Posts

প্রবন্ধ

ডিএনসিসির নতুন বাড়ি ভাড়া নির্দেশিকা: ভাড়াটিয়াদের স্বার্থ সুরক্ষা নাকি দুর্ভোগের নতুন দরজা?

January 30, 2026

রাইসুল সৌরভ

14
View

কিছুদিন আগে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি) কর্তৃপক্ষ যখন নগরে বাড়ি ভাড়া বিষয়ক বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেবে বলে ঘোষণা দিয়েছিল তখন রাজধানীর অগণিত ভাড়াটিয়ার মনে স্বস্তির আশা জাগালেও গত ২০ জানুয়ারি ডিএনসিসির প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ ভাড়াটিয়ার অধিকার নিশ্চিতে নিয়ন্ত্রকের পক্ষে বিস্তারিত নির্দেশিকা তুলে ধরার পর এ বিষয়ে নতুন কিছু আইনি প্রশ্ন ও বিড়ম্বনার আশংকা দেখা দিয়েছে। যদিও ব্যাপক সমালোচনার মুখে ডিএনসিসি নির্দেশিকা জারির দুই দিনের মধ্যে ব্যাখ্যা দিয়েছে যে বাড়ি ভাড়া নির্ধারণ মালিকও ভাড়াটিয়ার মধ্যে দর কষাকষি এবং বিদ্যমান আইনের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে। এর আগে এক রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ বিগত ২ ডিসেম্বর ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্টদের বাড়ি ভাড়া নির্ধারণে নীতিমালা প্রস্তুতে রুল জারি করেছিল। 

ডিএনসিসি ঘোষিত নির্দেশিকার কয়েকটি বিধান ভাড়াটিয়াদের মনে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। ডিএনসিসির বাড়ি ভাড়া সংক্রান্ত নির্দেশিকার উদ্দেশ্য হওয়া উচিৎ ছিল একটি নিয়ন্ত্রণহীন ও ভাড়াটিয়া নিষ্পেষিত বাজারে কিছুটা ভারসাম্য ও ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করা। এখন সেটিই বরং আইনগত বৈধতা ও বাস্তবে প্রয়োগযোগ্যতার প্রশ্নে নতুন জটিলতা তৈরি করেছে। 

এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় আশংকার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে বার্ষিক বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধি বাড়ি/ফ্ল্যাটের বাজারমূল্যের ১৫ শতাংশের বেশি না হওয়ার বিদ্যমান আইনি বিধান সংস্কারের উদ্যোগ না নিয়ে বরং তা বহাল রাখার বিধানে। যা প্রকৃতপক্ষে ভাড়া আকাশচুম্বী করার জন্য এখন একটি বৈধ ছাড়পত্র হিসেবে কাজ করবে। সেই সঙ্গে যোগ হয়েছে আইন লঙ্ঘন করে তিন মাস পর্যন্ত অগ্রিম নেয়ার বিধান অন্তর্ভুক্তি।

তাছাড়া ডিএনসিসি বাড়ি ভাড়া সংক্রান্ত যে নির্দেশনা দিয়েছে তার অধিকাংশই বাড়িওয়ালা এবং ভাড়াটিয়া উভয়েরই স্বার্থ বিরোধী, দায়সারা, অগোছাল, অযৌক্তিক, অস্পষ্ট ও বে-আইনি এবং মূলত দেশে ১৯৯১ সাল থেকে প্রচলিত বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইনের পুনরাবৃত্তি। এ ধরণের আইন, বিধি বা নির্দেশিকা প্রণয়নের সময় স্বার্থ সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের অধিকার সমুন্নত রাখার বিষয়ে বিশেষ নজর দিতে হয়। ডিএনসিসির এই নির্দেশিকা বিভিন্ন বিষয়ে ভাড়াটিয়াদের সঙ্গে আলোচনার ওপর জোরারোপ করলেও নির্দেশিকা প্রস্তুত করার আগে ডিএনসিসি কর্তৃপক্ষ নিজে স্বার্থ সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেছে ও মতামত নিয়েছে বলে মনে হয়নি। নিলেও সেসব সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত না করে নিজেদের মনমতো একটি অপরিকল্পিত নির্দেশিকা জারি করেছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।

যেমনঃ নির্দেশিকার ৪ দফানুসারে বাড়িওয়ালা তাঁর প্রত্যেক ভাড়াটিয়াকে ছাদের ও মূল গেটের (সদর দরজা) চাবি শর্তসাপেক্ষে দেবেন। কিন্তু শর্ত কী রকম হতে পারে বা শর্ত নির্ধারণে বিবেচ্য বিষয় কী কী হবে সে সম্পর্কে কোন নির্দেশনা নেই।

অধিকন্তু ৫ নম্বর দফায় বলা হয়েছে ভাড়াটিয়া মাসের ১০ তারিখের মধ্যে বাড়িওয়ালাকে ভাড়া প্রদান করবেন। অথচ ১৯৯১ সালের আইনানুসারে চুক্তির অবর্তমানে বাড়ি ভাড়া মাসের পরবর্তী মাসের পনর দিনের মধ্যে পরিশোধ করার কথা বলা আছে। যার ফলে ভাড়াটিয়াদের আইনি অধিকার ক্ষুন্ন করা হয়েছে।

আবার ৭ নম্বর দফায় বলা হয়েছে ভাড়া বাড়ানোর সময় হবে জুন-জুলাই। কোন ভাড়াটিয়া নিশ্চয় জুন-জুলাই মাসের জন্য অপেক্ষা করে বাড়ি ভাড়া নিবে না। সেক্ষেত্রে বছরের অন্য সময় কেউ ভাড়া নিলে দুই বছর মেয়াদান্তে জুন-জুলাই না হলে বাড়ির মালিক ভাড়া বৃদ্ধি করতে পারবেন না; যা মোটেও যৌক্তিক কোন নির্দেশনা নয় এবং বাড়ির মালিকের স্বার্থ পরিপন্থী। 

অপরদিকে, নির্দেশিকার ৯ দফায় বলা হয়েছে কেবল নির্দিষ্ট সময়ে ভাড়া দিতে ব্যর্থ হলে ভাড়াটিয়া উচ্ছেদ করা যাবে। কিন্তু আইনের ১৮ ধারায় আরও কিছু ক্ষেত্র সংযুক্ত করে স্পষ্ট করা হয়েছে কোন কোন ক্ষেত্রে বাড়ির মালিক ভাড়াটিয়াকে উচ্ছেদ করতে পারবেন এবং পারবেন না। ফলশ্রুতিতে, বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়া উভয়ের স্বার্থহানির শঙ্কা রয়েছে।

তাছাড়া ১৩ দফা আইনের বাইরে যেয়ে নির্ধারণ করে দিয়েছে যে, বাড়িওয়ালা চাইলে এক থেকে তিন মাসের অগ্রিম ভাড়া নিতে পারবেন। যদিও বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইনানুসারে সর্বোচ্চ এক মাসের ভাড়া অগ্রিম হিসেবে নেয়ার বিধান রয়েছে। সুতরাং, ভাড়াটিয়াদের ঘাড়ে এখন নতুন নির্দেশিকানুসারে অতিরিক্ত অগ্রিম জমা দেয়ার দায় চাপানো হয়েছে। অন্যদিকে ১৫ দফায় উল্লেখ রয়েছে যে বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়া সমিতি বিরোধ নিষ্পত্তি করতে না পারলে সিটি কর্পোরেশনের আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানাতে হবে। কিন্তু কত সময়ের মধ্যে এবং কী পদ্ধতিতে বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়া সমিতি বিরোধ নিষ্পত্তি করবে সে সম্পর্কে বিস্তারিত বলা নেই। আবার আইনানুযায়ী আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তার বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষমতা নেই। যদিও আইনের সাধারণ নীতিনুসারে নির্দেশিকা এবং আইনের মধ্যে সংঘর্ষ হলে অবশ্যই আইন প্রাধান্য পাবে। ফলে এই নির্দেশিকা আসলে কার স্বার্থ সংরক্ষণ করবে তা মোটেও স্পষ্ট নয়।

অন্যদিকে নির্দেশিকায় বাড়ির মালিক বা ভাড়াটিয়ার ওপর যেসব দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে সেসব পালনের নিশ্চয়তা বা জবাবদিহি কীভাবে করা হবে, কে সেসব দেখভাল করবে সে বিষয়ে কোন উল্লেখ নেই। সবচেয়ে বড় কথা কেউ এসব না মানলে তার পরিণতি কী হবে? এবং ডিএনসিসির কি এই নির্দেশনা বাস্তবায়নের কোন আইনি ক্ষমতা বা বাস্তব সক্ষমতা রাখে? 

এছাড়া নির্দেশিকাটি কার্যকর করার জন্য প্রয়োজনীয় অন্যান্য প্রশাসনিক কাঠামো অপর্যাপ্ত; যেমনঃ ওয়ার্ডভিত্তিক মালিক ও ভাড়াটিয়া সমিতি এবং তাদের মাধ্যমে সালিশি ব্যবস্থা আমাদের দেশে অপ্রচলিত। অতএব, এ সংক্রান্ত স্পষ্ট আইনি বিধি-বিধান না থাকলে সালিশ কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। সার্বিকভাবে নির্দেশিকাটি অনেকটাই উপদেশমূলক; যার আইনগত ভিত্তি ও বাস্তব প্রয়োগ কাঠামো উভয়ই প্রচন্ড রকম দুর্বল।

ডিএনসিসির রাজস্ব বিভাগ সূত্রে বর্তমানে ঢাকা শহরে প্রায় সাড়ে তিন কোটি মানুষের বসবাস করে; যাদের মধ্যে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ এলাকা মিলিয়ে মোট বাড়ির সংখ্যা মাত্র প্রায় ২৫ লাখ। ফলে শহরের বড় অংশই মূলত ভাড়াটিয়া। বিভিন্ন গবেষণা মতে একটি শহরে মানুষের আয়ের সর্বোচ্চ ২৫-৩০ শতাংশ যদি আবাসনে ব্যয় হয়, তাহলে তা গ্রহণযোগ্য ধরা হয়। অপরদিকে ঢাকায় অনেক ক্ষেত্রে মানুষকে আয়ের ৫০ থেকে ৬৫ শতাংশ বা ক্ষেত্রে বিশেষে তারও অধিক অর্থ শুধু বাড়ি ভাড়ায় ব্যয় করতে হয়। রাজধানী কেন্দ্রিক বাসা-বাড়ির ব্যাপক চাহিদা, জমির অপ্রাপ্যতা ও আকাশচুম্বী দাম, নির্মাণ সামগ্রীর অস্থিতিশীল উচ্চ মূল্য এবং অস্বাভাবিক নির্মাণ খরচের কারণে ঢাকায় ভাড়াটিয়া হিসেবে বসবাস ও জীবন-যাপন এমনিতেই ভীষণ ব্যয় বহুল। সাধারণ মানুষের আয়ের সিংহভাগ তাই ব্যয় হয় আবাস স্থলের মতো মৌলিক চাহিদার পেছনে। মরার উপর আবার খাঁড়ার ঘা হিসেবে যোগ হয়েছে সময়মতো বিল পরিশোধ করেও চাহিদামতো বা নিরবচ্ছিন্ন অপরিহার্য নাগরিক সুবিধা, যথাঃ পানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ প্রভৃতি না পাওয়া। 

অপরদিকে, ন্যায় সঙ্গত অধিকার না পেলে ভুক্তভোগী যে আইনের আশ্রয় নিবে তাতেও রয়েছে যথেষ্ট প্রতিবন্ধকতা। আমাদের প্রচলিত বিচার ব্যবস্থায় বাড়ি ভাড়ার মতো দেওয়ানী প্রকৃতির মোকদ্দমায় বিরোধ নিষ্পত্তি হতে প্রচুর সময় লাগে এবং বিচারপ্রার্থীকে অপরিসীম খরচ ও ভোগান্তি পোহাতে হয়। তাই ভুক্তভোগী সাধারণত এই বিষয়ে আদালতের দ্বারস্থ হন না। তাছাড়া আইন প্রয়োগে নানা বাঁধা এবং অসামঞ্জস্যতার কারণে বাড়িওয়ালার বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করে সে বাড়িতে শান্তিতে বসবাস করা আমাদের সামাজিক প্রেক্ষাপটে অলীক ধারণা। এর পাশপাশি আইনি অজ্ঞতা, প্রচারের অভাব, মামলা দায়েরে স্বাভাবিক ভীতি প্রভৃতি আইনি সমাধানের পথে না হাঁটার জন্য দায়ী।

তাই বলা যায় বাংলাদেশে বাস্তবে বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯১ এক রকম অকার্যকরই রয়েছে। আইনটি বাস্তবায়নে আজও বিধিমালা প্রণয়ন হয়নি; নিয়ন্ত্রক পদটি শূন্যই রয়েছে দশকের পর দশক ধরে। উপরন্তু বছরান্তে (প্রথম দুই বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর থেকে) ১৫ শতাংশ পর্যন্ত ভাড়া বৃদ্ধির এই বিধান দেশে বিদ্যামান বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯১ এর ১৫ ধারার মধ্যেই রয়েছে এবং যা পরিবর্তন করার ক্ষমতা স্থানীয় কর্তৃপক্ষ হিসেবে ডিএনসিসির নেই। ডিএনসিসির তাই এই নির্দেশিকা জারী করার পূর্বে আইনে তাদের কতটুকু ক্ষমতা দেওয়া আছে এবং ১৯৯১ সালের আইন পরিবর্তন করে কীভাবে যুগোপযোগী করা যায় সে বিষয়ে মনযোগী হওয়া উচিৎ ছিল। 

২০১৯ সালে দায়ের করা এক রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট বিভাগ ১৫ ধারা আইনগত কর্তৃত্ব বহির্ভূত ঘোষণা করেছিল এবং ভাড়া নিয়ন্ত্রক নিয়োগসহ বাড়ি ভাড়ার বিদ্যমান অসঙ্গতি দূর করে মানসম্মত বাড়ি ভাড়া নির্ধারণ ও সুপারিশ প্রণয়নে অনুসন্ধান আইন, ১৯৫৬ এর ৩(১) ধারা অনুযায়ী অনুসন্ধান কমিশন গঠনেরও নির্দেশ দিয়েছিল। কিন্তু রায় স্বাক্ষরের পূর্বে সংশ্লিষ্ট বিচারক মৃত্যুবরণ করায় মামলাটির এখন পুনরায় শুনানি চলছে। সুতরাং যে আইন ইতোমধ্যে প্রশ্নবিদ্ধ এবং যা কার্যকরে সরকারের পক্ষ থেকে কখনই কোন কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়েনি; সেই একই আইনের বিধান মেনে নির্দেশিকা ঘোষণা করলে তা যে বাস্তবসম্মত হবে না, সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না।

১৯৯১ সালের বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইনের মূল সমস্যাই হল বাজারমূল্য নির্ধারণের কোনো সুস্পষ্ট ও বাস্তবসম্মত পদ্ধতি না থাকা। ঢাকার স্থাবর সম্পত্তির (রিয়েল এস্টেট) বাজার অত্যন্ত অনিয়ন্ত্রিত এবং অস্বচ্ছ। একই ধরনের দুটি ফ্ল্যাটের বাজারমূল্য এলাকা, উপকরণ, সুবিধা, প্রতিষ্ঠান ভেদে আকাশ-পাতাল হতে পারে। তবে বাৎসরিক বাড়ি ভাড়া বাড়ির বর্তমান বাজার মূল্যের ১৫% কোনভাবেই যৌক্তিক নয়। সেক্ষেত্রে দেখা যাবে ৭০ লাখ টাকার একটি ফ্ল্যাটের ১৫% হারে মাসিক ভাড়া ৮৭ হাজার টাকাও বেশি হবে; যা এক হিসাবে বর্তমান ভাড়ার প্রায় পাঁচ গুণ! ফলে আইনের এই উদ্ভট বিধান ভাড়াটিয়াদের স্বার্থরক্ষার বদলে বাড়ির মালিকদের জন্য ভাড়া বাড়ানোর আইনি হাতিয়ার হিসেবে আবির্ভূত হবে এবং আইনের অপব্যবহারের দরজা খুলে দেবে। যদিও আইন ও নির্দেশিকায় মানসম্মত ভাড়া নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে; কিন্তু মানসম্মত ভাড়া ধার্যের বিস্তারিত পদ্ধতি ও বিবেচ্য বিষয়ে কিছুই বলা নেই।

বাংলাদেশের এই দুরবস্থার বিপরীতে উন্নত বিশ্ব যথাঃ আয়ারল্যান্ডের বাড়ি ভাড়া সংক্রান্ত আইনে চোখ বুলালে মালিক ও ভাড়াটিয়া উভয়ের স্বার্থ সংরক্ষণে অধিকতর সুষম ও কার্যকর কাঠামো রয়েছে বলে প্রতীয়মান হবে। যেমনঃ আয়ারল্যান্ডে এখন চরম আবাসন সংকট চলছে। যার ফলে বাড়ি ভাড়া আগের তুলনায় অধিক এবং ভাড়া পাওয়াও বেশ কঠিন। তথাপি বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধি সরকার কর্তৃক নির্ধারিত বর্তমান ভাড়ার একটি সর্বোচ্চ বার্ষিক শতাংশের (বর্তমানে সাধারণত ২%) মধ্যে সীমাবদ্ধ। যা একটি স্বচ্ছ, পূর্বানুমেয় ও ভাড়াটিয়া বান্ধব ব্যবস্থা। মালিক ভাড়া বৃদ্ধি করতে চাইলে, অবশ্যই বাজারমূল্যের তুলনায় ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং ভাড়াটিয়াকে নির্ধারিত ফর্মে কমপক্ষে ৯০ দিনের লিখিত নোটিশ দিতে হবে। উচ্ছেদ করতে চাইলেও ভাড়ার ধরণ ও ব্যাপ্তি অনুসারে পৃথক পৃথক সময়সীমা নির্ধারণ করা আছে। সাধারণত চুক্তির শর্ত না ভাঙলে, সম্পত্তির সংস্কার বা পরিবারের কারও জন্য প্রয়োজন না হলে ভাড়াটিয়া উচ্ছেদ করা যায় না। সেখানে এ সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য শক্তিশালী একটি স্বাধীন রেসিডেনশিয়াল টেনান্সিজ বোর্ড রয়েছে। আবার বোর্ডে কেউ মামলা দায়ের করে হারলে তাকে জয়ী পক্ষের মামলার সমস্ত খরচ বহন করতে হবে।

আয়ারল্যান্ড ও বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও বাড়ি ভাড়া বিষয়ক এই মডেল থেকে আমাদের প্রধান শিক্ষণ হতে পারে: ভাড়া নিয়ন্ত্রণে যৌক্তিক পদ্ধতি গ্রহণ (যেমন এলাকা ও সুবিধাভেদে বাস্তবভিত্তিক সর্বোচ্চ বার্ষিক শতাংশ নির্ধারণ এবং সময় সময় তা পরিমার্জন), নজরদারি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ এবং শক্তিশালী, স্বাধীন ও সহজগম্য বিরোধ নিষ্পত্তি সংস্থা (যেমনঃ বাড়ি ভাড়া ট্রাইবুনাল বা বোর্ড) গঠন, জয়ী পক্ষকে খরচ প্রদান প্রভৃতি। যেন আদালতের দীর্ঘসূত্রতা, ব্যয়ভার এবং অপ্রয়োজনীয় মামলা এড়ানো যায়।

সরকারের তাই এখন উচিত হবে 'বাজারমূল্যের ১৫%' এর পরিবর্তে, স্থানীয় বাজার বিশ্লেষণ, ভবনের মান, প্রদত্ত সুবিধা, এলাকা, প্রদত্ত নাগরিক সেবার মান, বসবাস উপযোগিতা এবং ভাড়াটিয়ার আয়ের সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে একটি ন্যায্য ভাড়া নির্ধারণের পদ্ধতি চালু করা; অবিলম্বে বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯১ এর প্রয়োজনীয় সংস্কার, আইনের অধীনে স্বত্তর বিধিমালা প্রণয়ন এবং প্রতিটি সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভায় ভাড়া নিয়ন্ত্রক পদ সৃষ্টি ও প্রয়োজনীয় সংখ্যক কর্মকর্তা নিয়োগ করা; বাড়ি ভাড়া বিরোধ নিষ্পত্তিতে ওয়াড ভিত্তিক পৃথক প্রতিষ্ঠান তৈরি; আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ এক মাসের অগ্রিম ভাড়া ও অন্যান্য বিধান কঠোরভাবে প্রয়োগ এবং নজরদারী করা,  ইত্যাদি। 

ঢাকার ভাড়াটিয়া জনগোষ্ঠী, যারা শহরের অর্থনীতির অন্যতম মেরুদণ্ড; তারা দীর্ঘদিন ধরে অবহেলা, বঞ্চনা ও শোষণের শিকার। একটি কার্যকর ও ন্যায়সঙ্গত ভাড়া নির্ধারণের জন্য প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক ও শক্তিশালী আইনি কাঠামো; যেন উভয় পক্ষের অধিকার সুনির্দিষ্ট এবং একটি দ্রুত প্রতিকার প্রক্রিয়া সকলের নাগালের মধ্যে থাকে। সরকার এবং নগর কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই একটি কল্পনাপ্রসূত নীতিমালা নয়, বরং দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য, ভারসাম্যপূর্ণ ও স্বচ্ছ আইনি কাঠামো প্রতিষ্ঠার দিকে মনোনিবেশ করতে হবে। নতুবা, এই নির্দেশিকা বরাবরের মতই কাগজে-কলমেই থেকে যাবে, আর বাড়ির মালিক ও ভাড়াটিয়ারা বহন করবে তার বিপরীতমুখী ফল। এখন তাই সময় এসেছে ঢাকাসহ সারা দেশের আবাসন বাজারের জন্য একটি আধুনিক, যুগোপযোগী ও মানবিক আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করার।

Comments

    Please login to post comment. Login