রাতের আকাশে চাঁদটা অদ্ভুত উজ্জ্বল। তার আলো যেন শহরের কাঁচের দালানগুলোর ভিতর ঢুকে সোনালি ছোঁয়া ফেলে দিচ্ছিল। শহরের এই অচেনা অলিগলিতে হেঁটে চলছিল হিয়া, এক ত্রিশ বছরের তরুণী, যার চোখে সবসময় নতুন কিছু খোঁজার আগ্রহ জ্বলছিল।
হিয়া ছোটবেলা থেকে গল্প লিখত। তবে কখনও নিজের গল্প কারো কাছে দেখায়নি। আজও তার পকেটে ছোট একটি খাতা লুকিয়ে রেখেছিল—একটি গল্প, যা সে কয়েক মাস ধরে লিখছিল। গল্পের নাম ছিল “চন্দ্রবিন্দু”।
হঠাৎ, অলি-গলির কোণে ছোট এক পুরনো বইয়ের দোকান তার নজর কেড়ে নিল। দোকানের জানালায় লেখা ছিল, “আপনার গল্প এখানে বিক্রি করা যায়। শুধু সাহস দেখাতে হবে।”
হিয়ার মন কেঁপে উঠল। এ কি সত্যিই সম্ভব? কি হয় যদি কেউ তার গল্প পড়ে ভালো না লাগে? তারপরও, কৌতূহল তাকে বাধ্য করল দরজা ঠেকাতে।
“আপনি কি সাহায্য করতে পারেন?” হিয়া জিজ্ঞেস করল, একটু লাজুকভাবে।
দোকানদার—বৃদ্ধ লোক, যার চোখে গভীর শান্তি আর অভিজ্ঞতার ঝিলিক—হেসে বললেন, “আমার এখানে গল্প বিক্রি হয়, কিন্তু প্রথমে আমাকে দেখাতে হবে। যদি সত্যিই গল্পে প্রাণ থাকে, পাঠক খুঁজে নেবে।”
হিয়া হাতের খাতা বের করল। সে গল্পের প্রথম লাইন পড়ল—
"চাঁদের আলোয় লুকানো একটি পৃথিবী আছে, যেখানে মানুষ শুধু স্বপ্ন দেখতে পারে।"
দোকানদারের চোখ বড় হয়ে গেল। “বহু দিন পরে আমি এমন গল্প পেলাম, যা সত্যিই ভেতর থেকে লেখা।”
পরের সপ্তাহে হিয়া তার গল্প বইয়ের দোকানে প্রকাশ করল। আশ্চর্যজনকভাবে, গল্পের কপি ফুরিয়ে গেল মাত্র কয়েকদিনে। পাঠকরা চিঠি পাঠাতে লাগল, অনলাইনে রিভিউ করতে লাগল। প্রতিটি চিঠি পড়ে হিয়া বুঝল, তার কল্পনা মানুষকে ছুঁয়ে গেছে।
একদিন দোকানের জানালার বাইরে দাঁড়িয়ে হিয়া দেখতে পেল এক অচেনা ছেলেকে, যার চোখে ঠিক সেই একই আগ্রহ, যা তার নিজের চোখে থাকে। ছেলেটি হেসে বলল, “আপনি কি চন্দ্রবিন্দুর গল্প লিখেছেন? আমি এই গল্প পড়ে রোমাঞ্চিত হয়েছি।”
হিয়া হেসে বলল, “হ্যাঁ… কিন্তু গল্পটা পুরোপুরি আমার নয়। পাঠকরা এটাকে বাঁচিয়েছে।”
সেদিন রাত, হিয়া শহরের ছাদে বসে চাঁদটা দেখছিল। সে বুঝল—গল্প লিখে নিজের মন খুলে দেওয়া মানে শুধু গল্প লেখা নয়, অন্যদের জীবনে আলো ছড়ানো। আর এই আলো ছড়ানো কোনো দামের মাপকাঠিতে মাপা যায় না।
চন্দ্রবিন্দু তার হৃদয়ে একটি অমোঘ নিদর্শন হয়ে রয়ে গেল। হিয়া জানল, গল্প লেখা শুধু প্যাশন নয়, এটি শক্তি—মনে রাখা শক্তি, যা মানুষকে জীবনে এগিয়ে নিয়ে যায়।
17
View