Posts

গল্প

শীতের মরনকামড়

January 29, 2026

Tahsin ess

18
View

পৌষ মাসের শেষ রাত।
হিমেল বাতাস যেন ধারালো ছুরির মতো গায়ের চামড়া কেটে কেটে ঢুকে পড়ছে। উত্তর দিকের হাওয়া মাঠ পেরিয়ে গ্রামের ভাঙা ঘরগুলোতে আছড়ে পড়ছে বারবার। আকাশে চাঁদ নেই, তারা নেই—শুধু ঘন কুয়াশার সাদা চাদর। চারদিক নিস্তব্ধ, অথচ সেই নিস্তব্ধতার ভেতরেই লুকিয়ে আছে শীতের মরণকামড়।

চরফুলতলা গ্রামের মানুষ জানে—এই শীত শুধু ঠান্ডা নয়, এই শীত মৃত্যু ডেকে আনে।

গ্রামের এক কোণে ছোট্ট মাটির ঘরে থাকে রমিজ উদ্দিন। বয়স পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই, কিন্তু শরীরটা যেন আশির কোঠার। সারাদিন ইটভাটায় কাজ করে সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরে। আজও ফিরেছে ক্লান্ত শরীরে। গায়ে একটাই ছেঁড়া চাদর, সেটা দিয়েই স্ত্রী আছিয়া আর দুই সন্তান—সাত বছরের মিনা আর চার বছরের রশিদ—কে জড়িয়ে ধরে বসে আছে।

চুলার আগুন নিভে গেছে অনেক আগেই। জ্বালানি নেই।

রমিজ কাঁপতে কাঁপতে বলল,
— “আল্লাহ জানে আজ রাতটা কেমন কাটবে।”

আছিয়া কিছু বলল না। শুধু মিনাকে বুকে জড়িয়ে ধরল আরও শক্ত করে। মিনার ঠোঁট নীল হয়ে গেছে, দাঁত ঠকঠক করে কাঁপছে। শীত তার ছোট শরীরে থাবা বসিয়েছে।

বাইরে হঠাৎ কুকুরের কান্নার মতো আওয়াজ। দূরের মসজিদ থেকে ভেসে আসে আজানের ধ্বনি, কিন্তু সেই ধ্বনিও যেন কুয়াশায় আটকে দুর্বল হয়ে গেছে।

রাতে হঠাৎ করেই মিনার জ্বর বেড়ে যায়। শরীর পুড়ে যাচ্ছে, অথচ হাত-পা বরফের মতো ঠান্ডা। রমিজ দিশেহারা হয়ে পড়ে। এই গভীর রাতে ডাক্তার? রাস্তা নেই, টাকা নেই।

সে মেয়েকে বুকে তুলে নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলে,
— “বাবা, একটু সহ্য কর… আব্বা আছি।”

কিন্তু শীত নিষ্ঠুর।
ভোরের আগেই মিনার শ্বাসটা ধীরে ধীরে থেমে যায়।

কুয়াশার ভেতর দিয়ে ভোর আসে, কিন্তু সে ভোর আলো নিয়ে আসে না—আনে লাশের নীরবতা।

গ্রামে খবর ছড়িয়ে পড়ে—আরও দু’জন বৃদ্ধ শীতে মারা গেছে। পাশের বাড়ির খালামণি, যে প্রতিদিন রোদে বসে হাঁড়ি বানাত, সে আর উঠেনি। শীত তার বুকের ভেতর জমে থাকা শেষ নিঃশ্বাসটুকুও কেড়ে নিয়েছে।

গ্রামের কবরস্থানে একের পর এক জানাজা। মানুষের চোখে পানি নেই, যেন কান্নার শক্তিটুকুও শীতে জমে গেছে।

রমিজ উদ্দিন মেয়ের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বলে,
— “এই শীত শুধু ঠান্ডা না… এই শীত গরিবের কফিন।”

সূর্য উঠলেও কুয়াশা কাটে না। শীত যেন মানুষের বুকের ভেতর স্থায়ীভাবে বসে গেছে।

কিন্তু শীত যতই নির্মম হোক, মানুষ থেমে থাকে না। গ্রামের কয়েকজন যুবক চাঁদা তুলে কম্বল আনতে যায়। কেউ পুরনো সোয়েটার দেয়, কেউ আগুন জ্বালানোর কাঠ। শীতের বিরুদ্ধে ছোট্ট একটা যুদ্ধ শুরু হয়।

রমিজ সেই কম্বল গায়ে জড়িয়ে প্রথমবারের মতো একটু উষ্ণতা অনুভব করে। কিন্তু বুকের ভেতরের শূন্যতা আর কখনো ভরাট হয় না।

কারণ—
শীত চলে যাবে,
কুয়াশা কেটে যাবে,
কিন্তু শীতের মরণকামড়ে যারা চলে যায়,
তারা আর কখনো ফিরে আসে না।

Comments

    Please login to post comment. Login