গল্পের নাম: গাছ কাটা
শিমুলতলার সেই বিশাল বটগাছটা ছিল গ্রামের নিঃশ্বাস, গ্রামের চোখ-মুখ, গ্রামের স্মৃতি। তার শিকড় মাটির গভীরে গিয়ে না জানার কত ইতিহাস জড়িয়ে রেখেছিল। সকাল হলে পাখিরা তার ডালে বসে গান গাইত, হাওয়া বইত পাতার ভাঁজের মধ্যে দিয়ে, যেন প্রকৃতিই নরম কোলকাতার মতো ছড়িয়ে দিচ্ছিল শান্তি। দুপুরে গ্রামবাসী তার ছায়ায় বিশ্রাম নিত, চেয়ে দেখত আকাশের নীল, শিখত প্রকৃতির ভাষা। বিকেলে শিশুরা তার চারপাশে খেলত, রাত হলে জোনাকির আলোয় সে পাহারা দিত ঘুমন্ত গ্রামকে।
একদিন হঠাৎ একটি কাগজ এলো। উন্নয়নের নোটিশ। রাস্তা হবে, বাজার হবে, ভবন উঠবে। কিন্তু গ্রামের বটগাছটা তখন পথে দাঁড়িয়ে ছিল—কাটতে হবে। প্রথম দিনই কুড়াল হাতে লোক এসে গাছের শিকড়ে আঘাত করল। গাছটা কেঁপে উঠল, পাতাগুলো ঝরে পড়ল, বাতাস ভারী হয়ে গেল। পাখিরা চমৎকার কোলাহলে উড়ে গেল। গ্রামের মানুষ প্রথমে চুপ করে থাকল—কারণ এখন তারা অভ্যস্ত, প্রশ্ন করা ভুল।
দিনের পর দিন গাছ কাটা চলল। এক গাছ, দুই গাছ, তারপর বন। নদীর পানি কমতে লাগল। মাটি ফেটে গেল, ফসল শুকোতে লাগল। আগের মতো নিয়মিত বৃষ্টি আর আসে না—কখনো অতিরিক্ত, কখনো একেবারেই না। শিশুরা বাইরে খেলতে পারে না, তাদের খেলা রোদে পুড়ে যায়। গ্রামের বৃদ্ধরা বারবার বলল, “এমন আগে কখনও ছিল না।” কিন্তু সময় আর ফিরে আসে না।
বছর কেটে গেল। গ্রামের চেহারা বদলে গেল। কংক্রিটের ভবন, রাস্তার ধ্বংসস্তূপ, গাড়ির হর্নের কোলাহল—ছায়া আর নেই। মানুষ অসুস্থ হতে লাগল। শ্বাস নিতে কষ্ট, চোখ জ্বালা। তারা বুঝতে লাগল—গাছ কাটা মানে শুধু কাঠ নেওয়া নয়, নিজের ভবিষ্যৎ কেটে ফেলা। প্রকৃতি ধীরে ধীরে নিঃশব্দে প্রতিশোধ নেয়। সে চিৎকার করে না, কিন্তু তার অনুপস্থিতি শূন্যতা তৈরি করে, এবং সেই শূন্যতাই মানুষের জীবনকে ভেঙে দেয়।
শিশুরা প্রশ্ন করল, “বৃক্ষগুলো কোথায় গেল?” বড়রা চুপ করে থাকল। তাদের জানার সময় শেষ। তারা বুঝল, যখন গাছ থাকবে না, তখন শিশুরা শিখবে শুধুই কংক্রিট ও ধুলোতে। তারা শিখবে, বাতাস মানে মাসিক বিল, জল মানে কেনা বস্তু। পাখির গান থাকবে শুধু স্মৃতিতে।
একদিন এক বৃদ্ধ দাঁড়াল গ্রামের মাঠে। তার চোখে ছিল অজস্র দুঃখ, কাঁদছে হৃদয়। সে বলল, “আমরা ভুল করেছি। আমরা কেবল আমাদের স্বার্থের জন্য গাছ কেটেছি, কিন্তু আমরা ভুলে গিয়েছি, গাছ বাঁচলেই মানুষ বাঁচে। আমাদের উন্নয়ন যদি প্রকৃতির ক্ষয় নিয়ে হয়, তবে তা অস্থায়ী, ক্ষণস্থায়ী এবং বিপজ্জনক।”
গ্রামের মানুষ একদিন সবাই মিলে চারা লাগাতে শুরু করল। ছোট ছোট চারা, কিন্তু বড় আশা। তারা ঠিক করল, উন্নয়ন হবে, কিন্তু প্রকৃতিকে নিয়ে। তারা শিখল, প্রকৃতি শুধুমাত্র উপকরণ নয়, এটি আমাদের জীবন, আমাদের ভবিষ্যৎ, আমাদের নীরব শিক্ষক।
কিন্তু গল্প এখানেই শেষ নয়। প্রকৃতি ধৈর্যশীল। চারা লাগালেই ফল নয়। যত্ন নিতে হয়, পানি দিতে হয়, সময় দিতে হয়। গ্রামের মানুষ শিখল ধৈর্য। শিখল, কেবল কুড়ালের শক্তি নয়, মানুষের অন্তরের সচেতনতা আর দায়িত্বশীলতা প্রকৃতিকে বাঁচাতে পারে।
আজ আমরা কোন দিকে যাচ্ছি? কুড়ালের দিকে, না চারার দিকে? এই সিদ্ধান্ত আমাদের। কারণ একবার ধ্বংস হয়ে গেলে প্রকৃতি আর ফিরে আসে না। কিন্তু যদি আমরা সচেতন হই, দায়িত্বশীল হই, গাছ বাঁচাই, চারা লাগাই—তাহলে আমাদের শিশুরাও শ্বাস নেবে, শিশুরা পাখির গান শুনবে, শিশুরা প্রকৃতির মাঝে বেড়ে উঠবে। গাছ বাঁচলে প্রকৃতি বাঁচে, প্রকৃতি বাঁচলে মানুষ বাঁচে।
এভাবেই শিমুলতলার গ্রামের মানুষ শিখল, গাছ কাটা শুধুমাত্র একটা ঘটনা নয়—এটা আমাদের জীবনের প্রতিচ্ছবি। যা আমরা আজ করি, তার ফল আগামীকাল আমাদের জীবনে পড়ে। আর প্রকৃতি, ধীরে হলেও, তার নিঃশব্দ পাঠ পাঠায়।
16
View