গ্রামের মানুষ আতর আলীকে আগে ডাকত ‘আতর কাকা’। এখন ডাকে ‘আতর সাহেব’। কপাল খুলেছে তার ছোট ছেলের কল্যাণে, যে দুবাই গিয়ে কী এক জাদুর কাঠির ছোঁয়ায় বস্তা বস্তা টাকা পাঠাচ্ছে। আতর আলীর এখন একটাই সমস্যা—টাকা খরচ করার জায়গা খুঁজে পাচ্ছেন না। সেদিন বিকেলে পাড়ার মন্টু গেল তার সাথে দেখা করতে। দেখল, আতর আলী ড্রয়িংরুমে বসে বিশাল এক রাজকীয় চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছেন। সামনে রাখা একটা রুপোর প্লেটে সাধারণ বিস্কুট নয়, দামী আমন্ড বাদাম। মন্টু বলল, “চাচা, শরীর কেমন?” আতর আলী একটা হাই তুলে বললেন, “শরীর ভালো রে মন্টু, কিন্তু মনটা ভার। এই যে দেখছিস এসিটা, এটা নাকি চব্বিশ ঘণ্টা না চালালে ঘরের বাতাসের ‘স্ট্যাটাস’ ঠিক থাকে না। বিল কত আসে জানিস? আমার তাতে কিছু যায় আসে না, কিন্তু এসির শব্দটা বড্ড বেশি ‘ভদ্র’—মাঝে মাঝে মনে হয় আমি কবরে শুয়ে আছি, কোনো শব্দ নেই!” মন্টু হাসল। সে জানে আতর আলীর এই নতুন স্বভাব—কথায় কথায় টাকার গরম দেখানো, তবে সেটা বেশ রসিয়ে রসিয়ে। আতর আলী আবার শুরু করলেন, “শোন মন্টু, কাল ঢাকা থেকে একটা লোক এসেছিল। আমাকে বলল, ‘চাচা, আপনার বাড়ির ছাদে একটা হেলিপ্যাড বানান।’ আমি বললাম, ‘হেলিকপ্টার কি আমার দাদায় রেখে গেছে?’ লোকটা হাসল। বলল, ‘টাকা থাকলে হেলিকপ্টার আকাশ থেকে নেমে আসবে।’ ভাবছি একটা বানিয়েই ফেলব। নামার জায়গা থাকলে পাখিও তো বসে, হেলিকপ্টার বসবে না কেন?” মন্টু বিস্কুট মুখে দিয়ে বলল, “চাচা, হেলিকপ্টার দিয়ে কী করবেন? বাজারে তো সেই লুঙ্গি পরেই যাবেন।” আতর আলী গম্ভীর হয়ে বললেন, “আরে পাগল! বাজারে যাব কেন? এখন বাজারই আমার কাছে আসবে। এই যে দেখছিস ফোনটা, এটা আইফোন কত যেন—সেদিন ছেলে পাঠাল। এটায় নাকি টিপ দিলে আমেরিকা থেকে পিৎজাও চলে আসে। আমি অবশ্য টিপ দিয়েছিলাম একবার, ভুল করে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি চলে এসেছিল। পরে পাঁচ হাজার টাকা বকশিশ দিয়ে বিদায় করলাম। টাকা থাকলে ভুল করাও একটা আনন্দ, বুঝলি?” গল্পের আসল মজা হলো, আতর আলীর এই প্রাচুর্য তাকে প্রকৃত সুখ দেয়নি, বরং এক ধরণের বিচিত্র অস্থিরতা দিয়েছে। তিনি এখন দামী ঘড়ি পরেন ঠিকই, কিন্তু সময়টা আগের মতোই কাটে—একটু অলস, একটু একাকী। বিদায় নেওয়ার সময় মন্টু দেখল, আতর আলী তার দামী আইফোনটা দিয়ে টেবিলের ওপর রাখা একটা মশা মারার চেষ্টা করছেন। মন্টু আঁতকে উঠে বলল, “চাচা! ওটা তো লাখ টাকার ফোন!” আতর আলী নির্বিকার ভঙ্গিতে বললেন, “আরে রাখ তোর লাখ টাকা! মশাটা যে রক্ত খাচ্ছে ওটা কি লাখ টাকার চেয়ে কম দামী? আমার শরীরে এখন দামী দামী ভিটামিন মেশানো রক্ত। তুচ্ছ একটা ফোনের মায়ায় মশাটাকে ছেড়ে দেব?” মন্টু বুঝতে পারল, মানুষের যখন অতিরিক্ত টাকা হয়, তখন সে বস্তুর মূল্য ভুলে যায়, কিন্তু নিজের ‘অহংকারকে’ দামী মনে করতে শুরু করে। আতর আলী হয়তো সুখে আছেন, কিংবা সুখ কেনার এক অদ্ভুত ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন