Posts

গল্প

এক চিলতে হাসি

February 11, 2026

Fuad Hassan Fahim

Original Author ফুয়াদ হাসান ফাহিম

12
View

১.
রাস্তার দু'পাশে সবুজের বাহার। সবুজ তার নিজের পরিপূর্ণ  সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলতে কোন কসুর করেনি। জমির সবুজ ফসল বাতাসের দোলায় দুলছে। সবুজের মন্ত্রমুগ্ধ নৃত্য দেখে অভিভূত হতে বাধ্য থাকবে প্রত্যেক দর্শক। কাতর হয়ে উঠবে কবি তার কাব্যে সবুজের নেশা জাগানো সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলতে। শুধু কী তাই!একজন লেখকও যদি দেখে,সেও ছটফট করবে কলমের খোঁচায় সবুজের অমায়িক রুপ তুলে ধরতে। সবুজ যেন আমার উদ্দেশ্যে বলছে,এই যে আমায় দেখ! দেখ আমার বাহারি রুপ! কই পাবে এমন মন মাতানো নৃত্য ? পাবে কোথাও এমন সৌন্দর্য ?

২.
হাঁটতে হাঁটতে একটি টিনের বাড়ির উঠোনে গিয়ে উঠলাম। এটা এই গ্রামের মসজিদের সভাপতির বাড়ি। বাড়ির ভিতর গিয়ে দেখলাম, মোট মিলে তিনটে ঘড়। একটিতে সভাপতি আর তার স্ত্রী থাকেন। অন্য ঘড়ে রান্নাবান্নার কাজ চলে। আর তৃতীয় ঘড়টি হবে আমার রমজানের একান্ত আশ্রয়স্থল। বাড়ি থেকে বেশ দূরে তারাবি ঠিক হয়েছে। খুব চেষ্টা করেছি  বাড়ির আশেপাশে তারাবি ঠিক করতে। কিন্তু আমাদের গ্রামের মানুষ খতম তারাবি পড়তে নারাজ। কী আর করব! অগত্যা দূর দেশেই আসতে হল। বাড়ির কথা না খুব মনে পড়ছে!  আমি বাড়ি থাকলে টুকটাক কাজও হত। বাড়িতে কোন পুরুষ মানুষ না থাকলে চলা কষ্টই হয়ে যায়। খুব জানতে মনে চাচ্ছে, বাড়িতে আমার বড় বোন আর ছোট ভাই কী করছে। মা তো আর...!

৩.
সেদিনের কথা ভাবছিলাম আর নিজেকে দোষারোপ করছিলাম। সেই চিত্র এখনও আমার চোখের সামনে ভাসে।  আমি যতই চাই ভুলে যেতে ততই আরও লেপ্টে ধরে। সেখান থেকেই এত কিছু। আমি তাকদিরকে বিশ্বাস করি কিন্তু দোষ তো আমারই।  সেদিন যদি আমি...! 
ফোনের কাঁপুনিতে সংবিৎ ফিরে পেলাম।  আমি জানি এটা আমার বড় বোন ছাড়া কেউ না। ফোন দিয়েই বলবে, “কী রে , সব ঠিকঠাক চলছে তো! খাওয়া দাওয়া হয়ছে তো! ওকে মনে হয় এক নিশ্বাসে কথা বলার এওয়ার্ড দেওয়া হবে। আজ প্রথম তারাবি শেষ হল। তাই জানতে ফোন করেছে।

৪.

বোন–(যা যা বলেছি সব বলার পর।)  প্রথম তারাবি কেমন হল?

আমি–ভালো আলহামদুলিল্লাহ। তোমরা কি খাওয়া দাওয়া করেছ?

বোন –হ্যাঁ করেছি।

আমি– মাকে খাওয়াইছ?

বোন–হ্যাঁ।

আমি– রাখ্ পরে আবার কথা হবে।

বোন–তোর্ কী মন খারাপ?

আমি– না রে! এমনি! একথা বলতেই ফোন কেটে দিলাম৷ 
আর যেন কথা আসছিল না। গলার স্বর আটকে যাচ্ছিল। কেউ একজন আমার গলা চেপে ধরেছে মনে হচ্ছিল। সবসময় শুধু অপরাধবোধ কাজ করে। আর করবেই না কেন? বোনও আর ফোন দিবে না। সেও জানে স্মৃতির পাতা মোছা অতটাও সহজ না।

৫.
সেদিন পনেরই রমাদান তারাবি শেষে আমি আর সভাপতি সাহেব পুকুর পার দিয়ে হাঁটছিলাম। সভাপতি সাহেব বৃদ্ধ হয়েছেন বটে কিন্তু তার সখগুলো এখনও যৌবনই রয়ে গেছে। তিনি হাঁটছেন আর বলছেন, জানো বাবা,নতুন বিয়ে হয়ে যখন তোমার আন্টি বাড়ি আসে তখন মাঝে মাঝে আমি আর তোমার আন্টি এখানে হাঁটতে আসতাম। রাতের অন্ধকারে কেউ দেখতেও পেত না। আমি আর তোমার আন্টি কখনো কখনো দৌড় প্রতিযোগিতাও দিতাম। এখন তোমার আন্টি বৃদ্ধ হওয়ায় আর আসা হয় না৷ আমি মনে মনে ভাবছিলাম এ যেন রাসুলের জীবনের এক টুকরো স্মৃতিচারণ। যেখানে হুযুর (সা.) আর আয়েশা রা. দৌড় প্রতিযোগীতায় নামতেন।

৬.
সত্যিই বিস্ময়কর যে, যখন পরকীয়ার নেশায় মাতিয়ে আছে পুরো জগৎ।  সেখানে এই রোমাঞ্চকর কাপল খুঁজে পাওয়া বড়ই দুর্লভ ব্যাপার। আমি তো মাঝে মাঝে তাক লাগিয়ে যাই। বয়স যেখানে আশি পেরিয়ে গেছে সেখানে এখনও তাদের মাঝে প্রেমালাপ চলে। সভাপতি সাহেব কখনো কখনো আন্টিকে নিয়ে কবিতাও আবৃত্তি করেন। অবশ্য সভাপতি সাহেব মাস্টার মানুষ। গ্রামের প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক। আমি রাতে শুয়ে শুয়ে তাদের আলাপ শুনি আর হাসি। স্বল্প সময়ের জন্য হলেও কষ্টের গ্লানি বোধটুকু কমিয়ে আসে। সেদিন কবি সাহেব কবিতা আবৃত্তিতে বলছিলেন,

“ওরে নারে নুরা ভাই,
সান্তাহার উড়ে যাই, 
জান্নাতিক ধরা খায়!”

জান্নাতি আন্টির নাম৷ আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে,এটা ভালোবাসার নাম। আসল নাম এখনও অজানা। এই নামের পিছনে বড় রহস্যও রয়েছে!

৭.
গত কয়েকদিন হল এক বাড়িতেই ইফতারির দাওয়াত পড়তেছে। অনেকে দাওয়াত দেয় কিন্তু কেন জানি ইমাম সাহেব শুধু ঐ বাড়িতেই নিয়ে যায়। আমি ব্যাপারটা গভীরভাবে নেইনি। কী ভাবছেন? এই যে,আপনাকেই বলছি! যে-এরকম এরকম...!
হু্, হু্!
সবসময় এগুলো ধারণা। একটু ভালো চিন্তা করা যায় না। তা ঠিকই ধরেছেন। এমন কাকতালীয় ঘটনা আমার জীবনে ঘটবে কখন ভাবতেও পারিনি। আজ রাস্তায় এক মুসল্লি ধরে বলল,বাবা এই এই কথা...! আমিও একদিন কথার ভঙ্গিতে সন্দেহ করেছিলাম। কিন্তু আজ সন্দেহ যেন সত্যে পরিণত হল।

৮.
আজ সাতাশতম রমাদান হাফেজ সাহেবদের বিদায় পালা। কতজনের মনে কত আনন্দ ঘিরে আছে এই সামান্য হাদিয়া নিয়ে। কিন্তু আমার মনে ততটুকু থাকাও যেন অপরাধ! অনেকে বিদায়ের সময় তো কেঁদেই ফেললেন। তাদের প্রশংসা শুনে আমি লজ্জায় মাথা তুলতে পারছিলাম না। কিন্তু পরক্ষণেই আবার ভাবি, আমি কী এর যোগ্য ? সবশেষে আমি আর সভাপতি সাহেব ঘরে এলাম।  তিনিও আমায় দোয়া দিলেন। আন্টি কঠিন পর্দা করেন। কিন্তু সেদিন তিনিও আমায় পর্দার পাশ থেকে দোয়া দিলেন। আবার আসতে বললেন।

৯.

বাড়ির পথে রওনা দিয়েছি। এখন আমি গাড়িতে। গাড়িতে উঠে বোনকে ফোন দিয়ে বললাম, কী কী লাগবে তোদের বল্, গলায় অভিভাবকের ভাব।

বোন–আমার কিছু লাগবে না। পারলে ছোট ভাই আর মায়ের জন্য কিছু নিয়ে আয়।

আমি জানি কাপড়ের প্রয়োজন সবচেয়ে ওর বেশি কিন্তু কোনদিনও বলবে না। এমন অভ্যাসেই গড়ে ওঠে আমাদের পরিবার। যেখানে চাওয়ার কোন সুযোগ নেই। মার্কেটে গিয়ে কাপড়ের দাম শুনে আমি কোনঠাসা হয়ে গেলাম। ‘এ কী! এখন দেখি কিছুই হয় না! ভেবেছিলাম এবার ঈদে অন্তত সবার মুখে হাসি ফুটাব। কিন্তু সবার জন্য হয়ত ঈদের আনন্দ না। ঈদ হয়ত অনেককে কাঁদানোর জন্যও আসে!

১০.
আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহর অশেষ কৃপায় সবার জন্য কাপড় কিনতে পেরেছি। শুধু আমিটা ছাড়া!
বাড়ির উঠোনে এসে দেখি ছোট ভাই খেলছে। আমাকে দেখে দৌড়ে এসে কাধে উঠে বসল। কাধে চড়ে মাইক বাজানো শুরু করল, ও আপু, ও...আপু, ও আপু ভাইয়া এসেছে। পুরো বাড়ি মাতিয়ে তুলতে আমার ছোট ভাই একাই যথেষ্ট।বাড়িতে গিয়ে কুশল বিনিময়ের পর দেরি না করে সবার ঈদের কাপড় বের করলাম। ছোট ভাই দেখে তো কাপড় নিয়ে পড়া শুরু করছে। আমি আর বোন দেখছি আর হাসছি। বোনকে বললাম, আরে তোরটা তো বেরি করলাম না। বোনেরটা বের করে দেখানর পর কিছুক্ষন শুধু কাপড়ের দিকে চেয়েছিল। হঠাৎ আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করল। আমি নিশ্চুপ হয়ে শুধু দাড়িয়ে ছিলাম। ছোট ভাই বড় বোনের কান্না দেখে হকচকিয়ে গিয়েছিল। সেদিন সে অনেক কেঁদেছিল। সব কাজ শেষে মার কাছে গেলাম। বাড়িতে এসে যখন প্রথম মার কাছে গিয়েছিলাম তখন তিনি ঘুমিয়ে ছিলেন। মার কাপড় সামনে নিয়ে গিয়ে রাখলাম। তিনি মনে হয় কিছুই আঁচ করতে পারেনি। করবেনই বা কই থেকে!  তার তো কোন স্মৃতিই স্বরণ নেই। মা এখন একটা প্রতিমূর্তি ছাড়া আর কিছু না। না বলতে পারে, না শুনতে পারে, না কিছু অনুভব করতে পারে। হাঁটাহাঁটিও ঠিকভাবে করতে পারে না।

১১.

ঈদের দিন বোন বলল,চল্, সবাই মিলে কাপড় পরে মার সামনে যাই। আমি সম্মত জানালে সবাই মিলে মায়ের সামনে দাঁড়ালাম। তিনি কিছুক্ষণ আমাদের দিকে তাকিয়েছিলেন। এ কী! তিনার হাতের আঙ্গুলগুলো নড়ছে!  হাত উপরের দিকে উঠাবে মনে হচ্ছে! মায়ের মুখে মৃদু হাসি! আমি স্পষ্ট দেখছি মার মুখে “এক চিলতে হাসি”! মা আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলেন! সঙ্গে সঙ্গে আমি হাত ধরে আমার গালে নেই। তাহলে মা কী বুঝতে পারছেন?  হঠাৎ তার হাত পরে গেল!  তখন বুঝলাম এখানে আশা জাগানোর কিছু নেই। আমার মা যখন সুস্থ ছিলেন তখন সর্বদা আমাদের এভাবে দোয়া দিতেন৷ সেই অভ্যাস এখনও রয়ে গেছে। মাঝে মাঝে মনে হয় আমার জন্ম না হলেও পারত! এগুলো সব তো আমার জন্যই। সেদিনের রাতের ঘটনা থেকেই মায়ের এই অবস্থা। বাবার না ফেরার দেশে গমন। সেদিনের রাত....!  

বলব কী ?   অন্তত আজ না । থাক না হয় কিছু না বলা গল্প । থাক না হয় কিছু রহস্য হয়ে। থাক না!

ফুয়াদ হাসান ফাহিম
১৬,১২,১৪৩১বঙ্গ.
৩০,৩,২০২৫খ্রি.

Comments

    Please login to post comment. Login