নির্বাচন সামনে এলেই বাংলাদেশের রাজনীতি অদ্ভুত এক উত্তেজনার চাদরে ঢেকে যায়। আশার সঙ্গে শঙ্কা, প্রত্যাশার সঙ্গে আতঙ্ক—সব মিলিয়ে একটি অস্থির পরিবেশ তৈরি হয়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সেই চিত্র আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। শাহবাগ ও আশপাশের এলাকায় সাম্প্রতিক সংঘর্ষ শুধু আইনশৃঙ্খলার প্রশ্নই নয়, বরং একটি বড় রাজনৈতিক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে—এই অস্থিরতার নেপথ্যে কি কেউ কলকাঠি নাড়ছে?
নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে এমন সংঘাত স্বাভাবিক কোনো ঘটনাই নয়। দাবি আদায়ের জন্য আন্দোলনের সময় বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বোধবুদ্ধির প্রয়োজন হয়। যেই সরকার কয়েক দিনের মধ্যেই বিদায় নিতে যাচ্ছে, যেই প্রশাসন পুরোপুরি নির্বাচন কমিশনের অধীনে—সে সময় রাজপথ উত্তপ্ত করে আদায়-সংগ্রামের ডাক দেওয়াকে সাধারণ মানুষ সন্দেহের চোখে দেখবেই। ফলে প্রশ্ন ওঠে, এটি কি নিছক আবেগী প্রতিবাদ, নাকি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অস্থিরতা?
ফেব্রুয়ারি মাস বাঙালির জীবনে আবেগ ও ঐতিহ্যের মাস। ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি, অমর একুশে বইমেলা—সব মিলিয়ে এই মাস জাতীয় চেতনার প্রতীক। এবার নির্বাচনের কারণে বইমেলা পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনের পর নতুন সরকারপ্রধানের হাতে বইমেলার উদ্বোধন—এটিও এক ধরনের প্রতীকী নতুন শুরু। অথচ সেই সময়ের আগেই রাজপথে আগুন জ্বালানোর চেষ্টা জাতীয়ভাবে আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে, সেটি ভাবার সময় এখনই।
বাস্তবতা হলো, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সহিংসতা, চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বের পুরোনো রোগ আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। জনগণ এসব নতুন কিছু হিসেবে দেখছে না। তারা বহু বছর ধরেই একই দৃশ্য দেখে এসেছে—ক্ষমতার পালাবদল, কিন্তু চরিত্রের বদল নয়। তবুও মানুষ আশায় বাঁচে। ভোটের দিন এলে তারা আবারও বিশ্বাস করতে চায়, এবার হয়তো কিছু বদলাবে।
এই আশাই বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে বড় পুঁজি, আবার সবচেয়ে বড় দুর্বলতাও। জনগণ বারবার প্রতিশ্রুতির ফাঁদে পড়ে, বারবার হতাশ হয়, তবু আশাহীন হয় না। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—এই জাতি ধ্বংসস্তূপ থেকেও উঠে দাঁড়াতে জানে। ফিনিক্স পাখির মতো বারবার নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, রাজনৈতিক দলগুলো কি সেই আশার মর্যাদা দিচ্ছে? ব্যক্তিকেন্দ্রিক নেতৃত্ব, দলের ভেতরে গণতন্ত্রের অনুপস্থিতি, জবাবদিহিহীন ক্ষমতার চর্চা—এসব কি সত্যিই বদলেছে? ইশতেহারে ‘জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র’-এর কথা বলা নতুন নয়। সংবিধানেও তা লেখা আছে। সমস্যা হলো চর্চায়। দলেই যদি জবাবদিহি না থাকে, রাষ্ট্রে তা আসবে কোন পথে?
ক্ষমতার সীমাহীন কেন্দ্রীকরণ যে কত ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে, তার উদাহরণ আমরা সাম্প্রতিক অতীতেই দেখেছি। শক্তিশালী জবাবদিহি ব্যবস্থা থাকলে ইতিহাস হয়তো ভিন্ন হতে পারত। এই শিক্ষা কি নতুন সরকার গ্রহণ করবে?
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন কেবল একটি ক্ষমতা হস্তান্তরের দিন নয়; এটি একটি যুগসন্ধি। যারা বিজয়ী হবেন, তাদের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে—তারা কি প্রতিপক্ষকে শত্রু না ভেবে রাজনৈতিক অংশীদার হিসেবে দেখতে পারবেন? প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্র গড়ার সদিচ্ছা দেখাতে পারবেন?
একটি কাজই যথেষ্ট—নিষ্ঠার সঙ্গে সুশাসনের পথে হাঁটা। জনগণ খুব বেশি কিছু চায় না। তারা শুধু চায়, তাদের আশা নিয়ে যেন আর কেউ ছিনিমিনি খেলতে না পারে। এখন প্রশ্ন একটাই—এই আশার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে কারা? আর সত্যিই কি এখনো কেউ কলকাঠি নাড়ছে?