
ধর্মেন্দ্রর ছেলে হিসেবে তার অভিষেক ছিল স্বাভাবিকভাবেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। ধর্মেন্দ্রর মতো আইকনের ছেলে হয়ে পর্দায় দাঁড়ানো মানে শুধু অভিনয় নয়, প্রতিটা ফ্রেমে তুলনা। কিন্তু এখানেই তার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ-তিনি ধর্মেন্দ্র হতে পারেননি, আবার হতে চানওনি। ৯০-এর দশকের শুরুতে যখন বলিউড ‘মাচো’, ‘উচ্চকণ্ঠ’, ‘ওভার-এক্সপ্রেসিভ’ নায়কের দিকে ঝুঁকছে, ববি দেওল ঠিক তার উল্টো পথে হাঁটেন। তার অভিনয়ে ছিল সংযম, ভেতরের টানাপোড়েন, আর একধরনের নীরব আবেগ-প্রেমিক, প্রতিশোধপরায়ণ যুবক, বিভ্রান্ত আত্মা-এই সব চরিত্রে তিনি নিজেকে ঢেলে দিয়েছেন এক ধরনের ইনট্রোভার্ট সেনসিটিভিটি দিয়ে, যা তখনকার মূলধারায় হিরোদের সিনেমায় খানিকটা বেমানানই ছিল। হয়তো এই কারণেই একটা সময় বলিউড তাঁকে ভুল বুঝেছিল।
সোলজার’, ‘বাদল’, ‘বিচ্চু’, ‘আজনবী’-এই ছবিগুলোয় ববি দেওলের অভিনয়ের একটা সাধারণ সূত্র আছে: কম কথা, বেশি চোখ। তখনকার বলিউড যেখানে অতিনাটকীয় সংলাপ আর হিরোইজমে ভরপুর, সেখানে ববি যেন একটু পিছিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ। ববির নায়ক চরিত্র চিৎকার করে নিজেদের জানান দেয় না; বরং ভাঙা চোখ, থমকে যাওয়া মুখভঙ্গি, হঠাৎ বিস্ফোরিত হওয়া রাগে নিজেদের প্রকাশ করে।ববির ক্যারিয়ারকে যদি গল্প হিসেবে দেখি, তাহলে সেটা দুই অধ্যায়ের। প্রথম অধ্যায়-নব্বইয়ের দশকের সুপারস্টার ববি। দ্বিতীয় অধ্যায়-দীর্ঘ বিরতির পর নিজেকে ভেঙে আবার গড়ে তোলা এক অভিনেতা, যিনি বুঝে গেছেন, নায়ক হতে না পারলেও চরিত্র হয়ে ওঠাই আসল জয়। আর সেই কারণেই হয়তো আজ বলিউডে সময়টা আবার ববি দেওলের। নব্বইয়ের দশকে যাঁর হাসি, হেয়ারস্টাইল আর চামড়ার জ্যাকেট মানেই ছিল তারুণ্যের পোস্টারবয়-সেই ববি দেওলকে নিয়ে একসময় আলোচনা থেমে গিয়েছিল প্রায় নি:শব্দে। অথচ সময়টা এখন এমন এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে আবারও বলিউডের আলো ববির দিকেই ফিরছে। যেন দীর্ঘ নীরবতার পর পর্দায় ফিরেছে এক চেনা নাম, কিন্তু একেবারে নতুন রূপে। বর্তমান ট্রেন্ড বদলেছে, বাজার বদলেছে-কিন্তু ববি দেওলের অভিনয়ের ভিতরের আগুনটা নেভেনি, শুধু আড়ালে ছিল।

১৯৯৫ সালে রাজকুমার সন্তোষির ‘বারসাত’ শুধু সুপারহিটই হয়নি, ববিকে এনে দিয়েছিল ফিল্মফেয়ার সেরা নবাগত অভিনেতার পুরস্কারও। সেই সিনেমার গান আজও রোমান্টিক প্লেলিস্টের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

সোলজার (১৯৯৮) যখন ববি দেওলকে দেখি এখানে তার চরিত্র রহস্যময়, আবেগে কম কথা বলা, চোখে প্রতিশোধের আগুন-কিন্তু সেই আগুন চিৎকার করে জ্বলে না। তার অভিনয় অনেকটাই অভিনেতা আবেগটা বাইরে দেখান না, বরং ভেতরে জমিয়ে রাখেন। অ্যাকশন আছে, কিন্তু তা শরীরী নয়-মানসিক। ‘সোলজার’ তো তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক বিস্ফোরণ-১৯৯৮ সালের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আয় করা সিনেমা।

বাদাল (২০০০)- এই ছবিতে ববি দেওল আসলে এক ভাঙা মানুষের গল্প বলেন।এই ছবিটি ছিলো তাঁর অভিনয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।একদিকে গ্রামীণ সরলতা, অন্যদিকে রাষ্ট্রের প্রতি ক্ষোভ।ববি এখানে হিরো নন, তিনি রাষ্ট্রীয় অবহেলার উৎপাদন। দেশপ্রেম এখানে স্লোগান নয়, ব্যক্তিগত ক্ষত। তার চোখের ভাষা সংলাপের চেয়ে বেশি কথা বলে-যা তখনকার দর্শকের একটা অংশ ধরতেই পারেনি।

বিচ্চু (২০০০) সম্ভবত তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে অবমূল্যায়িত অভিনয়। এক নিঃসঙ্গ ঘাতক-যার সহিংসতার পেছনে আবেগের ইতিহাস আছে। এখানে ববি দেওল নিজের শরীরী উপস্থিতিকে কমিয়ে এনে চরিত্রের মানসিক ভার বাড়ান। এটা সাহসী সিদ্ধান্ত।এখানে ববি প্রায় একেবারে অ্যান্টি-হিরো;ভালোবাসা তাকে যেমন কোমল করে ঠিক তেমনি সিস্টেম তাকে হিংস্র করে। এটা তার অভিনয়ের এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। বিচ্চু নায়ক নয়-সে সমাজের ফেলে দেওয়া এক মানুষ। ববি এখানে শরীরী ভাষা বদলে ফেলেন-মুখের ভাষা কমিয়ে, হাঁটা, তাকানো, কথা বলার ভঙ্গি সবই যেন অপরাধবোধে ভারী। তিনি এখানে “হিরো” হতে চাননি, বরং ভিকটিম থেকে ভায়োলেন্ট হয়ে ওঠা মানুষের মানসিক মানচিত্র এঁকেছেন।

আজনবী (২০০১) এখানে তিনি নায়ক হলেও নিরাপদ নন। সন্দেহ, ঈর্ষা, ভেতরের অস্থিরতা—সবকিছু খুব সূক্ষ্মভাবে ফুটে ওঠে। তার অভিনয়ে কোনো অতিনাটক নেই, বরং একধরনের ঠান্ডা অস্বস্তি তৈরি হয়। এখানে তিনি প্রেমিক হয়েও নিরাপত্তাহীন,রহস্যময়, কিন্তু এক্সপ্লেইনড নয়। তিনি দর্শককে বিশ্বাস করতে বাধ্য করেন না, বরং সন্দেহে রাখেন-এটাই শৈল্পিক ঝুঁকি।রাজ মালহোত্রা চরিত্রটি ববি দেওলের অভিনয় ক্যারিয়ারে সবচেয়ে আন্ডাররেটেড পারফরম্যান্সগুলোর মধ্যে আরেকটি।তিনি এখানে-নায়কসুলভ দাপট এড়িয়ে গেছেন। রাজ মালহোত্রা চরিত্রটি কোনো সাধারণ রোমান্টিক নায়কের নয়। এই চরিত্র মূলত একজন মানুষ, যে ভালোবাসা, বন্ধুত্ব আর বিশ্বাস-এই তিনটির মাঝখানে দাঁড়িয়ে ধীরে ধীরে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে।সন্দেহ, লজ্জা আর ভালোবাসা হারানোর যন্ত্রণা একসাথে বহন করেছেন। যখন স্ত্রী বদলের প্রস্তাব যখন আসে, তখন রাজের যে প্রতিবাদ-তা চিৎকারে নয়, বরং অপমানবোধ আর নৈতিক অস্বস্তিতে। এই জায়গায় ববি দেওলের অভিনয় আলাদা হয়ে ওঠে।তিনি রাজ চরিত্রকে কোনো সুপারহিরো বানাননি। বরং তাকে দেখিয়েছেন বিশ্বাসে আঘাত পাওয়া এক সাধারণ পুরুষ হিসেবে। তিনি বুঝিয়ে দেন, সব রাগ উচ্চস্বরে হয় না।এই চরিত্রে তিনি প্রমাণ করেন-তিনি শুধু প্রেমিক নায়ক নন, বরং বিশ্বাসঘাতকতা, সন্দেহ আর ভাঙনের গল্পও শরীর ও চোখের ভাষায় বলতে পারেন।এই অভিনয়টাই তার শৈল্পিকতা-চুপচাপ, পরিমিত, অথচ গভীর।অজনবী-তে রাজ আসলে একজন মানুষ, যে ভিড়ের মাঝেই অজনবী হয়ে যায়-আর ববি দেওল সেই অজনবী মানুষটাকে নিঃশব্দে আমাদের সামনে এনে দাঁড় করান।

এরপর যেন একের পর এক সাফল্যের সিঁড়ি।হামরাজ, গুপ্ত, নাকাব, জুরুম সব মিলিয়ে ১৯৯৫ থেকে ২০০২, এই সাত বছরে ববি ছিলেন নির্মাতাদের প্রথম সারির পছন্দ। ফ্যাশন সেন্সে তিনি হয়ে উঠেছিলেন বলিউডের ট্রেন্ডসেটার। এর মধ্যে ‘গুপ্ত’ দিয়ে বলিউড পেল এক কালজয়ী থ্রিলার, যেখানে ববি, মনিষা কৈরালা আর কাজলের ত্রিভুজ গল্প দর্শকদের হতবাক করেছিল।
সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতে একটা কথা আছে, দিনশেষে যতো বড় তুমিই স্টার হও না কেনো দিনশেষে একজন নায়কের নামের পাশে কতোটি হিট ফিল্ম যোগ হলো আর কতোটি ফ্লপ ফিল্ম যোগ হলো তা নিয়েই একজন অভিনেতার ভাগ্য নির্ধারণ হয়। কথাটির প্রমাণ পাওয়া যায় তরুণ প্রজন্মের অভিনেতা বিশাল জেঠওয়ার কন্ঠে। তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন 'হোমবাউন্ড' সিনেমা প্রশংসিত হয়েছে, কিন্তু বক্স অফিসে ফ্লপ! আমি অনেক প্রশংসা পাচ্ছি কিন্তু আমার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে প্রশংসিত সিনেমা কিন্তু আমাকে পরবর্তী কাজ দিবেনা! হোমবাউন্ডের পরেও আমাকে নানান জায়গায় গিয়ে কাজ চাইতে হচ্ছে। কারন বক্স অফিসের সফলতা একজন অভিনেতার জন্য অনেক জরুরী। সবাই সফল মানুষের পেছনেই লগ্নি করতে চায়, বিফলদের কাজ চাইতে হয়! এই কথাটির আরো একটি উজ্জ্বল প্রমাণ পাওয়া যায় ববি দেওলের মধ্যে।২০০৩-এর পর দৃশ্যপট বদলাতে শুরু করে।ক্যারিয়ারের মাঝপথে একটানা ছবি ফ্লপ করায়; ভুলভাল স্ক্রিপ্ট চয়েজের কারণে সমসাময়িক নায়কদের তুলনায় পিছিয়ে পড়েন ববি। বক্স অফিসে ছবির ব্যর্থতা সহ্য করতে না পেরে এক সময় অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়েন ববি। ঘরের চার দেওয়ালের মধ্যে মদের সিরাপির নেশায় হয়ে ওঠে তাঁর একমাত্র আশ্রয়।
এই সময়টায় তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজ বলতে মূলত মাল্টিস্টারার সিনেমা-‘আপনে’ কিংবা পরে ‘ইয়ামলা পাগলা দিওয়ানা’। ২০১০ সালে ‘ইয়ামলা পাগলা দিওয়ানা’ প্রায় ২০০ কোটি রুপি আয় করলেও আলোটা বেশি পড়ে ধর্মেন্দ্র আর সানি দেওলের দিকেই। ববি যেন নিজের গল্পেই হয়ে উঠেছিলেন পার্শ্বচরিত্র।ক্যারিয়ারের এই খারাপ সময়ে মুদ্রার উল্টো পিঠ ও দেখেছিলেন এই তারকা। তার এই খারাপ সময়ে সবাই তার দিকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। টানা চার বছর ডিপ্রেসনের সাথে লড়ে যেতে হয়েছে এই তারকাকে। একটা সময় সানী দেওল তো গর্ব করে বলতেন, যে সিনেমায় নায়ক মরে যায়, সেই সিনেমায় দেওল'রা কাজ করে না! সেই পরিবারের ছেলে হয়ে ববি মাথা কুটে মরেছেন একটা সুযোগের জন্য। যে পরিবার থেকে তিনি এসেছেন, তার বাবা এবং বড় ভাই যে মাপের সুপারস্টার ছিলেন, যেভাবে ববি নিজে তার ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন, সেই ববি একের পর এক ফোন দিয়ে কাজ চাইতেন। কিন্তু তার এই দুঃসময়ে পাশে এসে দাঁড়ায় বলিউড ভাইজান সালমান খান।

ভাইজানের পরামর্শে ২০১৮ সালে 'রেস থ্রি'র মাধ্যমে ভিলেন চরিত্রে অভিনয়ের মধ্যে দিয়ে আবারও কামব্যাক হয় ববির। এরপর একে একে চিরচেনা কর্মাশিয়াল সিনেমা 'হাউজফুল ফোর', 'পোষ্টার বয়েজ',এ অভিনয় করলেও তার অভিনয়ের বেশ সমালোচনা হয়েছিল। সেই সিনেমাগুলোতে চিত্রনাট্যের তেমন কোনো জোর ছিলনা। ববির চরিত্রটাও বিশেষ কিছু ভেবে লেখা হয়নি।

কিন্তু তার জন্য আশীর্বাদ হয়ে আসে ওটিটি প্লাটফর্ম।প্রত্যাবর্তনের শুরুটা হয় ওটিটি প্ল্যাটফর্ম থেকেই। শুরুটা হয় ক্লাস অফ ৮৩' ওয়েব ফিল্ম দিয়ে। তার সেই ভিন্টেজ নিরবতা এবং সংযত অভিনয়ের পুনরাবৃত্তি ঘটে 'ক্লাস অফ ৮৩' ওয়েব ফিল্মে।গল্পের কেন্দ্রে আছেন বিজয় সিং-একজন সৎ, নির্ভীক, আদর্শবাদী পুলিশ অফিসার। কিন্তু তার সততার মূল্য তাকে দিতে হয় কঠিনভাবে। রাজনীতি, অপরাধ জগত এবং প্রশাসনের অদৃশ্য আঁতাতের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে তিনি হেরে যান। ফলস্বরূপ তাকে “শাস্তি” হিসেবে বদলি করা হয়-একটি পুলিশ ট্রেনিং একাডেমিতে শিক্ষক হিসেবে।
সংলাপের চেয়ে নীরবতা, কোনো অতিনাটক নেই।মুখে কম কথা, দৃষ্টিতে বেশি প্রশ্ন। কোনো আবেগপ্রবণ বিস্ফোরণ নেই।তিনি যেন নিজেকেই সংযত করে রাখেন-যা চরিত্রটির ভেতরের দমবন্ধ অবস্থাকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে।ববি দেওল এখানে তার তারকা-ইমেজ ভেঙে এক পরাজিত আদর্শবাদীর মুখ হয়ে ওঠেন। এটি “হিরো কামব্যাক” নয়, বরং একজন মানুষের ভেতরের মৃত্যু দেখানোর অভিনয়।

কিন্তু সবকিছুকে উপেক্ষা 'আশ্রম' নামের ওয়েব সিরিজ করে ববি আলোচনায় এলেন। কে জানতো, ববির জন্য অপেক্ষা করছিলো সবচেয়ে ক্যারিয়ার বদলে মূহূর্ত খলনায়ক চরিত্র। দর্শক দেখতে পায় অন্যরকম এক ববিকে।এখান থেকেই জন্ম নেয় ‘লর্ড ববি’ ফেনোমেনন।আশ্রম-এ ববি দেওল কোনো প্রচলিত খলনায়ক নন।তিনি অস্ত্র ধরেন না, চিৎকার করেন না, রক্ত ঝরান না-তবু দর্শক তাকে ঘৃণা করে।এই ঘৃণা জন্মায় কারণ তার চরিত্রটি খুব চেনা, খুব বাস্তব।ববি দেওলের চরিত্র কাশীপুরওয়ালে বাবা নিরালা এমন এক মানুষ,যিনি ঈশ্বরের ভাষা ব্যবহার করে মানুষের জীবন দখল করেন। তার অভিব্যক্তি ছিলো প্রকাশ্যে আশীর্বাদ, গোপনে শোষণ, মুখে ভক্তি, মনে ক্ষমতার লালসা, কথায় করুণা, কাজে নিষ্ঠুরতা; তিনি খুন করেন না, কিন্তু আত্মা ধ্বংস করেন, এ কারণেই তিনি আরও ভয়ংকর।। দেওল পরিবারের সন্তান হয়ে এইরকম জঘন্য চরিত্র বেছে নেওয়া ছিলো আসলেই সাহসিকতার পরিচয় রাখেন ববি। তাছাড়াও ববি দেওলের চোখে তিনটি স্তর দেখা যায়-ভক্তের সামনে: করুণাময় ঈশ্বর;শিষ্যের সামনে: কর্তৃত্বপরায়ণ গুরু; নারীর সামনে: লোভের দৃষ্টি।এই ভণ্ড শরীরী ভাষাই দর্শককে ক্ষুব্ধ করে, কারণ এটি বিশ্বাসযোগ্য।

আশ্রমের সাফল্য ববির ক্যারিয়ার পুনরুজ্জীবিত করে। বিশেষ করে খলনায়ক চরিত্রের জন্য ববির চাহিদা বেড়ে যায়। লাভ হোস্টেল সিনেমাতে অভিনয়ের পর যেন তা আরও পাকাপোক্ত হয়। সিনেমাটিতে ববি বিরাজ সিং ডাগর চরিত্রে অভিনয় করেন। চরিত্রটি ছিল একজন অপরাধীর। যার লক্ষ্যবস্তু ছিল তরুণ দম্পতিরা। লাভ হোস্টেল ভয়ঙ্কর খলনায়কের চরিত্রে ববি দেওলের অভিনয় দর্শকের মাঝে দারুণ সাড়া ফেলে। ফলে আমরা নতুন ববিকে আবিষ্কার করি।ববি দেওল অভিনীত চরিত্রটির নাম দাগর। এখানে দাগর কোনো সাধারণ ভিলেন নয়। তিনি পেশাদার খুনি, ধর্ম ও সম্মানের নামে খুন করা একজন মানুষ- নির্লিপ্ত, নির্দয়, অথচ ভীষণ বাস্তব। তার কাছে হত্যা আবেগ নয়, যেনো দায়িত্ব।তিনি কাউকে ঘৃণা করেন না, ভালোবাসেনও না- তিনি শুধু ঠান্ডা মাথায় হত্যায় করেন। ববি দেওল এখানে তার শরীরী ভাষাকে ব্যবহার করেছেন একধরনের রাফ মিনিমালিজমে। দাঁড়ানো, বসা, এমনকি নিঃশ্বাস নেওয়াও যেন নিয়ন্ত্রিত। তার চরিত্রটি মানুষ নন, যেন সমাজের তৈরি এক হত্যার যন্ত্র। তিনি ভিলেন হতে পারেন, কিন্তু কার্টুন নন।ববি দেওলের অভিনয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি এখানে নীরবতা। দাগর চরিত্রটি চিৎকার করে না, খুব কম কথা বলেন , রেগে যায় না। সে ঠান্ডা, হিসেবি, নির্লিপ্ত। এই সংযত অভিনয়ই চরিত্রটিকে আরও ভয়ংকর করে তোলে। 'ক্লাস অফ ৮৩,'লাভ হোস্টেল', আশ্রম ইত্যাদি সিনেমায়/ওয়েব সিরিজে অভিনয় করে প্রশংসা অর্জন করলেও এতোকিছুর পরেও কোথাও যেনো একটা ফিকে রয়ে গিয়েছিল।তার কামব্যাক হিসেবে যর্থাথ ছিলো না।

বলে রাখা ভালো, ২০২৩ সালে রণবীর কাপুর অভিনীত 'অ্যানিমল' মুক্তির পর থেকেই বক্স অফিস মাতিয়ে বেড়াচ্ছে। সঞ্জু সিনেমার পর এটিই তার কামব্যাক সিনেমা হিসেবে গণণা করা যায়। মাঝে 'ব্রহ্মাস্ত্র', 'তু ঝুটি ম্যায় মাক্কার', সিনেমা ব্যবসাসফল হলেও তা রণবীরের সেরা কামব্যাকের সাথে বিবেচিত হয়নি। কিন্তু বছরের শেষে 'অ্যানিমল' দিয়ে যেন সবকিছু পুষিয়ে দিয়েছেন এই তারকা।'পাঠান', 'জাওয়ান', 'গাদার টু', এর পর এই বছর বড় সাকসেসফুল সিনেমার তকমাটা পেয়ে গেল 'অ্যানিমল',।'অ্যানিমল' বক্স অফিসে হিট উপহার দিয়ে দিয়েছে। শুধু কি হিট উপহার?? সাথে দর্শকদের নতুন করে উপহার দিয়েছে ৯০ দশকের তারকা ববি দেওলকে।

কিন্তু ববি এমন এক সিনেমা দিয়ে পর্দায় কামব্যাক করলেন যে সিনেমায় তার স্ক্রিনটাইম মেরেকেটে মিনিট দশেক! কোন সংলাপ নেই, শুধু অভিব্যক্তি দিয়েই চোখ কপালে তুলে দেয়া। স্টাইলিশ অ্যাপিয়ারেন্স, তবু ভয় ধরায় যে চরিত্র! অ্যানিমেল- এর আবরার হক যে এতটা ভাইরাল হয়েছে, সেটা ববির এমন ইনটেন্স অ্যাক্টিং স্কিল না থাকলে কখনোই হতো না। ববি অভিনয় দিয়ে যেমন দর্শক মাতিয়েছেন ঠিক তেমনি গান দিয়েও সবাইকে সমানভাবে মাতিয়ে তুলেছেন। ছবিতে অভিনেতা ববি দেওলের ‘এন্ট্রি সিনে’ পরিবেশন করা হয়েছে 'জামাল কদু' গানটি। গানটি ফারসি ভাষার একটি লোকগান। খুব অল্পসংখ্যক শ্রোতাই গানের অর্থ বুঝতে পেরেছেন। কিন্তু সুর–তৃষ্ণা মেটানো গানটি ইউটিউবে ট্রেন্ডিংয়ের তালিকার শীর্ষে রয়েছে। ২০২৩ সালের ৬ই ডিসেম্বর সিনেমার প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান টি সিরিজের ইউটিউবে গানের ভিডিও প্রকাশ করার মাত্র ৬ দিনের ব্যবধানে গানটি ইউটিউবে ট্রেন্ডিংয়ের তালিকার শীর্ষে উঠেছে; যা এখন পর্যন্ত ‘ভিউ’ হয়েছে ১৭৩ মিলিয়ন।কিন্তু এতোকিছুর পরেও ববির চরিত্র নিয়ে আফসোস রয়েই যায়। ববির চরিত্রটা যদি আরেকটু ডেপথ দিয়ে লেখা হতো, যদি স্ক্রিনটাইম আরেকটু বাড়তো, যদি গল্পের ডালপালায় ববির অস্তিত্ব আরেকটু থাকতো; তাহলে আবরার হক নামের এই চরিত্রটা কাল্ট একটা ক্যারেক্টার হলেও হতে পারতো। কিন্তু যেটুকু হয়েছে, তাতে ববি দেওল সাড়ম্বরে প্রত্যাবর্তনের একটা ইতিহাস লিখেছেন।২০২৩ সালের ‘অ্যানিমেল’-এ নির্বাক, ভয়ংকর ভিলেন আবরার হক-এই চরিত্রে ববির অভিনয় পুরো বলিউডকে এমনভাবে চমকে দিয়েছিলো যে, আইফা আর জি সিনে অ্যাওয়ার্ডে সেরা নেগেটিভ চরিত্রের পুরস্কারটি যেন এই কামব্যাকের অফিসিয়াল সিল।
এই চরিত্রে ববি দেওল বুঝিয়ে দিলেন-তিনি দেওল পরিবারের ট্র্যাডিশনাল নায়ক নন, তিনি একজন ভার্সেটাইল অভিনেতা, যাকে ইন্ডাস্ট্রি ব্যবহারই করতে পারেনি। দশ মিনিটের উপস্থিতিতে তিনি যে ছাপ ফেলেছেন, তা বহু পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবির নায়কের চেয়েও গভীর। দর্শক ভয় পেয়েছে, অস্বস্তিতে পড়েছে, আবার মুগ্ধও হয়েছে-একসঙ্গে। তাহলে প্রশ্ন উঠে যায়-এই অভিনয় কি শুধু ববি দেওলের সাফল্য, নাকি সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির প্রতি এক নীরব ধিক্কার? কারণ, একজন অভিনেতার এমন সম্ভাবনা বছরের পর বছর অবহেলায় পড়ে থাকলে দোষটা কার? ববি দেওল নিজে তো বদলাননি হঠাৎ করে-বদলেছে পরিচালকের দৃষ্টিভঙ্গি, বদলেছে চরিত্রের সাহস। ‘অ্যানিমল’ প্রমাণ করেছে, সমস্যা অভিনেতার মধ্যে ছিল না; সমস্যা ছিল ইন্ডাস্ট্রির অলস কাস্টিং মানসিকতায়। অ্যানিমল-এর সেই নির্বাক ভিলেন তাই শুধু একটি চরিত্র নয়-এটা এক নীরব প্রশ্ন।যদি এই সুযোগটা দশ বছর আগেই আসতো, তাহলে কি ববি দেওলকে এতদিন হারিয়ে যেতে হতো? হয়তো এই অভিনয় সরাসরি কোনো অভিযোগপত্র নয়, কিন্তু এটা নিঃসন্দেহে ইন্ডাস্ট্রির আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দেওয়া এক তীব্র সত্য। আর ববি দেওল? তিনি শুধু নিজের প্রাসঙ্গিকতা ফিরিয়ে আনেননি—তিনি প্রমাণ করেছেন, অভিনেতা কখনো শেষ হয়ে যায় না; সুযোগটাই শুধু দেরিতে আসে।

এখানেই থামেননি ববি। ২০২৪ এ তামিল ইন্ডাস্ট্রিতে অভিষেক হয় সুরিয়ার বিপরীতে কাঙ্গুবা সিনেমায়। সেখানেও ববিকে দেখা যায় খলনায়ক চরিত্রে। সিনেমা ফ্লপ হলেও ববি তার অভিনয় ম্লান হতে দেননি; অভিনয় এবং চরিত্রের লুক গুণে আলাদা জায়গা তৈরি করে নিয়েছিলেন দক্ষিণ ইন্ড্রাস্ট্রিতে।এই ধারাবাহিকতায় তেলুগু সিনেমা ‘ডাকু মহারাজ’,- ববি তার খলনায়কের নান্দনিক ছাপ রাখেন। অন্যদিকে তামিল ছবি ‘জনা নায়াগান,’-সময়টা এখন সত্যিই তাঁর। বিজয় থালাপতির বিপরীতে ভিলেন-এমন কাস্টিংও বলে দেয়, ইন্ডাস্ট্রি তাঁকে আবার গুরুত্বের সাথেই দেখছে।বলিউডে টিকে থাকতে হলে নিজেকে বদলাতে হবে, এটা বুঝে গিয়েছেন। তাই বেছে নিয়েছেন নিজের পরিণতি। তাই আবারও খলনায়কের চরিত্রে অবতীর্ণ হতে চলেছেন ববি। কিন্তু এইবারও অন্যভাবে। বর্তমানে যশরাজ ফিল্মসের স্পাইভার্সে যোগ হতে সবারই স্বপ্ন থাকে; ববির জন্য তাও স্বপ্ন হয়ে এলো। যশরাজ ফিল্মসের স্পাইভার্সে আগামী সিনেমায় তাকে দেখা যাবে খলনায়কের ভূমিকায়। আলিয়া ভাট থাকবেন এ থ্রিলার সিনেমার মুখ্য ভূমিকায়। এ সিনেমায় আলিয়ার বিপক্ষে খলনায়ক হিসাবে দুর্দান্ত অ্যাকশন করতে দেখা যাবে ববি দেওলকে।

কিন্তু ববির লক্ষ্য যেনো নিজের অভিনয় করা চরিত্রকেই ছাড়িয়ে যাওয়ার; তাই ২০২৫ সালে ‘দ্য বাস্টার্ডস অব বলিউড’ ওয়েব সিরিজে অজয় তালবার খলনায়ক চরিত্রে তিনি আবার প্রমাণ করলেন তিনিই ভবিষ্যতের আল্টিমেটলি ভিলেন ইন ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি। আমার দৃষ্টিতে অজয় তালবার চরিত্রটি একটু আলাদা কারণ নিজেকে ভালো লাগানোর চেষ্টায় করেন না; দর্শকের সহানুভূতিও চান না আবার ট্র্যাডিশনাল নায়ক হতেও চান না। তিনি জানেন,এই সময়ে সবচেয়ে শক্তিশালী চরিত্র হলো-যাকে দর্শক ভয় পায় কিন্তু ভুলতে পারে না। অজয় তালবার চরিত্রটি চিৎকার করে নয়,হাত উঁচু করে নয় বরং স্থির দাঁড়িয়ে থেকেও ভয় তৈরি করে। এই সংযত, আত্মবিশ্বাসী, অন্ধকার অভিনয়ই ববি দেওলকে আজকের দিনে বলিউডের সবচেয়ে কার্যকর “ব্যাডাস” মুখগুলোর একটিতে পরিণত করেছে।যে খলনায়ককে ভালোবাসা যায় না,কিন্তু অগ্রাহ্যও করা যায় না-সেটাই বড় অভিনয়।
ববি দেওলের জীবনের এ উত্থান-পতন আর পুনরাগমন যেন বলিউডের এক জীবন্ত অনুপ্রেরণা-যেখানে পতন মানেই শেষ নয়, বরং নতুন করে ওঠে দাঁড়ানোর সুযোগ।এক সময় ববি দেওলের জীবনের আকাশটা ছিল পুরোপুরি মেঘে ঢাকা। আশা বলতে গেলে কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। খারাপ সময় যেন একের পর এক ধাক্কা দিয়ে যাচ্ছিল, মনে হতো-সবকিছু বুঝি এখানেই শেষ। ঠিক সেই অন্ধকারের মাঝেই তিনি ধীরে ধীরে বুঝতে শেখেন, মানুষের জীবনে যত গভীর রাতই নামুক না কেন, কোথাও না কোথাও একটা আলোর দিক থাকেই।ববি দেওলের এ স্পষ্টবাদিতা আর আত্মসম্মানবোধই তাকে আবারো ফিরিয়ে এনেছে আলোচনায়। দীর্ঘদিনের খারাপ সময় শেষে তিনি যেন খুঁজে পান নিজের ভেতরের সেই হারানো বিশ্বাস। অন্ধকার সেই সময়টিতে তার সবচেয়ে বড় আলো হয়ে আসে তার সন্তানের সরল কথা। তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, একদিন আমার ছেলে তার মাকে বলল, ‘মা, তুমি তো রোজ কাজে যাও, বাবা তো বাড়িতে বসে থাকে।’ কথাটা আমার হৃদয়ে বাজলো। সেদিনই সিদ্ধান্ত নিলাম- এভাবে আর নয়।’এমনকি ববির ‘মদের নেশা ছিল ভয়ঙ্কর। তার ভাষায়, এটা মস্তিষ্কের সঙ্গে খেলা করে। আমি প্রতিদিন মদ খেতাম না, কিন্তু যখন খেতাম, তখন নিজের মধ্যে থাকতাম না। পরিবার আতঙ্কে থাকত।’
অহং, তারকাখ্যাতি-সবকিছু পেছনে ফেলে তিনি ঘুরেছেন এক অফিস থেকে আরেক অফিসে। পরিচালকদের দরজায় দরজায় কড়া নেড়েছেন। কোনো সংকোচ না রেখে নিজেই পরিচয় দিয়েছেন-“আমি ববি দেওল। দয়া করে আমাকে একটা কাজ দিন।”
এই কথার ভেতরে ছিল না কোনো অভিনয়, ছিল কেবল টিকে থাকার লড়াই। ছিল আবার উঠে দাঁড়ানোর জেদ। ববির বিশ্বাস, এতে লজ্জার কিছু নেই। অন্তত তিনি গিয়ে মানুষের সঙ্গে দেখা করেছিলেন, নিজের ইচ্ছেটা জানিয়েছিলেন। আর সেই চেষ্টাটুকুই হয়তো কারও না কারও মনে থেকে যায়।তারপর শুরু হয় নতুন পথচলা। মদ ছাড়লেন, নিজেকে নতুন করে গড়লেন। পাশে ছিলেন স্ত্রী তন্যা- সব ভাঙনের মধ্যেও যার ভালোবাসা ছিল অবিচল। ববি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, ‘অন্য কেউ হলে হয়তো এমন আচরণ সহ্য করত না। তন্যা আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ। মা-বাবার পর তিনিই আমার ভরসা।’ তিনি বলেন, ‘যখন হাতে কিছুই থাকে না, তখনই বোঝা যায় নিজের ভেতরে এমন কিছু একটা আছে, যার জন্যই শুরুটা এত ভালো হয়েছিল। ভেতর থেকে একটা আওয়াজ আসে-এখনো তোমার মধ্যে সেই জিনিসটা আছে। সেটাই তোমাকে আবার এগিয়ে নিয়ে যাবে।’ তিনিই প্রমাণ করেছেন সময় যতই বদলাক, প্রতিভা কখনো ম্লান হয় না।
একসময় যিনি বলেছিলেন, ‘দয়া করে একটা কাজ দিন’,সেই ববি দেওল আজ বলিউডের অন্যতম সম্মানিত অভিনেতা। শুধু কি বলিউড?? বর্তমানে দক্ষিণ ইন্ড্রাস্ট্রিতেও ববির খলনায়কত্বের আর্বিভাব হয়ে গেছে। দিন দিন পরিচালকদের কাছে তার চাহিদা বাড়ছে। একসময় বলিউডে নায়ক হিসেবে যার সুনাম ছিল। আর তিনিই এখন বলিউড এবং দক্ষিণ সিনেমায় একাই ঝড় তুলেই যাচ্ছেন খলনায়ক হিসেবে। আর তাতেই যেনো তিনি লিখে ফেললেন নিজের ফিল্ম ক্যারিয়ারের অটোবায়োগ্রাফি,'ফর্ম ইজ টেম্পোরারি,ক্লাস ইজ পারমানেন্ট।',
লেখক: আমি সুমন বৈদ্য বর্তমানে ঢাকার স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের জন্য অধ্যয়ন করছি।পাশাপাশি একজন ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও লেখক হিসেবে কর্মরত অবস্থায় রয়েছি।