Posts

কবিতা

কপোতাক্ষের পাড়ে—পাটকেলঘাটার কাহিনী

February 8, 2026

Razib Paul

Original Author রাজীব পাল

18
View

কপোতাক্ষ বয়ে চলে, ঢেউয়ে ঢেউয়ে,
নদীর বুকে দাঁড়ায় সেতু—অবিচল, দৃঢ়, স্থির।
উদ্বোধনের দিনে আয়ূব খানের কণ্ঠে
ঘোষণা—“নদী পথের পাশাপাশি,
সড়কও দরকার মানুষের চলার।”
১৯৬৮-৬৯, লোহার বাঁধনে বাঁধা স্বপ্ন,
গ্রামের আশা, শহরের দৃষ্টি,
সব মিলায় এই কপোতাক্ষ সেতুর আঁচলে।
তবে স্বপ্নের বীজ বোনা হয়েছিল আগে,
১৯৫২ সালে সুধীজনের দাবি—
“পাটকেলঘাটার মাটি আলো চায়, পথ চায়।”
১৯৬৪ সালে নির্মিত হয় সড়ক,
ত্রিশ কিলোমিটার দীর্ঘ এক রেখা,
৫ই মার্চের সূর্য পড়ে
নতুন দিনের বুকের ওপর,
সংযোগের প্রতিশ্রুতি বয়ে আনে।
পুরাকীর্তির ছায়া আছে এখানে—
কুমিরার স্বরসতী আচার্যের বাড়ি,
সচীন মিত্রের বাসভবন,
স্বরসতী ঘাটার শিব মন্দির,
খলিষখালীর জমিদারবাড়ির ধ্বংসাবশেষ।
ইতিহাস ছুঁয়ে যায় ইটের ভাঙা দেয়ালে,
মন্দিরের নীরব ঘণ্টায়,
মানবচেতনার ছাপ লুকিয়ে নেই কোথাও।
কিন্তু ইতিহাস শুধু গৌরব নয়—
রক্তেও লেখা।
২৩ এপ্রিল, ১৯৭১, দুপুর—
পারকুমিরা গ্রাম স্তব্ধ।
মনু কসাই আর রাজাকারদের হাত ধরে
পাকসেনারা নিয়ে আসে
নিরীহ মানুষকে, স্মরণার্থীদের।
সারি বেঁধে দাঁড় করিয়ে গুলি,
৭৯ জনের নামহীন দেহ
মাটির নিচে চুপচাপ কাঁদে।
কাশিপুরের হায়দার আলী,
পাটে জড়িয়ে আগুনে পুড়লেন—
কারণ ঘরে আগুন লাগাতে চাননি।
পুটিয়াখালীর মোহর আলী
মৃতের ভান করে বেঁচে গেলেন,
গুলির ফাঁক বয়ে আনল
সাক্ষ্য ইতিহাসের।
২৫ নভেম্বর, ১৯৭১—
কপোতাক্ষের দক্ষিণ পাড়, মাগুরা গ্রাম।
ঝুনু বাবুর বাড়িতে
মুক্তিযোদ্ধাদের স্থায়ী ঘাঁটি।
রাজাকার আসে হানাদার বাহিনীর সঙ্গে,
কিন্তু মুক্তিযোদ্ধারা প্রস্তুত।
ওৎ পেতে বসে, গ্রুপে গ্রুপে,
আক্রমণ হলো তুমুল,
শহীদ হলেন
আব্দুল আজিজ, আবু বক্কর, সুশীল সরকার,
এবং স্থানীয় কৃষক শহীদরা—
আবতাফউদ্দীন, ফজর আলী, রহমত আলী, হাছান আলী।
১৪ নভেম্বর—বালিয়াদহ গ্রাম।
ইউনুচের নেতৃত্বে অবস্থান,
ভারী অস্ত্রের মুখে
মুক্তিযোদ্ধারা টিকে থাকল না,
কিন্তু হারল না মনোবল।
৩ অক্টোবর—বারাত গ্রামের সন্তোষ বাবুর বাড়ি,
অস্থায়ী ঘাঁটি।
রাজাকারদের আক্রমণ, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রস্তুতি,
উল্টো আঘাতে তিনজন রাজাকার পড়ে।
পরের দিন ঘরে আগুন,
কিন্তু চেতনা অটুট।
পাটকেলঘাটা অঞ্চল চেনেছে তাদের অভিভাবককে—
নেপাল কৃষ্ণ ঘোষ, নগেন্দ্রনাথ সেন, পরেশনাথ সেন,
রাজা রুক্ষিণীকান্ত মিত্র, জনার্ধন ভট্টাচার্য, পঞ্চানন দত্ত।
এদের নাম লেখা ইতিহাসে,
মাটির কাহিনীতে, নদীর ঢেউয়ে।
জ্ঞানও জন্ম নিয়েছে এই মাটিতে—
ড. বিমল কৃষ্ণ বসু,
কলকাতা থেকে টেনেসি বিশ্ববিদ্যালয়।
ক্ষিতিনাথ ঘোষ, গণিতের অঙ্কে স্বপ্ন।
ড. মতিউর রহমান,
যুগীপুকুরিয়া থেকে
নিউক্লিয়ার বিজ্ঞানের শিখরে।
কপোতাক্ষ আজও বয়ে চলে,
সেতুর নিচে, স্মৃতির ভিতরে।
পাটকেলঘাটা জানে—
ইতিহাস মানে শুধু তারিখ নয়,
ইতিহাস মানে মানুষ,
রক্ত, শিক্ষা, এবং অটুট সাহস।

Comments

    Please login to post comment. Login