Posts

উপন্যাস

কোথায় যাচ্ছে আধুনিক পৃথিবী

February 12, 2026

Md Josam

Original Author MD samim sikdar

Translated by MD Shamim sikdar

10
View

কোথায় যাচ্ছে আধুনিক পৃথিবী
ঢাকার ব্যস্ত রাস্তায়, সকালের রোদে ঝলমলে একটা অফিস বিল্ডিংয়ের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল রাহাত। তার হাতে একটা স্মার্টফোন, যা তার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। চারপাশে লোকজনের ভিড়, সবাই তাদের ফোনে মগ্ন। কেউ হাসছে সোশ্যাল মিডিয়ার রিলস দেখে, কেউ টাইপ করছে অফিসের মেসেজ। রাহাতের চোখ পড়ল রাস্তার পাশে একটা বৃদ্ধ লোকের ওপর। লোকটা কাঁপতে কাঁপতে হাত বাড়িয়ে ভিক্ষা চাইছে। কিন্তু কেউ তাকে দেখছে না। একটা যুবক তার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ধাক্কা লাগিয়ে ফেলল, কিন্তু পেছন ফিরেও তাকাল না। ফোনে সে কথা বলছিল: "হ্যাঁ, বস, আমি আসছি। ট্র্যাফিক জ্যাম।"
রাহাতের মনে হলো, এই আধুনিক পৃথিবীটা কোথায় যাচ্ছে? সে নিজেও একসময় এমনই ছিল। সকাল থেকে রাত অবধি ফোনে আটকে, লাইক আর কমেন্টের জগতে। তার বোনের জন্মদিনে সে উপহার কিনতে ভুলে গিয়েছিল, কারণ একটা ভাইরাল ভিডিও শেয়ার করতে ব্যস্ত ছিল। আজকাল মানুষের মধ্যে অবহেলা এতটাই বেড়েছে যে, পরিবারের সদস্যরাও একটা টেবিলে বসে খাবার খাওয়ার সময় ফোন দেখে। রাহাতের বাবা, যিনি অসুস্থ, কতবার ফোন করেছেন সাহায্য চেয়ে, কিন্তু রাহাত "ব্যস্ত" বলে কেটে দিয়েছে।
সে অফিসে ঢুকল। লিফটে উঠতে উঠতে দেখল, তার সহকর্মী রিয়া কাঁদছে। "কী হয়েছে?" রাহাত জিজ্ঞেস করল। রিয়া বলল, "আমার ছেলে স্কুলে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। কিন্তু বস বললেন, প্রজেক্ট শেষ না করে যেতে পারব না।" রাহাত অবাক হলো। এই কর্পোরেট জগতে মানুষকে মেশিনের মতো দেখা হয়। লাভের জন্য সবকিছু। বসেরা কর্মচারীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে চিন্তা করে না। ওভারটাইম, স্ট্রেস, ডিপ্রেশন – এগুলো আধুনিক জীবনের স্বাভাবিক অংশ। রাহাতের এক বন্ধু সুইসাইড করেছে, কারণ তার কোম্পানি তাকে ছাঁটাই করেছে, নতুন AI টুলস এসেছে বলে। মানুষের চাকরি চলে যাচ্ছে মেশিনের হাতে, কিন্তু কেউ প্রতিবাদ করে না। সবাই সেলফি তুলে "হ্যাপি লাইফ" পোস্ট করে।
দুপুরে লাঞ্চ ব্রেকে রাহাত ক্যান্টিনে গেল। সেখানে টেবিলে বসা লোকেরা ফোন স্ক্রোলে মগ্ন। একটা মেয়ে তার প্লেটের খাবার ছবি তুলছে ইনস্টাগ্রামের জন্য, কিন্তু খাবারের অর্ধেক ফেলে দিল। রাহাত মনে মনে ভাবল, এই অপচয়। আধুনিক পৃথিবীতে খাবার ফেলে দেওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু পৃথিবীর অনেক জায়গায় লোকেরা অনাহারে মরছে। প্লাস্টিকের ব্যবহার, পরিবেশ দূষণ – সবকিছু। শহরের আকাশ ধোঁয়ায় ঢাকা, নদীতে প্লাস্টিক ভাসছে। মানুষ সেলফিশ হয়ে গেছে। "আমার সুবিধা হলেই হলো," এই মন্ত্র। ক্লাইমেট চেঞ্জ নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করে, কিন্তু নিজেরা এসি চালিয়ে গাড়ি চালায়।
সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার পথে রাহাত দেখল একটা দুর্ঘটনা। একটা গাড়ি ধাক্কা মেরেছে একটা রিকশাচালককে। চালক রাস্তায় পড়ে কাতরাচ্ছে। চারপাশে লোক জমেছে, কিন্তু সাহায্য করছে না। সবাই ফোন বের করে ভিডিও করছে। "ভাইরাল হবে," একজন বলল। রাহাতের রক্ত জমে গেল। এই অমানবিকতা! মানুষের দুর্দশা এখন কনটেন্ট। সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের অনুভূতি নষ্ট করেছে। লাইভ স্ট্রিম করে অপরাধ দেখানো হয়, কিন্তু কেউ থামায় না। বুলিং, হেট স্পিচ – সবকিছু। যুবকেরা ফেক নিউজ শেয়ার করে, সমাজ বিভক্ত করে। বয়স্কদের অবহেলা করে, কারণ তারা "পুরনো"। রাহাতের দাদু নার্সিং হোমে, কারণ ছেলেমেয়েরা "ব্যস্ত"।
বাড়ি ফিরে রাহাত আয়নায় নিজেকে দেখল। সে নিজেও এই পৃথিবীর অংশ। ফোনটা বন্ধ করে রাখল। বাইরে বেরিয়ে পাড়ার একটা বৃদ্ধাকে সাহায্য করল। কিন্তু মনে মনে জানে, এটা যথেষ্ট নয়। আধুনিক পৃথিবী দ্রুতগতিতে ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে। প্রযুক্তি আমাদের যুক্ত করেছে, কিন্তু মানুষিকতা ছিনিয়ে নিয়েছে। অবহেলা, সেলফিশনেস, অমানবিকতা – এগুলো বাড়ছে। যদি না আমরা সচেতন হই, তাহলে এই পৃথিবী আর মানুষের জায়গা থাকবে না। শুধু মেশিন আর ভার্চুয়াল জগত। কোথায় যাচ্ছে এই আধুনিক পৃথিবী? উত্তরটা ভয়ঙ্কর।

Comments

    Please login to post comment. Login