গণভোট বা Referendum দেওয়া হয় গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক প্রশ্নে সরাসরি জনগণের মতামত জানার জন্য, যেখানে সিদ্ধান্তটি রাষ্ট্রের কাঠামো, সংবিধান, সার্বভৌমত্ব বা জাতীয় নীতিতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। পৃথিবীর বহু দেশেই সরকার বা শাসকগোষ্ঠীর প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করে জনগণ। বাংলাদেশের প্রেক্ষিত অবশ্য ভিন্ন। এখানে ৩১ ভাগ জনসমর্থন নিয়েও কেউ যদি সরকার গঠন করে তারা রেফারেন্ডাম দিলে সেখানেও ম্যাজিক্যালি ভোট উঠে ৯০ ভাগের ওপরে।
বাংলাদেশে জাতীয় পর্যায়ে গণভোট হয়েছে তিনবার -১৯৭৭, ১৯৮৫ ও ১৯৯১ সালে। ১৯৭৭ সালের ৩০ মে রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক জিয়াউর রহমান তাঁর শাসন ও নীতির প্রতি জনসমর্থন আছে কি না -এই প্রশ্নে গণভোট দেন; সরকারি ফলাফলে প্রায় ৯৮.৯ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ এবং ১.১ শতাংশ ‘না’ ভোট পড়ে। এরপর ১৯৮৫ সালের ২১ মার্চ রাষ্ট্রপতি এইচ. এম. এরশাদ তাঁর নীতি ও কর্মসূচির সমর্থন চেয়ে গণভোট আয়োজন করেন; সরকারি হিসেবে প্রায় ৯৪ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ ও ৬ শতাংশ ‘না’ ভোট পড়ে। সবশেষে ১৯৯১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের পর রাষ্ট্রপতি শাসিত পদ্ধতির পরিবর্তে সংসদীয় পদ্ধতি পুনঃপ্রবর্তনের প্রশ্নে গণভোট হয়; এতে প্রায় ৮৩.৬ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ ও ১৬.৪ শতাংশ ‘না’ ভোট পড়ে এবং পরবর্তীতে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনের মাধ্যমে দেশে পুনরায় সংসদীয় শাসনব্যবস্থা চালু হয়।
বাংলাদেশে যাইহোক পৃথিবীর নানা দেশে বহুবার গণভোটে পরাজয় ঘটেছে এবং তা রাজনীতির স্বাভাবিক অংশ হিসেবেই বিবেচিত। যুক্তরাজ্যে ২০১৬ সালের ব্রেক্সিট গণভোটে সরকার ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকার পক্ষে অবস্থান নিলেও জনগণ বিপরীত রায় দেয়; ইতালিতে একই বছরে সংবিধান সংস্কার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হলে প্রধানমন্ত্রী মাত্তেও রেনজি পদত্যাগ করেন; ফ্রান্সে ২০০৫ সালে ইউরোপীয় সংবিধান চুক্তি নাকচ হয়; গ্রিসে ২০১৫ সালে ঋণচুক্তির শর্তের বিরুদ্ধে ভোট পড়ে; কলম্বিয়ায় শান্তিচুক্তি গণভোটে প্রথমে বাতিল হয়; আর চিলিতে ২০২২ সালে নতুন সংবিধানের খসড়াও বিপুল ভোটে প্রত্যাখ্যাত হয়। এসব উদাহরণ দেখায়, গণভোটে হারা কোনো ব্যতিক্রম নয় -বরং এটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ারই অংশ, যেখানে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জনগণের হাতেই ন্যস্ত থাকে।
২০২৬ সালে এসেও রাষ্ট্রীয় সংস্কার ও সংবিধান সংশোধনীর জন্য জুলাই সনদ প্রশ্নে গণভোট আহ্বান করা হয়েছে। ক্ষমতাচ্যুত এবং পরবর্তীতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আ.লীগ ছাড়া দেশের সকল রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যই এই গণভোটের ভিত্তি। সরকার আশা করছে 'হ্যাঁ' জয়যুক্ত হোক। পূর্বের ধারাবাহিকতা অনুসারে বলা যায় এবারও 'না' হারবে।
এমন বাস্তবতায় জুলাই চার্টারে স্বাক্ষরকারী দল বিএনপি প্রধান 'হ্যাঁ'র পক্ষে ভোট চাইলে সমস্যা কোথায়? বরং সাদিক কায়েম গংরা জনতার মঞ্চে বারবার অভিযোগ করছিল তারেক রহমান জুলাই স্পিরিট ধারণ করেন না -সেটার একটি মোক্ষম জবাব দেয়া হলো।
জুলাই চার্টারে স্বাক্ষরকারী দল জামায়াতে ইসলামী কি ওই সনদকে মান্যতা দিচ্ছে বা দেবে? এক কথায় উত্তর হলো না। জুলাই সনদে স্পষ্টভাবে নারীর অধিকার ও ক্ষমতায়নের পক্ষে অনুচ্ছেদ রাখা হয়েছে। নারী-পুরুষ ভেদে মানুষের ডিসক্রিমিনেশন বাতিল করা হয়েছে। ক্রমান্বয়ে স্থানীয় সরকার কিংবা সংসদের উচ্চ বা নিম্নকক্ষে নারী প্রতিনিধি বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। জুলাই সনদের ওই অনুচ্ছেদে এতটুকু মান্যতা দেয়নি জামায়াত। তারা একজন নারী প্রার্থীকেও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন দেয়নি। ইনফ্যাক্ট তারা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ঘোষণা দিয়ে দিয়েছে নারীরা নেতৃত্ব দিতে পারবে না কিংবা নেতৃস্থানে থাকতে পারবে না।
আগের রীতি মেনে ধরে নিলাম গণভোটে জুলাই চার্টার পাবলিক ম্যান্ডেট পেয়ে গেল -যারা সরকারে আসবে তারা কি ওই সনদে মান্যতা দেবে? জামায়াত যে দেবে না বা দিতে পারবে না সেটি তাদের কার্যক্রম, আলাপচারিতা এবং দলীয় অর্গানোগ্রাম থেকেই প্রমাণিত। বিএনপি যদি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় তারা কী করবে?
প্রস্তাবিত জুলাই সনদের ৮৪টি অনুচ্ছেদের ৭১টিতেই নোট হিসেবে লিখা হয়েছে [নোট: অবশ্য কোনো রাজনৈতিক দল বা জোট তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে উল্লেখপূর্বক যদি জনগণের ম্যান্ডেট লাভ করে তাহলে তারা সেইমতে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে।]
সবার জন্য সকল দুয়ারই খোলা রাখা হয়েছে। রাজনৈতিক দল বা নেতা তাদের জন্য কোনো পেরেশানি নাই। ভুগবে জনগণ। যেমনটা তারা ৫৫ বছর ধরেই ভুগে চলেছে। এলিটিজমকে নার্সিং করা দেশে কোনোপ্রকার ভোটই আম পাবলিকের জীবন ফুলে ফুলে সুশোভিত করতে পারবে না। ট্রাজিক পরিণতিও দূর করতে পারবে না।
লেখক: সাংবাদিক
৩১ জানুয়ারি ২০২৬