Posts

চিন্তা

বাংলাদেশের পথচ্যুত সন্তানের প্রত্যাবর্তন!

January 30, 2026

ফারদিন ফেরদৌস

27
View

Exclusive: Bangladesh’s Prodigal Son
By: Charlie Campbell / Dahaka
EDITOR AT LARGE 
January 28, 2026

তারেক রহমান তাঁর কণ্ঠস্বর হারিয়েছেন। ১৭৫ মিলিয়ন মানুষের দক্ষিণ এশীয় রাষ্ট্র বাংলাদেশের একজন প্রত্যাশিত নেতৃত্বপ্রার্থী—তাঁর জন্য এটি নিঃসন্দেহে অনুকূল নয়। তবু ঘটনাটির ভেতরে এক ধরনের নির্মম ব্যঙ্গ লুকিয়ে আছে। কারণ, স্বদেশে কার্যত বিরোধী শিবিরের প্রধান মুখপাত্র হিসেবে তাঁর ভাষণ এক দশক ধরে স্বৈরাচারী সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে দেশীয় গণমাধ্যমে নিষিদ্ধ ছিল। এখন কণ্ঠস্বর হারানোর এই বাস্তবতা যেন সেই দীর্ঘ নীরবতারই এক প্রতীকী প্রতিধ্বনি।

নির্বাসন থেকে ১৭ বছর পর স্বদেশে ফেরার পর প্রথম কোনো সাক্ষাৎকারে ‘টাইম’ (TIME)-কে তারেক রহমান বলেন, "আমার শরীর এখানকার আবহাওয়ার সাথে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে।" বাগানবিলাস ও গাঁদা ফুলে ঘেরা পারিবারিক বাড়ির বাগানে বসে কথা বলার সময় তিনি কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলেন, "এমনিতে আমি কথা বলায় খুব একটা পারদর্শী নই, তবে আমাকে কোনো দায়িত্ব দিলে আমি তা পালনের সর্বোচ্চ চেষ্টা করি।"

তারেক রহমানের জন্য গত কয়েক সপ্তাহ ছিল ঝোড়ো গতির। ২৫ ডিসেম্বর তিনি বাংলাদেশে পৌঁছালে ঢাকার বিমানবন্দরে রাতভর অপেক্ষারত লাখো মানুষ তাকে বিপুল সংবর্ধনা জানায়। মাত্র পাঁচ দিন পর তাঁর মা এবং বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া দীর্ঘ অসুস্থতার পর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাকে বিদায় জানাতে রাজধানীজুড়ে মানুষের যে ঢল নামে, তা ছিল অভূতপূর্ব। চোখে জল নিয়ে তারেক রহমান বলেন, "হৃদয়টা খুব ভারাক্রান্ত। তবে মায়ের কাছ থেকে শেখা শিক্ষা হলো—যখন আপনার ওপর কোনো দায়িত্ব আসবে, তখন তা আপনাকে পালন করতেই হবে।"

সেই দায়িত্ব হতে পারে মায়ের দেখানো পথ অনুসরণ করা। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে তারেক রহমান স্পষ্টত সবার চেয়ে এগিয়ে রয়েছেন। ১৮ মাস আগে এক ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর এই নির্বাচনের ডাক দেওয়া হয়েছে। তারেক রহমান নিজেকে এমন এক সেতুবন্ধন হিসেবে তুলে ধরছেন, যা বাংলাদেশের স্বাধীনতার সময়ের রাজনৈতিক অভিজাততন্ত্র এবং তরুণ বিপ্লবীদের আকাঙ্ক্ষার মধ্যে সমন্বয় ঘটাবে।

বর্তমানে দেশে অনেক সমস্যা দ্রুত সমাধানের দাবি রাখে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং টাকার মান কমে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় কমেছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়ায় আমদানিতে কড়াকড়ি আরোপ করতে হয়েছে, যা উৎপাদন ও জ্বালানি সরবরাহকে ব্যাহত করছে। এসব প্রতিকূলতা এমন এক অর্থনীতিকে বহুমুখী করার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা এখনও পোশাক রপ্তানি ও রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরশীল। ১৩.৫% যুব বেকারত্ব এবং প্রতি বছর ২০ লাখ তরুণের শ্রমবাজারে প্রবেশের বাস্তবতায় নতুন প্রজন্মের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা এক বড় চ্যালেঞ্জ।

তবে তারেক রহমানের সাথে কিছু বিতর্কিত অতীত বা ‘ব্যাগেজ’ জড়িয়ে আছে। তার প্রধান পরিচয় বংশীয়—জিয়াউর রহমান এবং খালেদা জিয়ার ছেলে হিসেবে। ৬০ বছর বয়সী এই নেতা বাংলাদেশের রাজনীতির সেই চিরচেনা দ্বিদলীয় মেরুকরণের এক পক্ষের প্রতিনিধিত্ব করেন (অন্যপক্ষে শেখ হাসিনা, যিনি দেশের প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা)।

তাঁর সমর্থকদের কাছে রহমান হলেন এক নির্যাতিত ত্রাণকর্তা, যিনি বিপর্যস্ত স্বদেশকে রক্ষা করতে ফিরে এসেছেন। তাঁর বিরোধীদের কাছে তিনি এক অন্ধকার রাজপুত্র—দুর্নীতিপরায়ণ ও সুবিধাভোগী এক বিশ্ববিদ্যালয় ড্রপআউট, যার নেতৃত্বের একমাত্র যোগ্যতা জন্মগত সুবিধা।
রহমান দাবি করেন, বিভক্ত জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে তুলতে তিনিই সঠিক ব্যক্তি। তিনি বলেন, “আমি এখানে আছি শুধু আমার বাবা-মায়ের সন্তান বলে নয়। আমার দলের সমর্থকরাই আজ আমাকে এখানে এনেছেন।”

বাংলাদেশিরাও সম্ভবত তাঁকে বিশ্বাস করতে প্রস্তুত। ডিসেম্বরের শেষ দিকের জনমত জরিপ অনুযায়ী, তার দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সমর্থন ছিল প্রায় ৭০%, যেখানে তাদের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামী ছিল ১৯ শতাংশে।

তা সত্ত্বেও জনমনে উদ্বেগ কাজ করছে। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপির শাসনামলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল টানা চার বছর বাংলাদেশকে বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। সংস্কারপন্থীরা আশঙ্কা করছেন যে, হাসিনাকে হঠাতে গিয়ে প্রায় ১,৪০০ জন আন্দোলনকারীর যে রক্ত ঝরেছে, তা যেন আবারও কোনো স্বার্থান্বেষী শাসকগোষ্ঠীর ক্ষমতায় বসার কারণ না হয়।

তারেক রহমান তার বিরুদ্ধে ওঠা সব দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তার পূর্ববর্তী সাজাগুলো বাতিল করেছে। তিনি বলেন, "তারা কোনো কিছুই প্রমাণ করতে পারেনি।" এটি সত্য যে, শেখ হাসিনার শাসনামলে অনুগত সংবাদমাধ্যমগুলো তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো বারবার প্রচার করত। তবে এটাও অনস্বীকার্য যে, তারেক রহমান সেই বংশীয় রাজনীতির সাথে যুক্ত, যার বিরুদ্ধে জুলাই বিপ্লবের তরুণরা গর্জে উঠেছিল।

দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হিসেবে বাংলাদেশ বর্তমানে জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনে এককভাবে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখে এবং মার্কিন ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ডের সাথে মহড়ায় অংশ নেয়। বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ এই দেশটি পার্শ্ববর্তী মিয়ানমার থেকে আসা ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগের বৃহত্তম উৎস এবং রপ্তানির শীর্ষ গন্তব্য। একই সময়ে বাংলাদেশ স্যামসাংয়ের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের জন্য হাই-টেক ম্যানুফ্যাকচারিং হাব হিসেবে চীনের বিকল্প হয়ে উঠছে। অন্যদিকে বেইজিংও বাংলাদেশের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়তে চায়, কারণ কৌশলগতভাবে বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের অবস্থান দক্ষিণ চীন সাগরে কোনো অবরোধের পরিস্থিতি তৈরি হলে চীনের জন্য বিকল্প পথ হতে পারে।

আশা করা হচ্ছে যে, নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শুরু করা প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারগুলো এমন সুরক্ষা নিশ্চিত করবে যা দেশকে পুনরায় স্বৈরতন্ত্রের দিকে ধাবিত হতে দেবে না। এবং এটাও প্রত্যাশা যে, নির্বাসিত জীবনে তারেক রহমান নিজের ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নিয়েছেন এবং একজন সত্যিকারের জননেতা হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলেছেন।

তারেক রহমান বলেন, "যাঁরা প্রাণ হারিয়েছেন, তাঁদের প্রতি আমাদের বিশাল দায়িত্ব রয়েছে। আমাদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে যাতে মানুষ তাদের রাজনৈতিক অধিকার ফিরে পায়।"

ব্যক্তিজীবনে তারেক রহমান মৃদুভাষী ও অন্তর্মুখী হিসেবে পরিচিত; তিনি কথা বলার চেয়ে শুনতেই বেশি পছন্দ করেন। লন্ডনে থাকার সময় তার প্রিয় কাজ ছিল রিচমন্ড পার্কে একা হাঁটা বা ইতিহাসের বই পড়া। তার প্রিয় চলচ্চিত্র ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’। তিনি হেসে বলেন, "আমি সম্ভবত এটি আটবার দেখেছি!"

তারেক রহমানকে একজন নীতি-নির্ধারক বা ‘পলিসি ওয়াঙ্ক’ হিসেবে মনে হয়, যিনি যেকোনো বিষয়ে তথ্য ও পরিসংখ্যান দিতে পারেন। তিনি ভূগর্ভস্থ পানির স্তর রক্ষায় ১২,০০০ মাইল খাল খনন, পরিবেশ রক্ষায় বছরে ৫ কোটি গাছ লাগানো এবং দূষণকবলিত ঢাকার বাতাসের মানোন্নয়নে ৫০টি নতুন সবুজ উদ্যান তৈরির পরিকল্পনা করেন। এছাড়া তার পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন, প্রবাসী শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে কারিগরি কলেজের আধুনিকায়ন এবং স্বাস্থ্যখাতের চাপ কমাতে বেসরকারি হাসপাতালের সাথে অংশীদারিত্ব।

তিনি বলেন, "আমি যদি আমার পরিকল্পনার মাত্র ৩০% বাস্তবায়ন করতে পারি, তবে আমি নিশ্চিত যে বাংলাদেশের মানুষ আমাকে সমর্থন করবে।"

তারেক রহমানের এই পরিকল্পনানির্ভর ভাবমূর্তি তার অতীত বদনামের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনি ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন, বিমান বাহিনী শাহীন স্কুলে পড়াশোনা করেন এবং আশির দশকের মাঝামাঝি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে ভর্তি হন। তবে দ্বিতীয় বর্ষে থাকাকালীন তিনি পড়ালেখা ছেড়ে দিয়ে ব্যবসা ও পরবর্তীতে নব্বইয়ের দশকে রাজনীতিতে সক্রিয় হন। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে তার উত্থান তাকে দলের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বে পরিণত করে, যা তাকে দুর্নীতির নানা বিতর্কের মুখেও ফেলেছিল।

অনেক বাংলাদেশির কাছে তিনি এখনও ‘খাম্বা তারেক’ নামে পরিচিত। অভিযোগ ছিল, এক সহযোগীর কাছ থেকে চড়া দামে হাজার হাজার বৈদ্যুতিক খুঁটি (খাম্বা) কেনা হলেও সেগুলোতে কখনো বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়নি। তিনি এসব অভিযোগ অস্বীকার করলেও ২০০৮ সালের একটি ফাঁস হওয়া মার্কিন কূটনৈতিক তারবার্তায় তাঁকে "দুর্নীতিগ্রস্ত সরকার ও সহিংস রাজনীতির প্রতীক" হিসেবে অভিহিত করা হয়েছিল।

২০০৭-২০০৮ সালের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তারেক রহমান ১৮ মাস জেল খাটেন। সে সময় তার বিরুদ্ধে অর্থপাচার ও গ্রেনেড হামলার পরিকল্পনাসহ ৮৪টি মামলা ছিল। কারাগারে নির্যাতনের ফলে তার মেরুদণ্ডে যে সমস্যা তৈরি হয়েছিল, তা আজও তাকে ভোগায়। চিকিৎসার জন্যই মূলত তিনি যুক্তরাজ্যে গিয়েছিলেন। তিনি বলেন, "শীত বেশি পড়লে পিঠে ব্যথা শুরু হয়। তবে আমি একে মানুষের প্রতি আমার দায়িত্বের স্মারক হিসেবে দেখি। আমি আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করব যাতে ভবিষ্যতে অন্য কাউকে এভাবে কষ্ট পেতে না হয়।" ২০১৮ সালে তার মা দুর্নীতির অভিযোগে কারাবরণ করলে তিনি লন্ডনে থেকেই দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন।

পরবর্তী এক দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতি দ্রুত বেড়েছে। ২০০৬ সালে ৭১ বিলিয়ন ডলারের জিডিপি ২০২২ সালে ৪৬০ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়। কিন্তু একই সাথে আওয়ামী লীগ আরও বেশি দমনমূলক হয়ে ওঠে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মতে, গত ১৫ বছরে প্রায় ৩,৫০০ মানুষ বিচারবহির্ভূতভাবে গুম হয়েছেন। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিকীকরণ করা হয়েছে। সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজকে নজরদারি ও হয়রানির শিকার হতে হয়েছে।

একসময় অর্থনৈতিক সূচকগুলো নেতিবাচক হতে শুরু করে—মূল্যবৃদ্ধি, বৈষম্য এবং বেকারত্ব আকাশচুম্বী হয়। জুলাই মাসের বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল কোটা সংস্কারের দাবিতে, কিন্তু হাসিনার কঠোর দমননীতি সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভের আগুন জ্বালিয়ে দেয়। কিশোর থেকে বৃদ্ধ, অধ্যাপক থেকে মেহনতি মানুষ—সবাই রাজপথে নেমে আসে।

বিক্ষোভকারীরা যখন ঢাকার গণভবনের দিকে অগ্রসর হয়, হাসিনা সামরিক হেলিকপ্টারে চড়ে ভারতে পালিয়ে যান। বর্তমানে তিনি সেখানেই আছেন এবং তার দলের নির্বাচনে অংশ নিতে না পারার সমালোচনা করছেন। হাসিনা টাইম-কে বলেন, "জনগণকে বিকল্পের মধ্যে বেছে নেওয়ার অধিকার দিতে হবে। সব প্রধান দলের অংশগ্রহণ ছাড়া বাংলাদেশে গণতন্ত্রের আশা নেই।"

তারেক রহমানের কাছে হাসিনার এই গণতন্ত্রের বয়ান বেশ হাস্যকর মনে হয়, বিশেষ করে যে পরিমাণ রক্তপাত তার শাসনামলে হয়েছে। তিনি বলেন, "যে অপরাধ করবে, আইনের মাধ্যমে তার বিচার হতে হবে। তাদের অবশ্যই শাস্তি পেতে হবে।" নভেম্বরে একটি ট্রাইব্যুনাল রায় দিয়েছে যে, হাসিনা দেশে ফিরলে তাকে মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি হতে হতে পারে।

তবে আওয়ামী লীগকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখার সিদ্ধান্তটি বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় রয়টার্সকে বলেছেন যে, আওয়ামী লীগ ছাড়া কোনো নির্বাচন হতে দেওয়া হবে না এবং প্রয়োজনে তারা সহিংস আন্দোলনের পথে হাঁটবেন।

এমন অস্থিরতা ওয়াশিংটনে খুব একটা সমর্থন পাবে না। বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের ২০% শুল্ক আরোপের ফলে বাংলাদেশের রপ্তানি খাত চাপে রয়েছে। তারেক রহমান জানান, তিনি বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর উপায় খুঁজছেন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে বোয়িং বিমান ও জ্বালানি অবকাঠামো কেনার মাধ্যমে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করবেন। তিনি বলেন, "ডোনাল্ড ট্রাম্প তার দেশের স্বার্থ দেখবেন, আমি আমার দেশের। কিন্তু আমরা একে অপরকে সাহায্য করতে পারি। আমি নিশ্চিত মি. ট্রাম্প একজন যুক্তিবাদী মানুষ।"

ঢাকার রাস্তায় এখনও জুলাই বিপ্লবের স্মৃতি টাটকা। দেয়ালজুড়ে হাসিনার পতনের চিত্র এবং ‘জেন-জি’র নতুন বাংলাদেশের স্লোগান। জাতীয় নাগরিক কমিটির হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, "জুলাইয়ের পর মানুষ বিচার বিভাগ ও প্রশাসনের স্বাধীনতা চেয়েছে। তারেক রহমান এখন পর্যন্ত ভালোই করছেন, তবে তার পারফরম্যান্স সম্পর্কে মন্তব্য করার সময় এখনও আসেনি।"

সংস্কারের সাফল্য নিয়েও সংশয় আছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে কোনো রাজনৈতিক দল ছিল না, এবং ড. ইউনূসের প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার অভাব থাকায় শুরুতে কিছুটা সমন্বয়হীনতা দেখা গেছে। নারীরা আন্দোলনে অগ্রভাগে থাকলেও সরকারে তাদের প্রতিনিধিত্ব ছিল সামান্য। নারী অধিকার নিয়ে প্রস্তাবিত সংস্কারগুলোও চরমপন্থীদের বাধার মুখে পড়েছে।

তবে কিছু সাফল্যও আছে। গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশন ১,৯১৩টি অভিযোগ খতিয়ে দেখেছে। সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার ওপর চাপ থাকা সত্ত্বেও অভিযুক্তদের বেসামরিক আদালতে বিচার করা হচ্ছে। রাজনৈতিক আলোচনার পথ এখন উন্মুক্ত। হাসিনাকে নিয়ে ভারতে বসে থাকা চক্রান্তের কঠোর সমালোচক শরিফ ওসমান হাদিকে ১২ ডিসেম্বর গুলি করে হত্যা করার পর কিছু সহিংসতার ঘটনা ঘটলেও, মানুষ এখন অনেকটা নির্ভয়ে কথা বলতে পারছে।

তারেক রহমান বলেন, "আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার হবে আইনের শাসন নিশ্চিত করা, যাতে মানুষ রাস্তায় এবং ব্যবসায় নিরাপদ বোধ করে।"

নির্বাচনের সাথে সাথে সংবিধান সংস্কারের ওপর একটি গণভোটও হতে পারে, যেখানে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা এবং দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী না থাকার প্রস্তাব থাকতে পারে। সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রধান আলী রিয়াজ বলেন, "এই সংস্কারগুলো না হওয়া হবে হতাশাজনক, যা দেশকে আবারও অতীতের অন্ধকার পথে নিয়ে যেতে পারে।"

আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে না রাখা প্রসঙ্গে তারেক রহমান নীতিগতভাবে কোনো দল নিষিদ্ধ করার পক্ষে নন। তিনি বলেন, "আজ আপনি এক দল নিষিদ্ধ করলে কাল অন্য কেউ আমাকে নিষিদ্ধ করবে না—তার গ্যারান্টি কী? তবে কেউ অপরাধ করলে তাকে অবশ্যই সাজা পেতে হবে।"

বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশে ইসলামপন্থী রাজনীতির উত্থানও একটি বড় আলোচনার বিষয়। ১০% হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান সংখ্যালঘু থাকলেও বাংলাদেশ সাংবিধানিকভাবে এখন ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে মানে। শেখ হাসিনা চরমপন্থা দমনের নামে কঠোর অবস্থান নিলেও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জামায়াতে ইসলামীর ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে। বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়া ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে জামায়াত তরুণদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচনে জামায়াতের ছাত্র সংগঠন বড় জয় পেয়েছে। যদিও সমালোচকরা তাদের ‘মডারেট’ হওয়ার দাবীকে কেবল কৌশল মনে করেন, সাধারণ মানুষ তাদের সততার বয়ানে আকৃষ্ট হচ্ছে। তারেক রহমান অবশ্য এ নিয়ে চিন্তিত নন; তিনি মনে করেন মানুষ শুধু অবাধে কথা বলার এবং গণতন্ত্রের অধিকার চায়।

ভারতের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নও হবে পরবর্তী সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ। ভারত বাংলাদেশের প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার হলেও হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়া এবং দিল্লির নেতিবাচক প্রচারণার কারণে তরুণ বাংলাদেশিদের মধ্যে ভারত-বিদ্বেষ তুঙ্গে। আটলান্টিক কাউন্সিলের মাইকেল কুগেলম্যানের মতে, "ভারতের সাথে বন্ধুত্ব বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া তারেক রহমানের জন্য বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি হতে পারে।"

এই প্রজন্ম এখন আর ৫০ বছর আগের মুক্তিযুদ্ধের গল্পের ওপর ভিত্তি করে ভোট দেয় না। তারা চায় এমন এক নেতা যিনি মানুষের কথা শুনবেন এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবেন। যদি অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি না হয়, তবে মানুষ হয়তো আবার হাসিনার আমলের কথা ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেলবে। কুগেলম্যান বলেন, "বংশীয় রাজনীতিকে একেবারে বাতিল করে দেওয়া যায় না। দুই বছর আগে বিএনপিকেও মৃত মনে করা হয়েছিল, কিন্তু তারা ফিরে এসেছে। হাসিনাও হয়তো ভবিষ্যতে ফিরে আসার চেষ্টা করবেন।"

তারেক রহমান দুর্নীতির ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতন থাকলেও, তার দলের তৃণমূলের সেই কর্মীরা—যারা গত ১৫ বছর ধরে নির্যাতিত হয়েছেন—তারা এখন ক্ষমতার সুযোগ নিতে চাইবেন কি না, তা নিয়ন্ত্রণ করা তারেক রহমানের জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ হবে।

তবে তারেক রহমান আগের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছেন। মে মাসে তিনি নিজেকে নিয়ে একটি ব্যঙ্গচিত্র শেয়ার করে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেছিলেন। খালেদা জিয়ার জানাজায় তিনি হাসিনাকে আক্রমণ না করে জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছিলেন। শেখ হাসিনার কঠোর ‘আয়রন লেডি’ মূর্তির বিপরীতে তারেক রহমান নিজেকে অনেক নমনীয়ভাবে উপস্থাপন করছেন। তার প্রিয় বিড়াল ‘জেবু’র ছবিও সোশাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে।

লন্ডনের জীবনের কোন জিনিসটা মিস করেন?—এমন প্রশ্নে তারেক রহমান দ্বিধাহীনভাবে উত্তর দেন, "আমার স্বাধীনতা।" নিজের ১০ ফুট উঁচু কাঁটাতারের বেড়া ঘেরা বাড়ির দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন, "এই বাড়ির নিরাপত্তা দেখলে আমার এখন দমবন্ধ লাগে।" রিচমন্ড পার্কে হাঁটা বা মেয়ের জন্য সারপ্রাইজ নিয়ে যাওয়ার দিনগুলো এখন অতীত।

তবুও তারেক রহমানের কোনো অভিযোগ নেই। তিনি ফিরে এসেছেন এক বড় উদ্দেশ্য নিয়ে। স্পাইডার-ম্যান চলচ্চিত্রের একটি উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, "বিশাল ক্ষমতার সাথে আসে বিশাল দায়িত্ব। আমি তা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি।"

Comments

    Please login to post comment. Login