জীবনের অনেক পরিচয়ের মধ্যে সবচেয়ে গভীর এবং সবচেয়ে আবেগময় পরিচয় হলো—আমি একজন বাবা। আর এই পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে আছে আমার ছয় বছরের ছোট্ট ছেলে, জনক ঋষি পাল। তার ছোট্ট মুখ, নিষ্পাপ চোখ আর সরল হাসির মধ্যে আমি প্রতিদিন নতুন করে জীবনের অর্থ খুঁজে পাই। সে এখনো জানে না পৃথিবী কত বড়, জীবন কত জটিল, কিন্তু আমি জানি—এই ছোট্ট শিশুটির ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার দায়িত্ব আমার কাঁধে।
জনকের প্রতিটি দিন আমার জন্য একটি নতুন অধ্যায়। সে যখন খেলতে খেলতে হেসে ওঠে, তখন মনে হয় পৃথিবীর সব ক্লান্তি দূর হয়ে গেছে। আবার যখন সে কোনো ভুল করে আমার দিকে ভয়ভরা চোখে তাকায়, তখন বুঝতে পারি—আমি শুধু তার বাবা নই, আমি তার শিক্ষক, তার পথপ্রদর্শক। এই অনুভূতি যেমন গর্বের, তেমনি গভীর দায়িত্বেরও।
আমি চাই না জনক শুধু পড়াশোনা করে বড় ডিগ্রিধারী হোক। আমি চাই, সে একজন সত্যিকারের মানুষ হোক। একজন মানুষ, যে মিথ্যা বলবে না, অন্যায় করবে না, অন্যের অধিকারকে সম্মান করবে। কারণ আমি বিশ্বাস করি, মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার চরিত্রে। জ্ঞান মানুষকে বড় করে, কিন্তু চরিত্র মানুষকে মহান করে।
আমি চাই, সে একজন সৎ সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠুক। সে যেন তার দেশকে ভালোবাসে, সমাজকে ভালোবাসে, এবং মানুষের পাশে দাঁড়াতে শেখে। সে যেন বুঝতে পারে, আমরা শুধু নিজের জন্য বাঁচি না—আমরা সমাজের জন্যও বাঁচি। একজন ভালো নাগরিক মানে শুধু আইন মানা নয়, বরং ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো, সত্যের পথে থাকা, এবং অন্যের কল্যাণে কাজ করা।
একই সাথে, আমার মনের গভীরে একটি বড় আকাঙ্ক্ষা আছে—জনক যেন একজন ধার্মিক মানুষ হয়। ধর্ম তাকে সঠিক পথ দেখাবে, তাকে বিনয়ী করবে, তাকে সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞ হতে শেখাবে। আমি চাই, সে যেন বুঝতে পারে জীবনের সবকিছু আমাদের নিজের শক্তিতে নয়, বরং সৃষ্টিকর্তার আশীর্বাদে সম্ভব হয়। ধর্ম তার ভিতর একটি নৈতিক শক্তি তৈরি করবে, যা তাকে সব প্রলোভন থেকে দূরে রাখবে।
কিন্তু একজন বাবা হিসেবে আমার ভয়ও আছে। পৃথিবী আজ অনেক পরিবর্তিত হয়েছে। প্রযুক্তি, সামাজিক যোগাযোগ, এবং নানা প্রলোভনের মধ্যে শিশুরা খুব সহজেই ভুল পথে চলে যেতে পারে। আমি ভয় পাই—যদি কোনোদিন সে ভুল বন্ধুদের সাথে মিশে যায়? যদি কোনোদিন সে সত্য থেকে দূরে সরে যায়? এই ভয় আমাকে সবসময় সতর্ক রাখে। আমি চাই, তার সাথে আমার সম্পর্ক যেন এমন হয়, যেখানে সে আমাকে ভয় না পায়, বরং বিশ্বাস করে, নিজের সব কথা আমাকে বলতে পারে।
আমার আবেগের সবচেয়ে বড় জায়গা হলো তার প্রতি আমার নিঃশর্ত ভালোবাসা। সে যখন আমার পাশে ঘুমিয়ে থাকে, তখন মনে হয় পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ আমার পাশে আছে। আমি তখন ভাবি—এই শিশুটির ভবিষ্যৎ কেমন হবে? সে কেমন মানুষ হবে? মানুষ কি তাকে ভালোবাসবে? সে কি অন্যের ভালোবাসা অর্জন করতে পারবে? এসব চিন্তা আমাকে কখনো আনন্দ দেয়, কখনো অজানা এক উদ্বেগে ভরিয়ে দেয়।
আমি জানি, তাকে শুধু ভালো স্কুলে ভর্তি করানোই যথেষ্ট নয়। তাকে ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হলে আমাকে তার পাশে থাকতে হবে, তাকে সময় দিতে হবে, তাকে ভালোবাসতে হবে, এবং সবচেয়ে বড় কথা—আমাকে নিজের জীবন দিয়ে তাকে উদাহরণ দেখাতে হবে। কারণ সন্তানরা বাবা-মায়ের কথার চেয়ে তাদের কাজ থেকেই বেশি শিক্ষা নেয়।
আমি স্বপ্ন দেখি, একদিন জনক বড় হবে। সে নিজের পরিচয়ে পরিচিত হবে। মানুষ তাকে সম্মান করবে তার সততা, তার নৈতিকতা এবং তার মানবিকতার জন্য। সে হয়তো বড় কোনো পদে থাকবে, হয়তো সাধারণ কোনো পেশায় থাকবে—কিন্তু আমার কাছে সবচেয়ে বড় বিষয় হবে, সে যেন একজন ভালো মানুষ থাকে।
জনক ঋষি পাল আমার জীবনের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ। তার মাধ্যমে আমি ভবিষ্যৎকে দেখি, তার মাধ্যমে আমি নিজের অস্তিত্বের অর্থ খুঁজে পাই। প্রতিদিন আমি সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করি—তিনি যেন আমার সন্তানকে সঠিক পথে পরিচালিত করেন, তাকে সত্যের পথে রাখেন, এবং আমাকে সেই শক্তি দেন, যাতে আমি আমার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারি।
কারণ একজন সন্তানের সাফল্য শুধু তার নিজের নয়—এটি তার বাবা-মায়ের জীবনের সবচেয়ে বড়
32
View