Posts

প্রবন্ধ

রাম গোপাল ভার্মা: দ্য ইন্সটিটিউশন অফ গ্যাংস্টার ফিল্ম

January 20, 2026

সুমন বৈদ্য

Original Author সুমন বৈদ্য

106
View
Ram Gopal Varma booked in Andhra Pradesh for hurting Hindu sentiments, case  filed by Rashtriya Praja Congress president Meda Srinivas - India Today
রাম গোপাল ভার্মা

• Why RGV remains the blueprint of gangster cinema

রাম গোপাল ভার্মা যাকে বলা হয় গ্যাংস্টার সিনেমা তৈরি করার আঁতুরঘর। সিনেমার সাংবিধানিক অর্থে বলা যায় এক প্রতিষ্ঠানের নাম।তিনি এমন একজন পরিচালক তাকে কিছু সো কলড  পরিচালক বা প্রযোজকের গণ্ডিতে তাঁকে বেঁধে রাখা বোধহয় ঠিক নয়। একের পর এক ভাল গ্যাংস্টার ছবি উপহার দিয়েছেন বলিউডকে।বিশেষত গ্যাংস্টার মুভিজ।গ্যাংস্টার সিনেমা এইটা বুঝায় না শুধু কয়েকটা গ্ৰুপের সংঘর্ষ। গ্যাংস্টার তৈরি হয় সমাজের সো কলড কিছু অসদুপায় ব্যক্তির মাধ্যমে। রাম গোপাল ভার্মা যেনো বিষয়টিকে যেনো অন্য মাত্রায় নিয়ে গেলেন। তার এই গ্যাংস্টার ফিল্ম/চরিত্রের উপর আকর্ষণ জন্মেছিল দ্য গডফাদার সিনেমা থেকে।দ্য গডফাদার তাঁর কাছে শুধু একটা সিনেমা নয়, এক ধরনের নেশা; তাঁর বহু নায়কই যেন ব্রুসলি থেকে অনুপ্রাণিত।

“বড় হয়ে নিজের বোধবুদ্ধি তৈরি হওয়ার পর থেকে তিনি কোনোদিন সো কলড বড়দের সম্মান করেননি, বন্ধুত্বকে গুরুত্ব দেইনি অথবা তেমন শিক্ষা নিয়েও ভাবিনি। একটিমাত্র জিনিস যেটা উপভোগ করেছেন, শ্রদ্ধা করেছেন, গুরুত্ব দিয়েছেন, ভালবেসেছেন এবং বিশ্বাস করেছেন, সেটা হল ফিল্ম-মেকিং।” তার নিজের একটি বই আছে নাম, গানস এন্ড থাইস- দ্যা স্টোরি অফ মাই লাইফ; যেখানে তিনি তার সিনেমার মতাদর্শ, সিনেমা তৈরির জন্য যে গল্পগুলো তাকে ভাবায় সেইসব নিয়ে আলোচনা করেছেন। এই ছাড়াও এই বইটির একটি বিশেষত্ব আছে। সিনেমার প্রতি প্রবল আকর্ষণ বোধ ছিলো রামুর সেই ছোট থেকেই। তার সবচেয়ে পছন্দের বিষয় ছিলো আশির দশকে অমিতাভ বচ্চনের হাতে থাকা বন্দুক ও শ্রীদেবীর উরু।যুবক বয়সে শ্রীদেবীর বাড়ির সামনে দাড়িয়ে থাকতেন। তার বায়োপিকে শ্রীদেবীকে সৌন্দর্যের দেবি আখ্যা দেন।

অনেকদিন ধরে আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ে চর্চা তার এবং পড়াশোনা করেছেন। রিসার্চ করতে গিয়ে গ্রাউন্ড রিয়ালিটি ঠিক কী, জানার চেষ্টা করেছেন। কেন এটা ‘ডি-কোম্পানি’, ঠিক কোন-কোন জায়গা থেকে এটা সাধারণ যে কোনও কোম্পানির মতো করে চালনা করা হত, ৮০-র দশকে যাঁরা গ্যাংয়ে ছিলেন, করিম লালা-সহ আরও অনেকে তাঁদের সাইকোলজি কী ছিল, সে সব বোঝার চেষ্টা করেছেন বিভিন্ন সোর্সের মাধ্যমে। সে সময় যে সব পুলিশ অফিসাররা বিভিন্ন গ্যাং সামলেছিলেন, তাঁদের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং তাঁদের অভিজ্ঞতা জানার চেষ্টা করেছেন ফলে তিনি ‘ডি-কোম্পানি’ তথা দাউদ ইব্রাহিমকে নিয়ে নয়, বহু মানুষ দাউদের ছায়ায় বাঁচত, আবার দাউদের ছায়াতেই মৃত্যু হয়েছিল তাঁদেরকে খুবই কাছ থেকে দেখার চেষ্টা করেছেন এবং নিজের পর্দাতেও খুবই রুক্ষ, করুণ অবস্থাগুলো দেখানোর চেষ্টা করেছেন।রামুর খুবই পছন্দের জায়গা ডার্ক; বিষয়টা তার সব সময়ই ভাল লাগে। আপনি লক্ষ্য করলে দেখবেন, রামু কখনও ছবিতে গ্যাংস্টারদের সাদা-কালো বা ভাল-মন্দ হিসেবে দেখাতে চাইনি। তিনি ঠান্ডা মাথার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখাতে চেয়েছেন, কত সহজে কত কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে মানুষগুলো। চরিত্রের অন্ধকার দিক থাকলেও তারাও তো মানুষ। দিনের শেষে সেই মানুষটা কী ভাবে, রামুকে ভাবায়, ফ্যাসিনেট করে।

Ram Gopal Varma - Bharatpedia
রাম গোপাল ভার্মা

সত্য (১৯৯৮), কউন (১৯৯৯), কোম্পানি (২০০২) সরকার (২০০৫), সরকার রাজ (২০০৮), রক্ত চরিত্র ও রক্ত চরিত্র ২ (২০১০), এই সিনেমা বরাবরই আমার পছন্দের এবং এখনো পুরোনো স্বাদের ঢেঁকুর তুলতে এই সিনেমাগুলি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখা হয়।তারপর পরবর্তী তিন দশকে রাম গোপাল ভার্মা বানালেন নাচ, কন্ট্র্যাক্ট, আগ-একটার পর একটা ব্যর্থতা এবং সেই সিনেমাগুলো কোনো জাতেরই ছিলো না।একজন সিনেমাপ্রেমী ও গণমাধ্যমের শিক্ষার্থী হিসেবে রাম গোপাল ভার্মার সিনেমা সবসময় আমাকে সিনেমার প্রতি আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি করতে সাহায্য করেছে‌। এবং তিনি আমার পছন্দের পরিচালকের মধ্যে একজন।যেখানে ইয়ং জেনারেশন সো কলড মির্জাপুর, কেজিএফ, পুষ্পা, মার্কোর মতো সিনেমা/ওয়েব সিরিজকে গ্যাংস্টার সিনেমার আদর্শ মানতে ব্যস্ত তখনই আমার রাম গোপাল ভার্মার দেখানো সমাজের নোংরা বাস্তবতার কথা মনে পড়ে, মনে পড়ে অকারণ উত্তেজনা, ফাঁপা সংলাপ না বলে নীরবতায়, ভায়োলেন্স কীভাবে প্রয়োগ করে‌।সিনেমাপ্রেমী ও গণমাধ্যমের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে রাম গোপাল ভার্মার মুখোমুখি বসে তাঁর সাক্ষাৎকার নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা আমার বহুদিনের।কিন্তু দূরত্বের কারণে তা সম্ভব নয়, তাই এই লেখাটিই দূর থেকে রইল তার প্রতি আমার উৎসর্গ।

রাম গোপাল ভার্মার সরকার সিনেমার সেই দৃশ্যটা এখনো আমার চোখে ভাসে যেখানে রশীদ দুবাই থেকে এসে অবৈধ ব্যবসা করার জন্য সরকারকে প্রস্তাব দেয়, ঠিক তখনই থমথমে পরিস্থিতি তৈরি হয় সেই অবস্থায় সরকার চিৎকার না করে, হুমকি না দিয়েও সে শুধু নিজের অবস্থান জানিয়ে দিয়ে বলে উঠে, "মুঝে যো সেহি লাগতা হ্যায়, ম্যাঁ করতা হুঁ…ওহ চাহে ভগবান কে খিলাফ হো, সমাজ কে খিলাফ হো,পুলিশ, কানুন…ইয়া ফির পুরো সিস্টেম কে খিলাফ কিউঁ না হো।" এখানেই রাম গোপাল ভার্মা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখান, "ক্ষমতা কখনো উত্তেজনায় কথা বলে না, ক্ষমতা কথা বলে ঠান্ডা মাথায়"।

ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে আপনি কী কী করতে পারেন?তেলুগুভাষী রাজ্যগুলোতে একটি প্রচলিত রসিকতা আছে-নিজের আসল প্যাশন খুঁজে পেতে হলে আগে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে হয়। সেই অর্থে, ইঞ্জিনিয়ারিং একজন তেলুগু ছেলের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ বা বংশগত পরম্পরা।তাই অবাক হওয়ার কিছু নেই যে, বহু তেলুগু যুবক ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে, কয়েক বছর চাকরি করে, কিছু টাকা জমানো শেষে স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা হয়ে ওঠেন। নাগেশ কুকুনূর, শেখর কাম্মুলা, শ্রীনিবাস অবসরালা, তরুণ ভাস্কার-তালিকাটা দীর্ঘ।তবে তাঁদের মধ্যে প্রথম ছিলেন রাম গোপাল ভার্মা।

তেলেগু রাজ্যের বংশগত পরম্পরা ইঞ্জিনিয়ার নিয়ে পড়াশোনা করার পর চাকরি নিয়ে হন্যে না হয়ে দুনিয়াকে অবাক করে, রাম গোপাল বর্মা খুলে বসলেন ভিডিও রেন্টাল লাইব্রেরি, ‘মুভি হাউজ’। পুঁজি, ২০,০০০ টাকা। ব্যবসা শুরুর আগেই, পরিচিত একজন ঠকিয়ে দিল অর্ধেক টাকা।

রামু ঘাবড়ালেন না। নিম্নবিত্ত এলাকায় দোকান। রোজকার খাটনির শেষে, লোকজন এলে, তাঁদের বসিয়ে, গল্প শোনাতে শুরু করলেন তিনি– রুচি বুঝে, রসিয়ে-কষিয়ে, সিনেমার গল্পই। ফলে, দুটো কাজ হল। এক, গল্প শোনার লোভে, গরিবগুরবো মানুষের ভিড় বাড়তে থাকল; ভিড় দেখে, কৌতূহলে, পয়সাওয়ালারা ক্যাসেট ভাড়া করতে শুরু করলেন। দুই, মজবুত হতে থাকল রামুর স্টোরিটেলিং স্কিল।

মাস আটেক পর, পুলিশ এসে, থানায় নিয়ে গেল তাঁকে। অপরাধ,‘আখরি রাস্তা’-র পাইরেটেড কপি তাঁর দোকানে। লকআপে ঢুকে, রামু কাজে লাগালেন স্টোরিটেলিং স্কিল; বন্ধু বানালেন পুলিশেদের। কলেজকালে তাঁর কাজ ছিল এলাকার গুন্ডা-মস্তানদের খেয়াল করা– সমাজের কাছে অচ্ছুত লোকগুলো কী করেন, কেন করেন, তাঁদের জীবন কেমন- এইসব। এবার বুঝতে শুরু করলেন পুলিশের সাইকোলজি।জিতেন্দ্র-শ্রীদেবী জুটিতে, বাপ্পি লাহিড়ীর মিউজিকে, ‘হিম্মতওয়ালা’ তখন সুপারহিট; ডিরেক্টর, রাঘবেন্দ্র রাও। পরবর্তী সিনেমার জন্য, রাঘবেন্দ্রকে সাইন করিয়েছিলেন নাগার্জুনের ভাই, ভেঙ্কট। কিন্তু, ভেঙ্কটের কাছে কোনও স্টোরি ছিল না। খবরটা পেয়েই, স্টোরি নিয়ে হাজির হলেন রামু। ভেঙ্কট বললেন, ‘তেলুগু মার্কেটে খাবে না, অন্য কিছু দাও!’ (সেদিনের নাকচ কাহিনি, পরে, ‘রাত্রি’; হিন্দিতে, ‘রাত’।)

বলে রাখা ভালো, রামু প্রথম ছবি বানানোর প্রেক্ষাপট বুঝতে গেলে, আশির দশকের তেলুগু সিনেমার দুনিয়াটাকে একটু চিনে নিতে হয়। একদিকে ছিলেন কে. বিশ্বনাথ ও বামসি-যাঁরা সমাজের অসঙ্গতি নিয়ে বাস্তবধর্মী ছবি বানাতেন। আর অন্যদিকে ছিলেন কে. রাঘবেন্দ্র রাও ও ইভিভি সত্যনারায়ণা-যাঁদের ছবিতে নায়িকাদের নাভি থেকে আঙুর তুলে নিত টিয়া পাখি।তখন ইন্ডাস্ট্রিতে সুপারস্টারদের বদল হচ্ছিল। কৃষ্ণা ও শোভাবন বাবুর মতো পুরোনো তারকারা সরে যাচ্ছিলেন। এন.টি. রামা রাও তখনো ছবি করতেন, কিন্তু চোখ ছিল রাজনীতিতে। সেই শূন্যতা পূরণ করছিলেন চিরঞ্জীবী, নাগার্জুন ও বেঙ্কটেশ-নতুন প্রজন্মের নায়কেরা।মুখ বদলালেও চরিত্র বদলায়নি।

তেলুগু নায়কের ওপর তখনো চাপ ছিল ইন্ড্রাস্ট্রিতে জায়গা আয়ত্ত করতে হবে। নায়িকাকে প্রেম নিবেদন, খলনায়ককে হত্যা, বোনের ইজ্জত রক্ষা, নিপীড়িতদের জন্য ন্যায়বিচার-সব একসঙ্গে সামলাতে হতো, এইসব ছিলো তখনকার ইন্ড্রাস্ট্রির নিয়মিত চর্চা।এই ঘুরপাক খাওয়া বৃত্তে ইন্ড্রাস্ট্রির সৃজনশীলতা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলো এবং ঝুঁকি নেওয়ার বদলে নিরাপদ পথে হাঁটাকেই যেনো তারা সাধুবাদ জানাতো।ঘণ্টা খানেক পরেই আবার এলেন রামু, সঙ্গে নতুন স্টোরি- এবার, গ্যাংস্টার ড্রামা ও স্টুডেন্ট পলিটিক্সের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিশিয়েছেন ‘অর্ধসত্য’, ‘অর্জুন’, আর ‘কালচক্র’। ভেঙ্কটের খুব পছন্দ হল; কিন্তু, রাঘবেন্দ্র বললেন, ‘ভীষণ এক্সপেরিমেন্টাল!’

রামু বুঝলেন, সিনেমাটা নিজেকেই বানাতে হবে; সুতরাং, সিনেমাটা শিখতে হবে। প্রোডিউসার সুরেন্দ্র তখন নাগার্জুনকে নিয়ে নতুন সিনেমায় হাত দিয়েছেন; ডিরেক্টর, বি. গোপাল। সুরেন্দ্রকে বলে-কয়ে, গোপালের ফিফথ অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে ঢুকে পড়লেন রামু। স্ক্রিপ্ট-রিডিং সেশনে, এমন এমন সাজেশন আর আইডিয়া দিতে শুরু করলেন তিনি, ক’দিনের মধ্যেই পেয়ে গেলেন প্রোমোশন! মানে, হাউজ থেকে দিয়ে দিল যাতায়াতের গাড়ি।

এদিকে ডিরেক্টরের চোখের বালি, রামু। দোষ, অ্যাটিটিউড আর ফটরফটর ইংরেজি। প্রোডিউসার বাজেট কমাতে বলায়, গোপাল বললেন, ‘নতুন ছোকরাকে কাটাও!’ বাস্তবিক, রামুর দ্বারা কাজকম্ম হচ্ছিল না। নিরুপায় সুরেন্দ্র তাঁকে বললেন, ‘এমনি থাকো, কিন্তু কোনও দায়িত্ব নিও না।’

খুশিই হলেন রামু। ইউনিটের বাকিরা যখন ভাবছেন, ‘ছেলেটা ফালতু সময় কাটায়!’ – রামু আবার কাজে লাগালেন স্টোরিটেলিং স্কিল। এবার, শ্রোতা, শটের ফাঁকে ফাঁকে, নাগার্জুন। অচিরে, রামু আখ্যা পেলেন, ‘নাগার্জুনের চামচা’।তেলুগু ইন্ডাস্ট্রিতে, নাগার্জুন তখন উদীয়মান স্টার! ততদিনে, ভেঙ্কট, সুরেন্দ্র আর নাগার্জুনের সঙ্গে গাঢ় হয়েছে রামুর সম্পর্ক। মনে মনে নাগার্জুন চাইছেন এবার রামু একটা সিনেমা বানাক। কিন্তু, তাঁর বাবা, ‘অন্নপূর্ণা স্টুডিওজ’-এর কর্ণধার, নাগেশ্বর রাও বললেন, ‘শুধু ইংরেজি কপচালে, ইংলিশ নভেল আর ফিল্মের মুখস্থ বুলি আওড়ালে, ডিরেক্টর হওয়া যায় না।’

পরিচালক তরণী তখন একটা শুটিং করছেন, যেখানে একটা সিনের স্ট্রাকচার নিয়ে নাগেশ্বরের সন্দেহ হল। ব্যাপারটা বোঝাতে না পেরে, তরণী দোহাই পাড়লেন, ‘এটা রামু আর সুরেন্দ্রর মাথা থেকে বেরিয়েছে।’ দু’জনকে ডেকে, নাগেশ্বর যখন হম্বিতম্বি করছেন, রামু তাঁকে থামালেন; পুরো দৃশ্যটা ব্যাখ্যা করলেন; গোটা সিনেমাতে সেটার গুরুত্ব বোঝালেন। নাগেশ্বর বললেন, ‘সিনটা তাহলে তুমিই শুট করো! দেখি, কেমন হয়!’ সেদিন বাড়ি ফিরে, ছেলেকে বললেন তিনি, ‘নতুন ছোকরাটি বেশ ইম্প্রেসিভ!’নাগার্জুনের মুখে খবরটা শুনে, রামু বুঝলেন এটাই তাঁর কাঙ্ক্ষিত সিনেমার সুযোগ; ঝুলি থেকে বের করলেন স্টুডেন্ট পলিটিক্সের সেই বাতিল গল্প। নায়ক, ভবানী; খলনায়ক, শিবা। নাগার্জুন রাজি, তবে একটা শর্তে: পাল্টাপাল্টি করতে হবে সুর-অসুরের নাম। আনকোরা পরিচালক, এক বাক্যে, মেনে নিলেন নায়কের আবদার। শুরু হল ‘শিবা’-র প্রি-প্রোডাকশন।

When Ram Gopal Varma narrated SHIVA's script to Nagarjuna 28 years ago,  this is what it looked like - Bollywood News & Gossip, Movie Reviews,  Trailers & Videos at Bollywoodlife.com
নাগার্জুনকে ‘শিবা’-র স্ক্রিপ্ট বুঝাছিলেন রাম গোপাল ভার্মা

কয়েক বছর আগে, ‘আমেরিকান সিনেমাটোগ্রাফার’-এ, স্টেডিক্যাম সম্বন্ধে পড়েছিলেন রামু। জিনিসটা খুব ইন্টারেস্টিং লেগেছিল তাঁর। ভাবলেন, প্রথম সিনেমাতেই কোথাও যদি কাজে লাগানো যায় সেটা! এদিক-সেদিক কথা বলতে বলতে, জানতে পারলেন, চেন্নাইয়ে ওই যন্ত্র একখান আছে বটে; কিন্তু, চার বছর ধরে পড়ে পড়ে ধুলো জমছে, কেউ কখনও ব্যবহার করেনি। মুখ বেঁকালেন সিনেমাটোগ্রাফার গোপাল রেড্ডি, ‘এ দেশে ওই ক্যামেরা হ্যান্ডেল করার লোক কোথায়!’রামু ঘাবড়ালেন না। খোঁজ লাগালেন চারিদিকে। জানা গেল, বম্বের এক বঙ্গসন্তান, জার্মানি থেকে সিনেমাটোগ্রাফি শিখে, আমেরিকা থেকে স্টেডিক্যামের আলাদা ট্রেনিং নিয়ে, বম্বের বেশ্যাপল্লি আর ডাব্বাওয়ালাদের নিয়ে ডকু বানিয়ে ঘুরছেন। নাম, দীপ পাল। চেন্নাই থেকে স্টেডিক্যামটা আনিয়ে, দীপকে ডাকা হল সেটা চালাতে।

দীপের বাবা, কোলিন পাল। কোলিন ছিলেন মেনস্ট্রিম হিন্দি ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির পাব্লিসিস্ট। উর্দু মেশানো ভাষার বদলে, কথ্য হিন্দুস্থানি ভাষা ব্যবহারের পক্ষে সওয়াল করেছিলেন তিনি। এখনের সময়ে যে-হিন্দি আমরা পর্দায় শুনতে পাই, বহু বছর আগে, তার পিছনে ছিল এক বাঙালির হাত। কোলিনের বাবা, নিরঞ্জন পাল। নিরঞ্জন ছিলেন বম্বে টকিজে স্ক্রিপ্টরাইটার, ডিরেক্টর। যে দুটো ব্লকবাস্টার রাতারাতি দেশের হার্টথ্রব করে তুলেছিল অশোক কুমারকে– ‘অচ্ছুত কন্যা’ আর ‘জীবন নাইয়া’– সে দুটো তাঁরই লেখা। নিরঞ্জনের বাবা, পরাধীন ভারতে রাজনীতির গ্রাফ বদলে দেওয়া ‘লাল-বাল-পাল’ ত্রয়ীর, হ্যাঁ, বিপিন চন্দ্র পাল।

Shiva (1990) - IMDb
‘শিবা’ সিনেমার পোস্টার

১৯৯০ সালে মুক্তি পেলো স্টুডেন্ট আন্ডারওয়ার্ল্ড পলিটিক্স শিবা। যা তার অঘোষিত আন্ডারওয়ার্ল্ড সিনেমার প্রথম সংস্করণ। যে পরিচালক একে তো নবাগত-যিনি ইংরেজিতে কথা বলেন, কমিক বই পড়েন, আর তেলুগু ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির দশকের পর দশক ধরে চলে আসা নিয়মকানুনের তোয়াক্কাই করেন না, বছরের পর বছর চলে অতিরিক্ত অপ্রয়োজনীয় মেলোড্রামাটিকে তিনি পছন্দ করেন না বললেই চলে; বরং তিনি দৃশ্যপাতও করেন না। ছবি মুক্তির সঙ্গে সঙ্গেই দর্শকদের করতালিতে হল কেঁপে উঠল। তারপর থেকে ইন্ডাস্ট্রি আর আগের মতো রইল না। সেইসাথে ভারতীয় অ্যাকশন ফিল্মের চোখে এসে পড়ল সজোর এক ঘুসি। সাধারণ দর্শক থেকে ক্রিটিককুল– সকলেই হাঁ হয়ে গেলেন রামুর ডেবিউতে। দীপ পালের কাজ এত দ্রুত ছাপ ফেলল ইন্ডাস্ট্রিতে, ‘শিবা’ রিলিজের এক বছরের মধ্যে, দশটারও বেশি স্টেডিক্যাম আনাতে হল এদেশে। হায়দরাবাদে তখন একটা কথা চালু হয়ে গিয়েছিল ছিল-“শিবা চুসাম, বন্দি এক্কাম” (আমরা শিবা দেখেছি, আর তারপর বাসে উঠে পড়েছি-মানে, জীবনটাই বদলে গেছে)।

পরের কয়েক বছরে সিনেমার অলিগলিতে এক অদ্ভুত টান সৃষ্টি হয়।  ইন্ডাস্ট্রির দৃশ্যপট বদলানোর স্বপ্ন নিয়ে একের পর এক পরিচালক, অভিনেতা আর চিত্রনাট্যকার এসে ভিড় জমালেন তাঁর পাশে। রুক্ষ, আপসহীন, নিয়মভাঙা এক চলচ্চিত্রকার-রাম গোপাল ভার্মা-যিনি এসেছিলেন ইন্ডাস্ট্রির নিয়ম ভাঙতে, স্বস্তির ছক ভেঙে দিতে, নতুন কিছু জন্ম দেওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা ছিলো।তিনি রাম গোপাল ভার্মা-শুধু ‘রাফ অ্যান্ড টাফ’ নন, বরং মূলস্রোতের ভদ্রতাকে অস্বস্তিতে ফেলেছিলেন। তাঁর ক্যামেরা ভয় পেত না, যাঁর গল্প আপস মানত না, আর তাঁর চিন্তা ইন্ডাস্ট্রিকে বাধ্য করেছিল নতুন করে নিজের দিকে তাকাতে।নব্বইয়ের দশকের পরিচালকদের মধ্যে রাম গোপাল ভার্মার ছবিগুলোই সবচেয়ে চেনা। তাঁর নায়কেরা ছিল অতোটা বড় মাপের নয় কিন্তু চরিত্র অনুযায়ী যতোটা শক্তিশালী দেখানো যায় ঠিক ততটুকুই, তারা কিন্তু মাটিতে পা রাখতো।সো কলড হিরো কেজিএফ, পুষ্পার মতো অতোটা গ্লোরিয়াস করা হতো না।তারা ভিলেনকে ধুলোয় মেশাত এবং তখনকার দিনে একটা প্রচলন ছিলো হিরো-হিরোইন নাচ গান মানেই থাইল্যান্ড অথবা সুইজারল্যান্ড। কিন্তু রামুর সিনেমায় ইন্টারভ্যালের পর সুইজারল্যান্ডে গিয়ে নাচত না।

Ram Gopal Varma
রাম গোপাল ভার্মা

আলো, সাউন্ড ডিজাইন, ক্যামেরার কাজ-সবকিছুতেই ছিল এক ধরনের রুক্ষ, গ্রিটি অনুভূতি। অথচ পরিচালক নিজে ছিলেন অদৃশ্য। খুব কম সাক্ষাৎকার, প্রায় কোনো ছবি নেই। আজকের দিনে ভাবাই যায় না-নব্বইয়ের দশকের রাম গোপাল ভার্মা ছিলেন এক অদৃশ্য শয়তান।শিবা-র পর এলো ড্রাক-হরর থ্রিলার সিনেমা রাত, জেমস হ্যাডলি চেজের  উপন্যাস মাই লাফজ কামজ লাস্ট ইন মাইন্ড অবলম্বনে দ্রোহী-র মতো ডার্ক ভায়োলেন্স আর হররের ভেতর দিয়েও রামু প্রমাণ করে দেন-তিনি চেনা ছকের নির্মাতা নন। তাঁর ক্যামেরা কখনোই দর্শককে স্বস্তির কম্বল জড়িয়ে বসতে দেয় না। বরং অস্বস্তির আঁচে পোড়ায়, চোখে আঙুল দিয়ে দেখায় সমাজের জমে থাকা অন্ধকার। যদিও দ্রোহী রাত সিনেমা দুটি ছিলো ফ্লপ তবু সেগুলিও পারিবারিক মেলোড্রামা আর সিরাপি প্রেমের বিরুদ্ধে এক নীরব প্রতিবাদ করেছিলেন রামু।রামুর এই ট্র্যাডিশনাল সিনেমার স্ট্রাকচার ভেঙ্গে দেওয়া দেখে তৎকালীন সময়ে গ্র্যাডি হেনড্রিক্স বলেছিলেন,“রাম গোপাল ভার্মাকে না জানলে আপনি বলিউড সম্পর্কে যা জানেন, তার সবটাই ভুল।”এই ছবিগুলো আপাতদৃষ্টিতে ভয়ংকর, রক্তাক্ত, কখনো নির্মম-কিন্তু তার ভেতরে লুকিয়ে থাকে এক নিঃশব্দ প্রতিবাদ। পারিবারিক মেলোড্রামার আর মদের সিরাপি প্রেমের বিপরীতে দাঁড়িয়ে রামু নির্মাণ করেন এমন সিনেমা, যা আরাম দেয় না, বরং প্রশ্ন তোলে। ভয় দেখিয়ে নয়, অস্বস্তি জাগিয়ে, এক নীরব প্রতিবাদী হয়ে তিনি দর্শককে বাধ্য করেন ভাবতে।

রাম গোপাল ভার্মা সিনেমা ইন্ড্রাস্ট্রিতে নায়কের সংজ্ঞা বদলে দিয়েছিলেন। বিশেষ করে গ্যাংস্টার ফিল্মে। তথাকথিত কেজিএফ, পুষ্পা, মার্কো সিনেমাতে নায়কদের যে আলিশান লুক এবং ভাবভঙ্গি দেখা যেতো তার ছিটেফোঁটাও ছিলো না রামুর সিনেমায়। তাঁর ছবিতে কখনোই প্রচলিত ‘হ্যান্ডসাম’ অভিনেতারা থাকত না। জেডি চক্রবর্তীকে মনে হতো-গাঁজা টানা কোনো আর্টসের ছাত্র, যে জুনিয়রদের কুর্তা ধার নেয়। মনোজ বাজপেয়ী সেই কলেজেরই সিনিয়র, যে জেডিকে বুলিং করত। তাঁর লেখকেরা ছিলেন না অভিজ্ঞ প্রবীণ-বরং অনুরাগ কাশ্যপ, জয়দীপ সাহনির মতো তরুণেরা, যাঁদের পুঁজি ছিল শুধু মৌলিকতা আর কাঁচা সত্য। যারা পরবর্তীতে সো কলড গল্পের স্রোতের বিপরীতে বৈচিত্র্যময় সিনেমা তৈরি করেছিলেন।ভার্মার ছবিতে ছিল না ‘মিট-কিউট’। তেলুগু সিনেমা এই ট্রপে বুঁদ হয়ে থাকে। তখন নায়কের নায়িকার নাভি দেখাই ছিল ছবির প্রধান কনফ্লিক্ট (খুশি)। ভার্মার ছবিতে খারাপ লোকেরা শুরু থেকেই খারাপ। প্রেমিক-প্রেমিকারা শুরু থেকেই প্রেমিক।

কিংবদন্তিদের সঙ্গে কাজ করলেও রাম গোপাল ভার্মা কখনোই তাঁদের কিংবদন্তি হয়ে থাকতে দিতেন না- তাঁদেরও নিজের অ্যাস্থেটিকে ঢুকিয়ে নিতেন। তাঁর সিনেমায় সবাইকে নতুন করে আবিষ্কার করতে হতো,পরিচিত গণ্ডি ভেঙে। গ্যাংস্টারদেরও যে নিজস্ব দর্শন, আত্মকথা আর ভাব প্রকাশের ভাষা থাকতে পারে-এই সাহসী ভাবনাই তিনি তুলে দিলেন গানের মধ্য দিয়ে। সেই কাজের দায়িত্ব দিলেন স্বয়ং কিংবদন্তি গীতিকার গুলজারের হাতে। ফলে ‘গোলি মার ভেজে মে’ হয়ে উঠল শুধু একটি গান নয়, বরং অপরাধী মানসিকতার একরকম স্বীকারোক্তি।অন্যদিকে, যাঁকে সুরের সৌন্দর্যের প্রতীক বলে ধরা হয়, সেই এ আর রহমানকেও ভার্মা ছেড়ে কথা বলেননি। দাউদ আর রঙ্গিলায় রহমানের কণ্ঠ আর সুরে তিনি ঢেলে দিলেন এক অচেনা রুক্ষতা, এক ধরনের শহুরে বেপরোয়া স্পন্দন-যা তখনকার সময়ে কল্পনাও করা কঠিন ছিল। পরিচ্ছন্ন মেলোডির বদলে সেখানে জন্ম নিল ঘাম, ধুলো আর অস্থিরতার শব্দ।এমনকি প্রেমের গানেও থাকল না সেই চেনা নরম আবরণ-প্রেম এখানে ঝরঝরে, অস্থির, কখনো কখনো অস্বস্তিকর।রাম গোপাল ভার্মার সিনেমায় কেউই নিজের পরিচিত ছাঁচ নিয়ে ঢুকতে পারেননি-সে সুরসম্রাটই হোন কিংবা জাত অভিনেত্রী। শিবা-য় তিনি তামিল ইন্ডাস্ট্রির কিংবদন্তি ইলয়ারাজাকে দিয়ে বানালেন এমন এক ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর, যা আর শুধু আবহসঙ্গীত নয়, ছবির রক্তচাপ। সেই সুর শহরের গলিতে গলিতে দৌড়ায়, সংঘর্ষের আগে শ্বাস নেয়, আর নীরবতার ভেতরেও হুমকি ছড়িয়ে দেয়-ইলয়ারাজার ক্যারিয়ারের সেরাগুলোর এক অনিবার্য মাইলফলক।

একইভাবে ক্ষণ ক্ষণম (Kshana Kshanam)-এ রামু নতুন করে আবিষ্কার করলেন শ্রীদেবীকে। এখানে তিনি কোনো দেবীমূর্তি নন, নেই আকাশি গ্ল্যামার বা নির্ভার রোমান্স। বরং শ্রীদেবী এক অস্থির, ভীতু, হঠাৎ বিপদের মুখে পড়া সাধারণ নারী—যার চোখে ভয়, শরীরে ক্লান্তি, আর দৌড়ে-পালাতে পালাতে ভেঙে পড়া মানবিকতা। রামু তাঁর অভিনয় থেকে ছেঁটে ফেললেন অলংকার, রেখে দিলেন কেবল স্নায়ু আর শ্বাস—ফলে জন্ম নিল একেবারে ভিন্ন শ্রীদেবী, যাকে তখনকার দর্শক নতুন করে চিনতে বাধ্য হলো।রঙ্গিলা-তে (১৯৯৫) এক টাপোরি আর এক উঠতি নায়িকার প্রেমকাহিনিতেও ছিল রামুর স্বাক্ষর-খুঁতখুঁতে চরিত্র, রাফ টেক্সচার। আমির খানের মুন্না আজও আলাদা করে মনে পড়ে।আর কোম্পানি-তে মোহনলাল-সেখানে পুলিশ মানে ইউনিফর্মের দাপট নয়; চোখের একটুখানি স্থিরতাই যথেষ্ট। কথা কম, উপস্থিতি বেশি। অপরাধীদের ওপর আঘাত নেমে আসে সংলাপে নয়, দৃষ্টিতে।

Raat (1992) - IMDb
'রাত' সিনেমার পোষ্টার

সে সময় রাম গোপাল ভার্মা যেন একা একা একটা ইন্ডাস্ট্রি চালিয়ে নিচ্ছিলেন। বছরে গড়ে পাঁচটা করে ছবি—কোনো স্টার নয়, বড় বাজেট নয়, তবু প্রতিটা গল্পে আলাদা গন্ধ। কখনো নিখাদ কমেডি (লাভ কে লিয়ে কুছ ভি করেগা)। এছাড়া হরর ছিলো তার প্রিয় আলাদা সাবজেক্ট। তাই কখনো ভয়ের অন্ধকারে ডুব দিয়ে তৈরি করা হরর সিনেমা বানিয়েছেন; আবার কখনো তৈরি করেছেন হরর থিমের ছোট ছোট গল্পের জটিল সমাহার(ভূত, ডরনা মানা হ্যায়, ফুক,রাত) যা তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা কাজ।

Kaun? (1999) - IMDb
'কউন' সিনেমার পোষ্টার

১৯৯৯ সাল। রাম গোপাল ভার্মার বৃহস্পতি তখন তুঙ্গে। সেরা পরিচালকের তালিকায় একদম প্রথম দিকেই উচ্চারিত হচ্ছে তার নাম।অবস্থাটা তখন এমন যে, ভার্মা যদি গ্যাংস্টার ঘরানার জঘন্যতম ছবিটিও বানাতেন, দর্শকরা হলের বাইরে লাইন লাগাত টিকিট কেটে সেটি দেখার জন্য। কিন্তু ৯০ দশকের ভার্মা ছিলেন একদমই ভিন্ন ধাতুতে গড়া। তখন সদ্য রিলিজ হয়েছিল সত্য,যা সিনেমার ইন্ডাস্ট্রির প্রেক্ষাপট বদলে দিয়েছিলো।কিন্তু, তিনি সত্য ছবির অভাবনীয় সাফল্যের জোয়ারে ভেসে গেলেন না।পরিচালক হিসেবে নতুন কিছু করে দেখানোর খিদেটা তখন তাঁকে এতটাই উদ্বুদ্ধ করল যে,তিনি অসীম সাহসী এক সিদ্ধান্ত নিয়ে বসলেন- তিনি বানাবেন সাইকোলজিক্যাল-থ্রিলার ঘরানার একটি ছবি, তবে গল্পের মূল কারিগর থাকবে নারী। শুনে অবশ্যই ভ্রু কুঁচকে যাওয়ার কথা; কিন্তু রাম গোপাল ভার্মা তা করে দেখালেন। এবং তার কনফিডেন্স এমন পর্যায়ে ছিলো ছবিটির শ্যুটিং শুরুর আগেই সবার জানা, ফ্লপ হবে ছবিটি। রামু তো হাল ছাড়লেনই না, ফ্লপ হবে জেনেও ছবিটি তিনি তৈরি করবেন।

Anurag Kashyap vs Ram Gopal Varma: Dark Movie Directors Compared :  r/bollywood
অনুরাগ কাশ্যপ ও রাম গোপাল ভার্মা

হ্যাঁ, ঠিক তাই; ছবিটির গল্প তৎকালীন সময়ে ভাগ্যাকাশে কেবল একটি কথাই জ্বলজ্বল করছিলো; তা হলো ফ্লপ। সে সময় ফেমিনিজম নিয়ে সাইকোপ্যাথ কিলার গ্যাংস্টার ছবিটি সহজে কেউ মেনে নিতে পারিনি, তাই বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পড়েছিলো ছবিটি।এখানেই শেষ নয়; সত্যের পর এইবারও তিনি পূর্ণ বিশ্বাস রাখলেন অনুরাগ নামের সেই তরুণ লেখকের উপর।(পরবর্তীতে গ্যাংস অফ ওয়াসেপুর, নো স্মোকিং, সেক্রেড গেমস কিংবা ব্ল্যাক ফ্রাইডে দিয়ে সিনেমা ইন্ড্রাস্ট্রিতে নিজের আলাদা বেঞ্চমার্ক তৈরি করেন)অনুরাগ একাই এবার পুরো ছবির কাহিনী রচনা করলেন। নাম দিলেন, ‘কউন?’।

রামু বরাবরই মেলোড্রামাটিক বিষয়ের উর্ধ্বে। তার সিনেমায় নায়ক-নায়িকা বৃষ্টিতে ভিজে গানের সাথে তাল দিয়ে নাচা তো দূরে থাকুক, হাঁটতে হাঁটতে, কিংবা কোথাও ঠায় বসে থেকেও কোনো গানের সাথে ঠোঁট নাড়াতে পারবেন না।কউন-এর নারী চরিত্রটি তৎকালীন ভারতীয় সিনেমার চেনা কাঠামো ভেঙে দেয়। নারী এখানে ভিকটিম নয়, সহানুভূতির পাত্র নয়-সে নিজেই ভয়ের উৎস। একজন নারী সিরিয়াল কিলার যে এতোটা ঠান্ডা, এতোটা হিসেবি, এবং একই সঙ্গে এতটা সাইকোপ্যাথ হতে পারে-এই ধারণা নব্বইয়ের দশকের প্রেক্ষাপটে ছিল রীতিমতো আকাশচুম্বী ভাবনা। ভার্মা এখানে নারীকে দেবী বা নির্যাতিত অবয়ব হিসেবে দেখাননি; দেখিয়েছেন ক্ষমতাসম্পন্ন অন্ধকারের ধারক হিসেবে। এখানেই রামু ঘটিয়েছেন বিপ্লব।

Urmila Matondkar-Manoj Bajpayee starrer 'Kaun' was one of Ram Gopal Varma's  best | Hindi Movie News - Times of India
'কউন' সিনেমায় উর্মিলা মাতন্ডকর ও মনোজ বাজপেয়ী

আমার চোখে, কউন চরিত্রটি তৈরি করার পেছনে রাম গোপাল ভার্মার উদ্দেশ্য ছিল খুব স্পষ্ট-দর্শকের নৈতিক আরাম ভেঙে দেওয়া। আমরা অভ্যস্ত, নারী মানেই নিরাপত্তা, দুর্বলতা কিংবা বিশ্বাসযোগ্যতা। ভার্মা এই বিশ্বাসটাকেই অস্ত্র বানিয়েছেন। দর্শক যতক্ষণ চরিত্রটিকে নিরাপদ মনে করে, ঠিক তখনই সে ধীরে ধীরে আতঙ্কে পরিণত হয়। এই ভয় কোনো চিৎকারে নয়-নীরবতায় জন্ম নেয়।এ যুগে আমরা আন্ধাধুনের মত সিনেমা দেখে মুগ্ধ হই। সে সময় কউনের মত সিনেমাকে বোঝার ও গ্রহন করার মত দর্শকের অভাব ছিল। তা না হলে সিনেমাটি আরো আলোচনার দাবি রাখে।

তবে রামুর প্রধান ইচ্ছে ছিলো গ্যাংস্টার ফিল্ম বানানো এবং তাদের জীবনের কঠিন বাস্তবতা সবার সামনে তুলে ধরতে চেয়েছিল। মুম্বাইয়ের আন্ডারওয়ার্ল্ড-গ্যাংস্টারদের জীবন নিয়ে আকর্ষণ বরাবরই তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছিলো।রাম গোপাল ভার্মার চলচ্চিত্রে গ্যাংস্টাররা প্রায়শই শুধু খলনায়ক নয়; তারা হয়ে ওঠে এক জটিল মানবিক এবং সামাজিক ন্যারেটিভের কেন্দ্রবিন্দু। আমার দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, ভার্মাকে আকর্ষণ করে এই চরিত্রগুলোর বহুমাত্রিকতা-যেখানে হিংসা, ক্ষমতা, নীতি এবং ব্যক্তিগত আবেগ একসাথে জন্ম নেয়।গ্যাংস্টারের জীবন ধারাবাহিক নয়, নিয়মিত নয়, বরং অনিশ্চয়তার এক যাত্রা-প্রতিটি মুহূর্তে হুমকি, চুক্তি, বিশ্বাসঘাতকতা, এবং সিদ্ধান্তের জটিলতা। ভার্মার ক্যামেরা সেই অস্থিরতা ধরতে চায়। এটি কেবল রক্তঝরা দৃশ্য নয়; এটি মানুষের চিন্তাভাবনা, ভয়, কৌশল এবং হঠাৎ পরিবর্তনের অনুভূতি।গ্যাংস্টাররা একটি নিখুঁত অর্থনীতি চালায়-যেখানে রক্তপাত, রাজনীতি, আর্থিক লেনদেন এবং প্রভাবশালী সম্পর্ক একত্রে চলে। ভার্মাকে আকর্ষণ করে এই “অপ্রকাশিত নিয়মের রাজ্য”-যেখানে শক্তি এবং হিংসার বিন্যাস বাস্তবসম্মত এবং কখনো রোমান্টিক নয়।প্রতিটি গ্যাংস্টার চরিত্রে থাকে অন্তর্দ্বন্দ্ব-কবে ক্ষমতা ব্যবহার করবে, কখন নীরব থাকবে, কখন নিজের নৈতিক সীমা অতিক্রম করবে। ভার্মা সেই অন্তর্দ্বন্দ্বকে চোখে, চোখের ভঙ্গিতে, নিঃশব্দে দেখাতে পছন্দ করেন। এটা দর্শককে শুধুই বিনোদিত করে না; তাদের ভাবতে বাধ্য করে।রাজনীতি তাঁকে টানে না, টানে তার মনস্তত্ত্ব।


“রাজনীতি নয়, তাকে উত্তেজিত করে তোলে রাজনীতির পেছনের কালো মনস্তত্ত্ব,” “মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক, অহংকারের সংঘর্ষ আর ক্ষমতার প্রতি তীব্র আকাঙ্ক্ষা-এই বিষয়গুলোই রামুর আগ্রহের কেন্দ্র। অনেকেই রাজনীতিকে সংজ্ঞায়িত করেন একটি দলের জেতা আসনের সংখ্যা দিয়ে, বা শুধুই নির্বাচনী অঙ্কে। সেটা একেবারেই আলাদা বিষয়-যা তাকে আগ্রহী করে না। রামুর আগ্রহ ক্ষমতার খেলায়।”তাই আন্ডারওয়ার্ল্ড ঘরানা হয়ে উঠল তাঁর ট্রেডমার্ক-ডিজাইনার; যা প্রেমকাহিনির যুগে একেবারে বিপরীত মেরু। মুম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ডের বড় একটি দিক বুঝতে হলে বুঝতে হবে শহরকে। কারণ মুম্বাই এমন একটি শহর, যেখানে একই বিল্ডিংয়ে থাকবেন, কিন্তু কেউ প্রতিবেশীকে চিনবেন না। এটাই নির্মম অন্ধকারের গল্প। রামু এই নির্মম অন্ধকারকে আমাদের সামনে নিয়ে আসে ১৯৯৮-এ সত্য সিনেমার মাধ্যমে।

RGV Heads For Satya Re-Release With Satya | RGV Heads For Satya Re-Release  With Satya
'সত্য' সিনেমার পোষ্টার

অদ্ভুত ক্যামেরা অ্যাঙ্গেলে চাপা হিংসা, অন্ধকার আবেগ, কালো অন্ধকারের বিজনেস ডিলিং, রাজনৈতিক সম্পর্কের মিশেলে ক্রাইম সিনেমার নতুন ব্লুপ্রিন্ট তৈরি হল। আন্ডারওয়ার্ল্ড এতটা বাস্তব আগে কখনও দেখানো হয়নি। এমনকি তৎকালীন সময়ে ট্রেড অ্যানালিস্ট তরন আদর্শ বলেছিলেন, “রাম গোপাল ভার্মা আমাদের এমন এক দুনিয়ায় নিয়ে গিয়েছিলেন, যা বরাবরই ছিল-কিন্তু দেখানোর সাহস কারও হয়নি।”তবে দর্শক এর আগেও মুম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ডের সাথে পরিচিত হয়েছিলো অমিতাভ বচ্চনের মাধ্যমে। কারণ অমিতাভ বচ্চনের 'দিওয়ার' ছিলো আন্ডারওয়ার্ল্ড ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব কেন্দ্রিক।সত্য এই সিনেমার চিত্রনাট্য লেখেন সৌরভ শুক্লা (যিনি এই সিনেমায় কাল্লু মামা চরিত্রে অভিনয়ও করেন) ও অনুরাগ কাশ্যপ। আর এই সিনেমার ‘ভিকু মাত্রে’ চরিত্রে অভিনয় করে লাইম লাইটে আসেন ভারতের ইতিহাসের অন্যতম সেরা অভিনেতা মনোজ বাজপেয়ী। আর নাম ভূমিকায় অভিনয় করেন সাউথের অভিনেতা জেডি চক্রবর্তী।

To celebrate Bachchan at 80, we look at one year up close | Mint
'দিওয়ার' সিনেমায় অমিতাভ বচ্চন

রাম গোপাল ভার্মার মুম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ডের সম্পর্কে প্রথম ধারণা আসে কুখ্যাত স্মাগলার হাজী মাস্তানের মাধ্যমে। তখন হাজী মাস্তান কীভাবে সরকার, ফিল্ম ইন্ড্রাস্ট্রি, কীভাবে গ্যাং কন্ট্রোল করতো সবকিছুই ছিলো খোলা বাস্তবতা।যার ফলে মানুষের অন্ধকার দিক ও ক্ষমতার ছায়া- রাজনীতির বিষয়গুলো আরো স্পষ্ট ধারণা পান তিনি। এরপর সিজার প্যালেস হোটেল ছিল এমন একটি পরিসর, যেখানে আন্ডারওয়ার্ল্ডের বাস্তব আবহ, ক্ষমতার বিন্যাস ও নীরব বোঝাপড়া সরাসরি চোখে পড়ত। সেই পরিবেশ, মানুষগুলোর উপস্থিতি এবং তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক রাম গোপাল ভার্মাকে গভীরভাবে আকর্ষণ করে। এই অভিজ্ঞতাই পরবর্তী সময়ে রামুকে সিনেমার শহরের অন্ধকার বাস্তবতা তুলে ধরতে সাহায্য করেছিলো।বলে রাখা ভালো, রাম গোপাল ভার্মার সিনেমার পাশাপাশি তিনি নতুন ধারণা জন্ম দেওয়ার মতো পরিচালক ও লেখক তিনি তৈরি করেছেন। শ্রীরাম রাঘবন (এক হাসিনা থি, আন্ধা ধুন), শিমিত আমিন (আব তক ছাপ্পান, চাক দে ইন্ডিয়া) ও অনুরাগ কশ্যাপ (গ্যাংস অব ওয়াসিপুর, নো স্মোকিং) তার দীক্ষায় দীক্ষিত।তাছাড়াও রাম গোপাল ভার্মার পরিচালনাভঙ্গি ও দৃষ্টিভঙ্গিতে অনুপ্রাণিত হয়েই মহেশ মাঞ্জরেকর (বাস্তব) ও সঞ্জয় গুপ্তা (কাঁটে, শুটআউট অ্যাট ওয়াদালা) নিজেদের আলাদা ভাষা ও স্টাইলে গ্যাংস্টার ফিল্ম নির্মাণের সাহস দেখিয়েছিলেন।

রাম গোপাল ভার্মা মূলত ‘ক্লাস অডিয়েন্স’-এর চেয়ে বেশি করে পৌঁছেছিলেন ম্যাস অডিয়েন্সের হৃদয়ে।সত্য তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। এই ছবিতে এমন বহু উপাদান ছিল, যা তৎকালীন মেইনস্ট্রিম হিন্দি সিনেমায় একেবারেই অচেনা। চরিত্রদের মুখে রাস্তাঘাটের ভাষা, অকপট গালাগালি-যেমন ‘চুতিয়া’ শব্দের ব্যবহার-দর্শকের কাছে অস্বস্তিকর নয়, বরং বাস্তব বলে মনে হয়েছিল।এই অকপট ভাষাই ম্যাস দর্শকের সঙ্গে গভীর সংযোগ তৈরি করে, বিশেষ করে মুম্বাইয়ের দর্শকদের সঙ্গে।কারণ ওই সময় শহরের দৈনন্দিন জীবনে আন্ডারওয়ার্ল্ড কোনো দূরের কল্পকাহিনি ছিল না, ছিল খোলা বাস্তবতা। রামু সেই বাস্তবতাকে কোনো সাজসজ্জা ছাড়াই পর্দায় তুলে ধরেছিলেন-যা মানুষ আগে কখনও মূলধারার সিনেমায় দেখেনি।এই বাস্তবতাই এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, সত্য-র নির্মাণশৈলী দেখে দর্শকের প্রশংসায় থেমে থাকেনি;খোদ গ্যাংস্টাররাও তাকে স্বীকৃতি জানায়। এক সাক্ষাৎকারে রাম গোপাল ভার্মা বলেন, একদিন তিনি একটি থিয়েটারের বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন, তখন এক ব্যক্তি এসে তাকে বলে-“আমাদের নিয়ে তুমি খুব ভালো সিনেমা বানিয়েছ।” এখানে ‘আমাদের’ বলতে লোকটি নিজেকেই গ্যাংস্টার হিসেবে চিহ্নিত করছিল।এই বাস্তবতার ছাপ এতটাই গভীর ছিল যে, এমনকি পুলিশ মহলেও একসময় সন্দেহ তৈরি হয়-রাম গোপাল ভার্মা কি আদৌ আন্ডারওয়ার্ল্ডের সঙ্গে যুক্ত নন?

Book excerpt: Why Ram Gopal Varma's 'Satya' still matters 23 years after  its release
'সত্য' সিনেমায় জেডি চক্রবর্তী ও মনোজ বাজপেয়ী

তাছাড়াও ৯৩’ সালের ব্লাস্টের কারণে আন্ডারওয়ার্ল্ড ব্যাপারটা সামনে চলে এসেছে। এর‌ বিশেষ কারণ ডি কোম্পানি সম্পৃক্ততা। তিনি আন্ডারওয়ার্ল্ড সম্পর্কে আরো ধারণা পাওয়ার সুযোগ পান সঞ্জয় দত্তের কাছ থেকে‌। কারণ সঞ্জয় দত্তের সঙ্গে আন্ডারওয়ার্ল্ডের সমস্যা ছিলো, তাই দাউদ সিনেমার শুটিং চলাকালে রামু আন্ডারওয়ার্ল্ডের আদ্যপান্ত সর্ম্পকে জানতে পারতেন।সাধারণত সন্ত্রাসীদের নিয়ে ভাবা হয় তারা হৃদয়হীন এবং নির্মম। কিন্তু রামু দেখালেন তাদের আন্ডারওয়ার্ল্ডের বাইরেও আলাদা জগত আছে।যেমন তাদেরও ইচ্ছে হলে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে খাবার খায়, গল্প করে। এমনকি তাদের কেউ আপনজন মরে গেলে তাদের উপর শোক না জানিয়ে বরং গালিগালাজ বা রাগ দেখিয়ে তাদের উপর অদ্ভুত শোক প্রকাশ করতো। রামু দেখানোর চেষ্টা করেছে তারাও দিনশেষে মানুষ, তাদেরও আপনজন আছে। তারা যেমন অনেকের কাছে চরম শত্রু আবার অনেকের কাছে মাসীহ।

Revisiting Ram Gopal Varma's 'Sarkar' as it turns 18
'সরকার' সিনেমার পোষ্টার

রামু সিনেমার প্রধান চরিত্রগুলোতে নানাভাবে দাউদ ইব্রাহিম এবং মুম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ডের কার্যকলাপ পোট্রে করেছে।রামু এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন বলিউডের অঘোষিত অভিভাবক অমিতাভ বচ্চন, তার পছন্দের অভিনেতা; তার চোখে আমার দেখা একমাত্র স্টার‌ যিনি চরিত্র হয়ে উঠতে পারেন।তাই তিনি অমিতাভকে পেয়ে নিজের সুযোগ কাজে লাগালেন, ঢুকিয়ে নিলেন নিজের অ্যাস্থেটিকে।সরকার-এ অমিতাভ বচ্চনের চরিত্রে স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে দাউদ ইব্রাহিমের ছায়া-ক্ষমতার নীরব উপস্থিতি, রাষ্ট্রের সমান্তরালে দাঁড়ানো এক অদৃশ্য সরকার-আবার একই সঙ্গে সেখানে ঢুকে পড়ে দ্যা গডফাদার-এর ডন ভিটো কর্লিওনের শীতল সংযম, পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ আর নৈতিকতার নিজস্ব কোড।রামু এখানেই থামেননি। তিনি এই দুই প্রভাবকে কপি করেননি, বরং ভারতীয় বাস্তবতায় ভেঙে-গড়ে নিয়েছেন। দাউদের মতো ‘আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন’ এখানে হিংস্র চিৎকারে বিশ্বাসী নয়, আর গডফাদারের মতো রোমান্টিক মাফিয়া-গ্ল্যামারেও ডুবে নেই। সরকার-এর গ্যাংস্টার ক্ষমতা দেখায় নীরবতায়, ভায়োলেন্স প্রয়োগ করে প্রয়োজনের চেয়েও কম-ঠিক যতটুকু হলে নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকে।সরকারে রামু অমিতাভকে যেনো ৯০ এর অ্যাংগ্রি ইয়ং ম্যানকে যেনো ফিরিয়ে আনলেন তবে এইবার অন্যভাবে। যা তখনকার বলিউড ইন্ডাস্ট্রি হয়তো এইভাবে গ্যাংস্টার কিং কীভাবে বানাতে হয় দেখেনি বা চেষ্টা করেননি। চিৎকার না করে, না শাসিয়ে, ধীর কন্ঠে শাসানো যায় এমন গ্যাংস্টার তিনি তৈরি করেছিলেন।

এইখানেই অমিতাভ বচ্চনের উপস্থাপন একেবারেই অন্যরকম। নব্বইয়ের পর যাকে আমরা প্রায়ই ‘পিতৃতান্ত্রিক’ বা ‘নৈতিক অভিভাবক’ চরিত্রে দেখেছি কাভি খুশি কাভি গাম,বাগবান সিনেমাতে, রামু তাকে ফের দাঁড় করালেন ভয়ের কেন্দ্রে-কিন্তু সেই ভয় উচ্চকণ্ঠ নয়। তাঁর চোখ, থেমে থাকা কণ্ঠ, দীর্ঘ নীরবতা-এইসবই অস্ত্র। গ্যাংস্টার হয়েও তিনি চিৎকার করেন না, রাগ দেখান না; বরং যেন চারপাশকে ঠান্ডা করে দেন। এই ঠান্ডা-স্বস্তিটাই আমার কাছে সবচেয়ে অস্বস্তিকর-কারণ এটা চেনা গ্যাংস্টার সিনেমার উত্তেজক বিশৃঙ্খলা নয়, বরং শাসনের স্থিরতা।ট্র্যাডিশনাল গ্যাংস্টার ধারায় যেখানে বন্দুক, রক্ত আর ক্ষমতার দম্ভ প্রধান, সরকার সেখানে ক্ষমতাকে দেখায় প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মতো-ফাইলের মতো ঠান্ডা, সিদ্ধান্তের মতো নির্মম। ভায়োলেন্স এখানে আবেগের বিস্ফোরণ নয়; এটা হিসেবি, প্রয়োজনভিত্তিক। তাই চরিত্রটি গ্যাংস্টার হয়েও একধরনের স্বস্তি দেয়-কারণ সে জানে কী করছে, কেন করছে, এবং কখন থামতে হবে।আমার দৃষ্টিতে, সরকার আসলে গ্যাংস্টার সিনেমা নয়-এটা ক্ষমতার রাজনীতি নিয়ে একটি ভয়ানকভাবে শান্ত চলচ্চিত্র। আর সেই শান্তির মধ্যেই লুকিয়ে আছে রাম গোপাল ভার্মার সবচেয়ে বড় সাফল্য: অমিতাভ বচ্চনকে তিনি নতুন করে ‘হিরো’ বানাননি, বানিয়েছেন এমন এক ক্ষমতার মুখ, যা দেখে হাততালি নয়-নীরবতা নেমে আসে।

Rakta Charitra (2010) - IMDb
'রক্ত চরিত্র' সিনেমার পোষ্টার

সব অভিনেতার কপালে হয়তো ভালো সিনেমা বা ভালো পরিচালকের দৃষ্টিতে অভিনয় করার সৌভাগ্য হয় না কিন্তু বিবেক অবেরয় সেই তুলনায় অনেকটাই আলাদা। কারণ তার সিনেমার ভাগ্যের চাকার চালক ছিলো রাম গোপাল ভার্মা। যার মাধ্যমে বলিউড ইন্ডাস্ট্রি নতুন একজন দ্বৈত চরিত্রের অভিনেতা পেয়েছিলো। যিনি কিনা ভিলেন-রোমান্টিক-কমেডি তিন বিভাগেই সমান পারদর্শী।কোম্পানীতে চান্দু চরিত্রে বলিউড অভিষেকের পর রাম গোপাল তাকে নিয়ে নির্মাণ করলেন রক্ত চরিত্র, চরিত্র তেলেঙ্গানার গ্যাংস্টার থেকে রাজনৈতিক নেতা।রাম গোপাল ভার্মা এখানে কোনো নায়ক বানাতে চাননি, বরং আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন ক্ষমতার সেই নির্লজ্জ রূপ, যা সভ্যতার দাবির আড়ালে আজও রক্তেই কথা বলে। আমার চোখে, রামু প্রতাপ রাবিকে বানিয়েছেন এক ধরনের ক্ষমতার প্রতি সাইকোপ্যাথ- যা সরকার-এর ‘ঠান্ডা ডন’-এর বিপরীতে দাঁড় করানো এক হিংস্র চরিত্র।

আর বিবেক ওবেরয় এই ভয়ংকর সত্যটাকে তুলে আনেন নিঃশব্দ কোনো অভিনয়ে নয়-বরং এক উন্মাদ, দগদগে চিৎকারে।আমার দৃষ্টিতে, রক্ত আসলে এক ব্যক্তির উত্থানের গল্প নয়; এটা এক সমাজের প্রতিচ্ছবি-যেখানে গ্যাংস্টার রাজনীতিবিদ হয়ে যায়, কিন্তু ভায়োলেন্সের চরিত্র বদলায় না, শুধু তার পোশাক পাল্টায়।রক্ত চরিত্র-এ প্রতাপ রাবি কোনো সাধারণ গ্যাংস্টার নয়; রাম গোপাল ভার্মার জগতে এই চরিত্রের জন্ম কোনো রোমান্টিক আন্ডারওয়ার্ল্ড কল্পনা থেকে নয়; তেলেঙ্গানার রুক্ষ মাটি থেকে উঠে আসা প্রতাপ রবি একদিকে নিজের পরিবারের রাজনৈতিক অপমানের বদলা নিতে মরিয়া, অন্যদিকে ক্ষমতার প্রতি তার ভেতরে জ্বলতে থাকে এক উন্মত্ত, ক্ষুধা-যা তাকে ধীরে ধীরে মানুষ থেকে হিংসার প্রতীক হয়ে উঠতে বাধ্য করে।রাম গোপাল ভার্মা দেখালেন প্রতাপ রাবির ভায়োলেন্স এখানে কোনো ‘সিগনেচার স্টাইল’ নয়। এটা অসংযত, আকস্মিক, প্রায় পশুর মতো। সে মারধর করে কারণ সে পারে, হত্যা করে কারণ সে থামতে জানে না। এখানে নেই গডফাদার-এর ঠান্ডা মাথা, নেই সরকার-এর হিসেবি শাসন। এখানে ক্ষমতা মানে রক্ত, ঘাম আর চিৎকারের ভেতর দিয়ে নিজের অস্তিত্ব প্রমাণ করা।

Company (2002) - IMDb
'কোম্পানি' সিনেমার পোষ্টার

আন্ডারওয়ার্ল্ড ট্রিলজির‌ আরেকটি সিনেমা কোম্পানি। দাউদ ইব্রাহিমের চরিত্রের ছায়া অবলম্বনে তৈরি করা হয় অজয় দেবগনের চরিত্র, চরিত্রের নাম মালিক।রাম গোপাল ভার্মা কোম্পানি-তে শুধু গল্প বলেননি, তিনি একটি চরিত্রকে পুনর্নির্মাণ করেছেন দাউদ ইব্রাহিমের ছায়া দিয়ে অজয় দেবগনকে নতুনভাবে জীবন্ত করেছেন। দেবগন এখানে কেবল গ্যাংস্টার নয়; তিনি হয়ে উঠেছেন ক্ষমতার নীরব অধিপতি, যার উপস্থিতি হঠাৎ কোনো চিৎকার ছাড়াই চারপাশের বাতাসকে শীতল করে দেয়।

দাউদ চরিত্রের রহস্যময়তা, ভয় আর সম্মানের মিশ্রণ এখানে স্পষ্ট, কিন্তু ভার্মা তা কপি করেননি। বরং তিনি দেবগনকে তৈরি করেছেন বাস্তব, হিসাবি, এবং হিমশীতল-এক ধরনের ঠান্ডা হিংসার প্রতীক। প্রতিটি দৃশ্যে তার দমন, নীরবতা, ছোটখাটো সংকেতই প্রায়শই ভয় সৃষ্টি করে।ভায়োলেন্স এখানে কোনো উত্তেজনাপূর্ণ নাটক নয়; তা নিয়ন্ত্রিত, হিসাবি, এবং প্রয়োজনভিত্তিক।দেবগনের শরীরী ভাষা-ধীরে ভ্রু উঁচু করা, হঠাৎ থেমে যাওয়া, স্থির পদক্ষেপ-সবই দর্শককে বোঝায়, যে সে কেবল গ্যাংস্টার নয়, এক পরিকল্পিত শক্তি। ভার্মার ক্যামেরা সেই শক্তিকে ধরে রাখে, বাড়ায়, কিন্তু কখনো বাড়তি রঙে মাখায় না। রাজনীতি, ব্যবসা আর আন্ডারওয়ার্ল্ডের সংযোগ যেনো এটি এক ধরনের প্রয়োজনীয় হিসাব-শুধু যে শক্তি আছে তা দেখানো নয়, বরং মালিক চরিত্র দিয়ে রামু দর্শকদের দেখাতে চেয়েছেন, কিভাবে প্রতিটি সিদ্ধান্ত, প্রতিটি পদক্ষেপ শহরের জীবনের ওপর প্রভাব ফেলে। ভায়োলেন্স এখানে শুধু রক্তপাত নয়; এটি রাজনৈতিক প্রভাব, ব্যবসায়িক রণনীতি, এবং ব্যক্তিগত শাসনের এক উপস্থাপনা।

D (2005) - IMDb
'ডি' সিনেমার পোষ্টার

ডি-তে রাম গোপাল ভার্মা রণদীপ হুদাকে দাঁড় করিয়েছেন কেবল একজন গ্যাংস্টারের রূপে নয়, বরং ক্ষমতার নিঃশব্দ প্রতিনিধি হিসেবে। রণদীপ হুদার অভিনয় ক্যারিয়ার যদিও বৈচিত্র্যময় রোলে ভরা তার মধ্যে এই চরিত্রটি আলাদা বেঞ্চমার্ক হয়ে থাকবে। দাউদ ইব্রাহিমের ছায়া স্পষ্ট, কিন্তু ভার্মা এটিকে সোজাসুজি অনুলিপি করেননি। তিনি হুদার মাধ্যমে দেখিয়েছেন দাউদের হিমশীতল, হিসাবি, এবং অমানবিক দিকগুলো-যেখানে হিংসা কখনো চিৎকার বা নাটকীয় বিস্ফোরণ নয়, বরং পরিকল্পিত এবং কার্যকর।ভার্মা ক্যামেরা তার নীরবতা ধরেছে, বাড়িয়েছে, কিন্তু কখনো অতিরঞ্জিত করে নয়।রণদীপ হুদার অভিনয় চিত্তাকর্ষকভাবে ভেতরের অস্পষ্ট ভয়, ধীর নীরবতা এবং প্রয়োজনমাফিক হিংসার সংমিশ্রণ দেখায়। তার চোখে, কথায়, এমনকি শরীরী ভাষাতেও আছে এক ধরনের ঠান্ডা শক্তি-যা চারপাশের মানুষকে এক অদ্ভুত সম্মান আর আতঙ্কের মধ্যে রাখে।

ভার্মার সিনেমাকে বসে বসে সিনেমার একাডেমিক ভাষায়, নির্দিষ্ট ফিল্ম থিয়োরি দিয়ে ভাষায় ব্যাখ্যা করা কঠিন। ভার্মার সিনেমা এমন নয় যে, চেয়ারে হেলান দিয়ে ভারী ভারী বিষয় ঝুলিয়ে তার মানে উদ্ধার করতে হবে। তাঁর ছবি মণি রত্নমের মতো প্রতীকে ভরা নয়, কিংবা সত্যজিৎ রায়ের মতো দার্শনিক স্তরে স্তরে সাজানোও না।রামু এমনই একজন পরিচালক যখন তিনি পর্দায় শহরের অলিগলিতে কাঁচা সত্য তুলে ধরতে চেয়েছেন, যা দর্শকদের অস্বস্তিতে ভোগায়, প্রশ্ন জাগায় সমাজ এবং সমাজের কালো অন্ধকার, ক্ষমতার লড়াই, মানুষের দুর্বলতা, সমাজ ব্যবস্থার বিষয় নিয়ে তখন তিনি বানিয়েছেন সত্য কিংবা শূল্যের মতো সিনেমা। কিন্তু আজ প্রশ্ন জাগে-এই রাম গোপাল ভার্মা কোথায় হারিয়ে গেলেন? আর যিনি রয়ে গেছেন, তিনি কেনো একের পর এক এত জঘন্য সিনেমা বানাচ্ছেন?যখন তিনি কাজ নিয়ে বড্ড ছেলেখেলা করেছেন তখন তিনি নাচ, ডার্লিং, কন্ট্র্যাক্ট এর মতো বাজে ছবি নির্মাণ করেছেন নির্দ্বিধায়।

Story pin image
রাম গোপাল ভার্মা

রামু কি আসলেই পাগল?‌এই পাগলামির জন্ম দিয়েছে কি তাহলে শিবা, সত্যা-র মতো কাল্ট ফিল্ম, যা তাকে অতি অহংকারী বানিয়েছে ?নাকি এই পাগলামীর জন্মের জন্য দায়ী আগ, নিশব্দ, ডার্লিং-এর মতো জঘন্য সিনেমা?আর তিনি নিজের সৃজনশীলকে এমনভাবে পচিয়েছেন, আগ সিনেমাতে অমিতাভ বচ্চনের চরিত্রে তিনি চেয়েছিলেন ক্ষমতার নেশায় আচ্ছন্ন এক অলস ভিলেন, যার অদ্ভুত হাসি কাশির মতো শোনায়। কিন্তু ছবি মুক্তির পর এক সিনিয়র পুলিশ অফিসার ফোন করে জিজ্ঞেস করেছিলেন-ভিলেনের কি জ্বর ছিল?ট্র্যাডিশনাল তারকা-ব্যবস্থার প্রতি অবজ্ঞা দেখিয়ে রামু বানালেন নিজের তারকারা-উর্মিলা, মনোজ বাজপেয়ী, বিবেক অবেরয়। কিন্তু সেই ‘অগাধ প্রতিভা’ আজ যেন অনুপস্থিত।আমার চোখে, সমস্যাটা শুধু খারাপ সিনেমা বানানো নয়; সমস্যাটা হলো-নিজের দর্শনকে ব্যবসার কাছে জোর করে বিকিয়ে দেওয়া।শিবা, সত্য, কোম্পানি, রক্ত চরিত্র, ডি-এই সিনেমাগুলো শুধু গ্যাংস্টার বা ভায়োলেন্সের গল্প ছিল না। এগুলো ছিল একেকটা নোংরা সামাজিক দলিল। ভার্মা তখন ক্যামেরাকে ব্যবহার করতেন ছুরি হিসেবে-ঝকঝকে নয়, ধারালো। তাঁর ফ্রেমে শহর ছিল ময়লা, চরিত্রগুলো ছিল নৈতিকভাবে দ্বিধাগ্রস্ত, আর সহিংসতা ছিল অস্বস্তিকরভাবে বাস্তব। সেখানে কোনো “স্টাইল” ছিল না-ছিল ড্রাক বাস্তবতা।

কিন্তু আজ? আজকের ভার্মার সিনেমায় আছে অকারণ উত্তেজনা, ফাঁপা সংলাপ, জোর করে ঢোকানো কামনা আর ভয় দেখানোর সস্তা চেষ্টা। ভায়োলেন্স আছে, কিন্তু তার কোনো সামাজিক প্রসঙ্গ নেই। সেইসাথে বর্তমানে তার সিনেমায় নারীর শরীর আছে, কিন্তু দৃষ্টিভঙ্গি নেই। ক্যামেরা আর চরিত্র-দুটোই যেন দিশেহারা।যে মানুষ একদিন দেখিয়েছিলেন, “Cinema should disturb you”, আজ তিনি নিজেই নিজের সিনেমাকে সিরিয়াল-লেভেলের চটুলতায় নামিয়ে এনেছেন।একসময় রাম গোপাল ভার্মা মানেই যে আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি ছিল, সেটা কোথাও হারিয়ে গেছে।আমার কাছে,রামু এখন সৃজনশীল উৎকর্ষের চেয়ে বাণিজ্যিক লাভের দিকে বর্তমান ব্যস্ততাকে বিকিয়ে দিয়েছে।  ভার্মা আজ আর সমাজকে দেখতে চান না-তিনি শুধু প্রাসঙ্গিক থাকতে চান। আর এই প্রাসঙ্গিক থাকার তাড়নাই তাঁকে ধ্বংস করেছে। ওটিটি, ইউটিউব, ‘বোল্ড কনটেন্ট’-এর নামে যে হাহাকার চলছে, সেখানে তিনি নিজের পুরনো দর্শন ভুলে গেছেন। ফলে তাঁর সিনেমা এখন আর প্রতিবাদ নয়-এগুলো আত্মসমর্পণ।সবচেয়ে বেদনাদায়ক ব্যাপারটা কী জানেন?এই মানুষটাই আমাদের শিখিয়েছিলেন-ভয় দেখাতে হলে জোরে চিৎকার করতে হয় না। একটা স্থির শট, একটা দীর্ঘ নীরবতা, একটা অসহায় মুখই যথেষ্ট। আজ সেই মানুষটাই ক্যামেরাকে ব্যবহার করছেন আত্মপ্রচার আর বিতর্ক তৈরির খেলনায়।

“খারাপ লাগে বলতে যে, ভিন্টেজ রামু এখন আর নেই,” এই আফসোস করেন তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু থেকে শুরু করে তার হাতে গড়ে উঠা শিষ্যরাও। একজন সিনেমাপ্রেমী ও গণমাধ্যমের শিক্ষার্থী হিসেবে রামুর বৈচিত্র্যময় সিনেমা থেকে বঞ্চিত হওয়াও আফসোস থেকে কোনো অংশে কম নয়।রাম গোপাল ভার্মা বানিজ্যিক লাভকে এমনভাবে প্রশ্রয় দিয়েছেন যেখানে তিনি রণ(Rann) ছবিতে ভারতের জাতীয় সংগীতকে ‘রিমিক্স’ করার দুঃসাহস দেখিয়েছেন। সেন্সর বোর্ডের নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে গিয়ে সুপ্রিম কোর্টে যেতে পিছপা হননি রামু। তার এই  সিদ্ধান্তকে ইন্ডাস্ট্রির অনেকেই নিছকই ‘বোকামি’ যারা কিছুই মনে করেন না এবং তৎকালীন সময়ে এক প্রবীণ পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “জাতীয় সংগীতের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে রামুকে সমর্থন করতে কোনো সুস্থ মানুষই নিজের গলায় দড়ি দেবে না।”কিন্তু রামু ছিলেন বরাবরই অহং, ঔদ্ধত্য আর বিতর্কপ্রিয়তা। তিনি সেই তৎকালীন সময়ে পাল্টা দাবি জানায় তার এই রিমিক্স গানটি ছিলো আধুনিক সমাজের বাস্তব প্রতিচ্ছবি।“আমরা সারাক্ষণ ‘ইনক্রেডিবল ইন্ডিয়া’, ‘মেরা ভারত মহান’ বলে চিৎকার করি-ভালোমানুষি আত্মপ্রশংসার এক ভ্রান্ত হ্যালো নিয়ে। এতে হয়তো কিছু পর্যটক বোকা হয়, কিন্তু দেশের মানুষ সত্যটা জানে। এই করুণ বাস্তবতাই আমি গানের আবেগে তুলে ধরতে চেয়েছি।”

এমনকি তেলেগু তারকা পবন কল্যানের ব্যাপারে বাজে মন্তব্য করেন। সে বিষয়ে পরে একটি সাক্ষাৎকারে বলেছেন,‘পবনের ভক্তরা কি রিয়েকশন দেয়, তার মজা নিতেই আমি মন্তব্য করেছিলাম। আমি জানি ওরা খুব ঝামেলা করবে, আমি কিন্তু মন্তব্য করে চুপচাপ বসে ছিলাম।’ তার কন্নড় সিনেমা ভিরাপ্পানের হিন্দি রিমেইকের সমালোচনা করায় এক নারী সাংবাদিকের চেহারা নিয়ে বাজে মন্তব্য করে বলেন, ‘সিনেমাটা তাহলে তোমার চেহারার মত।’ তার নিজের খুবই ঘনিষ্ঠ শিষ্য অনুরাগ কাশ্যপ বলেছিলেন,“আজকের রামু বা তাঁর সিনেমার সঙ্গে আমি আর সম্পর্ক খুঁজে পাই না।তার অতিরিক্ত প্রযোজনা, বাজারের চাপ, তারকা-নির্ভরতা-সব মিলিয়ে রামু নিজের ইউএসপি হারিয়েছেন।"তাই আমি যখন বলি, “রাম গোপাল ভার্মা কেনো এত জঘন্য সিনেমা বানাচ্ছেন”, তখন সেটা গালাগালি নয়-হতাশার স্বীকারোক্তি। কারণ আমি জানি, তিনি চাইলে আজও সত্য বানাতে পারেন। কিন্তু তিনি আর চান না। আর একজন শিল্পী যখন আর “চাইতে” চান না, তখন তার সিনেমা শুধু খারাপ হয় না- হয়ে যায় অপ্রাসঙ্গিক এবং দর্শকদের ধৈর্য্যৈর উপর নীরব শাসন। রাম গোপাল ভার্মা হারিয়ে যাননি।হয়তো তিনি আছেন-কিন্তু নিজের তৈরি অন্ধকারেই আটকে পড়েছেন।

যাই হোক, একটা কৃতিত্ব তাঁর দিতেই হয়-যে সময়ে চোপড়া আর জোহররা বারবার কারবা চৌথ, গ্লোরিয়াস শাড়ি আর আঠালো প্রেমকাহিনি রিসাইকেল করছিলেন, রাম গোপাল ভার্মা তখন হিন্দি সিনেমার গোটা ছকটাই উল্টে দিয়েছিলেন।এমনকি সুইজারল্যান্ডে দৌড়ে নাচ-গান করাকে করেছেন হাস্যকর, দেখিয়েছেন যে নাচ-গান ছাড়াও সিনেমা চলে।রামু প্রমাণ করেছিলেন পর্দার সামনে দাঁড়াতে হলে নায়ক মডেল হলে বা না হলেও-কোনো বাধা নয়।যার প্রমাণ স্বরুপ তিনি অনুরাগ কাশ্যপ, মনোজ বাজপেয়ী, বিবেক অবেরয়দের মতো নতুন ‘আউটসাইডার’দের জন্য পথ খুলে দিয়েছিলেন।

লেখক: আমি সুমন বৈদ্য বর্তমানে ঢাকার স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের জন্য অধ্যয়ন করছি।পাশাপাশি একজন ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও লেখক হিসেবে কর্মরত অবস্থায় রয়েছি।

Comments

    Please login to post comment. Login