Posts

চিন্তা

তারেক রহমানের প্রতি খোলাচিঠি!

February 16, 2026

ফারদিন ফেরদৌস

18
View

দীর্ঘ নির্বাসন শেষে দেশের মাটি স্পর্শ করে এখানকার সর্বমানুষের জন্য আপনি অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তার সবগুলোর সারকথা হলো 'শান্তি'! বিশ্বাস করি আপনি নিজে শান্তিপ্রিয়, তাই ওই শান্তির রেশটা দেশজুড়ে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছেন। আর এটা জনগণ বিশ্বাস করে আপনার ওপর পূর্ণ আস্থা রেখেছে। যেমনটা রেখেছিল আপনার মরহুমা মাতা বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি।

আমরা আমজনতা যা চাই তার সবটাই আপনার ঘোষিত মেনিফেস্টো ও ৩১ দফায় আছে। আপনার প্রথম কাজ হবে ইমিডিয়েট পূর্ববর্তী শাসকের পরিণতির কথা মনে রাখা। যারা অন্যের জীবনে বিভীষিকা নামিয়ে দিয়ে গণরোষে নিজেরাই দেশান্তরী হয়েছে। কর্মদোষে কলঙ্কের ওই জীবন কারোরই নিজের দিকে টেনে আনা উচিত নয়।

ব্রুটাল মেজরিটি শাসকের পা মাটি ভুলিয়ে দিয়ে আকাশে তুলে দেয়। কিন্তু যেকোনো বাস্তবতাতেই পা মাটিতে রাখা জরুরি। নিজের শেকড় কেটে দিয়ে উড়বার সাধ জাগলে ধরাপতনে খুববেশি সময় লাগে না। কাজেই পূর্ব অভিজ্ঞতাগুলো মনে রেখে আপনি অন্যের চেয়ে আলাদা হবেন -এই আশাবাদ রাখি।

আপনার নেতাকর্মীরা এই ভূমিরই সন্তান। এখানকার আলো বাতাসেই মানুষ। তাদের কাছে হঠাৎ করে ফেরেশতা চরিত্র আশা করা ভুল। বিগত রেজিম দেশজুড়ে নিজেদের সুবিধামতো চাঁদাবাজির যেসব সেক্টর বিনির্মাণ করে গিয়েছিল সেসব এখন কার দখলে আছে খোঁজ নিলেই জানতে পারবেন। দেশের সড়ক-মহাসড়কের ফুটপাত এবং শহরের স্কুল-কলেজের বাউন্ডারি দখল করে অবৈধ দোকানদারি পার্টিজান কারা করছে সেটাও কারো অবিদিত নয়। ধৈর্য ও বুদ্ধিমত্তার সাথে ক্রমান্বয়ে এসব বন্ধ করা জরুরি।

বিগত সরকার সারাদেশের সড়ক-মহাসড়কে ভাইরাসের মতো করে অবৈধ ব্যাটারি রিকশা ছড়িয়ে দিয়েছে। তাদের নেতারাই জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর ব্যাটারি ও চায়না থেকে আমদানি করা মোটর ব্যবসা করেছে। এখন হয়ত ব্যবসা হাতবদল হয়েছে। সড়কে এই অদ্ভুতুড়ে যানবাহনটি ছাড়া এখন মানসম্পন্ন গণপরিবহন নাই বললেই চলে। পৃথিবীর কোথাও নাই নিবন্ধনহীন কোন যান, ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া চালকেরা গতিশীল হাইওয়েতে বেপরোয়াভাবে চালাতে পারে! বাংলাদেশে এটা হচ্ছে। এই ব্যাটারি রিকশা সড়ক দুর্ঘটনার সবচেয়ে বড় কারণ। ওইসব চালকদের পুনর্বাসনের মাধ্যমে এই বাজে যানবাহন সড়ক থেকে তুলে দেয়া অতীব জরুরি।

বাংলাদেশে শীতকালে আগে খেলাধুলা, গানবাজনা, নাটক-থিয়েটার, যাত্রাপালা, বাউল গান এবং দেশজ ভাবধারার কনসার্ট অনুষ্ঠিত হতো। আর এখন একশ্রেণীর কমেডিয়ান ওয়াইজেন কর্তৃক ভিন্নমতাদর্শীর প্রতি গলাফাটানো বিষোদগার-বিসম্বাদ ছাড়া সাধারণ মানুষের অন্যকোনো বিনোদন নাই। ধর্মের বাতাবরণে মানুষ অন্যকে ঘৃণা করতে শিখছে -সহজ মানুষ হওয়ার সাধনা কেউ করছে না। হাজার বছরের বাঙালিয়ানা এবং চিরায়ত সংস্কৃতির সুরক্ষা আপনার কাছে আমরা প্রত্যাশা করছি। আপনি দেশজুড়ে ব্যাপকভাবে খেলার মাঠ, লাইব্রেরি, এম্ফি থিয়েটার, বিনোদন পার্ক, সাহিত্য ক্লাব, সংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্র, বিজ্ঞান গবেষণাগার গড়ে তুলুন।

সবচেয়ে বড় সংকট শিক্ষাব্যবস্থায়। বিগত রেজিম ৯ হাজার মাদ্রাসা নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার সময় সেটিকে ১৯ হাজার মাদ্রাসায় উন্নীত করে যায়। কিন্তু সেসব মাদ্রাসায় শিক্ষা বলতে আদৌ কিছু হয় সে ব্যাপারে ন্যূনতম রাষ্ট্রীয় মনিটরিং ব্যবস্থা রাখা হয়নি। শহরের দেয়ালে নজর করলেই দেখা যায় যত্রতত্রভাবে একই ভবনে তিন চারটি মাদ্রাসাও তাদের কার্যক্রম চালাচ্ছে। যেগুলোর কোনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি বা নিবন্ধন নাই। ইংলিশ মিডিয়াম, বাংলা মিডিয়াম এবং কওমি-আলিয়া; অন্যকোনো দেশে প্রাথমিক বা মাধ্যমিক শিক্ষায় এত বিভাজন কখনোই কেউ বরদাশত করবে না। কিন্তু আমরা আমাদের অবারিত স্বাধীনতা এভাবে বিপথে প্রয়োগ করে চলেছি। আমাদের দাবি শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজিয়ে বৈশ্বিক মান অনুযায়ী একমুখী, বিজ্ঞানভিত্তিক, আধুনিক ও যুগোপযোগী করতে হবে। শিশুদের শিক্ষা ও সংস্কৃতি না বদলালে দেশ বদলাবে না।

বাংলাদেশের মানুষ আইনভঙ্গ করতে আনন্দ পায়। এই মানুষগুলোকে আইন মানার আনন্দ ও দায়িত্ববোধ ফিরিয়ে দিতে হবে মিস্টার Tarique Rahman.

দীর্ঘস্থায়ী একনায়কোচিত শাসনব্যবস্থার ঘেরাটোপ থেকে মুক্তি খুঁজতে চব্বিশের জেনজি প্রজন্ম বিপ্লব ডেকে এনেছিল। সরকার বদল হয়েছে। গণতান্ত্রিক উত্তরণে দেশ অগ্রগামী হয়েছে। কিন্তু জেনজির রাগ-বিরাগ এখনো প্রশমিত হয়নি। এই প্রজন্মকে সভ্যতা, ভব্যতা, স্থৈর্য, প্রেম, মায়া-মমতা, সহনশীলতা, ঔদার্য এবং গুরুজনে ভক্তি আত্মস্থ করবার মন্ত্রণা দিতে হবে। তরুণদের মন পড়তে আপনার কন্যা জাইমা রহমানের মতামত আমলে নিন।

দুর্নীতি বন্ধ করবেন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখবেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাবেন, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবেন, ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসার ঘটাবেন -এসবই খুবই সেকেলে এবং কথার কথা। মানুষকে প্রকৃত মানুষ হয়ে উঠবার লেসন যদি না দিতে পারেন -কোনো প্রতিশ্রুতি বা প্রতিজ্ঞাই কার্যকর করা যাবে না।

সবশেষে বলব ইন্টারনেট, এন্ড্রয়েড, ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটকের মোহ থেকে শিশুদের রক্ষা করে তাদের সেই চিরাচরিত আনন্দটা ফিরিয়ে দিন। যেখানে বাড়ির মুরুব্বিরা জোনাক জ্বলা চাঁদনি রাতে বাড়ির উঠোনে বসে কচিকাঁচাদেরকে ঠাকুরমার ঝুলির গল্প শুনিয়ে তাদের চিন্তার জগতকে বিশাল বড় করে তুলবেন।

কোটি মানুষের সমর্থন আপনি পেয়েছেন।
সেজন্য আপনার কাছে আমাদের প্রত্যাশাও অনেক বড়। আশা করি আপনি পারবেন এবং পারতে আপনাকে হবেই। একই বৃত্তের ঘূর্ণাবর্তে বাংলাদেশ আটকে থাকতে পারে না। আপনি বিপুল ভোটারের মন জয় করেছেন। কুডোস! এবার দেশ জয়ের পালা। আপনার হাত ধরে বাংলাদেশ বিশ্বসভায় নাম করলে ইতিহাস তার সুবর্ণ পাতা আপনার জন্যও কাল থেকে কালান্তরে সংরক্ষিত রাখবে।

ইতি:
ফারদিন ফেরদৌস 
অকৃতি অধম সাধারণ নাগরিক
১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

Comments

    Please login to post comment. Login