কয়েক সপ্তাহ কেটে গেছে।
চাকরির খবর নেই। শহরটা আগের মতোই ব্যস্ত, অথচ আমার জন্য থেমে আছে। প্রতিদিন সন্ধ্যায় অজান্তেই একই রাস্তায় এসে দাঁড়াই–পুরনো ল্যাম্পপোস্টটার দিকে তাকিয়ে থাকি।
যেন আলোটা কিছু বলতে চায়, কিন্তু শব্দ খুঁজে পায় না।
সেদিন বৃষ্টি ছিল না। এটাই অদ্ভুত।
চায়ের দোকানটা এখনো আছে। একই কেটলি, একই ধোঁয়া, একই কাপে গরম চা। শুধু তৃষা নেই।
চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বসে ছিলাম, হঠাৎ কেউ পাশে এসে দাঁড়াল। চেনা গন্ধ। জুঁই ফুলের হালকা সুবাস। তৃষা…
আজ নীল শাড়ি নয়। সাদামাটা একটা সালওয়ার-কামিজ।
চোখে আগের সেই লাজুক হাসি নেই–বরং এক ধরনের সিদ্ধান্তের দৃঢ়তা।
সে চুপ করে বসল।
কিছুক্ষণ কোনো কথা হলো না।
এই নীরবতাটা শব্দের চেয়েও বেশি কথা বলছিল। শেষ পর্যন্ত তৃষাই ভাঙল নীরবতা।
–“আমি সেদিন যা বলতে পারিনি, আজ বলতে এসেছি।”
আমি কিছু বললাম না। শুধু শুনতে থাকলাম।
–“এই শহরে আমি কাউকে বিশ্বাস করিনি। সম্পর্ক মানে আমার কাছে ছিল ভয়। সবাই আসে, তারপর নিজের মতো গল্প বানিয়ে চলে যায়।”
সে একবার আমার দিকে তাকাল।
–“কিন্তু তুমি শুনতে জানো। জবাব দেওয়ার জন্য নয়, বোঝার জন্য।”

হালকা বাতাসে ল্যাম্পপোস্টের আলো কেঁপে উঠল।
আমি বললাম, –“আমার নিজের জীবনটাই তো এলোমেলো। তবু তোমার কথা শুনতে পারলে… সেটা বোঝা মনে হয়নি।”
তৃষা হাসল। এবার আর লাজুক না।
–“আমি হারিয়ে যেতে চাইনি। আমি শুধু দেখতে চেয়েছিলাম, কেউ খুঁজবে কি না।”
আমি গভীর শ্বাস নিলাম। –“আমি খুঁজছিলাম। প্রতিদিন।”
সে চায়ের কাপে তাকিয়ে বলল, –“জানো, গরম চা যেমন ঠান্ডা হয়, মানুষও তেমন বদলায়। কিন্তু কিছু স্মৃতি থাকে–যেগুলো আবার গরম করা যায়।”
চায়ের শেষ চুমুকটা নিলাম। ল্যাম্পপোস্টের আলো নিভে যাওয়ার আগে তৃষা উঠে দাঁড়াল।
এইবার সে বলল না ‘আবার দেখা হবে’।
সে শুধু বলল, –“চলো, হাঁটি। গল্পগুলো বসে বসে লেখা যায় না।”
আমরা পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করলাম। পেছনে চায়ের দোকান, সামনে অচেনা রাস্তা। বৃষ্টি নেই, তবু মনে হচ্ছিল–এই শহর আবার ভিজে যাচ্ছে।
ল্যাম্পপোস্টের আলো পেছনে পড়ে রইল। কিন্তু ভেতরে কোথাও একটা আলো জ্বলে উঠল।
এই গল্প এখানেই শেষ না।
শুধু এক কাপ চা দিয়ে শুরু হয়েছিল,
এবার সে নিজেই হাত ধরে হাঁটতে শিখেছে।