প্রখ্যাত ইসলামি ব্যক্তিত্ব, হাদিস শাস্ত্রের সুপণ্ডিত, ধর্মসাম্যের সমর্থক, প্রসিদ্ধ খতিব, ইমাম, তরিকতের খাদেম, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক ও মাইজভাণ্ডারী দর্শনের চর্যাকার সুফি হজরত মাওলানা মোহাম্মদ ফজলুল করিম জাফরাবাদী আল মাইজভাণ্ডারী (র.) ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দের ১লা মার্চ (১৭ ফাল্গুন, ১৩৬০ বঙ্গাব্দ) পূর্ব পাকিস্তানের দক্ষিণ-পূর্বভাগ তথা চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া মহকুমার (বর্তমান চন্দনাইশ) সাঙ্গুঘেঁষা চরাঞ্চল কৃষিনির্ভর সবুজ গ্রাম জাফরাবাদের এক সাধারণ বাঙালি মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা ওয়াহেদ আলি পেশায় একজন কৃষক ছিলেন। আর মাতা বিলকিছ খাতুন গ্রামীণ আনপড়া গৃহিণী হলেও শিক্ষানুরাগী ছিলেন। সেই মহীয়সী মায়ের প্রচেষ্টায় তিনি দাখিল, আলিম ও ফাজিল শেষ করে দারুল উলুম আলিয়া মাদ্রাসার হাদিস বিভাগ থেকে কৃতিত্বের সাথে কামিল ডিগ্রি অর্জন করেন। সেই সময় জাঁদরেল ইসলামি পণ্ডিত আল্লামা জালাল উদ্দীন আল কাদেরী (র.) তাঁর সতীর্থ ছিলেন।
পড়াশুনা শেষ করে মানুষ গড়ার কারিগরে ব্রতী হয়ে 'হেড মাওলানা' পদে সাতবাড়িয়া বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে যোগদান করেন। পরবর্তীতে একই প্রতিষ্ঠানে সফলতার সাথে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করে অবসর নেন। তাঁর বর্ণিল কর্মজীবনে অগণিত শিক্ষার্থী পেয়েছিল আলোর ছোঁয়া।
ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত বিধায় ছাত্রজীবন থেকে কর্মজীবনের শুরু অবধি রক্ষণশীল একজন মুসলিম ছিলেন। পরবর্তীতে মাইজভাণ্ডারী মতাদর্শী ফকির শাহ্সুফি মৌলভী ফজলুল হক হাফেজনগরী (র.) এঁর প্রভাবে মাইজভাণ্ডারী দর্শনের প্রতি উদ্বুদ্ধ হয়ে উদারচিন্তাবাদী পড়েন।
ফলস্বরূপ একদা প্রথমবারের মতো মাইজভাণ্ডার দরবার শরিফে গিয়েই তিনি গাউসিয়া হক মঞ্জিলের সিংসাহনে উপবিষ্ট ঐশী পুরুষ বিশ্বঅলি শাহানশাহ্ হজরত সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভাণ্ডারী (ক.) এঁর সাক্ষাৎধন্য হন। সেই শুভক্ষণে তাঁর ইহজনমে ভাবান্তর ঘটে, হয়ে ওঠেন গভীর আবেগদীপ্ত এক প্রেমিক পুরুষ। আরবি সাহিত্যে যেমনটা–
কুম কুম ইয়া হাবিবি কাম তানামু,
আল আশিকু ওয়াল মাশুক লা ইয়ানামু।
সুফিবাদ ও মাইজভাণ্ডারী দর্শন তাঁকে গভীরভাবে স্পর্শ করে। কালক্রমে হয়ে ওঠেন মানবপ্রেমে উদারনৈতিক এক পুরুষ। শাহানশাহ্ মাইজভাণ্ডারী (ক.) এঁর জীবদ্দশায় তিনি সংসারী হননি, ওফাত পরবর্তী বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হলেও তিনি সচেতনচিত্তে ছিলেন উদাসী ও স্রষ্টা প্রেমে বিভোর। তাঁর সাদামাটা আটপৌরে জীবন সহধর্মিণী ইয়াছমিন খানমকে খান বাড়ির সমস্ত জৌলুস সানন্দে পরিত্যাগ করতে অনুপ্রাণিত করেছিল।
শাহানশাহ্ মাইজভাণ্ডারী (ক.) তাঁর পীরে মুর্শেদ ছিলেন। পরবর্তীতে শাহানশাহ্ মাইজভাণ্ডারী (ক.) তাঁর একমাত্র শাহজাদা সৈয়দ মোহাম্মদ হাসান মাইজভাণ্ডারী (মা.)'কে বিশ্ববাসীর রাহবাররূপে খেলাফতে অভিষিক্ত করলে তাঁকেও বিনয়চিত্তে আপন রাহবার হিশেবে বরণ করে নেন। আমৃত্যু জৈবিক সকল কামনা বাসনাকে উপেক্ষা করে নীরবে কঠোর রেয়াজত সাধনায় নিমগ্ন ছিলেন। তিনি আওলাদে রাসুল (সা.) বিশ্বঅলি শাহানশাহ্ হজরত সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভাণ্ডারী (ক.) এঁর সোহবতধন্য সেই পুণ্যাত্মা, সাধারণ্যে যিনি স্রষ্টাভিমুখী অভিযাত্রী এক অসাধারণ কৃতিপুরুষ।
মাইজভাণ্ডারীয়া তরিকায় নবুয়ত ও বেলায়তের অপূর্ব সম্মেলন দেখে এই তরিকায় দীক্ষা নেওয়ার জন্য বিশ্ববাসীর প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে তিনি রচনা করেন অমর পংক্তিমালা—
হেরাগুহার আলোকধারা,
মাইজভাণ্ডারে দিয়েছে ধরা।
বিশ্ববাসী আয়রে আয়—
মাইজভাণ্ডারী আলোকধারায়।
কেবল ভাবগম্ভীর জীবনে নিজেকে নিবিষ্ট রাখেননি। সাংগঠনিক ব্যক্তিত্ব হিশেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। কর্মএলাকায় বুদ্ধিজীবী সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিশেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়াও বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদেও যুক্ত ছিলেন। মসজিদের ইমাম থেকে খতিবের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। মাইজভাণ্ডারীয়া ত্বরিকার প্রচারে প্রত্যন্ত অঞ্চলে চষে বেড়িয়েছেন। সেই সূত্রে 'মাইজভাণ্ডারী গাউসিয়া হক কমিটি বাংলাদেশ' সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ে নেতৃত্ব দেন। ইউনিয়ন শাখার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, উপজেলা থেকে জেলা পর্যায়ে সমন্বয়ক এবং আরো পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় পর্ষদের সদস্য হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। প্রত্যন্ত জনপদে মাইজভাণ্ডারীয়া তরিকতের লেওয়া-ই আহমদী সমুন্নতকরণে ও প্রচারণায় অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ এসজেডএইচএম ট্রাস্ট কর্তৃক গাউসিয়া হক মঞ্জিলের খাদেম খেতাবে ভূষিত হন।
এই সাধকপুরুষ কোমল অথচ বলিষ্ঠ এক ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন। জীবনের শেষ শয্যায়ও তিনি বিচলিত হননি, চোখে বিন্দুমাত্র জল ছিলো না। মহান রব আল্লাহর প্রতি ছিল তাঁর অগাধ বিশ্বাস, নবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি ছিলো অশেষ মোহাব্বত এবং আপন মুর্শেদের প্রতি ছিলো অটল ভক্তি। ইহজীবন সমাপ্তিতে এই মহীয়ান তাঁর সহধর্মিণী, তিনকন্যা ও দুইপুত্র (জ্যেষ্ঠ কন্যা নুসরত জাহান খানম, প্রভাষক, আসহাব সিরাজ পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট; মেজ কন্যা ফাতেমা খাইরুন নেছা, সহকারী শিক্ষক, মাদরাসা-ই শাহানশাহ্ হযরত সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভাণ্ডারী [ক.]; জ্যেষ্ঠ পুত্র মুহাম্মদ জিয়াউল হাসান, সহকারী শিক্ষক, মুজাফরাবাদ এন. জে. উচ্চবিদ্যালয়; কনিষ্ঠ পুত্র মোহাম্মদ জিয়াউল হোসাইন, শিক্ষার্থী, স্নাতক, সরকারি কমার্স কলেজ চট্টগ্রাম ও কনিষ্ঠ কন্যা ইসরাত জাহান খানম, শিক্ষার্থী, বিজ্ঞান বিভাগ, আই.এসসি, মহিলা কলেজ চট্টগ্রাম) রেখে যান। সর্বজীবের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা পোষণকারী এই মহীয়ান অগণিত গুণগ্রাহীর হৃদয়ে বেদনার প্রস্রবণ সৃষ্টি করে ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দের ২৯ নভেম্বর (১৪ অগ্রহায়ণ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ) মহামহিম প্রভুর সান্নিধ্যে অনন্তজীবনে পাড়ি দেন।