প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শুরুতেই ব্যক্তিগত রুটিন ওয়ার্কে ব্যাপক পরিবর্তন এনে জনমনে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছেন তারেক রহমান। তিনি নিজের গাড়ি, চালক এবং জ্বালানি ব্যবহার করছেন। চিরায়ত ভিআইপিগিরিকে প্রায় সাধারণে নামিয়ে এনেছেন। সড়কে প্রধানমন্ত্রীর চলাচলের কারণে গণভোগান্তি রহিত হচ্ছে বলা যায়। তাঁর সংসদ সদস্যরা ট্যাক্স ফ্রি গাড়ি এবং সরকারি প্লট নেবেন না বলে প্রথম সভায় ঘোষণা দিয়েছেন।
রুলিং পার্টি বিএনপির সাথে কিঞ্চিত মতদ্বৈততা তৈরি হয়েছে সংসদে বিরোধী দল জামায়াত-এনসিপির সাথে। সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছে বিরোধী দল, যেখানে বিএনপি সংসদ কার্যকর হওয়ার পর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার কথা জানিয়েছে। বিএনপির দাবি জুলাই সনদ, গণভোট ও সংবিধান সংস্কার পরিষদ এখনো অসাংবিধানিক। যদিও প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস ও তাঁর সভাসদদের চাপে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন একটি অধ্যাদেশ জারি করে গণভোটের আয়োজন করেছেন। কিন্তু আইনত সংসদ বহাল না থাকা অবস্থায় রাষ্ট্রপতি সংবিধান সংশোধন ইস্যুতে অধ্যাদেশ জারির প্রাধিকার রাখেন না। এর ওপর এক আইনজীবী স্বতপ্রণোদিত হয়েছে গণভোট বাতিল চেয়ে আদালতে রিটও করেছেন। বলা হচ্ছে ওই অধ্যাদেশ অনুযায়ী ৬০ জনের কোরাম হলেই সংবিধান সংস্কার পরিষদ সভা ডেকে নতুন সংবিধান বানিয়ে নিতে পারবে। রাজনৈতিক সংঘাতময় এমন কাজ ডা. শফিকুর রহমান ও নাহিদ ইসলাম করবেন? আমাদের তা মনে হয় না। সংসদে এক তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া বিএনপিও নিশ্চয় তাদের নিজেদেরকে প্রটেক্ট করতে তূণে তীর জমিয়ে রেখেছে।
অন্যদের চেয়ে আলাদা বুদ্ধি না থাকলে দীর্ঘ ১৯ বছর পরে বিপুলভোটে রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসতে পারত না বিএনপি। আমরা আগেই বলেছি বাংলাদেশের সরকার পরিবর্তন কেবলমাত্র জনগণের ভোটাধিকার প্রয়োগ বা চর্মচক্ষে দেখা গোণাগুণির ফলাফল মাত্র নয়। এর ভিতরে থাকে আন্তর্জাতিক রাজনীতির বহুদিনের গোছানো কূটকৌশল। থাকে অনেক অজানা ভূরাজনীতি।
প্রশ্ন আসছে জুলাই সনদ নিয়ে সরকারি দল ও বিরোধীদের মধ্যে প্রথম দিন থেকেই যে বিভেদ বিভাজন তৈরি হয়েছে -এটি রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত করে ভিন্নতর পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে নাকি শক্ত হাতে বিএনপি সব সামাল দিতে পারবে?
এর উত্তর আছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিনন্দন বার্তায়। মিস্টার ট্রাম্প তারেক রহমানকে আমেরিকার জনগণের পক্ষ থেকে অভিনন্দন জানিয়েছেন এবং সফল মেয়াদ কামনা করেছেন।
প্রধানমন্ত্রী পদে দায়িত্ব নেওয়ার পর মিস্টার রহমানকে অভিনন্দন জানিয়ে লেখা চিঠিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উল্লেখ করেছেন, 'আমাদের দুই দেশের অংশীদারিত্ব পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও একটি মুক্ত ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক গড়ে তোলার অভিন্ন স্বার্থের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত -যেখানে শক্তিশালী ও সার্বভৌম রাষ্ট্রসমূহ সমৃদ্ধ হতে পারে। আপনি যখন আপনার দায়িত্বভার গ্রহণ করছেন, তখন আমি আশা করি আমাদের পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির বাস্তবায়নের মাধ্যমে আমাদের বাণিজ্য সম্পর্কের অসাধারণ গতি আপনি বজায় রাখতে সহায়তা করবেন, যা উভয় দেশের কৃষক ও শ্রমিকদের জন্য সুফল বয়ে আনে। আমি আরও আশা করি যে, আপনি নিয়মিত প্রতিরক্ষা চুক্তিগুলো সম্পন্ন করতে দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন, যাতে আপনার সামরিক বাহিনী বিশ্বের সেরা উচ্চমানের আমেরিকান নির্মিত সরঞ্জাম ব্যবহারের সুযোগ পায়।'
সম্প্রতি বাংলাদেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড নামে এই চুক্তি বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনের আগে এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শেষ সময়ে স্বাক্ষর হওয়ায় পর এটা নিয়ে নানা সমালোচনা দেখা যাচ্ছে।
জুলাই সনদ, সংবিধান সংস্কার পরিষদ এবং বাণিজ্য চুক্তি -এসবের বাইরে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তরফে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফল মেয়াদ কামনা করা এবং প্রতিরক্ষা চুক্তি এগিয়ে নেয়ার কথা বলা খুব বেশি সিগনিফিক্যান্ট এবং সিম্বলিক।
তারেক রহমান বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়ে বিএনপিকে ক্ষমতায় ফেরাবে এটি আমেরিকার চেয়ে বেশি ভালো আর কেউ জানত না। নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী টাইমস ম্যাগাজিন এবং ব্রিটেনের শক্তিশালী গণমাধ্যম রয়টার্সের নিউজগুলো পুনর্পাঠ করলে দেখবেন সেখানে তারেক রহমানকে প্রধানমন্ত্রী পদের খুব কাছাকাছি বলে বারবার উল্লেখ করা হয়েছে। আমেরিকার সাথে যে বাণিজ্য চুক্তিটি হয়েছে সেটির অন্যতম রূপকার ড. খলিলুর রহমান। ওই খলিলুর রহমান এখন তারেক রহমানের কেবিনেটের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
স্মরণ করা যেতে পারে অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের সম্মেলনে যোগ দিতে গেল বছর ১৯ নভেম্বর দিল্লি গিয়েছিলেন। ভারত মহাসাগরের পাঁচটি দেশের সমন্বয়ে গঠিত কলম্বো সিকিউরিটি কনক্লেভের সম্মেলন ২০ নভেম্বর দিল্লিতে অনুষ্ঠিত হয়।
ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের আমন্ত্রণে দুই দিনের সফরে দিল্লি যান খলিলুর রহমান। ওই বছর অক্টোবরের দ্বিতীয়ার্ধে অজিত দোভাল ওই সম্মেলনে অংশ নিতে খলিলুর রহমানকে আমন্ত্রণ জানান। কলম্বো সিকিউরিটি কনক্লেভের (সিএসসি) জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের সপ্তম সম্মেলনের স্বাগতিক দেশ ছিল ভারত।
একটা বিষয় খেয়াল করা যাক -ট্রাম্প তাঁর অভিনন্দন বার্তায় বলেছেন, আমাদের দুই দেশের অংশীদারিত্ব পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও একটি মুক্ত ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক গড়ে তোলার অভিন্ন স্বার্থের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত!'
ইন্দো-প্যাসিফিক (Indo-Pacific) হলো একটি ভূরাজনৈতিক ধারণা, যা Indian Ocean ও Pacific Ocean–কে একটি একীভূত কৌশলগত অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করে। অর্থাৎ দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, পূর্ব এশিয়া ও ওশেনিয়া -এই বিশাল সামুদ্রিক ও উপকূলীয় অঞ্চলকে একসঙ্গে ধরে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষণ করা হয়।
অভিনন্দন বার্তায় 'Free and open Indo-Pacific' শব্দবন্ধটি এসেছে -যেটি মূলত বৃহৎ শক্তিগুলোর কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষার এক রাজনৈতিক বার্তা।
যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে ইন্দো-প্যাসিফিক মানে কেবল বাণিজ্য নয়, শক্তির প্রতিযোগিতাও। এখানে চায়নার দ্রুত উত্থান ও সামুদ্রিক প্রভাব বিস্তার মোকাবিলায় ভারত একটি স্বাভাবিক ভারসাম্য রক্ষাকারী শক্তি। ভারতের ভৌগোলিক অবস্থান বিশেষকরে -Indian Ocean–এর কেন্দ্রবর্তী উপস্থিতি -দেশটিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। বহু জনগোষ্ঠী ও বৃহৎ অর্থনীতির ভারত যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক সামরিক অংশীদার না হলেও গুরুত্বপূর্ণ 'স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার' হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
সুতরাং যেটি বলা হচ্ছে, তারেক রহমান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে করা বাণিজ্য চুক্তি সামাল দেবেন কেমনে? এই প্রশ্নটি অবান্তর। আমরা বিশ্বাস করি তিনি ক্ষমতায় আসার আগেই ভালো করে জেনে বুঝে নিয়েছেন নিজের দেশকে গুরুত্ব দিয়েই ক্ষমতাধর যুক্তরাষ্ট্র এবং প্রতিবেশি ভারতের সাথে সম্পর্কটা মর্যাদাপূর্ণ রাখতে ঠিক কী কী করতে হবে। আর এই কাজে অভিজ্ঞ খলিলুর রহমান তারেক রহমানের অন্যতম সিপাহসালার নিঃসন্দেহে। আর ওই করণীয়র মধ্যেই নিহিত আছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের Successful term তথা সফল মেয়াদ কামনার আসল রূপকথা।
লেখক: সাংবাদিক
২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬