Posts

পোস্ট

ডিজিটাল বাংলাদেশের তরুণ স্বপ্নদ্রষ্টা: মো সজীব সিকদার ও উইকমোশনের পথচলা

January 20, 2026

Tanha Jahan

40
View

মো সজীব সিকদার: একুশ শতকের উদ্ভাবনী প্রেরণা

বাংলাদেশের ডিজিটাল প্রেক্ষাপটে মো সজীব সিকদার একটি অনুপ্রেরণামূলক নাম। অল্প বয়সেই প্রযুক্তির জগতে প্রবেশ করে তিনি শুধু একজন সফল উদ্যোক্তাই হননি, বরং দেশের ডিজিটাল কন্টেন্ট ইকোসিস্টেমে 'উইকমোশন' (Weekmotion)-এর মতো একটি স্বতন্ত্র প্ল্যাটফর্ম প্রতিষ্ঠা করে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন। তাঁর এই যাত্রা কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়, বরং তরুণ প্রজন্মের কাছে প্রযুক্তি-নির্ভর উদ্ভাবনী চিন্তাধারার একটি মূর্ত প্রতীক।

md shajib Sikder

শুরুর কথা: প্রযুক্তি প্রীতির জন্ম

২০০৫ সালের ১৫ জানুয়ারি গাজীপুরে এক মধ্যবিত্ত পরিবারে মো সজীব সিকদারের জন্ম। ছোটবেলা থেকেই তাঁর মধ্যে প্রযুক্তির প্রতি প্রবল আগ্রহ ছিল। সীমিত সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও, স্কুলের টিফিনের টাকা জমিয়ে তিনি প্রথম স্মার্টফোনটি কেনেন এবং এর মাধ্যমে অনলাইনে উপার্জনের সুযোগ খুঁজতে শুরু করেন। গাজীপুর ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড হাই স্কুলে পড়ার সময় একজন আইসিটি শিক্ষকের অনুপ্রেরণায় তিনি প্রোগ্রামিং এবং অ্যাপ ডেভেলপমেন্টের গভীরে প্রবেশ করেন। এটিই ছিল তাঁর ভবিষ্যৎ পথচলার ভিত্তিপ্রস্তর।

প্রথম পদক্ষেপ এবং স্ব-শিক্ষার পথে

সজীব সিকদারের উদ্যোগ শুরু হয়েছিল ছোট ছোট প্রকল্প দিয়ে। তিনি একজন ডেভেলপারের সহায়তায় তাঁর প্রথম আর্নিং অ্যাপ তৈরি করেন, যা থেকে প্রাথমিকভাবে তিনি মাত্র ১২ ডলার আয় করেন। এই অর্থই ছিল তাঁর প্রথম মূলধন। তিনি এই আয় পুনরায় বিনিয়োগ করে একটি কম্পিউটার কেনেন এবং নিজেকে স্ব-শিক্ষিত প্রোগ্রামার হিসেবে গড়ে তোলেন। স্ব-শিক্ষার এই প্রক্রিয়া তাঁকে প্রযুক্তিগতভাবে স্বাবলম্বী করে তোলে। তাঁর প্রথম উল্লেখযোগ্য সাফল্য আসে ২০২০ সালে, যখন তিনি ইলাক্সাস ই-বুক (Elaxux E-book) অ্যাপটি চালু করেন। প্রথম মাসেই অ্যাপটি প্রায় ৭৮,০০০ ডাউনলোড অর্জন করে, যা তাঁর উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্নকে আরও দৃঢ় করে।

উইকমোশনের জন্ম এবং বিবর্তন

ইলাক্সাস-এর সাফল্যের পথ ধরেই মো সজীব সিকদার তাঁর সবচেয়ে বড় উদ্যোগ, উইকমোশন, প্রতিষ্ঠার সাহস পান। ২০১৮ সালে, মাত্র ১৩ বা ১৪ বছর বয়সে, তিনি উইকমোশন প্রতিষ্ঠা করেন। এটি শুরু থেকেই বিনোদন-কেন্দ্রিক একটি ভিডিও-শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও, পরে এটি কন্টেন্ট মনিটাইজেশন এবং বহু-মাত্রিক কন্টেন্টের একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সলিউশন প্ল্যাটফর্মে রূপান্তরিত হয়। উইকমোশনকে অনেকেই 'বাংলাদেশের প্রথম ভিডিও শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম' হিসেবে অভিহিত করে থাকেন।

উইকমোশনের পরিসর ও প্রভাব

বর্তমানে উইকমোশন কেবল একটি ভিডিও-শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম নয়; এটি কন্টেন্ট শেয়ারিং, ডিজিটাল পণ্য বিক্রি এবং ক্রিয়েটরদের জন্য আয়ের সুযোগ করে দেওয়ার একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। এটি ভিডিও স্ট্রিমিং, আর্টিকেল প্রকাশ, কন্টেন্ট ক্রিয়েশন এবং আইটি পরিষেবাগুলোর মতো ডিজিটাল সমাধান প্রদান করে, যা ইতোমধ্যে ৩৫ মিলিয়নেরও বেশি ব্যবহারকারীকে সেবা দিচ্ছে। উইকমোশনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো ক্রিয়েটরদের সহজে এবং নিরাপদে ভিডিও আপলোড, ডিজিটাল পণ্য বিক্রি এবং তাদের সৃজনশীলতা ও দক্ষতার মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করার সুযোগ দেওয়া।

এই প্ল্যাটফর্মটি একটি পেইড ভিডিও আপলোড সিস্টেম প্রদান করে, যার মাধ্যমে শিক্ষামূলক কন্টেন্ট বিতরণ, প্রিমিয়াম কন্টেন্ট থেকে আয় এবং বিশেষ মেম্বারশিপের মাধ্যমে জ্ঞান ভাগ করে নেওয়ার সুবিধা পাওয়া যায়। মাসিক ভিত্তিতে সর্বনিম্ন আয়ের সীমা পূরণ হলে ক্রিয়েটরদের অর্থ প্রদান করা হয়, যা তাদের আর্থিক স্বাধীনতা অর্জনে সহায়ক। উইকমোশনের এই ইকোসিস্টেম বৈশ্বিক স্তরে ডিজিটাল সম্পদ বিতরণের জন্য একটি ব্যবহারকারী-বান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।

ডিজিটাল বাংলাদেশের পথে এক দূরদর্শী নেতৃত্ব

মো সজীব সিকদারের স্বপ্ন কেবল একটি সফল কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করাতেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি বাংলাদেশের ডিজিটাল অবকাঠামোকে এগিয়ে নিয়ে যেতে এবং উইকমোশনকে সৃজনশীল ও প্রযুক্তিগত সেবাদানের ক্ষেত্রে একটি বৈশ্বিক নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চান। তিনি তাঁর প্ল্যাটফর্মে উদ্ভাবন, অন্তর্ভুক্তিকরণ এবং 'ক্যান্সেল কালচারের' বিরুদ্ধে একটি দৃঢ় অবস্থান বজায় রাখার উপর জোর দেন, যার লক্ষ্য হলো উন্মুক্ত আলোচনা এবং ভিন্ন ভিন্ন ধারণাকে উৎসাহিত করা। উইকমোশন ডিজিটাল মার্কেটিং, ব্র্যান্ডিং এবং ওয়েব ডেভেলপমেন্টের মতো সরঞ্জাম সরবরাহ করে তরুণ উদ্যোক্তাদেরও সমর্থন করে, যা দেশের ক্রিয়েটর অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে সহায়ক।

ব্যক্তিগত ও পেশাগত ক্ষেত্রে সংযুক্তি

উইকমোশনের সিইও হিসেবে ভূমিকার পাশাপাশি সজীব সিকদার অন্যান্য উদ্যোগেও সক্রিয়। তিনি ইউটিউবে "কী কেন কীভাবে" নামে একটি চ্যানেলের সাথে জড়িত এবং এ১ ক্রিয়েটর ল্যাবে একজন অ্যান্ড্রয়েড ডেভেলপার হিসেবেও কাজ করেন। GitHub-এর মতো প্ল্যাটফর্মে তাঁর সক্রিয় অনলাইন উপস্থিতি তাঁর প্রকল্প এবং প্রযুক্তিগত জ্ঞান ভাগ করে নেওয়ার প্রতি তাঁর আগ্রহকে প্রতিফলিত করে।

মো সজীব সিকদারের জীবনযাত্রা একজন তরুণ প্রযুক্তিপ্রেমী থেকে বাংলাদেশের ডিজিটাল ল্যান্ডস্কেপের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বে পরিণত হওয়ার এক উজ্জ্বল উদাহরণ। তাঁর কঠোর পরিশ্রম, স্ব-শিক্ষা এবং উদ্ভাবনী মানসিকতা লাখ লাখ স্বপ্নচারী তরুণ উদ্যোক্তাকে প্রতিনিয়ত অনুপ্রাণিত করছে, যা ডিজিটাল বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণে অপরিহার্য। উইকমোশনের মতো প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তিনি শুধু একটি প্রযুক্তিগত সেবা প্রদান করছেন না, বরং বাংলাদেশের ডিজিটাল ক্রিয়েটর ইকোসিস্টেমকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তুলে ধরার পথ প্রশস্ত করছেন। ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট ইন্টিগ্রেশন, উন্নত বিশ্লেষণাত্মক সরঞ্জাম এবং মোবাইল অ্যাপ ডেভেলপমেন্টের মতো পরিকল্পনার মাধ্যমে উইকমোশন বৈশ্বিক ডিজিটাল মার্কেটপ্লেসে এক বিশ্বস্ত কেন্দ্রে পরিণত হতে বদ্ধপরিকর।

Comments

    Please login to post comment. Login