বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ধর্ম নিয়ে কথা বলতে হচ্ছে। কেন? কারণ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যেই দলটি তাঁর বা তাদের এক নাম্বার অপোনেন্ট তারা ধর্মভিত্তিক দল। তারেক রহমানকে স্বঘোষিত সেক্যুলার আ.লীগকে নিয়ে কথা বলতে হচ্ছে না বা প্রয়োজনই পড়ছে না -আ.লীগ নিজ কর্মদোষে দেশছাড়া। ডুবতে থাকা ব্যক্তি বা দলকে নিয়ে কথা বলবার জরুরত খুব একটা পড়ে না। কাজেই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রধান মিস্টার রহমানকে কথা বলতে হচ্ছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে। এমনকি তারেক রহমান হালের তৃতীয় শক্তি এনসিপির নাম ধরে বাতচিত করছেন না -তাদের জোটসঙ্গী জামায়াতকে বলাটাই যথেষ্ট মনে করছেন তিনি।
কিন্তু মুশকিল হয়েছে বিরাটভাবে চেতে গেছেন জামায়াত সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। মিস্টার পরওয়ার তারেক রহমানকে ধর্ম শিখতে বলছেন, হাওয়া ভবন এবং দুর্নীতিতে পাঁচবার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার খোটা দিচ্ছেন। যদিও ওই চ্যাম্পিয়নশিপ অর্জনের কালে জামায়াতও বিএনপি সরকারের অংশীদার ছিল।
তাহলে তারেক রহমান কি প্রথম নির্বাচনী সভায় বয়ানের চাল দিতে ভুল করলেন? আমরা মনে করি 'না'। তারেক রহমান জানতেন, জামায়াতের অতীত ঘাটলে তারেকের অতীতও খুঁড়ে বের করবেন জামায়াতিরা। এতে আলটিমেট ফায়দা কার? অতি অবশ্যই গণতন্ত্রের, মুক্তমতের এবং আপামর সাধারণ জনতার।
তারেক রহমান যখন নাম না উল্লেখ করেই নিজ অনুসারী তথা মিডিয়ার মাধ্যমে দেশবাসীকে জামায়াতের একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের ভূমিকা মনে করিয়ে দিলেন -অমনি জামায়াত বুঝে গেল ওই কথাগুলো তাদেরকেই বলা হয়েছে। এবং একাত্তরের ভূমিকার নিদান খুঁজতে জুলাই আপ্রাইজিং -এর পর আগুন ও বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয়া শেখ মুজিবেরই দ্বারস্থ হতে হচ্ছে। বলতে হচ্ছে যাকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতি বলা হয় সেই শেখ মুজিবই জীবিতাবস্থায় একাত্তরের রাজাকার ইস্যু সমাধান করে গেছেন। ইট ওয়াজ ডিসাইডেড ম্যাটার। অবস্থাদৃষ্টে আমরা বলতে পারি, তারেক রহমান জামায়াতের একাত্তর ইস্যু সামনে এনে ঔচিত্যপূর্ণ কাজ করেছেন। জামায়াত ভোটের আগে এই ইস্যুতে যৌক্তিক তর্ক করতে পারছে।
অপরদিকে তর্কে হারিয়ে দিতে তারেক রহমানকে ধর্ম শিখে আসতে বলেছে জামায়াত। এই যে ধর্ম শিখতে বলা, অতীত খুঁড়ে দোষ বের করে আনা -এসবই তারেক রহমানকে ভুল শোধরানোর পথ বাতলে দেবে। কোনো মানুষই ভুলত্রুটির উর্ধ্বে নয়। তিনি নিজের ভুলগুলো নিয়ে এখন ভোটারদের সামনে কোনো প্রকার রাখঢাক না রেখেই কথা বলতে পারবেন। ভুল স্বীকারে কোনো দোষ নেই। বাঙালি প্রকৃতিগতভাবেই ক্ষমাশীল এবং ভুলোমনা। তাই যদি না হতো জামায়াতকে তারা এভাবে নিজেদের আপনার লোক মনে করত না।
ভোটকে কেন্দ্র করে জয় লাভের জন্য জামায়াত তার সর্বস্ব দিয়ে লড়বে এটাই স্বাভাবিক। আর বাঙালি যেহেতু ধর্মভীরু -ধর্মকার্ড এখানে নিশ্চিতই খুব কাজে দেয়। সুতরাং জামায়াত যদি ধর্মকার্ডের ইটটি ছুঁড়ে -নিউটনের গতিসূত্র মেনে বিএনপিও ধর্মকার্ডের পাটকেলটি মারবে। রাজনীতির ময়দানে নো কম্প্রোমাইজ।
তারেক রহমান সিলেটের সমাবেশে সম্মানিত একজন হাজী সাহেবকে সাক্ষী মেনে বলেন, 'দোজখের মালিক আল্লাহ; বেহেশতের মালিক আল্লাহ, এই পৃথিবীর মালিক আল্লাহ, কাবার মালিক আল্লাহ। আরে ভাই যেটার মালিক আল্লাহ, সেটা কি অন্য কেউ দেওয়ার ক্ষমতা রাখে? রাখে না। তাহলে নির্বাচনের আগেই একটি দল ‘এই দেব, ওই দেব বলছে’; টিকিট দেব বলছে না? যেটার মালিক মানুষ না, সেটার কথা যদি সে বলে, শিরক করা হচ্ছে, হচ্ছে না? কাজেই আগেই তো আপনাদেরকে ঠকাচ্ছে, নির্বাচনের পরে তাহলে কেমন ঠকাবে আপনাদেরকে- বোঝেন এবার।'
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের এই বক্তব্যের নিন্দা জানিয়েছেন মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, ‘কোনো একজন মুসলমান, যিনি আল্লাহ, রাসুল ও আখেরাতকে বিশ্বাস করেন, তিনি পরকালে বিশ্বাসী আরেকজনকে কাফের বলতে পারেন না, এটি জায়েজ নয়। তিনি এটা বড় অপরাধ করেছেন।’
গোলাম পরওয়ার আরও বলেন, ‘আমরা ধারণা করেছিলাম, উনি লন্ডনে গেছেন, পড়াশোনা করেছেন, কিছুটা পলিটিক্যাল ম্যাচিউরিটি হয়তো আছে। কিন্তু দেখি যে উনি তো এখন বড় মুফতি হয়ে গেছেন। বিলেত থেকে এসে ফতোয়া দিচ্ছেন, কে মুসলমান আর কে কাফের। এটা বলার তাঁর কোনো অধিকার নেই। রাজনৈতিক নেতা হিসেবে সৌজন্যতা, শিষ্টাচারবোধের জায়গা থেকেও এই কথা বলা যায় না।’
এরপরই যথারীতি মিস্টার পরওয়ার বলেন, 'আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে দ্বীন কায়েমের নিয়মতান্ত্রিক জিহাদ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন খুলনা-৫ (ডুমুরিয়া ফুলতলা) আসনে ১০–দলীয় জোট প্রার্থী ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় অস্ত্রের যুদ্ধের পরিবর্তে ব্যালটের মাধ্যমেই রাষ্ট্রক্ষমতা ও আইন পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হয়েছে এবং এটিই বর্তমান সময়ের সংগ্রামের পথ।'
ব্যালটের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা ও আইন পরিবর্তনকে জিহাদ বলা যাবে কি যাবে না -এটা বলবেন ফিকহশাস্ত্র বিশারদরা। তাই না?
কিন্তু হিসাবে বিজ্ঞানে এমকম পাশ এবং সাবেক সাংবাদিক মিয়া গোলাম পরওয়ার কিংবা ডা. শফিকুর রহমানের মতো স্বনামধন্য চিকিৎসক যদি ধর্মীয় বিষয়ে বয়ান দেয়ার অধিকার রাখেন অতি অবশ্যই জেনারেল শিক্ষায় শিক্ষিত তারেক রহমানও শিরক, বেহেশত বা দোজখ নিয়ে কথা বলবার অধিকার রাখেন।
আমরা শুধু বলব এই আলোচনা বা সমালোচনা যেন সভ্যতা ও ভব্যতার সীমা ছাড়িয়ে না যায়। কাউকে ব্যক্তিগত আক্রমণের বিষয়বস্তু যেন না করা হয়। আমরা না তারেক রহমানের, না শফিকুর রহমানের। আমরা না বিএনপির, না জামায়াতের। আমরা দেশে বিশুদ্ধ গণতন্ত্র সমুন্নত রাখা এবং সর্বমানুষের সমানাধিকারের পক্ষে কথা বলি। এবং এটাই আমাদের ব্রত ও সাধনা।
নির্বাচনী মাঠ গরম হচ্ছে হোক। শেষ পর্যন্ত জয়টা যেন দেশের হয় এবং হাসিটা যেন মানুষের থাকে। বিএনপি কিংবা জামায়াত সত্যিকারের ভোটে আপনারা যারাই ক্ষমতায় আসুন আমরা স্যালুট জানাবো। কোনো ধরণের চৌর্যবৃত্তি কিংবা নির্বাচন প্রকৌশলের ধান্দাবাজির পক্ষে আমরা আগেও ছিলাম না, এখনো নেই।
লেখক: সাংবাদিক
২৩ জানুয়ারি ২০২৬