Posts

চিন্তা

ক্ষমতা শূন্যতা পছন্দ করে না!

February 9, 2026

ফারদিন ফেরদৌস

15
View

আগের তিন নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাবিহীন একপাক্ষিক হলেও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোটাদাগে বিএনপি-জামায়াত দুইপক্ষের মধ্যে মাঠের লড়াই হচ্ছে। এই দুই দলই অতীতে আওয়ামী রেজিমের বিরুদ্ধে এক হয়ে লড়েছে। এবং তাদের যুগপৎ আন্দোলন ও কৌশলে আ.লীগ সরকার দেশ ছেড়ে বাইরের বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। পতিত অলিগার্ক ও পুঁজিপতি আমলা-মন্ত্রীরা দেশ ছেড়ে গেলেও নিরীহ কর্মী সমর্থকেরা দাঁতে কামড় দিয়ে দেশের মাটিতে পড়ে রয়েছে। কোনো যদি, কিন্তু বা তবে ছাড়া যদি সুষ্ঠু নির্বাচন হয় তাহলে এই ভোটারেরাই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের বিজয়ের অন্যতম ফ্যাক্টর হতে পারে। প্রশ্ন হলো কার্যক্রম নিষিদ্ধ আ.লীগ কর্মীদের কি ভোট দিতে যাওয়া উচিত হবে?

একটা কথা স্পষ্ট করা জরুরি -ভোট দেওয়া একটি নাগরিক অধিকার, কোনো একক দলের সম্পত্তি নয়। কোনো দল নিষিদ্ধ হতে পারে, কোনো নেতা নির্দেশ দিতে পারেন; কিন্তু নাগরিকের ভোটাধিকার সংবিধানসিদ্ধ ও ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। ক্ষমতাচ্যুত দলীয় প্রধান যদি অনুসারীদের ভোটকেন্দ্রে না যেতে বলেন, তাহলে সমর্থকদের কী করা উচিত?

রাজনৈতিক আনুগত্য এক জিনিস, আর নাগরিক দায়িত্ব আরেক জিনিস। একজন সমর্থক তার নেতার প্রতি রাজনৈতিক সহমর্মিতা দেখাতে পারেন -বর্জন, প্রতিবাদ বা প্রতীকী অবস্থান হিসেবে ভোট না-ও দিতে পারেন। সেটি রাজনৈতিক কৌশল হতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্য, ভোটে অংশ না নেওয়া মানে নিজের কণ্ঠস্বর স্বেচ্ছায় নীরব করে রাখা। বিশেষ করে যদি নির্বাচনে অন্য দল, স্বতন্ত্র প্রার্থী বা বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি থাকে, তাহলে ভোট না দেওয়া মানে সেই প্রতিযোগিতা থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া।

বাস্তব রাজনীতির কঠিন দিক হলো -ক্ষমতা শূন্যতা পছন্দ করে না। আপনি না গেলে কেউ না কেউ যাবে। এবং যারা যাবে, তারাই রাষ্ট্রযন্ত্র, নীতিনির্ধারণ, প্রশাসনিক প্রভাব -সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ পাবে। ইতিহাসে বহু উদাহরণ আছে যেখানে বর্জন দীর্ঘমেয়াদে বর্জনকারী দলেরই ক্ষতি করেছে, কারণ মাঠে অনুপস্থিত থাকলে সংগঠন ঢিলে হয়, কর্মীরা নিরুৎসাহিত হয়, আর ভোটারদের অভ্যাস বদলে যায়।

আমরা অতীতে বর্জনকারী বিএনপি ও জামায়াতের জন্যও হুবহু একই কথা বলেছি। আ.লীগের ভোটাররা কেন্দ্রে গেলেও বিএনপি বা জামায়াতের প্রার্থীরা সংসদে যাবে। না গেলেও একই ফল ফলবে। কিন্তু গেলে একটা লাভ আছে -তাদের দৃষ্টিতে মন্দের ভালোকে বেছে নেয়ার সুযোগ তারা পাচ্ছে। বাস্তবতা হলো বিএনপি এবং জামায়াতের বর্তমান জনসমর্থন দেখবার পরও আওয়ামী দৃষ্টিকোণ দিয়ে তাদেরকে রাজনৈতিক অপোনেন্ট না ভাববার কোনো কারণ নাই। বিএনপি এবং জামায়াতকে বাইরে রেখে কেউ বলবে না যে, আ.লীগ তোমরা আবার একলা নির্বাচন করো। বাংলাদেশের রাজনৈতিক মাঠ আ.লীগের জন্য শূন্য পড়ে নেই।

পক্ষ দুইটা। একপক্ষ মুক্তিযুদ্ধের কথা বলে, নারীর ক্ষমতায়ন ও নেতৃত্বকে অকুন্ঠ সমর্থন করে, গণতন্ত্র সুরক্ষার দাবি করে। আরেকপক্ষ মুক্তিযুদ্ধকে নানাভাবে ভিলিফাই করে। নারীর নেতৃত্ব কস্মিনকালেও মেনে নেবে না বলে জোর গলায় দাবি করে। ইনিয়ে বিনিয়ে গণতন্ত্র ও বহুত্ববাদের বাইরে গিয়ে একটি‌ নির্দিষ্ট ধর্মীয় শাসনব্যবস্থার পক্ষে জনমত গড়ে। তৃতীয় আরেকটি পক্ষ আছে বটে তারা ঘুরেফিরে ওই প্রথমোক্ত দুইপক্ষেরই নিষ্ঠ লেজুড়। আপনার অধিকার আছে যে কাউকে ভোট দেয়ার। আপনি যদি নারীকে অধস্তন রাখতে চান, গণতন্ত্রকে মেনে নিতে সমস্যা মনে হয়, মুক্তিযুদ্ধের আলাপ বাদ দিতে চান তবে আপনার চয়েস খুব ভালোভাবেই এবারের নির্বাচনে আছে। আর এর বিপরীতে যেতে চাইলে সেটার ব্যবস্থাও আছে।

সবার প্রত্যক্ষ ভোটে যেই রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসীন হোক তাদেরকেই আমাদের স্যালুট করতে হবে। গণমানুষ হিসেবে ক্ষমতাসীনদের নীতির সমালোচনা কিংবা ক্ষমতাকে জবাবদিহি করতে পারব বটে নির্বাচিতদের বাতিল করবার সুযোগ কারোরই নেই। তবে ক্ষমতা যদি বিগড়ে যায় -পুনর্বার জুলাই নামিয়ে দেয়ার সক্ষমতা আম পাবলিকের আছে। আপনি ওই গণমানুষই তাই ক্ষমতার আসল পূর্ণতা।

লেখক: সাংবাদিক 
৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

Comments

    Please login to post comment. Login