Posts

গল্প

১৪ই ফেব্রুয়ারি – বিশ্ব ভালোবাসা দিবস

February 14, 2026

Md Josam

Original Author মোঃ জসিম

Translated by মোঃ জসিম

6
View

১৪ই ফেব্রুয়ারি – বিশ্ব ভালোবাসা দিবস
আজ সকালে ঘুম ভাঙতেই বুঝলাম, বুকের ভেতরটা যেন কেউ চেপে ধরে আছে। জানালার কাচে ধুলো জমেছে, বাইরে ঢাকার ধোঁয়া-ধুলো মিশে একটা হলদে আলো। ফোনটা হাতে নিয়ে দেখি—কোনো নোটিফিকেশন নেই। আজকের দিনে এটাই সবচেয়ে সত্যি খবর।
আমার নাম রাহাত। তেত্রিশ বছর বয়স। একটা ছোট সরকারি চাকরি, মাসে যা আসে তা দিয়ে মা’র ওষুধ আর ভাড়া চলে যায়। বাকিটা কোনোমতে বেঁচে থাকার খরচ। ভালোবাসা? সেটা অনেকদিন আগেই আমার জীবন থেকে ছুটি নিয়ে চলে গেছে।
দশ বছর আগে এই দিনে আমি আর নীলা প্রথম হাত ধরেছিলাম। রমনা পার্কের পেছনের সেই ছোট্ট বেঞ্চে। সে বলেছিল, “রাহাত, আমি তোমাকে ছেড়ে যাব না। কখনো না।” আমি বিশ্বাস করেছিলাম। মানুষ যখন সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে, তখনই সবচেয়ে বোকা হয়ে যায়।
পাঁচ বছর পর সে বিয়ে করল অন্য কাউকে। কারণটা খুব সহজ ছিল—আমার বাবা মারা যাওয়ার পর আমাদের পরিবারের অবস্থা এমন দাঁড়াল যে আমি আর “যোগ্য” ছিলাম না। নীলার বাবা-মা বলেছিলেন, “মেয়ের জীবন নষ্ট করব না।” নীলা কিছু বলেনি। শুধু একটা মেসেজ পাঠিয়েছিল রাত দুটোয়—
“সরি। আমি পারলাম না।”
সেই মেসেজটা এখনো আমার ফোনে আছে। ডিলিট করতে পারিনি। যেন সেটা আমার শাস্তি।
আজ সকালে অফিসে গিয়ে দেখি সবাই হাসি-ঠাট্টা করছে। লাল গোলাপ, হার্টের বেলুন, চকলেটের প্যাকেট। একজন কলিগ বলল, “রাহাত ভাই, আজ তো ভ্যালেন্টাইনস ডে! কারো জন্য কিছু নিলেন না?” আমি হাসলাম। সেই হাসিটা আমার মুখে অনেকদিন ধরে প্র্যাকটিস করা।
দুপুরে লাঞ্চের সময় ছাদে উঠলাম। একা। নিচে রাস্তায় দেখা যাচ্ছে ছেলে-মেয়েরা হাত ধরে হাঁটছে। কয়েকটা মেয়ে লাল শাড়ি পরে ছবি তুলছে। আমি ভাবলাম—এই দিনটা কি শুধু তাদের জন্য? যারা হারায়নি, যাদের কেউ ছেড়ে যায়নি?
পকেট থেকে একটা পুরনো ছবি বের করলাম। নীলার সাথে আমার শেষ ছবি। সে হাসছে, আমি তার কাঁধে হাত রেখে। ছবিটা এতদিন ধরে রেখেছি যে কোণগুলো হলদে হয়ে গেছে। আঙুল দিয়ে তার মুখ ছুঁলাম। কিছুক্ষণ পর বুঝলাম—চোখ ভিজে এসেছে।
আমি কাঁদিনি অনেকদিন। কিন্তু আজ কান্নাটা থামাতে পারলাম না। ছাদের এক কোণে বসে নিঃশব্দে কাঁদলাম। কেউ দেখল না। ভালোই হলো।
সন্ধ্যা নামার সময় ফিরলাম বাসায়। মা জিজ্ঞেস করলেন, “আজ অফিসে কেমন ছিল?” বললাম, “ভালো।” মিথ্যে বলতে আমার আর অসুবিধা হয় না।
রাত ন’টার দিকে ফোনটা বেজে উঠল। অচেনা নম্বর। ধরলাম।
ওপাশ থেকে একটা চেনা গলা।
“রাহাত?”
নীলা।
আমার গলা শুকিয়ে গেল। কিছু বলতে পারলাম না।
সে বলল, “আমি জানি আজ তোমার খুব খারাপ লাগছে। আমারও লাগছে। আমি... আমি অনেক ভুল করেছি।”
আমি চুপ।
সে আবার বলল, “আমি ডিভোর্স করেছি। দুই বছর হলো। তোমাকে বলতে পারিনি। লজ্জা করত। আজ আর পারলাম না।”
আমি তবু চুপ।
“রাহাত... তুমি কি এখনো আমাকে ঘৃণা করো?”
আমি অনেকক্ষণ পর বললাম—
“ঘৃণা করলে তো ভুলে যেতে পারতাম। আমি তো ভুলতে পারিনি।”
ওপাশে কান্নার শব্দ।
আমি বললাম, “আজ রাতে আর কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। কাল সকালে ফোন করিস।”
লাইন কেটে দিলাম।
ফোনটা টেবিলে রেখে জানালার কাছে গেলাম। বাইরে তখনো অনেক গাড়ির হর্ন, অনেক হাসি, অনেক লাল আলো। কিন্তু আমার বুকের ভেতরটা একটু হালকা লাগছিল।
ভালোবাসা কখনো পুরোপুরি মরে না।
সে শুধু লুকিয়ে থাকে।
কখনো কখনো খুব গভীরে, কখনো কখনো অনেক বছর পর আবার নিজেকে দেখা দেয়।
আর সেটা দেখার জন্যই হয়তো আমাদের এত কষ্ট সহ্য করতে হয়।
আজ ১৪ই ফেব্রুয়ারি।
বিশ্ব ভালোবাসা দিবস।
আমার জীবনে আজ প্রথমবার মনে হলো—
এই দিনটা হয়তো আমার জন্যও।
(শেষ)

Comments

    Please login to post comment. Login