Posts

চিন্তা

বাংলাদেশকে সবার করবেন তারেক রহমান!

February 16, 2026

ফারদিন ফেরদৌস

17
View

তারেক রহমান দেশে এসে প্রথম যে কথাটি তিনবার বলেছিলেন, সেটি হলো 'শান্তি'। তারপর যেটি বলেছিলেন, আমরা প্রতিশোধ নিতে চাই না। বস্তুত ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন শেষে দেশে ফেরার পর থেকে নির্বাচনী প্রচারণার শেষ দিন পর্যন্ত তারেক রহমান বিনয় ও ভালোবাসার বার্তা সর্বত্র ছড়িয়ে দিতে চেয়েছেন। তাঁর এই বার্তার প্রধান অনুষঙ্গ ছিল একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, ২৪ এর গণ-আন্দোলন, দেশাত্ববোধ, মুক্তবুদ্ধি, সমানাধিকার এবং সর্বজনের সমান কল্যাণ চিন্তা। তারেক রহমানের পরিষ্কার মেসেজ জনগণ গ্রহণ করেছে এবং ৩ কোটি ৭৩ লাখ ৪১ হাজার ৫ শত ৪ জন ভোটার সমর্থন দিয়ে দুই শতাধিক আসনে তারেক রহমানের দল বিএনপিকে বিজয়ী করেছে।

মিস্টার রহমান নির্বাচনকালীন তাঁর ভাষণে বলেছেন, 'আমরা চাইনা যে বিভীষিকার মধ্য দিয়ে বিএনপি গেছে, সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি বাংলাদেশে হোক। কারণ এই ঘটনার যদি পুনরাবৃত্তি হয়, তাহলে কোনোভাবেই শান্তি প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভবপর নয়। আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি, আমাদের নেতাকর্মীরা পঙ্গুত্ব বরণ করেছে, সম্পদ হারিয়েছে; কিন্তু প্রতিশোধ কখনোই শান্তি এনে দিতে পারে না। প্রতিশোধ কখনোই ভালো কিছু এনে দিতে পারে না। সেজন্য সর্বত্র আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা এ দেশ এবং জাতিকে রক্ষা করতে পারে।'

তারেক রহমানের শান্তির বাণীতে জনগণ আস্থা রেখেছে। যার ফলে ১২ ফেব্রুয়ারি একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ হারে নাই। পরিবর্তিত বাস্তবতায় দেশে দেড় বছর ধরে জারি রাখা ভিনভাষা ইনসাফের পরিবর্তে 'ন‍্যায়বিচার', ইনকিলাবের পরিবর্তে 'বিপ্লব' এবং আজাদীর পরিবর্তে 'স্বাধীনতা' রক্ষা পেয়েছে। একুশে ফেব্রুয়ারি, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, জাতীয় পতাকা, জাতীয় সঙ্গীত, নবান্ন, পৌষ-পার্বণ, বসন্ত উৎসব, পহেলা বৈশাখ, জারি, সারি, বাউল, ফকির, লালন, রাধা রমণ, শাহ আব্দুল করিম এই ভূমিতে স্বমহিমায় বিরাজ করবার নিঃশ্বাস পাচ্ছে।

চরম অশ্লীল, আক্রমণাত্মক, শিষ্টাচারবহির্ভূত, ভাঁড়ামি ও কুরুচিপূর্ণ যে গালিগুলো মুখে আনতে পারছি না। এমনকি কল্পনায় আনলেও ব্রেন অনীহা প্রকাশ করছে -গেল দেড় বছর ধরে নয়া বন্দোবস্তের দাবিদার তরুণেরা এই সমাজ ও জাতিরাষ্ট্রকে যেসব গেলাতে চেয়েছিল এককথায় ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে তা ভীষণভাবে ফেইল করেছে। বেপরোয়া বটের বাটপারির বিরুদ্ধে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে নীরব ভোটারেরা। ওদের পৃষ্ঠপোষক অর্থগৃধ্নু ইনফ্লুয়েন্সারদেরও টাটা বাই বাই বলে দিয়েছে দেশের আপামর মেজরিটি।

এবারের জাতীয় নির্বাচনের বড় শক্তি এটা। এবং যেই নির্বাচন অনুষ্ঠান সফল করতে পেরে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনুস এরং জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের মতো রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারকেরা।

'বিএনপি এমন একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে চায় যেখানে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, বিশ্বাসী, অবিশ্বাসী, কিংবা সংশয়বাদী, পাহাড়ে কিংবা সমতলে বসবাসকারী সকলে নিরাপদ থাকবে।' নির্বাচনের কয়েক ঘন্টা আগে টেলিভিশন ভাষণে তারেক রহমান এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। যেই দেশে নাস্তিক শব্দটা উচ্চারণ করলেই ধর্মানুভূতিতে আঘাত নামের দুর্মর মবোক্রিসি জায়েজ হয়ে যায় সেখানে তারেক রহমানের এমন বয়ান অভাবনীয় ও বিস্ময়কর। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের কোনো শাসক এতটা ইমপার্শিয়াল, ইম্পর্ট্যান্ট এবং সেন্সিবল কমিটমেন্ট দিতে পারেন নাই। তারেক রহমান তাঁর কথায় অনড় থাকলে এই বাংলাদেশ নিশ্চিতই বিশ্বমুখ হয়ে উঠবে।

নির্বাচনকালে তারেক রহমান তাঁর বক্তব্যে আরো বলেছেন, 'পড়ালেখা অবশ্যই দরকার একটা জাতির জন্য, কিন্তু শুধু পড়ালেখা করলে তো হবে না। আর্ট-কালচার যদি না জানে একটা জাতির কেমন করে হবে? আর্ট-কালচার জানতে হবে, হিস্ট্রি না জানলে তো হবে না। আমরা চাই আমাদের বাচ্চারা ছবি আঁকা শিখবে, গান শিখবে, কীভাবে মিউজিক ইন্সট্রুমেন্ট বাজাতে হয় শিখবে। সরকার কয়েক ধরনের মিউজিক ইকুইপমেন্টের ব্যবস্থা করবে। গান শেখার ব্যবস্থা করবে। বাচ্চারা চুজ করবে, সে গান গাইবে নাকি ইন্সট্রুমেন্ট বাজাবে। ফ্যামিলি প্রোভাইড না করতে পারলেও রাষ্ট্র দায়িত্ব নেবে শিশুরা যাতে তাদের কোয়ালিটি প্রকাশ করতে পারে।' এমন কথা কোনো শাসকের মুখ দিয়ে যখন উচ্চারিত তখনই তাঁর ব্যক্তিগত রুচিবোধ ও পারিবারিক শিক্ষা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া। নির্বাচনের আগে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গানের শিক্ষক নিয়োগ বন্ধ নিয়ে সোরগোল তুলে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ অপরাপর ধর্মভিত্তিক দল। এমনকি দেশে গানের অনুষ্ঠান একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল, গানে যুক্তি তর্ক তুলে ধরার জন্য বাউল শিল্পী আবুল হোসেনের মতো সংস্কৃতিসেবীদের গ্রেফতার করা হচ্ছিল। এমন বাস্তবতায় তারেক রহমানের বাঙালি সংস্কৃতি রক্ষার বার্তাটি দেশের মুক্তবুদ্ধির সকল মানুষকে যারপরনাই আশ্বস্ত করেছে।

নির্বাচনী জয়ী হওয়ার পর সংবাদ সম্মেলনেও বুদ্ধিমত্তা ও পরিমিতিবোধের পরিচয় দিলেন তারেক রহমান। হয়ে যাওয়া নির্বাচনটা সহজ ছিল কিনা এবং দুইশ'র বেশি আসন পাইতে তারেক রহমানকে কোনো ইঞ্জিনিয়ারিং করতে হলো কিনা? এটাই ছিল সাংবাদিক খালেদ মুহিউদ্দীনের তরফে প্রশ্ন এবং ছোট্ট ল্যাজ। তারেক রহমান জবাব দিলেন, 'জনগণকে কনভিন্স করাটাই হচ্ছে আমাদের ইঞ্জিনিয়ারিং, আমাদের ইঞ্জিনিয়ারিংটা ছিল জনগণকে আমাদের পক্ষে নিয়ে আসা -সেটাতে আলহামদুলিল্লাহ্ আমরা সফল হয়েছি। আর জনগণকে কনভিন্স করে একটি সুষ্ঠু সুন্দর পরিবেশ এনশিওর করাটাই আপনার প্রথম প্রশ্নের উত্তর -কঠিন হবে কিনা? যে কোনো ভালো কাজ, ভালো গোল অ্যাচিভ করতে হলে তো কষ্ট করতে হয়, কঠিন হবেই।'

ওই সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরানোর প্রশ্নে তারেক রহমান বলেন 'এটি আইনি প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে'। বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে যেখানে আওয়ামী লীগের অনেক সমর্থক রয়েছে, সেই বিবেচনায় সমস্যা সমাধান বা মিটমাটের জন্য পরিকল্পনা কী, এ প্রশ্নের উত্তরে মিস্টার রহমান বলেন- 'আইনের শাসন নিশ্চিত করার মাধ্যমে সমাধান হবে'। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের রায় বা সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা হবে কি না তারেক রহমানের পক্ষে তেমন আরেকটি প্রশ্নের উত্তর দেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, 'এটি বিচার বিভাগের বিষয়'।

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক কেমন হবে সে প্রশ্নের উত্তরে 'বাংলাদেশ ও দেশের মানুষের স্বার্থ বিবেচনায় সব দেশের জন্য একই বৈদেশিক নীতি' বজায় রাখার কথা বলেন তারেক রহমান। দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কোনো রকমের অন্যায় কিংবা বেআইনি কর্মকাণ্ড 'বরদাশত করা হবে না'- বলে জানান তিনি। এছাড়া জুলাই সনদ নিয়েও তাঁর লিখিত বক্তব্যে বলা হয় 'আমরা জনগণের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ও প্রত্যাশিত প্রতিটি অঙ্গীকার পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করবো ইনশাআল্লাহ'।

নির্বাচনের প্রাক্কালে মনে হয়েছিল বাংলাদেশটা প্রতিক্রিয়াশীলতা ও ধর্মান্ধতার অন্ধকারে হারাতে বসেছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিলীন হতে বসেছে। নারীর শিক্ষা, কর্ম, নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার ও ক্ষমতায়ন থমকে যাচ্ছে। সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প চারপাশে ছড়িয়ে পড়ছে। উদারনৈতিক ও সহনশীল সমাজব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়েছে। কিন্তু দেশের কোটি সচেতন মানুষের সদিচ্ছায় ঠিক এর বিপরীতটাই ঘটল। প্রগতিশীল নারী ও পুরুষেরা যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল।

তারেক রহমানের দল এক তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। অতীত অভিজ্ঞতা বলে এমন ব্রুটাল মেজরিটি শাসক দলকে একনায়কে রূপান্তর করে। ব্রিটেনের মতো বিশুদ্ধ গণতান্ত্রিক দেশে দীর্ঘদিন বসবাস করবার ফলে নিশ্চয়ই তারেক রহমানের মন ও মেজাজে গণকল্যাণকামিতা ভর করছে। সবার আন্তরিক সহযোগিতা পেলে নিশ্চয়ই তাঁর পরিকল্পিত সর্বজনের সমাজ গড়ে তুলতে পারবেন।

আত্মস্বার্থনিমগ্ন মানুষ বরাবর ক্ষমতার বলয়ে থাকতে খুব পছন্দ করে। চারপাশে ঝাপসা চোখে তাকালেও এখন তাই সবাইকে ক্লিয়ার বিএনপি দেখতে পাওয়া যাবে। বিশেষ করে দক্ষিণপন্থী ব্লকটার দিকে নজর করলে এটা আরো ভালো দেখা যাবে। তারেক রহমানের জন্য ওই হাইব্রিডদের সামাল দেয়াই হবে বড় ধাক্কা। বিশ্বাস করি তিনি 'গুপ্ত' ভালো চেনেন ও বুঝেন।

সরকার পরিচালনায় সমূহ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে তারেক রহমানকে। তবে মিস্টার রহমানের স্পষ্ট বয়ান, 'From today we're all free, with true essence of freedom and rights restored.' মানবিক বাংলাদেশ গড়তে ভিন্নমতসহ সকলের সহযোগিতা চেয়েছেন তারেক রহমান। অপজিশন লিডারদের বাড়ি বয়ে গিয়েও তিনি একই বার্তা দিয়েছেন। অসুর পরাভূত করে 'সুরে'র আরাধনায় নিজেকে ব্যাপৃত রাখবেন এক সময়ের নির্বাসিত আর এখনকার সরকার প্রধান তারেক রহমান। তবেই নিশ্চিত হবে সর্বমানুষের সুন্দর সহাবস্থানের নিখাদ বাংলাদেশ। জাতীয়তাবাদী স্লোগানটাও তখন সার্থক অভিধায় অভিষিক্ত হবে, 'সবার আগে বাংলাদেশ।

লেখক: সাংবাদিক 
১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

Comments

    Please login to post comment. Login