গল্পের নাম: নদীর ওপারে আলো
চরেরবাড়ি গ্রামটি যেন নদীর বুকেই জন্ম নিয়েছে। বছরের অর্ধেক সময় নদী তাকে আগলে রাখে, আর বাকি সময় ভয় দেখায়। বর্ষায় যখন পানি বাড়ে, তখন মনে হয়—গ্রামটা বুঝি আর থাকবে না। আবার শীত এলে চর জেগে ওঠে, মাঠে ফসল হয়, মানুষ নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখে।
এই গ্রামেই জন্ম রাশেদের। জন্মের পরপরই তার বাবা বলেছিলেন, “ছেলেটার চোখে কিছু একটা আছে।” সেই “কিছু একটা” কী, তখন কেউ বুঝতে পারেনি। আজ বুঝলে অবাক হতো না।
রাশেদের বাবা কাদের মাঝি। নদীই তার জীবন, নদীই তার ভয়। প্রতিদিন ভোরে নৌকা নিয়ে বের হন—কখনো মানুষ পার করেন, কখনো মাল। আয় অনিশ্চিত। কোনো দিন পকেটে টাকা থাকে, কোনো দিন শুধু ক্লান্তি। মা আমিনা বেগম স্কুলে রান্নার কাজ করেন। চুলে পাকা রং আগেই ঢুকেছে, কিন্তু মুখে কখনো হতাশা নেই।
রাশেদ ছোট থেকেই চুপচাপ। খেলাধুলার চেয়ে সে বেশি পছন্দ করত বসে বসে ভাবতে। তার সবচেয়ে প্রিয় জায়গা ছিল নদীর পাড়। সেখানে বসে সে ঢেউ গুনত, নৌকা দেখত, আর ভাবত—এই নদীর ওপারে কী আছে?
একদিন স্কুলের পুরোনো পাঠাগারে ঢুকে সে একটি বই পেয়েছিল। বইটি ছিল ছেঁড়া, ধুলো জমা, অনেকেই ছুঁয়েও দেখেনি। কিন্তু রাশেদের কাছে সেটাই ছিল জানালা। জানালা, যেটা খুললেই অন্য একটা পৃথিবী দেখা যায়। সে বই পড়ে জেনেছে—মানুষ চাইলে নিজের ভাগ্য বদলাতে পারে।
তবে বাস্তবতা তাকে বারবার থামিয়ে দিত। অনেক রাতে সে মায়ের কাশির শব্দ শুনত। বাবাকে শুনত হিসাব মিলাতে না পেরে দীর্ঘশ্বাস ফেলতে। তখন তার বুক ভারী হয়ে যেত। সে ভাবত, “আমি কি শুধু স্বপ্ন দেখেই থেমে যাব?”
বর্ষা এলো। একদিন নয়, টানা কয়েক দিন বৃষ্টি। নদী ফুলে উঠল। ঘর থেকে বের হলেই হাঁটুসমান পানি। সেই ভয়াল সন্ধ্যায় খবর এলো—পাশের চরের এক বৃদ্ধ মানুষ গুরুতর অসুস্থ। তাকে এখনই হাসপাতালে নিতে হবে।
লোকজন জড়ো হলো। কেউ বলল, “স্রোত খুব বেশি।” কেউ বলল, “নৌকা উল্টে যাবে।” তখন কাদের মাঝি এগিয়ে এলেন। তিনি জানতেন ঝুঁকি কতটা, তবুও পিছু হটলেন না। রাশেদ বাবার চোখে সেই দৃঢ়তা দেখল—যেটা শব্দে বোঝানো যায় না।
নৌকা নদীতে নামল। ঢেউয়ের সঙ্গে লড়াই চলল। গ্রামের মানুষ নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল। অনেকক্ষণ পর নৌকা ফিরে এলো। বৃদ্ধ মানুষটি বেঁচে গেছে। সেই রাতে রাশেদ ঘুমোতে পারেনি। সে বুঝেছিল—দায়িত্ব মানে নিজের ভয়কে পিছনে ফেলে দেওয়া।
এই ঘটনার পর তার ভেতরে কিছু বদলে গেল। সে আরও মন দিয়ে পড়াশোনা শুরু করল। শিক্ষক লক্ষ করলেন। একদিন তিনি বললেন, “শহর থেকে একটা বৃত্তির সুযোগ এসেছে। খুব কম জন পাবে।” রাশেদের বুক কেঁপে উঠল, কিন্তু চোখে আশা জ্বলে উঠল।
পরীক্ষার আগের দিনগুলো ছিল কঠিন। বাতির আলোয় পড়া, ক্লান্ত চোখ, তবুও থামেনি। পরীক্ষার দিন সে পরিষ্কার জামা পরল। নামাজ পড়ে মায়ের দোয়া নিল। মা শুধু বললেন, “আল্লাহ তোর মনের চেষ্টাটা দেখবেন।”
পরীক্ষা শেষ হলো। অপেক্ষা শুরু হলো। এই অপেক্ষা নদীর মতো—শান্ত দেখালেও ভেতরে স্রোত। অনেক সময় রাশেদের মনে হতো, হয়তো কিছুই হবে না। আবার কখনো মনে হতো—এইবার কিছু বদলাবে।
এক বিকেলে শিক্ষক তাকে ডাকলেন। হাতে একটি চিঠি। রাশেদ কাঁপা হাতে চিঠি খুলল। পড়তে পড়তে তার চোখ ভিজে গেল। সে বৃত্তি পেয়েছে। শহরের স্কুল, নতুন জীবন।
সেই রাতে সে নদীর ধারে দাঁড়াল। চাঁদের আলো পানিতে কাঁপছে। সে বুঝল—এই নদীই তাকে শক্ত করেছে। কষ্টই তাকে গড়েছে। আলো শুধু নদীর ওপারে ছিল না, আলো জন্মেছিল তার ভেতরেই।
চরেরবাড়ি গ্রাম আগের মতোই রইল। নদীও বয়ে চলল। কিন্তু রাশেদের গল্প বদলে গেল। সে জানে—স্বপ্ন বড় হলে পথ আপনাআপনি খুলে যায়।