দিল্লী বিমানবন্দরের ভেতর ছোট্ট এক বইয়ের দোকানে Astronomy’র কিছু ভালো বই খুজে পেয়েছি। সেকালে আকাশের নক্ষত্রদের নিয়ে খুব আগ্রহ ছিল। দেশে তো তেমন ভালো কিছু পেতাম না। আমার পকেটে আছে ৭৩৫ রুপী। ৪টা বইয়ের দাম এসেছে ৯১৮ রুপী। একটু পর চেক-ইনের জন্যে ডাকবে। ইচ্ছে করছে না, তাও মন খারাপ করে চিন্তা করছি কোন বইটা বাদ দেয়া যায়। আমি আগে কখনো বিদেশ দেখিনি।
আমার পিছে বেশ সুদর্শন এক পুরুষ দাড়িয়ে আছেন। প্রায় সাদা চুল। বয়স হবে হয়তো ৬৫’র ঘরে। পরিপাটি পোশাক। বুদ্ধিমান চোখ। মুখে লম্বা গোফ। মিলিটারিতে এমন গোফকে বলে ‘মার্চ’।
-ব্যাটা, তোমার কি পকেটে টান পড়েছে ?
আমতা আমতা করে তাঁর দিকে তাকাই। লজ্জা লাগছে। পিছে অনেকেই লাইনে দাঁড়ানো। ইংরেজীতে তাকে কি বলা যায় , সেটা পেটে গুছানোর চেষ্টা করছি।
- কোথা থেকে এসেছো ইয়াং ম্যান ?
- আংকেল আমি বাংলাদেশী …
- বাংলাদেশ ? আমি কর্নেল সালিম, আমি তোমার দেশের জন্যে যুদ্ধ করেছি ! বুকে আসো ব্যাটা !
বেঁচে থাকলে ২০১২ সালে আব্বুর বয়স কত হত ? একটা সম্পুর্ন অপরিচিত বয়স্ক মানুষ, শক্ত করে আমাকে বুকে টেনে নিলেন। ছাড়াছাড়ির নাম নাই। আমার ঘামে ভেজা গা ভরে গেল তাঁর Bleu de Chanel এর রাজকীয় সুবাসে।
কর্নেল সালিম আমার হাত ঝাকিয়ে বললেন, ‘ ব্যাটা, আমি তোমার দেশের জন্যে যুদ্ধ করেছি ! ‘
আমাকে আর বইয়ের দাম দেয়া লাগে না। পেটপুরে খাওয়ালেন। তার সাথে জীবনে প্রথম বিমানবন্দরের লাউঞ্জে ঢুকলাম। আমাকে জিজ্ঞেস করেন, কুষ্টিয়ার মানুষ কেমন আছে ? লক্ষীপুর চিনি কিনা … জোর করে আমাকে নিজের ব্যাগ থেকে ১০০ সিঙ্গাপুরিয়ান ডলার দিলেন ! তাঁর কিনে দেয়া একগাদা চিপস আর মিষ্টি নিয়ে আমি ঢাকা ফিরি। আমের ড্রাই ফ্রুটস আমার সেবারই প্রথম খাওয়া। কি যে মজা !
কর্নেল সালিমের সাথে আমার সারাজীবন যোগাযোগ ছিল। নিজের আপন মানুষের মত তিনি বাকী জীবন নিজেই আমার খোজ রেখেছেন। ২০১৯ এ ছ্যাকা খেয়ে দেবদাস হয়ে ভারতের আনাচে কানাচে ‘নেটওয়ার্কের বাহিরে’ যখন ঘুরে বেড়াই, এক ভোরবেলা ইমেইলে তার নাতনীর চিঠি পাই।
‘ দাদু মারা গিয়েছেন। তিনি বলে গিয়েছেন সুযোগ থাকলে আপনার জন্যে অপেক্ষা করতে। আপনি কি আসতে পারবেন জানাযায় ? ‘
খোদা আমাকে কর্নেল সালিমের খাটিয়া কাধে নেবার সম্মান দিয়েছিল। মাগরিবের সন্ধ্যায় চোখ মুছে আমার মনে হয়েছিল, হয়তো এ সম্মানের জন্যে আমাকে ছ্যাকা খেতে হয়েছে ! হয়তো তাঁর কবরে মাটি দেবার জন্যে আমাকে ভারতে মুসাফিরের বেশে ঘুরে বেড়াতে হচ্ছে। হয়তো তাঁর জানাজায় যেন আসতে পারি , যে ছোট জানালার সস্তা হোটেলে উঠেছিলাম; তার মালিক আমাকে আগের রাতে পাঞ্জাবী উপহার দিয়েছিলেন। হয়তো এই ই-মেইলের জন্যে সে রাতে আমি একটা ইন্টারনেট সিম কিনেছিলাম।
আজ কর্নেল সালিমের ছেলের সাথে দেখা হল দোহা বিমানবন্দরে। কোকা-কোলার গন্ধে ভরা Mancera Tonka Cola কিনে দাম দিতে দাড়িয়েছি। নেটওয়ার্কের কারনে কার্ড প্রথম দুবার কাজ করেনি। ব্রিগেডিয়ার জাভেদ পিঠে হাত রেখে বললেন, ‘ আমি যে তোমার পিছে খেয়াল করলে না কেন ? এই আমার কার্ড থেকে বিল রাখো ... '
জীবন কি এক আশ্চর্য চক্র … !
-রাকীবামানিবাস
১২ই ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
