Posts

গল্প

অসুখী আধুনিকতা

January 29, 2026

Md Josam

Original Author মোঃ জসিম

Translated by মোঃ জসিম

28
View

গল্পের নাম: অসুখী আধুনিকতা
নিরালা শহর এক সময় খুব সাধারণ ছিল। সকালে ঘুম ভাঙত মসজিদের আজান আর পাখির ডাকে। মানুষ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে একে অপরকে সালাম দিত, খোঁজ নিত। সন্ধ্যায় ছাদে ছাদে কথা হতো, গল্প হতো, হাসি হতো।
কিন্তু সময় বদলেছে।
নিরালা এখন আধুনিক।
এখন সকাল শুরু হয় স্ক্রিনের আলো দিয়ে। মানুষ চোখ খুলেই নিজের মুখ দেখে না—দেখে ফোন। কার মেসেজ এলো, কার পোস্টে কত লাইক, কে কোথায় গেল—এই সব জানা বেশি জরুরি, নিজের মনটা কেমন আছে সেটা নয়।
এই শহরেই থাকত আরিফ।
আরিফ বাইরে থেকে সফল একজন মানুষ। ভালো চাকরি, ভালো বেতন, ভালো পোশাক, সোশ্যাল মিডিয়ায় জনপ্রিয়তা। তার ছবি মানেই ঝকঝকে হাসি, দামি ক্যাফে, সুন্দর ক্যাপশন।
লোকজন বলত,
“ভাই, জীবনটা তো স্বর্গ!”
কিন্তু কেউ জানত না—রাতে ঘুমানোর আগে আরিফ নিজের বুকের ভেতর এক অদ্ভুত ভার অনুভব করত। একটা চাপা কষ্ট, যার কোনো নাম নেই।
তার মা একই বাড়িতে থাকে। তবু দিনে দিনে কথা হয় পাঁচ মিনিট।
তার বাবা পাশে বসে খবর দেখেন, তবু দু’জনের মাঝে কথা নেই।
একই ছাদের নিচে থেকেও তারা আলাদা জগতে বাস করে—নিজ নিজ স্ক্রিনের ভেতর।
একদিন আরিফ লক্ষ করল, তার মা চুপচাপ জানালার দিকে তাকিয়ে আছেন।
সে জিজ্ঞেস করল,
“মা, কী দেখছো?”
মা একটু হেসে বললেন,
“কিছু না… আগের দিনের কথা ভাবছিলাম।”
আরিফ বুঝল না। সে বুঝতেই শেখেনি।
নিরালার মানুষ এখন আর কাঁদে না—স্ট্যাটাস দেয়।
ভেঙে পড়ে না—স্টোরি দেয়।
কারও মৃত্যু হলে শোক করে না—পোস্টে ‘RIP’ লিখে স্ক্রল করে চলে যায়।
বন্ধুরা একসাথে বসে, কিন্তু কথা বলে না। সবাই ব্যস্ত নিজের ভার্চুয়াল জীবনে।
কারও চোখে চোখ রেখে কথা বললে অস্বস্তি লাগে, কিন্তু অচেনা মানুষের কমেন্টে আত্মসম্মান খুঁজে পায়।
আরিফেরও এমনই ছিল।
একদিন অফিস থেকে ফেরার পথে সে দেখল, রাস্তার ধারে এক বৃদ্ধ বসে আছেন। তার হাতে একটা পুরোনো খাতা।
আরিফ জানতে চাইল,
“চাচা, কী লেখেন?”
বৃদ্ধ বললেন,
“মানুষের কথা।”
আরিফ অবাক হলো।
“এখনও কেউ শোনে নাকি?”
বৃদ্ধ মৃদু হেসে বললেন,
“শোনে না বলেই তো লিখি। নইলে সব কথা মরে যায়।”
এই কথাটা আরিফকে নাড়া দিল।
সেদিন রাতে সে ফোন খুলে বসল। অসংখ্য নোটিফিকেশন। কেউ তার ছবি পছন্দ করেছে, কেউ মন্তব্য করেছে।
কিন্তু হঠাৎ তার মনে হলো—এই মানুষগুলো কি তাকে চেনে?
তার ক্লান্তি জানে?
তার ভয় জানে?
তার নিঃসঙ্গতা জানে?
উত্তর ছিল—না।
সে প্রথমবার ফোনটা নামিয়ে রাখল।
পরের কয়েকদিন অস্বস্তিতে কাটল। মনে হচ্ছিল সে কিছু হারাচ্ছে।
আসলে সে হারাচ্ছিল—একটা মিথ্যা ব্যস্ততা।
ধীরে ধীরে সে বাবার সাথে বসে কথা বলতে শুরু করল।
মা’র হাতের রান্না খেয়ে বলল, “ভালো হয়েছে।”
বন্ধুর সাথে বসে ফোন ছাড়া কথা বলল।
সে বুঝল—আধুনিকতা আমাদের সময় বাঁচায়নি, সময় চুরি করেছে।
আমাদের কাছাকাছি আনেনি, দূরে ঠেলে দিয়েছে।
আমাদের সব দিয়েছে, শুধু শান্তি ছাড়া।
নিরালা শহর বদলায়নি।
মানুষ এখনও স্ক্রিনে ডুবে।
কিন্তু আরিফ বদলেছে।
সে জানে—
আধুনিক হওয়া দোষ না।
দোষ হলো, মানুষ হওয়াটা ভুলে যাওয়া।
এই গল্প শুধু আরিফের না।
এই গল্প আমার, তোমার, আমাদের সবার।
কারণ আমরা সবাই কোনো না কোনোভাবে
এই অসুখী আধুনিকতার ভেতরেই বেঁচে আছি।

Comments

    Please login to post comment. Login