বৃষ্টি নামলে শহরটা অন্যরকম হয়ে যায়।রাস্তাগুলো ভিজে ওঠে, আলোগুলো ঝাপসা লাগে,
রাস্তাগুলো ভিজে ওঠে, আলোগুলো ঝাপসা লাগে,আর মানুষের ভেতরের না বলা কথাগুলো যেন শব্দ খুঁজে পায়। সেই রকমই এক বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায় আরিফ প্রথমবার লাবণ্যকে দেখেছিল।ক্যাফেটার জানালার পাশে বসে সে একটা পুরোনো ডায়েরিতে কিছু লিখছিল। লিখছিল, তা আরিফ জানত না—কিন্তু কলমের গতিতে একটা গভীরতা ছিল। যেন সে শব্দ দিয়ে নিজের হৃদয়টা খুলে রাখছে। আরিফ নিজেও একজন লেখক।তবে সে নিজেকে লেখক বলত না— বলতো আমি হৃদয়ের গল্পকার। প্রতিদিনের মতো সেদিনও সে গল্প লিখতে এসেছিল। কিন্তু সেই সন্ধ্যায় গল্প লিখতে পারেনি। কারণ তার চোখ আটকে গিয়েছিল লাবণ্যর চোখে। চোখে চোখ পড়তেই লাবণ্য লাজুক হেসে ফেলেছিল। সে হাসিটা ছিল ঠিক বসন্তের প্রথম ফুলের মতো —নরম, শান্ত, অথচ গভীর। পরের দিনও আরিফ এলো। লাবণ্যও এলো। তারপর আর বলা লাগে না— একই সময়, একই টেবিল, একই জানালার পাশে বসে থাকা। তারা কথা বলত কম, কিন্তু অনুভব করত বেশি। কখনো কবিতা, কখনো নীরবতা, কখনো শুধু চোখের ভাষা। একদিন লাবণ্য বলেছিল, —“তুমি কী লেখো?”আরিফ হেসে বলেছিল,—“মানুষের না বলা অনুভূতির গল্প।” লাবণ্য চুপ করে ছিল কিছুক্ষণ। তারপর খুব আস্তে বলেছিল,—“তাহলে আমার গল্পটাও লিখবে?”সেই প্রশ্নটা আরিফের হৃদয়ে দাগ কেটে গিয়েছিল। দিনগুলো ভালোই কাটছিল। কিন্তু জীবনের গল্প সবসময় সহজ হয় না। একদিন লাবণ্য আর এল না। একদিন, দু’দিন, এক সপ্তাহ… ক্যাফের জানালার পাশে বসে আরিফ অপেক্ষা করত। কিন্তু লাবণ্য আর আসত না।
অনেক পরে জানা গেল— লাবণ্যকে পরিবার নিয়ে অন্য শহরে চলে যেতে হয়েছে। কোনো বিদায় নেই, কোনো ঠিকানা নেই। আরিফের লেখা থেমে যায়নি, কিন্তু প্রতিটা গল্পেই একটা শূন্যতা ছিল। বছর কেটে যায়। একদিন বইমেলায় আরিফের লেখা প্রথম উপন্যাস প্রকাশ হয়— নাম ছিল “হৃদয়ের গল্পকার”। বইয়ের ভিড়ের মাঝেই হঠাৎ সে একটা পরিচিত কণ্ঠ শুনতে পেল,— “এই গল্পটা… আমার খুব চেনা লাগছে।” ঘুরে তাকিয়ে আরিফ স্থির হয়ে গেল।লাবণ্য। চোখে আগের মতোই নরম আলো,মুখে সেই চেনা হাসি। লাবণ্য বলল, —“তুমি আমার গল্পটা লিখেছিলে, তাই না? ”আরিফ কাঁপা গলায় বলল, —“আমি তোমাকে ভুলতে পারিনি।”লাবণ্য চোখ ভিজিয়ে বলল,—“আমি চাইনি তুমি আমাকে ভুলে যাও।” সেই দিন আর তারা আলাদা হয়নি। আজ তারা একই ছাদের নিচে থাকে। লাবণ্য পড়ে, আরিফ লেখে।রাতে জানালার পাশে বসে তারা গল্প করে— কখনো শব্দে, কখনো নীরবতায়। কখনো শব্দে, কখনো নীরবতায়। আরিফ এখনো নিজেকে লেখক বলে না। সে এখনো বলে—“আমি হৃদয়ের গল্পকার, আর আমার সবচেয়ে সুন্দর গল্পটা—তুমি।” ❤️