০১.
সন্ধ্যা
♦️
তেপান্তর পেরিয়ে, আকাশসম পাহাড় ছাড়িয়ে- ঠিক সন্ধ্যায় সন্ধ্যার মুখোমুখি। নেই আলাপন, নেই স্মরণ; শুধু চোখে তাকিয়েই মরণ। য্যানো ফেঁসে গ্যাছি যাবজ্জীবন।
হুটহাট দুয়েক কথা। কথার সূত্রে দীর্ঘসূত্রতা। এগিয়ে গিয়ে আবার পিছিয়ে যায় সমুদয় সময়ের নিদারুণ ব্যস্ততা। এ কী মিথ, না বাস্তবতা? সন্ধ্যা এসে কয়, এ তো মিছে নয়; বোশেখ মাসের শীতের তপ্ততা।
শীতের পাটাতনে বর্ষণের পূর্বাভাস, সয়ে যায়-রয়ে যায় যাবতীয় অভ্যাস। অভ্যাসের আভাসে গতি ও প্রকৃতির জালে সুগন্ধি রুমাল ছুঁয়ে যায়; স্মৃতিতে অনুভবে সে সন্ধ্যা আমারে কুঁড়ে কুঁড়ে খায়।
০২.
বিশেষ দ্রষ্টব্য
♦️
জটিলতার জ্বরে জর্জরিত, জ্বর শয্যায় ডাকি তোমারে অবিরত
নারী এসে কপাল ছুঁয়ে দাও, জলপট্টি মেখে দাও
তুশ জ্বালিয়ে প্রতিচিন্তার তত্ত্ব তালাশে আমার জীবন নাও
লকলকে গল্পে-কবিতায় সান্ত্বনা টুকে একটু ঘুম পাড়িয়ে দাও।
মাঝরাতের ভবঘুরে আলাপে ছন্দ তুলে আবার ঘুম কেড়ে নাও
ওষুধ হয়ে দু্ঃখবোধের যাতনা কেড়ে
অসুখের সুখ ছড়িয়ে দাও;
আজীবন থেকে যাও, কালান্তরের গভীরতর সময়ে মিশে যাও।
মায়ার বাঁধনে বাঁধা পড়ে গ্যাছো জীবনদর্শনের সৃজনভুবনে
হিমোগ্লোবিনের মতো মিশে যাচ্ছো, বিশেষ দ্রষ্টব্যের পেন্ডুলামে।
০৩.
বনভাঙার দুঃখ
♦️
হেঁটে যায় ইচ্ছারা, এগুতে চায় না ব্যথারা। থেমে থেমে বাড়ন্ত প্রেম প্রলয়ের ঝুঁকিতে চারিপাশে বাঁধে বাসা। হায়, হায় এরই নাম কী ভালোবাসা! মিনারের পাদদেশে বসে মৃতনদীর নিবেদিত উপমায় কথার ফুলঝুরি, নিত্যনৈমিত্তিক স্তব্ধতার স্তবকে থেমে যায় ঘড়ি!
ফিরি। ফিরে এসে মনোজগতে ভিড় করি। প্রেম যায়, প্রেম আসে; মনোহর বদ্ধ সময়ে শালুক মাখি। আঁচলের পাশ ধরে তোমার শানে রেখে গ্যাছি এ জীবন চাবি।
পাঠ-পরাপাঠের কারবালায় দাঁড়িয়ে বেলা কেটে গ্যাছে। থেমে গ্যাছে নিয়ন আলোর মুখ। চাড্ডায় বসে স্বস্তির নিঃশ্বাসে ঝরে পড়ে বনভাঙার দুঃখ।
০৪.
ভাঁটফুল
♦️
দুর্দশার গালিচায় পা ফেলে হামাগুড়ি দিয়ে হাঁটছি। তোমার কাছে যাচ্ছি। যাচ্ছি তো যাচ্ছি। খুব সন্নিকটে পৌঁছে উল্টো রথে ফিরছি। ঋণগ্রস্ত দুনিয়ার বোঝা বইতে না পারার দায় নিয়ে মৃত্যুর ডগায় সুড়সুড়ি দিচ্ছি।
অবেলায় ফোঁটা কাশফুল নিয়তির নির্মম পরিহাসে হাসছে, আমাকে- তোমাকে দেখছে। জম্পেশ আয়োজনে নিন্দার সভা বসাচ্ছে, তা দেখে অধিষ্ঠিত ভাবনায় অতিষ্ঠ হয়ে গেছি;
অধিকারহীনতায় সব রেখে ঘুমিয়ে গ্যাছো; ঘুম ঘুম চোখের পানি তোমার চিবুক ছুঁয়ে গ্যালো। কার তরে এ পানির আবদার; আমার? মোটেও না। যতোই করো তর্কের মশগুল; আমি তো অবহেলায় অনাদরে জেগে থাকা ভাঁটফুল।
০৫.
সন্ধ্যা মালতী
♦️
দুঃখবোধের সলতে কেরোসিনে চুবিয়ে দিয়াশলাই বক্স থেকে কাঠি সন্তর্পণে বের করে কপালে মাখছি। আগুন ধরাচ্ছি। দুঃখ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। সুখী মানুষ হবার লোভে সুখের সন্ধানে তোমার সাথে ভাব জমাচ্ছি, অকূল সাগরে ভেসে গেছে তোমার সুখ, দুঃখবোধের বাক্স নিয়ে ঘুরছো তা ভেবে পাইনি।
ব্যথার পাপকে পাশ কাটিয়ে দীর্ঘজীবী করো ভালোবাসার চাষাবাদ, অখণ্ড হৃদয় পূর্ণ করে ধরো বিবমিষার হাত। সন্ধ্যা মালতী, কোনক্রমে টাল মাটাল হয়ে প্রেম উপচে দাও, যাপিত জীবনের প্রেম উস্কে দাও। সব রেখে বাঁচো; ছয়কে ভয়, ভয়কে ছয়ের কাছে রাখো। দুঃখ রেখে সুখকে মাখো, বাঁচো এবং বাঁচো।
০৬.
বোটানিক্যাল
♦️
বৃষ্টিমুখর রাস্তায় ছায়াহীন জীবনের ছাতা বিহীন ধর্মঘট। যেতে যেতে বোটানিক্যাল গার্ডেন। শাপলার লম্ফঝম্পে ব্যাঙের অনশন, দেখে ইচ্ছে করে থাকি আরো কিছুক্ষণ। থাকা, মূলত তোমাকে রাখা- বহুদলীয় গণতন্ত্রের মোড়কে মোড়ানো আছে ভাঙা জীবন।
স্টেশনের চত্বরে কোলাহল, কোলাহলে অপ্রকৃতিস্থ হয়ে পড়ে কথার আবদার তথা কৌতূহল। তথাকথিত বিরোধী বাহাসে পক্ষাবলম্বনে ফিরে দেখি সেই বোটানিক্যাল। শাপলা। ব্যাঙ। গেইট ফুল। থেমে থাকা আধো ভাঙা সিঁড়ি। সব মাথায় রেখে পাতি এক জাল; সামনে এসে খাবি খায় রাতের বোটানিক্যাল কঙ্কাল।
০৭.
পুঁজিবাদী প্রেম
♦️
কাঙ্ক্ষিত জীবনের অনাকাঙ্ক্ষিত বাঁধায় থেমে যাচ্ছে স্বপ্নের পাতা।
চোখের পাপড়িতে লেগে যায় অর্ধমৃত টিকটিকির রক্ত।
শাদালাল আলোয় বিবর্ণ তালপাতারসেপাই।
হে খোদা, দেখাও কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধির সম্পর্কহীন সম্পর্কের অবলা কামিনীর চিহ্ন।
আত্মিক লেনা দেনায় অপ্রস্তুত লেনিন হয়ে
সমাজতান্ত্রিক প্রেম যে খুঁজে বেড়াচ্ছি।
চে গেভারার চোখে জল, সে জানে-
বিপ্লব কখনোই একতারা বাজিয়ে আসে না।
পিছনের গলিতে শব্দহীন প্রতিবাদের দেয়ালচিত্র,
ভেঙে পড়া আদর্শের জীর্ণ ছায়া বুকে ধরে
আমি হেঁটে যাই পরিত্যক্ত সোভিয়েত মনস্তত্ত্বে,
যেখানে হৃদয় মানে রাজনীতি আর নিঃশ্বাস মানে প্রশ্ন।
ভোরবেলা কুয়াশায় ঢাকা এক মানসিক রাষ্ট্রপতি জিজ্ঞেস করে-ভালোবাসা কী আজও পুঁজিবাদী পণ্য?
আর আমি, সস্তা চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে, বিড়ি ফুকে উত্তর খুঁজি নীরবতার লালরঙা খামে।
০৮.
অভিসম্পাত
♦️
দুপুরের রোদমাখা শীত-গলায় বেসুরো গীত। হাতি দেখে নেমে দাঁড়িয়ে গেলাম। রিকশায় তোমায় দেখে- পা এগিয়ে উঠে; পাশাপাশি বসে আছি, শরমের গরমে ঘেমে যাচ্ছি। ঘর্মাক্ত সর্বনাশা স্রোতে পতিত কান্নার আওয়াজ পাচ্ছি।
স্বরূপে ফিরেছি। রিকশা থেকে নেমে পেছন পেছন হাঁটছি। হাঁটছি তো হাঁটছি। প্রণতী জানিয়ে সময়ের হেরফের করে ভেড়া শাবকের ন্যায় কাঁদছি। হাঁটছি, কাঁদছি। সেই হাঁটা এবং কাঁদা অনন্ত কালের অভিসম্পাতে ঢুকে গেছে কসম খোদার টেরই পাইনি।
০৯.
অ্যাবসার্ড
♦️
মুখোশপরা জগতে মুখোশহীন, মুখোশের আশ্রয়ে; প্রশ্রয়ে ভুলেও যাইনি। তবুও মুখোশপরা জগতে মুখোশধারী আমি! তথাপি 'মুখোশপরা পাঠশালা'য় নিয়মিত যাই, নিই তালিম।
কথাগুচ্ছে ক্লান্তি বাড়ে, চুপ থেকে নিশ্চুপ হয়ে যাই; নিন্দা মেখে ঘুমাই। ইহলোকের শাঁসালো শ্বাসে অ্যাবসার্ড হয়ে যায় কেয়ামত।
১০.
জার্নি উইথ কবিয়াল
♦️
লাল পিঁপড়ার ধীরগতির আস্ফালনে মাছিরা ভনভন করে, কাঠের খাঁচা পাখি খুঁজে। পেঁজা তুলোর মত নরম আকাশ জলপাই বনে বাঘ শিকার করে। মুরোগ ফুলের গাছের মুরোদ হয় না ফুল ফুটানোর, ফুল ফুটে পাথরকুচির ডালে।
দুর্বাঘাসে দুর্ভাগা লাউপাতারা বেড়ে উঠে। গলাকাটা মুরগি ঘাড় উঁচিয়ে দিকবিদিক নানানদিকের খাবার আনে, তা খেয়ে টালমাটাল হয়ে পড়ে দিন দুনিয়া। তেমনি তোমারে ভালবাসতে যেয়ে দুনিয়ারে হত্যা করে শেওলামাখা ইট হয়ে শুয়ে থাকি কবরখানার নীলাভ সবুজ কবরে। কাঁদে দুর্বাঘাস। পাথরকুচি। জলপাই পাতা।মাছি। লাল পিঁপড়া।
১১.
ভূগোলের ধারাপাত
♦️
তোমারে নিয়া শঙ্কিত, প্র্যাকটিক্যাল সময় প্রকম্পিত। অপরাধ চিত্রায়িত করছো জীবনহানির জগত জুড়ে। শাদা মুকুটে কালো নিশানা লেপন করছো সমাজ ও সংস্কৃতির সর্বস্তরে। পরাজিত গানের লিরিক্স বাজছে সোনার মুখোশে।
হম্বিতম্বি সাজঘরের পথ খুলেছে অনুকম্পাহীন বাহাদুরেরা। হলুদ গুঁড়া মেখে অনিদ্রার গায়ে হলুদ আয়োজন, তাতে উগ্র অ্যামেনিয়ার ঘ্রাণে ঘটে বিবেক ও বোধের বিস্তরণ।
১২.
শূন্য
♦️
চিন্তনে ও মননে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তর পাটাতন, বাস্তবিক অর্থে শূন্যে অবগাহন। শূন্যে ডুবে শূন্যতায় ভেসে যাই, সাঁতরে কিম্বা হামাগুড়ি দিয়ে ফিরে ফিরে তাকাই। আঁধার পেরিয়ে অন্তঃকরণের হিসাবনিকাশ, দর কষাকষি বিনিময় ভাবনার; শূন্য হাতে শূন্য মগজের বসবাস।
সন্ধ্যার পর সান্ধ্য আইন। সেই আইনের আওতায় সন্ধ্যা ডেকে নিয়ে আসে জনমের জঙ। সেই জঙের সিম্ফনিতে যেতে চাই, যাওয়ার রাস্তা নাইবা পাই; ন ডরাই!
হে সন্ধ্যার শিয়ালমুখী, কোরো মোরে ধন্য; আমার যাবজ্জীবনের শুন্যস্থান যে শূন্য। চলো পূর্ণতার পূর্ণমানে সজ্ঞানের সসম্মানে শূন্যতার আলাপনায় হয়ে উঠি স্বয়ংসম্পূর্ণ।