ছোটবেলা থেকেই সে আমাকে আলাদা চোখে দেখত। আমরা একে ওপরের পরিচিত কারণ—ও আমার মামাতো বোন। আমি বুঝতাম, তবু বুঝেও না বোঝার ভান করতাম। কারণ তখন আমার জীবনে অন্য একজন ছিল। তাই ওর নীরব অপেক্ষা, চাপা অভিমান—সবই চোখ এড়িয়ে গিয়েছিল।
সময় বদলাল। মানুষ বদলায়, সম্পর্কও। বড় ভাইয়ের বিয়ে ঠিক হতেই বাড়িটা হঠাৎ করে উৎসবের রঙে ভরে উঠল। আত্মীয়, বন্ধু, পরিচিত—সবাই আসতে লাগল। ওরাও এলো।
অনেকদিন পর ওকে দেখলাম। আগের সেই চঞ্চল মেয়েটা নেই—চোখে এখন এক ধরনের শান্ত গভীরতা। কথা কম, কিন্তু দৃষ্টিতে অনেক কিছু জমে আছে।
হলুদ সন্ধ্যার দিন। বাড়ি ভরা মানুষ, হাসি, গান, ব্যস্ততা। আমি নিজের রুমে কিছু জিনিস নিতে যাচ্ছিলাম । দরজা খোলা দেখে ভেবেছিলাম রুম ফাঁকা। তাই কোনো চিন্তা না করেই ঢুকে পড়লাম।
ভেতরে ঢুকেই থেমে গেলাম।
সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শাড়ি পরার চেষ্টা করছে। আমাকে দেখেই হঠাৎ ঘুরে দাঁড়াল। লজ্জায় গাল দুটো লাল হয়ে উঠল।
“ভাইয়া… তুমি?”
কণ্ঠটা অপ্রস্তুত।
আমি তাড়াতাড়ি অন্যদিকে ঘুরে বললাম,
“সরি, আমি ভাবিনি কেউ আছে। আমার কিছু জিনিস নিতে এসেছিলাম।”
সে একটু থেমে বলল,
“দরজায় নক করোনি কেন?”
আমি হালকা হাসি দিয়ে বললাম,
“দরজা খোলা ছিল তো।”
ও নিচু স্বরে বলল,
“ভুলে গিয়েছিলাম দরজা লাগাতে ।”
কথার ফাঁকে চোখে পড়ল—ওর ব্লাউজের পেছনের একটা বোতাম খোলা। আমি অস্বস্তি নিয়ে বললাম,
“একটা বোতাম… খোলা আছে।”
সে একটু থেমে, যেন অনেক ভেবে বলল,
“আমি লাগাতে পারছি না। তুমি কি… একটু সাহায্য করবে?”
মুহূর্তটা ভারী হয়ে উঠল। আমি কিছু না বলে খুব সাবধানে বোতামটা লাগিয়ে দিলাম। হাত সরিয়ে নিতেই বুঝলাম—হৃদস্পন্দনটা অস্বাভাবিক দ্রুত।
সে ধীরে বলল,
“ধন্যবাদ।”
এরপর একটু চুপচাপ। বাইরে থেকে গান আর হাসির শব্দ আসছে, কিন্তু ঘরের ভেতরটা যেন আলাদা এক জগৎ।
সে হঠাৎ বলল,
“তুমি আগের মতো নেই।”
আমি অবাক হয়ে তাকালাম।
“মানে?”
“আগে আমার দিকে তাকাতেই না। আজ তাকালে… চোখে অন্য কিছু আছে।”
কথাগুলো খুব শান্ত, কিন্তু ভেতরে জমে থাকা অনেক দিনের।
আমি কিছু বলার আগেই সে বলল,
“আমি জানি, তখন তোমার অন্য জীবন ছিল। আমি কিছু চাইনি। শুধু অপেক্ষা করেছি।”
আমি ধীরে বললাম,
“কিছু অনুভূতি সময় নেয়… বুঝতে।”
সে আমার দিকে তাকাল। চোখে জল নয়, কিন্তু আবেগ ভরপুর।
“আমি এখনো অপেক্ষায় আছি।”
এই কথাটুকুই যথেষ্ট ছিল। আমি ধীরে হাত বাড়ালাম। ওর হাতটা আমার হাতের ভেতরে এলো। কোনো জোর নেই, কোনো তাড়াহুড়ো নেই—শুধু নীরব সম্মতি।
এই প্রথম…
কথা নয়, স্পর্শই সব বলল।
দরজার বাইরে থেকে কারও ডাক ভেসে এলো। আমরা দু’জনেই বাস্তবে ফিরে এলাম। সে ধীরে হাত ছাড়িয়ে নিল, কিন্তু চোখে একফোঁটা অজানা হাসি রেখে।
আমি বেরিয়ে আসার সময় বুঝলাম—
এটা শেষ নয়।
এটা শুধু রোমান্সের প্রথম ধাপ।
এরপর—পার্ট ২
134
View