Posts

গল্প

পরিনীতা - শেষ পর্ব

January 15, 2026

Rezwana Roji

Original Author শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

Translated by রেজওয়ানা প্রধান

13
View

শেখর মাকে লইয়া যখন ফিরিয়া আসিল তখন ও তাহার বিবাহের দশ-বারো দিন বিলম্ব ছিল।

দিন তিন এক পরে একদিন সকালে ললিতা শেখরের মায়ের কাছে বসিয়া একটা ডালায় কি কতকগুলো তুলিতেছিল।

শেখর জানিতো না তাই কি একটা কাজে? মা বলিয়া ঘরে ঢুকিয়াই হঠাৎ থতমত খাইয়া দাঁড়াইলো। ললিতা মুখ নিচু করিয়া কাজ করিতে লাগিল। 

মা জিজ্ঞাসা করিলেন কিরে? 

সে যে জন্য আসিয়াছিল, তাহা ভুলিয়া গিয়া, না এখন থাক, বলিয়া তাড়াতাড়ি বাহির হইয়া গেল। ললিতার মুখ দেখিতে পাই নাই , কিন্তু তাহার হাত দুইটির উপর দৃষ্টি পড়িয়াছিল। তাহা সম্পূর্ণ নিরাভরণ ,না হইলেও দুগাছি করিয়া কাচের চুড়ি ছাড়া আর কিছু ছিল না। শেখর মনে মনে ক্রোর হাসি হাসিয়া বলিল এর আর এক রকমের  ভরং। গিরিন সংহতিপন্ন তাহা সে জানিত তাহার পত্নীর হাত এরূপ অলংকার শূন্য হইবার কোন সঙ্গত হেতু সে খুঁজিয়া পাইলো না।

সেই দিনেই সন্ধ্যার সময় সে দ্রুতপদে নিচে নামিয়া আসিতেছিল ললিতাও সেই সিঁড়িতে উপরে উঠিতেছিল, একপাশে ঘেসিয়া দাড়াইলো। কিন্তু শেখর নিকটে আসিতেই অত্যন্ত সংকোচের সহিত মৃদু কন্ঠে বলিল তোমাকে একটা কথা বলবার আছে। 

শেখর এক মুহূর্ত স্থির হইয়া বিস্ময়ের সরে বলিল , কাকে? আমাকে? 

আমার সঙ্গে আবার কি কথা! বলিয়া শেখর পূর্বাপেক্ষা দ্রুত পদে নামিয়া গেল।

ললিতা সেইখানে কিছুক্ষণ স্তব্ধভাবে দাঁড়াইয়া থাকিয়া অতি ক্ষুদ্র একটা নিঃশ্বাস ফেলিয়া ধীরে ধীরে চলিয়া গেল। 

পরদিন সকালে শেখর তাহার বাহিরের ঘরে বসিয়া সেই দিনের সংবাদপত্র পড়িতে ছিল, নিরতিষয় বিষয়ের সহিত চোখ তুলিয়া দেখিল গিরিন প্রবেশ করিতেছে। গিরিন নমস্কার কোরিয়া নিকটে চৌকি টানিয়া লইয়া বসিল ।শেখর প্রতি নমস্কার করিয়া সংবাদপত্র টা একপাশে রাখিয়া দিয়া জিজ্ঞাসু মুখে চাহিয়া রহিল। উভয়ের চোখের পরিচয় ছিল বটে কিন্তু আলাপ ছিল না এবং সে পক্ষে আজ পর্যন্ত দুজনের কেহই কিছু মাত্র আগ্রহ প্রকাশ করে নাই। 

গিরিন একেবারেই কাজের কথা পাড়িল। বলিল ,বিশেষ প্রয়োজনে আপনাকে একটু বিরক্ত করতে এসেছি। আমার শাশুড়ি ঠাকরুনের অভিপ্রায় আপনি শুনেছেন , বাড়িটা তিনি আপনাদের কাছে বিক্রি করে ফেলতে চান ,আজ আমাকে দিয়ে বলে পাঠালেন শীঘ্র যা হোক একটা বন্দোবস্ত হয়ে গেলেই তারা এ মাসেই মুঙ্গের এ ফিরে যেতে পারেন। 

গিরিনকে দেখিবা মাত্রই শেখরের বুকের মধ্যে ঝড় উঠিয়াছিল কথাগুলো তাহার কিছু মাত্র ভালো লাগিল না, অপ্রসন্ন মুখে বলিল সে তো ঠিক কথা কিন্তু বাবার অবর্তমানে দাদা এখন মালিক তাকে বলা আবশ্যক।

গিরিন মৃদু হাসিয়া বলিল সে আমরাও জানি কিন্তু তাকে আপনি বললেই তো ভালো হয়। 

শেখর তেমনি ভাবেই জবাব দিল আপনি বললেও হতে পারে , ও পক্ষের অভিভাবক এখন আপনি ই।

গিরিন কহিল আমার বলবার আবশ্যক হলে বলতে পারি, কিন্তু কাল সেজদি বলছিলেন আপনি একটু মনোযোগ করলে অতি সহজেই হতে পারে। 

শেখর মোটা তাকিয়া টাই হেলান দিয়া বসিয়া এতক্ষন কথা কহিতেছিলেন সোজা হইয়া উঠিয়া বসিয়া বলিল কে বললেন?

গিরিন বলিল সেজদি, ললিতা দিদি বলছিলেন-

শেখর বিস্ময় হতবুদ্ধি হইয়া গেল। তারপরে গিরিন কি যে বলিয়া গেল তাহার একবিন্দুও তাহার কানে গেল না ,খানিকক্ষণ বিহবল দৃষ্টিতে তাহার মুখপানে চাহিয়া থাকিয়া বলিয়া উঠিল আমাকে মাফ করবেন গিরিন বাবু, কিন্তু ললিতার সঙ্গে কি আপনার বিবাহ হয়নি?

গিরিন জিভ কাটিয়ে বলিল আজ্ঞে না ওদের সকলেই আপনি জানেন, কালীর সঙ্গে আমার -

কিন্তু সেরকম তো কথা ছিল না। 

গিরিন ললিতার মুখে সব কথাই শুনিয়াছিল, কহিলো,, না কথা ছিল না সে কথা সত্য ,গুরু চরণ বাবু মৃত্যুকালে আমাকে অনুরোধ করে গিয়েছিলেন । আমি আর কোথাও যেন বিবাহ না করি আমিও প্রতিশ্রুত হই। তার মৃত্যুর পরে সেজদিদি আমাকে বুঝিয়ে বলেন । অবশ্য এসব কথা আর কেউ জানে না যে, ইতিপূর্বেই তাহার বিবাহ হয়ে গেছে এবং স্বামী জীবিত আছেন। একথা আর কেউ হয়তো বিশ্বাস করত না কিন্তু আমি তার একটি কথাও অবিশ্বাস করিনি, তাছাড়া স্ত্রীলোকের একবারের অধিক বিবাহ হতে পারেনা -ওকি ?

শেখরের দুই চক্ষু বাষ্পাকুল হইয়া উঠিয়াছিল, এখন সেই বাষ্প অশ্রুধারায় চোখের কোন বহিয়া গিরিনের সম্মুখেই ঝরঝর করিয়া ঝরিয়া পড়িল। কিন্তু সেদিকে তাহার চৈতন্য ছিল না, তাহার মনেও পড়িল না, পুরুষের সম্মুখেই পুরুষের এই দুর্বলতা প্রকাশ পাওয়া অত্যন্ত লজ্জাকর। 

গিরিন নিঃশব্দে চাহিয়া রহিল। তাহার মনে মনে সন্দেহ ছিলই আজ সে ললিতার স্বামীকে নিশ্চয়ই চিনতে পারিল । শেখর চোখ মুছিয়া ভারি গলায় বলিল কিন্তু আপনি তো ললিতাকে স্নেহ করেন?

গিরিনের মুখের উপরে প্রচ্ছন্ন বেদনার গারো ছায়া পড়িল। কিন্তু পরক্ষণে সে মৃদু মৃদু হাসিতে লাগিল। আস্তে আস্তে বলিল সে কথার জবাব দেওয়া অনাবশ্যক ,তাছাড়া স্নেহ যত বড়ই হোক জেনে শুনে কেউ পরের বিবাহিত স্ত্রীকে বিবাহ করে না, যাক গুরুজনের সম্বন্ধে ওসব আলোচনা আমি করতে চাইনে, বলিয়া সে আর একবার হাসিয়া উঠিয়া দাঁড়াইয়া বলিল, আজ যাই আবার অন্য সময় দেখা হবে বলিয়া নমস্কার করিয়া বাহির হইয়া গেল।

গিরিনকে শেখর চিরদিনই মনে মনে বিদ্বেষ করিয়াছে , এইবারে সেই বিদ্বেষ নিবিড় ঘৃণায় পর্যবসিত হইয়াছিল । কিন্তু আজ সে চলিয়া যাইবা মাত্র শেখর উঠিয়ে আসিয়া ভূমি তলে বারংবার মাথা ঠেকাইয়া এই অপরিচিত ব্রাহ্ম যুবকটির উদ্দেশ্যে প্রণাম করিতে লাগিল। মানুষ নিঃশব্দে যে কত বড় স্বার্থ ত্যাগ করিতে পারে ।হাসি মুখে কি কঠোর প্রতিশ্রুতি পালন করিতে পারে তাহা আজ সে প্রথম দেখিল।

অপরাহ্ণ বেলায় ভুবেনেশ্বরী নিজের ঘরে মেঝেই বসিয়া ললিতার সাহায্যে নতুন বস্ত্রের রাশি থাক দিয়া সাজাইয়া রাখিতেছিলেন। শেখর ঘরে ঢুকিয়া মায়ের শয্যার উপর গিয়া বসিল আজ সে ললিতাকে দেখিয়া ব্যস্ত হইয়া পালাইলো না ।

মা চাহিয়া দেখিয়া বলিলেন কি রে !

শেখর জবাব দিল না চুপ করিয়া থাক দেওয়া দেখিতে লাগিল। খানিক পরে বলিল ও কি হচ্ছে মা? 

মা বলিলেন নতুন কাপড় কাকে কি রকম দিতে হবে হিসেব করে দেখছি, বোধ করি আরো কিছু কিনতে হবে না মা?

ললিতা ঘাড় নারিয়া সায় দিল।

শেখর হাসি মুখে কহিল, আর যদি বিয়ে না করি মা?

ভুবনেশ্বরী হাসিলেন। বলিলেন তা তুমি পারো তোমার গুণে ঘাট নেই। 

শেখর হাসিয়া বলিল তাই বোধ করি হয়ে দাঁড়ায় মা। 

মা গম্ভীর হইয়া বলিলেন, ও কি কথা ! অমন অলক্ষণে কথা মুখে আনিস নে। 

শেখর বলিল এতদিন মুখে তো আনিনি মাহ কিন্তু আর না আনলে নয় আর চুপ করে থাকলে মহাপাতক হবে মা।

ভুবনেশ্বরী বুঝিতে না পারিয়া শঙ্কিত মুখে চাহিয়া রহিলেন। 

শেখর বলিল তোমার এই ছেলেটির অনেক অপরাধী তুমি ক্ষমা করে এসেছ, এটাও ক্ষমা করো মা ,আমি সত্যিই এ বিয়ে করতে পারব না।

পুত্রের কথা ও মুখের ভাব দেখিয়া ভুবনেশ্বরী সত্যিই উদ্বিগ্ন হইলেন ,কিন্তু সে ভাব চাপা দিয়ে বলিলেন, আচ্ছা আচ্ছা তাই হবে এখন যা তুই এখান থেকে আমাকে জ্বালাতন করিস না - শেখর আমার অনেক কাজ।

শেখর আর একবার হাসিবার ব্যর্থ প্রয়াস করিয়া ,শুষ্ক স্বরে বলিল না মা সত্যিই বলছি তোমাকে এ বিয়ে হতে পারে না।

কেন একি ছেলেখেলা? 

ছেলেখেলা নয় বলেই তো বলছি মা। 

ভুবনেশ্বরী এবার রীতিমতো ভীত হইয়া সরোষে বলিলেন , কি হয়েছে আমাকে বুঝিয়ে বল শেখর, এসব গোলমেলে কথা আমার ভালো লাগেনা।

শেখর মৃদু কন্ঠে বলিল ,আর একদিন শুনো মা, আর একদিন বলবো। 

আর একদিন বলবি! তিনি কাপড়ের গোছা একধারে ঠেলিয়ে দিয়ে বলিলেন , তবে আজই আমাকে কাশি পাঠিয়ে দে ,এমন সংসারে আমি একটা রাত কাটাতে চাইনে।

শেখর অধঃ মুখে বসিয়া রহিল। 

ভুবনেশ্বরী অধিকতর অস্থির হইয়া বলিলেন , ললিতা ও আমার সঙ্গে কাশি যেতে চায় ,দেখি তার যদি একটা কিছু বন্দোবস্ত করতে পারি।

এবার শেখর মুখ তুলিয়া হাসিল, তুমি নিয়ে যাবে তার আবার বন্দোবস্ত কার সঙ্গে করবে মা! তোমার হুকুমের বড় ওর আবার কি আছে! 

ছেলের হাসিমুখ দেখিয়া তিনি মনে মনে একটু যেন আশান্বিতা হইলেন, ললিতার পানে একবার চাহিয়া দেখিয়া বলিলেন, শুনলি মা কথা ,ও মনে করে আমি ইচ্ছা করলে যেন যেখানে খুশি নিয়ে যেতে পারি ?ওর মামীর মত নিতে হবে না?

ললিতা জবাব দিল না, শেখরের কথাবার্তার ধরনের সে মনে মনে অত্যন্ত সংকুচিত হইয়া উঠিতেছিল।

শেখর বলিয়া ফেলিল তাকে জানাতে চাও জানাও গে , সে তোমার ইচ্ছে, কিন্তু তুমি যা বলবে তাই হবে মা ,এ আমিও মনে করি, যাকে নিয়ে যেতে চাচ্ছো সেও মনে করে ও তোমার পুত্রবধু বলিয়া ফেলিয়াই শেখর ঘার হেট করিয়া রহিল।

ভুবনেশ্বরী বিস্ময়ে স্তম্ভিত হইয়া গেলেন, জননী সম্মুখে সন্তানের মুখে কি পরিহাস,। এক দৃষ্টে তাহার দিকে চাহিয়া বলিলেন কি বললি ? ও আমার কি?

শেখর মুখ তুলিতে পারিল না, কিন্তু জবাব দিল । আস্তে আস্তে বলিল ওই তো বললুম মা আজ নয় চার বছরের বেশি হল। তুমি সত্যিই ওর মা। আমি আর বলতে পারিনে মা, ওকে জিজ্ঞাসা করো ওই বলবে,- বলিয়াই দেখিলো ললিতা গলায় আঁচল দিয়ে মাকে প্রণাম করিবার উদ্যোগ করিতেছে ,সেও উঠিয়া আসিয়া তাহার পাশে দাড়াইলো এবং উভয়ে একত্রে মায়ের পদপ্রান্তে ভূমিষ্ঠ প্রণাম করিয়া শেখর নিঃশব্দে বাহির হইয়া গেল।

ভুবনেশ্বরীর দই  চোখ দিয়ে আনন্দ অশ্রু ঝরিয়া পড়িতে লাগিল। তিনি ললিতাকে সত্যই অত্যন্ত ভালোবাসিতেন। সিন্দুক খুলিয়া নিজের সমস্ত অলংকার বাহির করিয়া তাহাকে পড়াইতে পড়াইতে একটু একটু করিয়া সব কথা জানিয়ে লইলেন ,তাই বুঝি গিরিনের কালির সঙ্গে বিয়ে হয়েছে?

ললিতা বলিল হ্যাঁ মা তাই। গিরিন বাবুর মত মানুষ সংসারে আর আছে কিনা জানিনা। আমি তাকে বুঝিয়ে বলতেই তিনি বিশ্বাস করলেন যে সত্যিই আমার বিয়ে হয়ে গেছে। স্বামী আমাকে গ্রহণ করুন না করুন সে তার ইচ্ছে, কিন্তু তিনি আছেন।

ভুবনেশ্বরী তাহার মাথায় হাত দিয়া বলিলেন ,আছে বৈকি মা! আশীর্বাদ করি জন্ম জন্ম দীর্ঘজীবী হয়ে থাকুক, একটু বোস মা আমি অবিনাশ কে জানিয়ে আসি যে, বিয়ের কোনে বদল হয়ে গেছে ,বলিয়া হাসিয়া বড় ছেলের ঘরের দিকে চলিয়া গেলেন।


 

Comments

    Please login to post comment. Login