গল্পের নাম: অসুখী আধুনিকতা
শহরের নাম ছিল নিরালা—নামে যতটা নিরালা, বাস্তবে ততটাই কোলাহলপূর্ণ। চারদিকে উঁচু দালান, ঝকঝকে বিলবোর্ড, আর মানুষের হাতে হাতে জ্বলজ্বলে স্ক্রিন। এখানে সকাল শুরু হতো অ্যালার্মের শব্দে নয়, নোটিফিকেশনের কম্পনে। চোখ খুলেই মানুষ আগে নিজের ফোনটা খুঁজে নিত, তারপর নিজের মনটাকে।
এই শহরেই থাকত আরিফ। বয়স বেশি না, তবু চোখের ভেতর এক ধরনের ক্লান্তি বাসা বেঁধেছিল। সে একটি ভালো চাকরি করত, সামাজিক মাধ্যমে হাজার হাজার ফলোয়ার, ছবি দিলে লাইক পড়ত ঝরঝর করে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতো—আরিফের জীবন নিখুঁত। কিন্তু প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর আগে তার মনে হতো, এই নিখুঁততার ভেতর কোথাও একটা গভীর ফাঁক আছে।
আরিফের বাবা গ্রামের মানুষ। একসময় গ্রামে তারা সবাই একসাথে বসে রাতের খাবার খেত, গল্প করত, হাসত। এখন বাবা ফোনে কথা বললে বলেন,
“তোর মা’র সাথে সারাদিন কথা হয় না রে। সে এক ঘরে, আমি আরেক ঘরে—দু’জনেই মোবাইল নিয়ে বসে থাকি।”
আরিফ তখন হেসে উড়িয়ে দিত। কিন্তু মনের ভেতর কথাটা গেঁথে থাকত।
নিরালায় মানুষ কথা বলত, কিন্তু শুনত না। ক্যাফেতে বসে বন্ধুদের আড্ডা—সবাই এক টেবিলে, কিন্তু চোখ ছিল আলাদা আলাদা স্ক্রিনে। কেউ কারও চোখের দিকে তাকাত না। দুঃখের কথা কেউ বললে তার উত্তর আসত না, আসত একটা রিঅ্যাকশন—🙂 বা 👍।
একদিন অফিস থেকে ফেরার পথে আরিফ দেখল, রাস্তায় এক বৃদ্ধ বসে আছেন। তার সামনে একটা পুরোনো রেডিও। আধুনিক শহরে এই দৃশ্য অদ্ভুত। আরিফ থামল। বৃদ্ধ বললেন,
“এই রেডিওটা জানিস? একসময় মানুষ একসাথে বসে এটা শুনত। তখন খবর শুধু খবর ছিল, তুলনা ছিল না।”
আরিফ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। হঠাৎ মনে হলো—সে কতদিন কাউকে মন দিয়ে শোনেনি? কতদিন নিজের কষ্ট কাউকে খুলে বলেনি?
সেদিন রাতে আরিফ তার ফোনটা টেবিলে রেখে জানালার কাছে দাঁড়াল। বাইরে শহরের আলো ঝলমল করছে, কিন্তু ভেতরে তার বুকের ভেতর অদ্ভুত অন্ধকার। সে ভাবল—আমরা আধুনিক হয়েছি, কিন্তু সুখী হয়েছি কি? সবকিছু শেয়ার করি, অথচ অনুভূতিগুলো লুকিয়ে রাখি। সবার সাথে যুক্ত, তবু একা।
পরদিন আরিফ সামাজিক মাধ্যম থেকে কিছুদিনের জন্য দূরে থাকার সিদ্ধান্ত নিল। প্রথম কয়েকদিন অস্থির লাগল, মনে হলো কিছু হারিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ধীরে ধীরে সে বুঝল—সে আসলে নিজেকেই ফিরে পাচ্ছে। সে বাবা-মাকে ফোন করল, লম্বা কথা বলল। বন্ধুর সাথে মুখোমুখি বসে চা খেল, ফোন ছুঁয়েও দেখল না।
নিরালা শহর বদলায়নি। মানুষ আগের মতোই স্ক্রিনে ডুবে আছে। কিন্তু আরিফ বদলেছে। সে বুঝেছে, আধুনিকতা খারাপ নয়—অসুখী হয় তখনই, যখন মানুষ হওয়ার জায়গাটা আমরা ভুলে যাই।
এই গল্প কোনো একজনের নয়। এটা আমাদের সবার।
কারণ আমরা সবাই কোনো না কোনোভাবে এই অসুখী আধুনিকতার ভেতর দিয়েই হাঁটছি।
20
View