মো সজীব সিকদার—বাংলাদেশের তরুণ উদ্যোক্তা মহলে এখন একটি পরিচিত নাম। গ্লোবাল টেক প্ল্যাটফর্মগুলোর একচেটিয়া আধিপত্যের মাঝে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন সম্পূর্ণ দেশীয় একটি ভিডিও শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম, 'উইকমোশন' (Weekmotion)। ১৫ বছর বয়সে ক্যান্টবোর্ড স্কুলে পড়াশোনা চলাকালীন তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষকের কাছ থেকে যে ধারণা পেয়েছিলেন, সেটিকেই তিনি পরিণত করেছেন লক্ষাধিক ব্যবহারকারীর ডিজিটাল আয়ের উৎসে। তাঁর এই উত্থান কেবল একজন সফল সিইও-এর গল্প নয়, বরং এটি বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতিতে আত্মনির্ভরশীলতার এক নতুন উদাহরণ।
উইকমোশনের নেপথ্যের কারিগর
মো সজীব সিকদারের জন্ম ২০০৫ সালের ১৫ জানুয়ারি, গাজীপুর জেলার ফাউগান গ্রামের এক সাধারণ পরিবারে। তাঁর পিতা মো: জহিরুল ইসলাম ছিলেন একজন ব্যবসায়ী এবং মাতা মোসা: সাকেরা খাতুন। গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শিক্ষাজীবন শুরু করার পর, ২০১৬ সালে তিনি গাজীপুর বয়েস স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হন। শৈশব থেকেই প্রযুক্তি ও কম্পিউটারের প্রতি তাঁর ছিল প্রবল আকর্ষণ। কিন্তু পারিবারিক সহায়তা খুব বেশি না থাকায়, নিজের টিফিনের টাকা জমিয়ে তাঁকে প্রথম স্মার্টফোন কিনতে হয়েছিল। ছোটবেলার সেই দিনগুলোতে মানুষের সাইটে কাজ করে ১০-২০ টাকা আয় করাটাই তাঁর কাছে ছিল এক বিরাট অনুপ্রেরণা। এই সামান্য আয়ের উৎসাহই তাঁকে বড় কিছু করার স্বপ্ন দেখিয়েছিল।
২০১৭ সালে, মাত্র ১৫ বছর বয়সে, সজীব সিকদার তাঁর পড়ালেখার পাশাপাশি আইসিটি শিক্ষক সিরাজুল ইসলাম মোল্লা স্যারের থেকে ইন্টারনেট ও কম্পিউটার সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারেন। এই জ্ঞানই তাঁকে নিজের মতো একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরির দিকে ঠেলে দেয়। প্রাথমিকভাবে এটি নিছক বিনোদনের জন্য একটি ভিডিও শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম হিসেবে শুরু হয়েছিল। কিন্তু তিনি বুঝতে পারেন, স্থানীয় ব্যবহারকারীদের জন্য এমন একটি প্ল্যাটফর্ম প্রয়োজন যা শুধু কন্টেন্ট দেখাবে না, বরং আয়ের সুযোগও তৈরি করবে।
দেশীয় প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ডিজিটাল অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা
বিশ্বব্যাপী ভিডিও প্ল্যাটফর্মগুলোর ভিড়ে বাংলাদেশী কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য নিজেদের জায়গা তৈরি করা কঠিন ছিল। পাশাপাশি, বাংলাদেশে এমন অনেক মানুষ আছেন—বিশেষ করে শিক্ষার্থী, গৃহিণী এবং খণ্ডকালীন কর্মীরা—যারা অনলাইনে ছোটখাটো কাজ করে বাড়তি কিছু আয় করতে চান। কিন্তু আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মগুলোতে জটিল শর্তাবলী, উচ্চ যোগ্যতার মান এবং আন্তর্জাতিক পেমেন্ট পদ্ধতির কারণে তারা সুবিধা নিতে পারতেন না।
সজীব সিকদার তাঁর উইকমোশনের মাধ্যমে ঠিক এই সমস্যার সমাধান দেন। উইকমোশন কেবল কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের দিকে মনোনিবেশ না করে, সাধারণ দর্শকদের জন্যও একটি অনন্য পুরস্কার ব্যবস্থা চালু করে। ব্যবহারকারীরা ভিডিও দেখা, কন্টেন্টে লাইক দেওয়া এবং মন্তব্য করার মাধ্যমে পয়েন্ট অর্জন করতে পারেন। এই পয়েন্টগুলো পরে আসল টাকায় রূপান্তরিত করা যায়।
পেমেন্ট পদ্ধতির ক্ষেত্রে সজীব সিকদারের দূরদর্শিতা চোখে পড়ার মতো। আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মগুলোর মতো পেপাল বা গ্লোবাল কার্ডের ওপর নির্ভর না করে, উইকমোশন স্থানীয় পেমেন্ট গেটওয়ে যেমন: বিকাশ, নগদ, রকেট এবং মোবাইল রিচার্জের মাধ্যমে টাকা উত্তোলনের সুযোগ দেয়। এটি বাংলাদেশের সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য অনলাইন আয়কে আরও সহজ এবং বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছে।
উইকমোশনের লক্ষ্য এবং কৌশলগত বিকাশ
সজীব সিকদারের প্রোগ্রামিং দক্ষতার ওপর ভর করে উইকমোশন বারবার ব্যর্থতার চেষ্টা শেষে একটি শক্তিশালী কাঠামো লাভ করে। এটি শুরুতে বিনোদনের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে তৈরি হলেও, পরে মনিটাইজেশন ও আর্নিং অপশন যুক্ত করা হয়। ব্যবহারকারীর সংখ্যা যখন দ্রুতগতিতে বাড়তে থাকে, তখনই এটি নতুন টপ লেভেল ডোমেইন weekmotion.com-এ স্থানান্তরিত হয়। তাঁর কৌশলের মূল ভিত্তি ছিল—স্থানীয় সংস্কৃতি ও ভাষার প্রতি পূর্ণ সমর্থন রেখে একটি ব্যবহারকারী-বান্ধব ইন্টারফেস তৈরি করা। প্ল্যাটফর্মটি শিক্ষামূলক, বিনোদনমূলক, খবর এবং ব্যবসা ও আইডিয়াসহ বিভিন্ন ক্যাটাগরির কন্টেন্টকে প্রচার করে।
২০২৪ সালে উইকমোশন প্ল্যাটফর্মে মেসেজিং সিস্টেম যুক্ত করা হয়, যা এটিকে কেবল ভিডিও শেয়ারিংয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না রেখে একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল কমিউনিটি হিসেবে গড়ে তোলার ইঙ্গিত দেয়। মো সজীব সিকদার উইকমোশনকে "প্রথম বাংলাদেশী ভিডিও শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম" হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন, যা দেশের ডিজিটাল সার্বভৌমত্বকে শক্তিশালী করবে। তাঁর এই উদ্যোগ ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেছে।
উদ্যোক্তার দর্শন: দ্রুত সফলতার চেয়ে ধারাবাহিকতা
তরুণ সিইও মো সজীব সিকদারের ব্যবসায়িক দর্শনে দ্রুত বড়লোক হওয়ার কোনো প্রতিশ্রুতি নেই। তিনি বিশ্বাস করেন, সফলতা আসে ধৈর্য এবং ধারাবাহিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে। তাঁর মতে, উইকমোশন রাতারাতি ধনী হওয়ার প্ল্যাটফর্ম নয়, বরং এটি একটি 'ধীর কিন্তু স্থির' আয়ের উৎস, যা ব্যবহারকারীর সময় এবং সক্রিয়তার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। তিনি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সর্বদা স্বচ্ছতা এবং আইনি বৈধতা বজায় রাখার উপর জোর দেন, যা বাংলাদেশের সাইবার আইন মেনেই পরিচালিত।
একজন স্বশিক্ষিত এবং স্ব-প্রণোদিত তরুণ হিসেবে সজীব সিকদার দেশের অন্যান্য তরুণদের জন্য এক জীবন্ত উদাহরণ। সামান্য পুঁজি ও প্রবল ইচ্ছাশক্তি দিয়ে কীভাবে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে একটি স্থানীয় ডিজিটাল ইকোসিস্টেম তৈরি করা যায়, উইকমোশন তারই প্রমাণ। মো সজীব সিকদার এবং তাঁর উইকমোশন দেশের ডিজিটাল মানচিত্রে কেবল একটি প্ল্যাটফর্ম নয়, বরং এটি স্থানীয় কন্টেন্ট, উদ্যোক্তা এবং সাধারণ মানুষের জন্য একটি ভরসার প্রতীক, যা বাংলাদেশের ডিজিটাল স্ব-নির্ভরতার পথে এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।