ফেব্রুয়ারির জ্বালা
রাহাতের ফোনটা সকাল থেকে বারবার ভাইব্রেট করছে। প্রতিবারই সে এক মুহূর্তের জন্য থমকে যায়—হয়তো কেউ মনে করে একটা “হাই” পাঠিয়েছে। কিন্তু না। ব্যাংকের বিল, ই-কমার্সের প্রমোশন, আর গতকালের শেয়ার অ্যাপের নোটিফিকেশন। আজ ৭ ফেব্রুয়ারি।
বাসা থেকে বেরিয়ে অফিসের দিকে হাঁটতে হাঁটতে চোখে পড়ে—রাস্তার দুই ধারে লাল গোলাপের ঝুড়ি। ছেলেরা একটা করে গোলাপ হাতে নিয়ে হাসিমুখে হাঁটছে। কয়েকটা মেয়ে দুই-তিনটা গোলাপ নিয়ে সেলফি তুলছে। একটা ছেলে তার গার্লফ্রেন্ডকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে ছবি তুলছে। রাহাত মুখ ফিরিয়ে নেয়। তার বুকের ভেতরটা যেন কেউ চিমটি কেটে ধরেছে।
চায়ের দোকানে বসে সিগারেট ধরায়। পাশের টেবিলে দুজন কথা বলছে—
“আজ রাতে প্রপোজ করব। গত বছর টাইম পাইনি, এবার আর ছাড়ব না।”
“আমারটা তো চকলেট আর টেডি দুইটাই চেয়েছে। পরশু থেকে অনলাইনে অর্ডার দিয়ে রেখেছি।”
রাহাতের গলা শুকিয়ে যায়। তার কোনো “আমারটা” নেই। কোনো চাওয়া-পাওয়ার লিস্ট নেই। কোনো প্রপোজ করার মানুষ নেই। সে চায়ের কাপটা শক্ত করে ধরে, যেন সেটা তার শেষ অবলম্বন।
বিকেলে অফিস শেষ করে ফুটপাত ধরে হাঁটছে। ছোট ছোট স্টল বসেছে। লাল হার্টের বেলুন, “Be Mine” লেখা মগ, কাপলের টি-শার্ট, হাতে লেখা চিঠির কার্ড। একটা ছেলে তার মেয়েকে বলছে—
“এই কার্ডটা পড়লে তুই কাঁদবি। আমি দুই রাত জেগে লিখেছি।”
রাহাতের পা আটকে যায়। সে ভাবে—আমি কি কখনো কাউকে এতটা সময় দিতে পারতাম? এতটা মন দিতে পারতাম? নাকি আমার ভালোবাসা দেওয়ার ক্ষমতাই ছিল না?
সন্ধ্যা নামে। ফেসবুক খোলে। টাইমলাইন ভরে গেছে—
“হ্যাপি প্রপোজ ডে আমার পাগলী ❤️”
“তোমার সাথে এই ফেব্রুয়ারি সবচেয়ে সুন্দর ❤️”
“১৪ তারিখের সারপ্রাইজ প্ল্যান রেডি! কেউ স্পয়ল করবা না”
“আজকে প্রথমবার বললাম I Love You... ওর চোখে পানি চলে এসেছিল 🥹”
রাহাত স্ক্রল করতে করতে থেমে যায়। তার আঙুল কাঁপছে। সে ফোনটা বন্ধ করে দেয়।
রাতে ছাদে উঠে দাঁড়ায়। দূরের বিল্ডিংয়ের ছাদে দুজন। মেয়েটা ছেলেটার কাঁধে মাথা রেখেছে। তারা কথা বলছে না, শুধু চুপচাপ দাঁড়িয়ে। রাহাতের চোখ গরম হয়। সে ফিসফিস করে বলে—
“আমারও তো কেউ থাকতে পারত। আমিও তো এভাবে দাঁড়াতে পারতাম।”
কিন্তু তারপরই মনে হয়—কে থাকত? কে আমার জন্য সময় দিত? আমি কি সত্যিই কাউকে এতটা ভালো রাখতে পারতাম?
১০ তারিখ। অফিসে সবাই ফেব্রুয়ারির প্ল্যান নিয়ে কথা বলছে।
“রাহাত, তুই কী করছিস ১৪ তারিখ?”
“কিছু না। বাসায়।”
“আরে চল না, আমরা সবাই মিলে রুফটপে যাব।”
“ভালো লাগবে না। তুই যা।”
বাসায় ফেরার পথে একটা ছোট মেয়ে তার মায়ের হাত ধরে হাঁটছে। তার হাতে লাল হার্ট বেলুন। হঠাৎ বাতাসে বেলুনটা ছিঁড়ে উড়ে গেল। মেয়েটা কাঁদতে লাগল। রাহাত থমকে দাঁড়ায়। তার মনে হয়—আমারও তো অনেক কিছু উড়ে গেছে। স্বপ্ন, আশা, সম্ভাবনা। কিন্তু আমি কাঁদতে পারি না। কারণ আমাকে তো “ম্যান” থাকতে হবে। সিঙ্গেল তো, কাঁদলে লোকে হাসবে।
১৪ তারিখ।
সকাল থেকে ফোন বন্ধ। সব অ্যাপ লগআউট। জানালার পাশে বসে চা খাচ্ছে। বাইরে আকাশ লালচে। সূর্য ডুবছে। রাস্তায় হর্ন, হাসি, গান—সব মিলেমিশে একটা উৎসবের শব্দ।
রাহাত নিজের সাথে কথা বলে—
“এই মাসটা তোর জন্য না। ঠিক আছে। তবু তুই বেঁচে আছিস। তুই হয়তো কাউকে পাসনি, কিন্তু তুই নিজেকে হারাসনি। তোর মধ্যে ভালোবাসা আছে। হয়তো এখনো কেউ এসে নেয়নি। না এলেও... তুই নিজেকে ভালোবাসতে শিখবি।”
চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ে। প্রথমবার। শুধু নিজের জন্য। অন্য কারো গল্পের জন্য না।
সে একটা পুরোনো খাতা বের করে লেখে—
“ফেব্রুয়ারি আমাকে জ্বালিয়েছে। অনেক জ্বালিয়েছে। কিন্তু এই জ্বালা আমাকে শিখিয়েছে—আমি অসম্পূর্ণ নই। আমার ভালোবাসা কেউ না নিলেও, সেটা মিথ্যা হয় না। একদিন হয়তো কেউ আসবে। না এলেও... আমি থাকব। নিজের জন্য।”
সকালে উঠে জানালা খোলে। ফেব্রুয়ারি এখনো আছে। কিন্তু তার ভেতরের আগুনটা একটু ঠান্ডা হয়েছে।
সে বুঝতে পেরেছে—জ্বালা থাকবে। কিন্তু সেই জ্বালাই হয়তো একদিন আলো জ্বালাবে।
আর সেদিন পর্যন্ত... সে একা হাঁটবে। চুপচাপ। কিন্তু মাথা নিচু করে না।
9
View