Posts

চিন্তা

আগামীর বাংলাদেশ: ভাবাবেগ ও বিবেকের রাজনীতি!

January 28, 2026

ফারদিন ফেরদৌস

37
View

আল জাজিরাকে দেওয়া বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের সাক্ষাৎকারে নারীর অধিকার, নেতৃত্ব ও ইসলামি আইন বিষয়ে দলের অবস্থান স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তিনি বলেছেন, জামায়াত ক্ষমতায় এলে ইসলামি আইন জারি হবে কিনা -তা জনগণ ও সংসদের সিদ্ধান্ত; দলের অন্য নেতাদের বক্তব্যকে তিনি গুরুত্ব দেন না।

নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে তিনি স্বীকার করেন যে এবারের নির্বাচনে জামায়াত একজন নারী প্রার্থীও দেয়নি। এটিকে তিনি 'বাংলাদেশের কালচার' ও 'প্রস্তুতির অভাব' বলে ব্যাখ্যা করেন। ভবিষ্যতে নারীদের প্রস্তুত করা হবে বললেও, তিনি স্পষ্টভাবে জানান -কোনো নারী কখনোই জামায়াতের আমির হতে পারবেন না। এর যুক্তি হিসেবে তিনি নারীর শারীরিক ভূমিকা, মাতৃত্ব ও আল্লাহর সৃষ্টি-ব্যবস্থার কথা বলেন এবং দাবি করেন, নেতৃত্বের ক্ষেত্রে নারীদের সীমাবদ্ধতা আছে।

নারী প্রধানমন্ত্রী, নারী প্রতিষ্ঠানপ্রধানের ক্ষেত্রে দেশ কিংবা বৈশ্বিক উদাহরণ থাকা সত্ত্বেও তিনি নারীর রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বকে স্বাভাবিক বা উপযুক্ত বলে মানতে চান নি।

যেখানে জনসংখ্যার অর্ধেক নারী, শিক্ষা, শ্রমবাজার, রপ্তানি ও কৃষিতে নারীরা প্রধান চালিকাশক্তি -এমন বাস্তবতায় জামায়াতের এই দৃষ্টিভঙ্গি নারীর প্রতি কাঠামোগত বৈষম্য এবং ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ সীমাবদ্ধতার ইঙ্গিত দেয়।

আমরা বলতে পারি, আপনি কেন জামায়াতের আমিরের কাছে জানতে চাইবেন যে, আপনারা ক্ষমতায় গেলে কি শরিয়া আইন দেবেন? আপনার দলে কি কখনো নারীরা আমির হতে পারবে? এই দুইটি প্রশ্নের স্পষ্ট জবাব তাদের গঠনতন্ত্রেই আছে। আপনি যদি রিলিজিয়াস স্পিরিটে পরিপূর্ণ আস্থাবান হন নারী নেতৃত্ব আপনিও মানতে পারবেন না।

কথা হলো জামায়াত যদি ক্ষমতায় যায় এবং ব্রুটাল মেজরিটি পায় তাহলে সংবিধান বাতিল করে দিয়ে তাদের গঠনতন্ত্র অনুসারে সংবিধান সংশোধন করে নিতে পারবে কি? মোটাদাগে এখানে দুইটা বড় বাধা আছে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তিতে পাওয়া সংবিধান ছুঁড়ে ফেলে দিলে বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্রের অস্তিত্ব থাকে কিনা? এবং দ্বিতীয়ত জুলাই চার্টারে বর্ণিত নারীর অধিকার, ক্ষমতায়ন এবং নেতৃত্বের যে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে; বহুত্ববাদী মানবাধিকার রক্ষার যে কমিটমেন্ট রাজনৈতিক দলগুলো দিয়েছে সেটার মান্যতা থাকে কিনা? না, এর কোনোটাই থাকবে না।

তাহলে জামায়াত যদি তাদের মতো করে সংবিধান বানিয়ে বলে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ছিল ভারত ও আ.লীগের ষড়যন্ত্র -তাহলে এইদেশে কিন্তু আমার সোনার বাংলা জাতীয় সঙ্গীত থাকে না, লাল সবুজের জাতীয় পতাকাও টেকে না। সেইসাথে বিএনপিসহ অপরাপর দলের সাথে জামায়াতের স্বাক্ষর করা জুলাই সনদও বাতিল করে দিতে হবে। এখন বলেন জামায়াত ছাড়া বাকি দলগুলো এসব কেন মানবে?

এবং মানবে না বলেই বিএনপি নির্বাচনী প্রচারণার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের ন্যারেটিভ খুব বেশি বেশি হাজির করছে। এবং এটা করতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধকে মেজর জিয়ার একক কৃতিত্ব বলেও তারা হাজির করছে না। এর মাধ্যমে বিএনপি এক ঢিলে দুই পাখি মারছে। একদিকে প্রচ্ছন্নভাবে স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতকে লেসন দিচ্ছে। দ্বিতীয়ত মুক্তিযুদ্ধের একক কৃতিত্বের দাবিদার আ.লীগের রাশ টেনে ধরছে।

তাহলে ঘটনাটা কী ঘটতে যাচ্ছে? 
আমেরিকাভিত্তিক একটি জরিপ সংস্থা আগামী নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াতের জনসমর্থনের খুব কম পার্থক্য দেখিয়েছে। আল জাজিরা ইংলিশ লিখেছে, 'A December survey by the United States-based International Republican Institute put the BNP’s support at 33 percent, with Jamaat close behind at 29 percent.'

তাহলে ভোটে নির্বাচিত হওয়া কিংবা সরকার গঠনের মতো জনসমর্থন বেশি পাওয়ায় কোন ফ্যাক্টরটি প্রধানতম অনুষঙ্গ হিসেবে কাজ করবে? নিরপরাধ আওয়ামী ভোটারদের একটি বড় পার্ট থাকবে সামনের নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার ক্ষেত্রে। খেয়াল করলে দেখবেন জামায়াত বা বিএনপি কোনো দলই শেখ হাসিনা বা তার দলের বিচারের কথা জোরেশোরে মুখে আনছে না। বিএনপি বলছে স্বৈরাচার বিদায় হয়েছে এখন দেশ গড়ার পালা। জামায়াত আরেকটু বাড়িয়ে বলছে তাদের প্রতি অতীতের নিপীড়কদের তারা ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবে।

ঠিক এই কারণেই দেশে শরিয়া আইন ইমপোজড হবে না। কারণ যারা সরকার গঠন করবে তাদের বড় অংশ জুড়ে সেক্যুলারদের সমর্থন থাকবে। সেক্যুলারদের নানাবিধ আত্মস্বার্থকেন্দ্রিক ভুলভ্রান্তি আছে, কিন্তু তারা দেশটায় যে মানবতাবাদী ও বহুত্ববাদী গণতন্ত্র দেখতে চায় এই চাওয়াটায় ভুল নেই।

আগামী নির্বাচনে আরেকবার প্রমাণ হবে দেশের মানুষ আমার সোনার বাংলা গাইতে চায় কিনা, পহেলা বৈশাখ পালন করতে চায় কিনা? আমরা মনে করি বিএনপি যদি দ্বিতীয় দলও থাকে জামায়াতের পক্ষে একমুখী শরিয়া আইন জারি করা সম্ভবপর হবে না। আর যদি মার্কিন সমর্থন নিয়ে ক্ষমতাসীন জামায়াত গণতন্ত্র ফেলে দিয়ে ধর্মীয় আইন জারি করেই ফেলে সেই শাসনটা হবে আরব আমিরাত বা কাতারের মতো। জীবনাচরণে মার্কিনিদের সাথে ইউএই কিংবা কাতারের খুব বেশি পার্থক্য নেই।

তবে আমাদের অ্যাজাম্পশন বা পূর্বধারণা হলো তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করবে। সেই সরকারে জামায়াত ও এনসিপির শীর্ষ নেতৃবৃন্দ মন্ত্রীর মর্যাদায় অভিষিক্ত হবে। ঠিক জাতীয় সরকার নয়; তবে স্থিতিশীল রাজনীতির জন্য কাছাকাছি একটা সরকার ব্যবস্থা আমরা দেখব -যেটি হয়ত আগে দেখিনি। এবং আজকের অন্তর্বর্তী সরকারের শীর্ষতম ব্যক্তি সেই সরকারের অধীনে রাষ্ট্রের এক নাম্বার ব্যক্তি হতে পারেন। সেই সরকার কি জুলাই চার্টারের মান্যতা দেবে? ওই চার্টারের ৮৪টি অনুচ্ছেদের ৭১টিতে নোট হিসেবে লিখা হয়েছে তবে ক্ষমতাসীন দল নির্বাচনী ইশতেহারের আলোকে গণম্যান্ডেট নিয়ে নিজেদের মতো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে। তখনকার ক্ষমতাসীন দল নিজেদের জন্য ভালোটাই নিশ্চয় সবার আগে করবে। ভাবাবেগ দিয়ে নয় বিবেক দিয়েই চলবে।

লেখক: সাংবাদিক 
২৮ জানুয়ারি ২০২৬

Comments

    Please login to post comment. Login