাকে, প্রতিদিন, প্রতিমুহূর্ত, এক নিরব, অচঞ্চল যান্ত্রিক পথে।
শহরটি যেন এক জীবন্ত কেল্লা। প্রতি ইট, প্রতি পাথর যেন মানুষের বিষণ্নতার ইতিহাস শোনায়। কেউ জানতে চায় না কারো গল্প। কেউ শোনে না কারো আহাজারি। এবং শহরটি নীরব, শান্ত, বিষণ্ন।
এভাবেই ইট আর পাথরের শহর বেঁচে থাকে—জীবনের সমস্ত আনন্দ হারিয়ে যাওয়ার পর, কেবল দুঃখ এবং একঘেয়ে শান্তির ছায়া নিয়ে।