Posts

পোস্ট

আবুল হাশিম

February 14, 2026

Razib Paul

Original Author রাজীব পাল

6
View

বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন কিছু নাম আছে, যারা ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থেকেও ক্ষমতার মোহে অন্ধ হননি। তাঁদের অন্যতম হলেন আবুল হাশিম—চিন্তায় উদার, অবস্থানে দৃঢ় এবং স্বপ্নে স্বতন্ত্র বাংলার এক নির্ভীক প্রবক্তা। ১৯৩০ সালে লন্ডন-এ অনুষ্ঠিত গোলটেবিল বৈঠকে মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি হিসেবে তাঁর অংশগ্রহণ ছিল তাঁর জাতীয় রাজনৈতিক উত্থানের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
উদারপন্থার ভিত রচনা
মুসলিম লীগ-এ যোগ দিয়ে তিনি দলটির উদার ও প্রগতিশীল ধারা গড়ে তোলার কাজে মনোনিবেশ করেন। কেবল সংগঠন বিস্তার নয়, চিন্তার পরিসরও প্রসারিত করতে চেয়েছিলেন তিনি। বহু প্রগতিশীল বাঙালি মুসলিম তরুণকে তিনি রাজনীতিতে উদ্বুদ্ধ করেন—যারা পরবর্তীকালে বাংলা ও পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিসরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
১৯৩৬ সালে বর্ধমান থেকে নির্দলীয় প্রার্থী হিসেবে বঙ্গীয় আইনসভায় নির্বাচিত হওয়া তাঁর জনভিত্তির প্রমাণ বহন করে। ১৯৩৭ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে মুসলিম লীগে যোগ দিয়ে ১৯৩৮ সালে বর্ধমান জেলা মুসলিম লীগের সভাপতি এবং ১৯৪২ সালে বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৪৩ সালের ৭ নভেম্বর তিনি বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন—যা তাঁকে বাংলার মুসলিম রাজনীতির অন্যতম কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত করে।
লাহোর প্রস্তাব ও যুক্ত বাংলার স্বপ্ন
১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাব-এ পাকিস্তানকে একক রাষ্ট্র হিসেবে নয়, বরং মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলভিত্তিক স্বাধীন রাষ্ট্রের ধারণা দেওয়া হয়েছিল। এর অর্থ ছিল—বাংলা একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। কিন্তু ১৯৪৬ সালে দিল্লিতে মুসলিম লীগের সভায় মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ-র পরামর্শে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তান প্রস্তাব উত্থাপন করলে আবুল হাশিম দৃঢ়ভাবে এর বিরোধিতা করেন।
তিনি বিশ্বাস করতেন, ভাষা ও সংস্কৃতির ভিত্তিতে গড়ে ওঠা বাংলা একটি ঐক্যবদ্ধ সত্তা। তাই তিনি কংগ্রেস নেতা শরৎচন্দ্র বসু-র সঙ্গে যুক্ত হয়ে স্বাধীন ও সার্বভৌম ‘যুক্ত বাংলা’র ধারণা সামনে আনেন। ভারতের ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেন-এর অধীনে প্রণীত ‘প্ল্যান বলকান’-এ প্রদেশভিত্তিক স্বাধীনতার সুযোগ থাকলেও কংগ্রেস নেতা জওহরলাল নেহেরু-র বিরোধিতায় সেই সম্ভাবনা শেষ পর্যন্ত নস্যাৎ হয়ে যায়।
১৯৪৭ সালের ১০ মে তিনি শরৎচন্দ্র বসুকে সঙ্গে নিয়ে মহাত্মা গান্ধী-র সোদপুর আশ্রমে গিয়ে সাধারণ ভাষা, সাধারণ সংস্কৃতি ও ইতিহাসের ভিত্তিতে হিন্দু-মুসলমানের যৌথ রাষ্ট্র হিসেবে যুক্ত বাংলার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। তাঁর কণ্ঠে তখন ছিল সাম্প্রদায়িক বিভাজনের বিরুদ্ধে এক ঐক্যের আহ্বান।
পাকিস্তান আমলে সংগ্রামী ভূমিকা
দেশভাগের পর তিনি পশ্চিমবঙ্গ আইনসভায় বিরোধী দলের নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীকালে ঢাকা-য় এসে তিনি ভাষা ও সংস্কৃতির অধিকারের প্রশ্নে সক্রিয় হন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন-এ অংশগ্রহণের কারণে ২৫ ফেব্রুয়ারি তিনি গ্রেফতার হন এবং প্রায় ১৬ মাস কারাভোগ করেন।
পরে খেলাফতে রাব্বানী পার্টি-র নেতৃত্ব গ্রহণ করে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। আইয়ুব খান-এর শাসনামলে ইসলামিক একাডেমির (বর্তমান ইসলামিক ফাউন্ডেশন) পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তাঁর উদ্যোগে কুরআন শরিফ-এর আরবি থেকে বাংলা অনুবাদ প্রকাশিত হয়।
তবে তিনি কেবল ধর্মীয় চর্চায় সীমাবদ্ধ থাকেননি। ১৯৬৭ সালে রবীন্দ্রসংগীত প্রচার বন্ধের সরকারি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তাঁর প্রতিবাদ ছিল সংস্কৃতি-চেতনার এক স্পষ্ট অবস্থান—যেখানে বাঙালিত্ব ও ইসলামী চেতনার মধ্যে তিনি কোনো দ্বন্দ্ব দেখেননি।
উপসংহার
আবুল হাশিম ছিলেন বিভক্তির রাজনীতির বিপরীতে ঐক্যের কণ্ঠ। তিনি ছিলেন মতাদর্শে উদার, কর্মে দৃঢ় এবং দৃষ্টিভঙ্গিতে সুদূরপ্রসারী। যুক্ত বাংলা বাস্তবায়িত হয়নি, কিন্তু তাঁর স্বপ্ন আজও প্রাসঙ্গিক—ভাষা, সংস্কৃতি ও ন্যায়ভিত্তিক রাজনীতির এক সমন্বিত সমাজের স্বপ্ন।
ইতিহাসের পৃষ্ঠায় তিনি কেবল একজন রাজনীতিবিদ নন; তিনি এক আদর্শ, যিনি প্রমাণ করেছেন—নীতি ও বিশ্বাসে অটল থাকাই একজন নেতার প্রকৃত শক্তি।

Comments

    Please login to post comment. Login