৩০ ডিসেম্বরের সকাল।
রাজশাহীর শীত শুধু ঠান্ডা নয়—এ শীতের ভেতর থাকে একধরনের স্থিরতা, যেন সময় নিজেই একটু ধীর হয়ে হাঁটে। গ্রান্ড রিভার ভিউ হোটেলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে সাদমান টের পেল, পদ্মার দিক থেকে ভেসে আসা হালকা কুয়াশা আর শীতল বাতাস শহরটাকে আজ অন্যরকম করে তুলেছে। নিশাত গরম চায়ের কাপ দু’হাতে জড়িয়ে ধরে নদীর দিকে তাকিয়ে ছিল—চুপচাপ, অথচ গভীর মনোযোগে।
নাস্তা শেষে আসাদুজ্জামান ভাইয়ের সাথে এশিয়ান ট্যুরের গাড়িতে উঠে তারা বেরিয়ে পড়ল। আজকের দিনটা যেন রাজশাহী নিজেই তাদের কাছে নিজের গল্প খুলে ধরবে—পাতায়, পাথরে, নদীতে আর মানুষের মুখে মুখে।

রেসকোর্স থেকে উদ্যান
সকাল দশটার দিকে তারা পৌঁছাল রাজশাহীর বোটানিক্যাল গার্ডেনে—যার আসল নাম শহীদ এ.এইচ.এম কামারুজ্জামান কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানা। তিনটি টিকিট কেটে ঢোকার মুহূর্তেই
নিশাত বলল,
“ভাবতে ভালো লাগে—একটা জায়গার এতগুলো জীবন থাকে!”
একসময় যে মাঠে ব্রিটিশ আমলে ঘোড়ার খুরের শব্দ পড়ত, টমটমের চাকা ঘুরত, আজ সেখানে পাখির ডাক, গাছের পাতার নড়াচড়া আর মানুষের হাঁটার শব্দ। আসাদুজ্জামান ভাই বলতে লাগলেন—কীভাবে স্বাধীনতার পর এই পরিত্যক্ত জায়গাটাকে শহরের শ্বাস নেওয়ার জায়গা করে তোলা হয়েছিল।
শীতের রোদ গাছের পাতার ফাঁক গলে পড়ে ছায়া–আলোয় এক অদ্ভুত নকশা এঁকে দিচ্ছিল। সাদমান মনে মনে ভাবল—ইতিহাস শুধু বইয়ে থাকে না, ইতিহাস অনেক সময় নিঃশব্দে আমাদের পাশ দিয়েই হেঁটে যায়।
পাথরের ভাষা, সময়ের স্মৃতি
দুপুরের আগেই তারা রওনা হলো বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরের দিকে। মাত্র তিন কিলোমিটার পথ, কিন্তু শহরের রাস্তা বদলানোর সাথে সাথে সময়ের স্তরও যেন বদলে যাচ্ছিল।
ভেতরে ঢুকেই নিশাত থমকে দাঁড়াল। হাজার বছরের পুরোনো ভাস্কর্য, শিলালিপি, মুদ্রা—সবাই যেন নীরবে তাকিয়ে আছে বর্তমানের মানুষের দিকে। জাদুঘরের কর্মীদের কথা, আসাদুজ্জামান ভাইয়ের ব্যাখ্যা, আর দেয়ালে লেখা সাল–তারিখ—সব মিলিয়ে জায়গাটা যেন এক জীবন্ত পাঠশালা।
পাল–সেন–গুপ্ত আমলের পাথরের মুখগুলো দেখে সাদমান অনুভব করল, সময় আসলে হারায় না—শুধু রূপ বদলায়। রাজশাহী শহর তার আধুনিক কোলাহলের আড়ালেও এই প্রাচীন স্মৃতিগুলো আগলে রেখেছে।
নদীর কাছে বিকেল
দুপুর গড়িয়ে বিকেল। আই বাঁধে পৌঁছাতে পৌঁছাতে আকাশে রোদের রঙ নরম হয়ে এসেছে। ৪.৮ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে যখন তারা বাঁধের ওপর দাঁড়াল, পদ্মা তখন প্রশস্ত বুক মেলে নিশ্চুপ বয়ে যাচ্ছে।
আই আকৃতির এই বাঁধ শুধু মাটি আর প্রকৌশল নয়—এটা শহরকে রক্ষা করার এক নীরব প্রতিজ্ঞা। স্থানীয় মানুষদের কথা, নদীভাঙনের গল্প, আর দূরে সূর্যাস্তের কমলা আলো—সব মিলিয়ে বিকেলটা যেন হঠাৎ করেই গভীর হয়ে উঠল।
নিশাত বলল,
“নদী দেখলে মনে হয়—সব কিছুর শেষ নেই, শুধু প্রবাহ আছে।”
দরগার নীরবতা
সন্ধ্যার আগেই তারা গেল শাহ মখদুম রূপোশ (র.)–এর মাজারে। পদ্মার তীর ঘেঁষা দরগাপাড়া এলাকায় সন্ধ্যার আলো অন্যরকম শান্ত। এখানে শব্দ কম, অনুভব বেশি।
শাহ মখদুমের জীবনকথা—বাগদাদ থেকে রাজশাহী, অত্যাচারী শাসকের পতন, শান্তির প্রতিষ্ঠা—সবকিছু যেন বাতাসের ভেতর ভাসছিল। মাজার প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে সাদমান অনুভব করল, ইতিহাস এখানে শুধু ঘটনা নয়, বিশ্বাস আর আস্থার গল্প।
ফিরে আসা
দিন শেষে তারা আবার হোটেলের পথে। গাড়ির জানালা দিয়ে রাজশাহীর রাতের আলো দেখা যায়—শান্ত, পরিমিত, অপ্রদর্শনমূলক।
এই শহর চিৎকার করে নিজের পরিচয় দেয় না। রাজশাহী কথা বলে ধীরে—নদীর মতো, শীতের বাতাসের মতো, পুরোনো পাথরের মতো।
মধুমতি এক্সপ্রেসের প্রথম যাত্রা যেখানে গন্তব্যের দিকে ছিল, এই দ্বিতীয় পাঠ সেখানে পৌঁছে শিখিয়ে দিল—
ভ্রমণ আসলে জায়গা দেখা নয়,
ভ্রমণ হলো সময়কে ছুঁয়ে দেখা।