Posts

চিন্তা

একটি পত্র.!

January 19, 2026

Mohammad Siddek

Original Author মোহাম্মদ সিদ্দীক

27
View

একটি নীল খামের কান্না: রক্তের সম্পর্কের ইতি

​আরিফ সাহেব যখন আজ স্টোর রুমের পুরনো ধুলোবালি পরিষ্কার করছিলেন, তখন হঠাৎ একটি পুরনো পারিবারিক ছবি হাতে এলো। ছবিতে পাঁচ ভাইবোন একসাথে হাসছে—মাঝখানে আরিফ সাহেব বড় ভাই হিসেবে সবাইকে আগলে রেখেছেন। ছবিটি দেখে তার বুকটা হু হু করে উঠল। এক ফোঁটা তপ্ত অশ্রু ছবির ওপর পড়তেই যেন বর্তমানের রূঢ় বাস্তবতা চোখের সামনে ভেসে উঠল।

​আরিফ সাহেব ছিলেন সেই বড় ভাই, যিনি বাবার মৃত্যুর পর নিজের ক্যারিয়ার, শখ, এমনকি নিজের সুখের কথা ভাবেননি। দিনরাত এক করে পরিশ্রম করেছেন শুধু ছোট চার ভাইবোনকে মানুষের মতো মানুষ করতে। বড় বোনটির বিয়ে দিয়েছেন ধুমধাম করে, মেজ ভাইকে বিদেশে পাঠিয়েছেন নিজের জমানো শেষ টাকা দিয়ে, আর দুই ছোট ভাইকে শহরের নামী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়েছেন।

বিশ্বাসের অমর্যাদা

আরিফ সাহেব ভেবেছিলেন, ভাইবোনেরা বড় হয়ে তার পাশে দাঁড়াবে। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। বাবার রেখে যাওয়া যে পৈতৃক ভিটে আর সামান্য কিছু জমি ছিল, সেটার দিকেই ছিল সবার নজর।

​এক শীতের বিকেলে মেজ ভাই বিদেশ থেকে ফিরে সবাইকে এক করল। তারা দাবি তুলল, পৈতৃক সম্পত্তি ভাগ করতে হবে। আরিফ সাহেব শান্তভাবে বললেন, "সবই তো তোমাদের, ভাগাভাগির কী আছে?" কিন্তু তিনি জানতেন না, পর্দার আড়ালে চার ভাইবোন মিলে আগেই জাল দলিল তৈরি করে রেখেছে।

সেই চরম মুহূর্ত

একটি উকিল নোটিশ যখন আরিফ সাহেবের হাতে এলো, তখন তার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেল। যে ভাইদের তিনি কোলে-পিঠে করে মানুষ করেছেন, তারাই আজ আদালতে দাঁড়িয়ে দাবি করছে যে, আরিফ সাহেব নাকি বাবার সম্পত্তির সিংহভাগ অবৈধভাবে ভোগ করছেন।

​ছোট বোনটি, যার চোখের জল দেখলে আরিফ সাহেব পাগল হয়ে যেতেন, সে আজ সবার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, "বড় ভাই তো আমাদের জন্য যা করেছে, সেটা তার দায়িত্ব ছিল। এখন আমাদের ন্যায্য পাওনা বুঝিয়ে দিলেই হয়।"

হৃদয় ভাঙার শব্দ

সেই মুহূর্তে আরিফ সাহেব বুঝতে পারলেন, মানুষের শরীরের হাড় ভাঙলে শব্দ হয়, কিন্তু কলিজা বা হৃদয় যখন আপন মানুষের আঘাতে চুরমার হয়, তখন কোনো শব্দ হয় না। শুধু নিঃশ্বাসে টান পড়ে। তিনি কোনো প্রতিবাদ করলেন না। আদালতে গিয়ে শান্তভাবে সই করে দিলেন সব কাগজে।

​বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে আসার সময় তিনি শুধু একটি কথাই বললেন,

​"আমি তোদের সম্পত্তি দিয়েছিলাম আমার ভালোবাসা মনে করে, আর তোরা সেটা নিলি অধিকার মনে করে। আজ থেকে আমার রক্তে কোনো ভাইবোন রইল না, রইল শুধু কিছু অপরিচিত মুখ।"


 

উপসংহার

আজ আরিফ সাহেব একাকী এক ভাড়া বাসায় থাকেন। তার চার ভাইবোন এখন খুব বিত্তবান, দামী গাড়িতে ঘোরে। কিন্তু আরিফ সাহেবের সেই জরাজীর্ণ স্টোর রুমের ছবির হাসিমুখগুলো আজ কোথাও নেই। মাঝে মাঝে রাতের আঁধারে তিনি ভাবেন, মানুষের দেওয়া ক্ষত হয়তো শুকিয়ে যায়, কিন্তু নিজের রক্তের দেওয়া বিষাক্ত ছোবল আত্মার ভেতর আমৃত্যু বয়ে বেড়াতে হয়।

Comments

    Please login to post comment. Login