প্রথম পর্ব: স্মৃতিময় শৈশব আর ভাঙনের শুরু
"আমার শৈশবটা ছিল রান্নাবাটি খেলার মতো সাজানো। আমি আর আমার ছোট বোন যখন মিছিমিছি রান্না করতাম, বাবা তখন আমাদের রান্না করা সেই ধুলোবালির খাবারগুলো এমন তৃপ্তি নিয়ে খেতেন যেন অমৃত খাচ্ছেন। বাবা আমাকে প্রচণ্ড ভালোবাসতেন, কারণ আমি তখন মেধাবী ছিলাম, স্কুলে সবাই আমাকে বাহবা দিত। মধ্যবিত্তের সেই ছোট ঘরটা আমার কাছে স্বর্গের মতো ছিল।
কিন্তু সেই সুখের দিনগুলো যে বালুর বাঁধের মতো ভেঙে যাবে, তা বুঝিনি। বাবা যখন অসুস্থ হলেন, আমরা জানতামই না যে উনার লিভার ছিঁড়ে ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়ছে। আমাদের ৫ বোন আর মাকে সুখী করতে গিয়ে নিজের শরীরের দিকে তাকানোর সময় পাননি তিনি। বাবার চিকিৎসার জন্য আমাদের সেই সাজানো তিনতলা বাড়িটা বিক্রি করতে হলো। জীবনের প্রথম বড় ধাক্কাটা খেলাম যখন আমাকে জেঠার বাসায় রেখে আসা হলো।
এক বছরের সেই জীবন ছিল এক জ্যান্ত নরক। প্রতিটা মুহূর্ত, প্রতিটা রাত আমি কেঁদে কাটিয়েছি। জেঠার বাড়ির লোকজন আমাকে কথায় কথায় আঘাত করত, উপহাস করত। অথচ আমি শুধু ভাবতাম—বাবা তো সেরে উঠছেন, এই কষ্টটুকু সহ্য করে নিই। আমি জানতাম না, বাবা যে সুস্থ হওয়ার কথা বলছেন, সেটা ছিল তাঁর শেষবারের মতো আমাদের সান্ত্বনা দেওয়া।
জেঠার বাসায় থাকার সময় আমি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম, পানিটুকু গিলতে পারতাম না। তারা তখন আমাকে হসপিটালে নিয়ে গিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু সেখানেও শান্তি দেয়নি। সেই কিশোরী বয়সে আমি প্রথমবার শুনলাম—'ও নাটক করছে'। আমার কান্না, আমার ব্যথা, আমার শরীর ভেঙে পড়া—সবই নাকি ছিল অভিনয়। বিশ্বাস করুন, তখন থেকেই আমার ভেতরে একটা অংশ মরে যেতে শুরু করেছিল।"
দ্বিতীয় পর্ব: শৈশব চুরির সেই অভিশপ্ত দুপুর
"জীবন মাঝেমধ্যে এমন মোড় নেয়, যেখান থেকে আর পেছনে ফেরার পথ থাকে না। বিখ্যাত সেই স্কুলে ভর্তি হওয়ার খবরটা যখন জানলাম, তখন খুব ইচ্ছা ছিল বাবার মুখে হাসি ফোটাব। কিন্তু সেই দিনটিই যে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অভিশাপ হয়ে আসবে, তা কে জানত!
স্কুলে যাওয়ার প্রথম দিনে আমি আমার মতো করেই তৈরি হতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমার বড় বোন জোর করলেন সাজগোজ করতে। তাঁর কথায় রাজি হয়েই আমি রওনা হলাম। মাঝপথে কোনো রিকশা ছিল না। এক সিএনজি চালক এসে যখন খুব ভালো মানুষের মতো অনুরোধ করল, তখন আমি সরল বিশ্বাসে উঠে পড়েছিলাম। সেই সরলতাই ছিল আমার কাল।
মাঝপথে নির্জন এক জায়গায় যখন সে গাড়ি থামাল, আমার বুকটা ভয়ে কাঁপছিল। লোকটা যখন আমার ব্যক্তিগত জীবনের কথা জিজ্ঞাসা করতে করতে আমার শরীরে হাত দিল, তখন বুঝলাম আমি এক নরপশুর খপ্পরে পড়েছি। নিজের জীবন বাজি রেখে সেখান থেকে দৌড়ে পালিয়েছিলাম। বাসায় এসে যখন বোনকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়লাম, তখন আমার পা কাঁপছিল। আমি চেয়েছিলাম একটু সান্ত্বনা, একটু নিরাপত্তা।
কিন্তু আমার সেই বোন, যাকে আমি পরম আশ্রয়ের জন্য জড়িয়ে ধরেছিলাম, সে আমাকে জড়িয়ে ধরার বদলে উল্টো দোষারোপ শুরু করল। পরিবারের বাকিরা আমাকে সাহায্য করার বদলে বলল, 'তোরই দোষ, তুই কেন উঠলি?' যে মেয়েটি একটু আগে লাঞ্ছিত হয়ে এল, তাকেই করা হলো অপরাধী। আমি একা ঘরে কাঁদছিলাম, আর আমার মন বারবার বলছিল—পৃথিবীতে কি আমার জন্য কোনো নিরাপদ জায়গা নেই?"
তৃতীয় পর্বের আভাস: শেষ আশাটুকুও নিভে গেল
"সিএনজি চালকের সেই ভয়ংকর স্মৃতি ভুলতে না ভুলতেই নেমে এল জীবনের সেই কালরাত্রি। আমি জেঠার বাসায় তখন। রাত ১টার দিকে ঘুমানোর চেষ্টা করছি, কিন্তু বাবার মুখটা বারবার ভেসে উঠছিল। পরদিন সকালে চাচাতো বোনের মুখে শুনলাম সেই খবর—'তোর বাবা নেই'।
আমি পাথর হয়ে গেলাম। মনে হলো মাথার ওপরের আকাশটা ভেঙে পড়ল। কিন্তু সেই শোকের মুহূর্তেও আমার বড় বোন আমাকে ছাড় দিল না। চিৎকার করে বলল, 'এখন কেন কাঁদছিস? যখন বাবা বেঁচে ছিল তখন তো সম্মান করিসনি!' একে তো বাবার মৃত্যু, তার ওপর এই চরম অপবাদ—আমি যেন জ্যান্ত কবরে চলে গেলাম।
২০২২ সালের সেই রোজা আর মাগরিবের আজান আমার কানে আজও ভাসে। বাবার লাশের গাড়িটা এল, কিন্তু আপন মানুষগুলো আমাকে বাবার মুখটা শেষবারের মতো মন ভরে দেখতেও দিল না। সেই থেকে আমার যুদ্ধের শুরু। নিজেদের বাড়ি বিক্রি হয়ে গেল, আমরা ভাড়া বাসায় চলে এলাম। আমি যখন নিজের যৌন অভিমুখিতা (Bisexuality) নিয়ে কথা বললাম, তারা আমাকে হাসাহাসি করে উড়িয়ে দিল। আমাকে পাগল সাব্যস্ত করে প্রতিনিয়ত 'নাটক' করার অপবাদ দেওয়া হলো। আজ আমি এই লড়াইয়ে একা, বড় একা।"
চতুর্থ পর্ব: ছাই হয়ে যাওয়া স্বপ্ন আর বর্তমানের যুদ্ধ
"বাবার চলে যাওয়ার সাথে সাথেই আমাদের সাজানো পৃথিবীটা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়লো। যে তিনতলা বাড়িতে আমাদের হাসিকান্না মিশে ছিল, বাবার চিকিৎসার খরচ মেটাতে সেই বাড়ির অর্ধেকটা আগেই বিক্রি হয়েছিল, আর বাবার মৃত্যুর পর বাকিটুকুও হাতছাড়া হয়ে গেল। আমরা আজ এক ভাড়া বাসার চার দেয়ালের মাঝে বন্দি।
সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয় যখন দেখি, বাবার মৃত্যুর পর আপন মানুষগুলো মুহূর্তের মধ্যে পর হয়ে গেল। যারা একদিন বাবার উপকারে ধন্য হতো, আজ তারাই আমাদের 'বোঝা' মনে করে। আমার বড় বোন থেকে শুরু করে আত্মীয়স্বজন—সবার মুখে একটাই কথা, 'ও নাটক করছে'। আমি যখন রাতে ঘুমাতে পারি না, যখন আমার ট্রমাগুলো আমাকে তাড়া করে ফেরে, তখন তারা বলে আমি পড়ার ভয়ে অভিনয় করছি।
আমি একজন Bisexual—এই সত্যটা যখন আমার পরিবারের সামনে এলো, তারা আমাকে বোঝার চেষ্টা না করে বরং উপহাসের পাত্রী বানালো। আমার পছন্দ, আমার পরিচয় নিয়ে হাসাহাসি করাটা তাদের কাছে যেন একটা বিনোদন। কেউ একবারও জানতে চাইলো না, আমার এই ভেঙে চুরমার হয়ে যাওয়া মনের ভেতর কী চলছে। আমি এখন একাকীত্বের এক গভীর সমুদ্রে হাবুডুবু খাচ্ছি, যেখানে কূল বলতে কিছু নেই। প্রতিদিন নিজেকে শেষ করে দেওয়ার চিন্তা মাথায় আসে, কিন্তু পরক্ষণেই মনে হয়—না, আমাকে আমার এই যন্ত্রণার কথাগুলো দুনিয়াকে জানিয়ে যেতেই হবে।"
পঞ্চম পর্ব: মায়ের মমতা নাকি নিষ্ঠুর বাস্তবতা?
"আমার ট্রমা যখন আমাকে পুরোপুরি গ্রাস করে নিল, তখন মা আমাকে প্রথমবারের মতো একজন মানসিক ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলেন। আমি ভেবেছিলাম হয়তো এবার কেউ আমাকে বুঝবে, হয়তো আমার এই যন্ত্রণার শেষ হবে। ডাক্তার আমাকে দীর্ঘক্ষণ পর্যবেক্ষণ করার পর গম্ভীর মুখে মাকে বললেন, 'ওর অবস্থা ভালো না, ওকে সুস্থ করতে হলে অন্তত তিন মাস হাসপাতালে ভর্তি রাখতে হবে।'
মায়ের মুখটা তখন পাথরের মতো হয়ে গেল। তিনি ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করলেন, 'ভর্তি ছাড়া আর কোনো উপায় নেই?' তাঁর কণ্ঠে আমার সুস্থতার আকুতির চেয়ে দায় এড়ানোর সুরটাই বেশি ছিল। ডাক্তার স্তম্ভিত হয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'আপনি কি ওর মা নাকি অন্য কিছু? আপনার সন্তান এত বড় একটা মানসিক যুদ্ধের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে, আর আপনি বলছেন চিকিৎসা করবেন না?'
ডাক্তারের সেই কথাগুলো তীরের মতো আমার বুকে বিঁধেছিল। সেদিন বুঝেছিলাম, আমার নিজের মা-ও আমার এই যন্ত্রণাকে কেবল একটা উপদ্রব বা বাড়তি ঝামেলা মনে করেন। যে আশ্রয় পাওয়ার কথা ছিল মায়ের আঁচলে, সেখানে জুটল কেবল অবহেলা। ডাক্তার যাকে চিকিৎসা বললেন, আমার পরিবার তাকে নাম দিল 'নাটক'।"
ষষ্ঠ পর্ব: ওষুধের লড়াই আর বিষাক্ত অপবাদ
"ডাক্তার বলেছিলেন ওষুধ না খেলে আমি কোনোদিন স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারব না। অথচ সেই ওষুধটুকু খেতে গেলেও আমাকে শুনতে হয় হাজারো গঞ্জনা। মা আজ আমাকে এমন সব শব্দে আক্রমণ করলেন যা মুখে আনতেও ঘৃণা হয়। তিনি আমাকে 'মদতি' বলে ডাকলেন, আমাকে 'খারাপ মেয়ে' সাব্যস্ত করলেন।
আমার অপরাধ কী? আমি শুধু সুস্থ হতে চেয়েছিলাম। আমি চেয়েছিলাম আমার মাথার ভেতরের সেই কুয়াশাগুলো দূর হোক। মা একদিকে বলছেন আমি যেন সুস্থ থাকি, অথচ সুস্থ হওয়ার প্রধান মাধ্যম যে ওষুধ, সেটা নিয়েই তিনি বিষোদগার করছেন। এই দ্বিচারিতা আমাকে তিলে তিলে শেষ করে দিচ্ছে। যখন নিজের জন্মদাত্রী মা-ই আমাকে বাজে মেয়ে বলে গালি দেন, তখন বাইরের জগতের কাছে সম্মান আশা করাটাই যেন বিলাসিতা। আমার মনে হয়, আমি কি আসলেই কোনো অপরাধ করেছি, নাকি এই অসুস্থতাটাই আমার আজন্ম পাপ?"
সপ্তম পর্ব: বেঁচে থাকার আড়ালে আত্মহননের চিৎকার
"মা আজ সরাসরি বলে দিলেন— 'মরে গিয়ে অন্য জায়গায় গিয়ে আমার বুক খালি কর'। নিজের মায়ের মুখে যখন কেউ শোনে যে তার মরে যাওয়াই ভালো, তখন বেঁচে থাকার সব শক্তি হারিয়ে যায়। আমি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে খুঁজি, কিন্তু সেখানে এক বিধ্বস্ত ছায়া ছাড়া আর কিছু দেখি না। আমার একাকীত্বের এই প্রহরে পাশে কেউ নেই, শুধু আছে একরাশ ওষুধের বড়ি আর মায়ের দেওয়া সেই বিষাক্ত গালিগুলো।
আমি বারবার নিজেকে শেষ করে দিতে চেয়েছি, কিন্তু পরক্ষণেই মনে হয়েছে—আমি যদি মরে যাই, তবে আমার এই সত্য কাহিনীগুলো কে বলবে? আমার এই লড়াইটা কি তবে হার দিয়ে শেষ হবে? না, আমি মরব না। আমাকে বেঁচে থাকতে হবে কেবল এই মানুষগুলোকে প্রমাণ করার জন্য যে, আমি নাটক করিনি। আমি অসুস্থ ছিলাম, আর তোমরা সেই অসুস্থতাকে উপহাস করেছ। আমার এই যন্ত্রণার প্রতিটি রক্তবিন্দু দিয়ে আমি আমার গল্পের শেষ পাতা পর্যন্ত লিখে যাব।"
অষ্টম পর্ব: আত্মপরিচয় আর উপহাসের আড়ালে আমি
"সবাই যখন আমাকে 'নাটক' করার অপবাদ দিয়ে ব্যস্ত, তখন আমার মনের ভেতর চলছিল আরও এক কঠিন যুদ্ধ। আমি যখন অনুভব করলাম আমার ভালো লাগা বা ভালো বাসার অনুভূতিগুলো একটু ভিন্ন—আমি যখন বুঝলাম আমি একজন Bisexual—তখন আমার মনে হয়েছিল হয়তো এবার নিজের একটা পরিচয় খুঁজে পেলাম। কিন্তু এই পরিচয়টাই আমার পরিবারের কাছে এক নতুন বিনোদনের খোরাক হয়ে দাঁড়াল।
আমি যখন আমার এই অনুভূতির কথা তাদের জানালাম, তারা আমার পাশে দাঁড়ানো তো দূরে থাক, আমাকে নিয়ে হাসাহাসি শুরু করল। তাদের কাছে এটি যেন কোনো রোগ কিংবা শয়তানি। আমার বড় বোন থেকে শুরু করে মা—সবার চোখে আমি এক 'অস্বাভাবিক' বা 'বিপথগামী' মেয়ে। তারা জানে না, একজন মানুষের আত্মপরিচয় কতটা গভীর থেকে আসে। তারা শুধু জানে উপহাস করতে, আর আমাকে প্রতিনিয়ত অপরাধী সাব্যস্ত করতে।
আমার পছন্দ, আমার সত্তাকে যখন নিজের আপন মানুষরাই সম্মান করে না, তখন এই পৃথিবীতে নিজেকে খুব নিঃসঙ্গ মনে হয়। মনে হয়, আমি এমন এক খাঁচায় বন্দি যেখানে আমার নিঃশ্বাস নেওয়ার অধিকারটুকুও অন্যের মর্জির ওপর নির্ভর করে। আমার পরিচয় কি সত্যিই হাসির বস্তু? নাকি এটা আমার সেই সংগ্রামী জীবনেরই একটা অংশ যা কেউ কোনোদিন বু সপ্তম পর্ব: বেঁচে থাকার আড়ালে আত্মহননের চিৎকার
"মা আজ সরাসরি বলে দিলেন— 'মরে গিয়ে অন্য জায়গায় গিয়ে আমার বুক খালি কর'। নিজের মায়ের মুখে যখন কেউ শোনে যে তার মরে যাওয়াই ভালো, তখন বেঁচে থাকার সব শক্তি হারিয়ে যায়। আমি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে খুঁজি, কিন্তু সেখানে এক বিধ্বস্ত ছায়া ছাড়া আর কিছু দেখি না। আমার একাকীত্বের এই প্রহরে পাশে কেউ নেই, শুধু আছে একরাশ ওষুধের বড়ি আর মায়ের দেওয়া সেই বিষাক্ত গালিগুলো।
আমি বারবার নিজেকে শেষ করে দিতে চেয়েছি, কিন্তু পরক্ষণেই মনে হয়েছে—আমি যদি মরে যাই, তবে আমার এই সত্য কাহিনীগুলো কে বলবে? আমার এই লড়াইটা কি তবে হার দিয়ে শেষ হবে? না, আমি মরব না। আমাকে বেঁচে থাকতে হবে কেবল এই মানুষগুলোকে প্রমাণ করার জন্য যে, আমি নাটক করিনি। আমি অসুস্থ ছিলাম, আর তোমরা সেই অসুস্থতাকে উপহাস করেছ। আমার এই যন্ত্রণার প্রতিটি রক্তবিন্দু দিয়ে আমি আমার গল্পের শেষ পাতা পর্যন্ত লিখে যাব।"ঝতে চায়নি?"
নবম পর্ব: অন্ধকার প্রহর এবং ফিরে আসার লড়াই
"মাঝেমধ্যে রাতগুলো এত দীর্ঘ আর অন্ধকার মনে হয় যে, বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়াটাকেই সহজ মনে হয়। যখন চারপাশ থেকে 'নাটকবাজ' আর 'খারাপ মেয়ে' তকমাগুলো ধেয়ে আসে, যখন নিজের মা-ও মরে গিয়ে বুক খালি করার কথা বলেন, তখন আমি নিজেকে খুব অপরাধী মনে করি। মনে হয়, আমার না জন্মালেই হয়তো সবার জীবন শান্তিতে কাটত।
অনেকবার এমন হয়েছে যে, মুঠো ভর্তি ঘুমের ওষুধ নিয়ে হাতে বসেছিলাম। অনেকবার আমার সেই অন্ধকার ঘরের একলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে নিচে তাকিয়ে ভেবেছি—এই তো এক মুহূর্তের কাজ, সব কষ্টের শেষ। কিন্তু যখনই নিজেকে শেষ করে দিতে চেয়েছি, তখনই কেন জানি বাবার সেই হাসিমুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠেছে। বাবার ছোটবেলার সেই আদর, সেই মেধা আর আমার আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্নের কথা মনে পড়েছে।
আমি বুঝতে পেরেছি, আমি যদি মরে যাই তবে আমার প্রতি হওয়া এই অবিচারগুলোর কোনো বিচার হবে না। যারা আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করছে, তারাই জিতে যাবে। আমি নিজেকে নিজে প্রশ্ন করেছি—আমি কি কাপুরুষের মতো হার মেনে নেব? না। আমার অস্তিত্বকে যারা অস্বীকার করতে চায়, তাদের সামনেই আমাকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হবে। আত্মহত্যার চিন্তাটা যখনই আমায় গ্রাস করে, আমি আমার ডায়েরিটা খুঁজি। কলম যখন কাগজে চলতে থাকে, মনে হয় আমি এক একটা যুদ্ধ জিতছি। মৃত্যু নয়, আমি আমার যন্ত্রণাকে অমর করে যেতে চাই আমার গল্পের মধ্য দিয়ে।"
দশম পর্ব: আগামীর স্বপ্ন আর কলমের শক্তি
চলো, এখন তোমার গল্পের দশম পর্বটি সাজিয়ে ফেলি। এই পর্বে আমরা লিখব কেন তুমি এই প্রতিকূলতার মাঝেও লিখতে চাও এবং তোমার স্বপ্ন কী।
"আজ আমি যখন এই কথাগুলো লিখছি, আমার চারপাশে কেউ নেই। মা পাশের ঘরে হয়তো এখনো আমাকে নিয়ে বিড়বিড় করছেন, বোনরা হয়তো ব্যস্ত তাদের নিজেদের জীবন নিয়ে। কিন্তু আমার হাতে যে কলমটি আছে, সেটি আজ আমার সবচেয়ে বড় শক্তি। আমি বুঝেছি, আমার শরীরের ওষুধ যেমন আমাকে বাঁচিয়ে রাখবে, তেমনি এই লেখাগুলো আমার আত্মাকে শান্তি দেবে।
আমি চাই না আমার মতো আর কোনো মেয়ে 'নাটক' করার অপবাদ শুনে নিজের জীবন শেষ করে দিক। আমি চাই আমার এই গল্পের মাধ্যমে সমাজ বুঝুক—মানসিক ট্রমা কোনো অভিনয় নয়, এটি একটি যুদ্ধ। আমার স্বপ্ন আমি একদিন একজন সফল লেখিকা হব। সেদিন হয়তো আমার এই ভাঙা ঘরে থাকার গ্লানি থাকবে না, সেদিন হয়তো আমার পরিচয় নিয়ে কেউ হাসাহাসি করার সাহস পাবে না। আমি আমার বাবার সেই মেধাবী মেয়েটি হয়েই আবার ফিরতে চাই, তবে এবার আর ক্লাসের বইয়ে নয়, এবার মানুষের হৃদয়ে আমার জায়গা হবে আমার গল্পের মাধ্যমে।"
একাদশ পর্ব: ঘৃণা আর ভালোবাসার অদ্ভুত এক যুদ্ধ
"মায়ের প্রতি আমার ক্ষোভ পাহাড় সমান, আবার দিনশেষে সেই মায়ের মুখটা দেখলেই কেন জানি বুকটা হু হু করে ওঠে। তিনি আমাকে গালি দেন, মরে যেতে বলেন—এগুলো শুনলে মনে হয় আমার কেউ নেই। কিন্তু আমি জানি, এই সমাজ আর দারিদ্র্য আমার হাসিখুশি মা-কে এমন পাথর বানিয়ে দিয়েছে। তিনি হার মানতে শিখিয়েছেন, আর আমি শিখছি জয় করতে। আমাদের এই সম্পর্কের মাঝে যে দেয়াল দাঁড়িয়ে আছে, আমি চাই আমার লেখালেখি দিয়ে সেই দেয়ালের ওপর একটা জানলা তৈরি করতে। মা হয়তো কোনোদিন আমার গল্প পড়ে বুঝবেন, তাঁর 'খারাপ মেয়ে' আসলে কতটা লড়াই করে বেঁচে ছিল।"
দ্বাদশ পর্ব: নতুন সূর্যের অপেক্ষায়
"আজ আমার ডায়েরির শেষ পাতা। কিন্তু আমার জীবনের লড়াইয়ের কেবল শুরু। আমি আজ একা নই, আমার সাথে আছে কয়েক হাজার শব্দ আর আমার বাবার সেই স্মৃতি। আমি যারা এই লেখাটি পড়ছেন, তাদের বলতে চাই—পরিবার বা সমাজ যদি আপনাকে অস্বীকার করে, তবে ভেঙে পড়বেন না। নিজের শক্তি নিজে হোন। আমি স্মৃতি, আমি ফিনিক্স পাখির মতো ছাই থেকে জেগে উঠতে জানি। আমার এই গল্পটি যদি একজনের মনেও বেঁচে থাকার সাহস জোগায়, তবেই আমার এই চোখের জল আর রাতের পর রাত জেগে লেখা সার্থক হবে। আমি হারব না, কারণ আমি জানি অন্ধকার যত গভীর হয়, ভোরের আলো তত কাছে থাকে।"
১৩তম পর্ব: ধ্বংসস্তূপ থেকে ফিনিক্সের উড়াল
"বারোটি পর্ব শেষ করার পর আমি ভেবেছিলাম, আমার গল্প বোধহয় এখানেই শেষ। আমার জীবনের ডায়েরিটার শেষ পাতাটি হয়তো আজই বন্ধ হয়ে যাবে। মনের ভেতর যখন অন্ধকারের পাহাড় জমেছিল, যখন আপনজনদের অবহেলা আর তুচ্ছতাচ্ছিল্য সইতে সইতে আমি ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম, তখন ভেবেছিলাম—যে জীবনের কোনো মূল্য নেই, তাকে বয়ে নিয়ে কী লাভ?
কিন্তু আজ এই মাঝরাতে, যখন আমি ওই আটটি ঔষধের বড়ি হাতে নিয়েছিলাম, তখন হঠাৎ মনে হলো—আমি যদি আজ শেষ হয়ে যাই, তবে আমার এই তেরো বছরের সংগ্রাম, আমার বাবার ভালোবাসা আর আমার এই অবহেলিত জীবনের গল্পটাও তো হারিয়ে যাবে। আমি কি সত্যিই হেরে যাওয়ার জন্য জন্মেছিলাম? আমার বোন আমাকে বলেছিল আমার নাকি 'সাহস নেই'। আজ সেই অপমানের জবাব দিতেই আমি উঠে দাঁড়ালাম। আমি প্রমাণ করলাম, মরার চেয়ে বেঁচে থাকা অনেক বেশি সাহসের কাজ।
আমি আজ আমার হাতের ওই বিষগুলো ডাস্টবিনে ফেলে দিয়েছি। যারা আমাকে অবহেলা করেছে, তাদের সামনে আমি আজ একজন প্রকাশিত লেখিকা হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছি। হয়তো আজ আমার পাঠক মাত্র চারজন, কিন্তু এই চারজনই আমার কাছে চার লাখের সমান। কারণ তারা আমার সেই কষ্টগুলো পড়ছে, যা আমি আজ পর্যন্ত কাউকে বলতে পারিনি।
এই ১৩ নম্বর পর্বটি আমার শোকের নয়, বরং আমার শক্তির জয়গান। আমি এখন থেকে প্রতিটা দিন লড়াই করবো। যান্ত্রিক সমস্যা আসুক, মেইল না যাক, কিংবা জীবন আরও কঠিন হোক—আমি আর হার মানবো না। এই ডায়েরিটা এখন থেকে আমার বেঁচে থাকার অক্সিজেন। যারা আমায় অবহেলা করেছো, দেখো—আমি এখনো ফুরিয়ে যাইনি। আমি ফিনিক্স পাখির মতো ছাই থেকে আবার ডানা মেলে উড়তে শুরু করেছি।
আমার লড়াই কেবল শুরু হলো। আমি জানি, অন্ধকার কাটিয়ে একদিন ভোরের আলো আসবেই।"
১৪তম পর্ব: ত্যাগের প্রতিদান যখন অবহেলা
"আজকের সকালটা শুরু হয়েছিল এক তীব্র শারীরিক আর মানসিক যন্ত্রণা নিয়ে। শরীরটা গত কয়েকদিন ধরেই সায় দিচ্ছে না; ঘাড়, গলা আর সারা শরীরে অসহ্য ব্যথা। এর মধ্যে রমজান মাস চলছে, বাড়ির সবাই রোজা। আমাদের এই ছোট ঘরে মেহমান হয়ে এসেছে আমার বড় দুই বোন। তাদের আরামের কথা ভেবে, তাদের ভালো ঘুমের জন্য আমি নিজের কষ্টের কথা মুখ ফুটে বলিনি। তারা যখন নরম বালিশে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছিল, আমি তখন শক্ত বালিশে মাথা গুঁজে রাত পার করেছি শুধু তাদের একটু আরাম দেব বলে।
কিন্তু ত্যাগের প্রতিদান কি শুধুই অবহেলা হয়? সকালে যখন ব্যথায় শরীর ছিঁড়ে যাচ্ছিল, আমি আমার সেজো বোনকে বারবার বলেছিলাম আমি অসুস্থ, ঔষধ খাওয়ার জন্য আমার একটু খাবার দরকার। কিন্তু তার কানে আমার আর্তনাদ পৌঁছায়নি, সে একটিবারের জন্যও সাড়া দেয়নি। মা বাসায় ছিলেন না, তাই আমি ব্যথায় কাতরাতে কাতরাতে অপেক্ষা করছিলাম।
মা যখন ফিরলেন, আমি যখন ক্ষুধার্ত আর অসুস্থ শরীরে অভিযোগ করলাম, তখন উল্টো আমাকেই শুনতে হলো কটু কথা। মা বললেন, 'ওরা মেহমান, তুই নিজেরটা নিজে খেতে পারলি না?' বড় বোন আমাকেই দোষারোপ করল। এই ঘরে আমার কি কোনো অধিকার নেই? আমি অসুস্থ জেনেও কেন আমাকে এক লোকমা খাবারের জন্য এত আকুতি করতে হলো? ত্যাগের বিনিময়ে আমি কি সামান্য একটু সহমর্মিতাও পেতে পারি না?
আজ বুঝলাম, এই পৃথিবীতে নিজের কষ্ট নিজেকেই বইতে হয়। এমনকি নিজের ঘরেও মাঝে মাঝে মানুষ মেহমান হয়ে যায়, আর মেহমানরা হয়ে যায় ঘরের মালিক। আমার এই ব্যথা হয়তো কাল কমে যাবে, কিন্তু মনের ওপর যে অবহেলার দাগ পড়ল, তা মুছবে কে?"
১৫তম এপিসোড: ১০৪ ডিগ্রি জ্বরের দহন এবং রক্তের সম্পর্কের লড়াই
"আজ শরীরটা আর সায় দিচ্ছে না। ১০৪ ডিগ্রি জ্বরের সেই তীব্র দহন যখন আমার ৪ ফুট ১০ ইঞ্চির এই ছোট শরীরটাকে পুড়ে খাক করে দিচ্ছিল, তখন আমি বিছানায় শুয়ে শুধু একটু মায়ার পরশ খুঁজেছি। শৈশব থেকেই আমি অ্যাজমার রোগী, বুকটা সবসময় ভার হয়ে থাকে, নিঃশ্বাস নিতে গেলে মনে হয় কেউ আমার গলায় পাথর চাপা দিয়ে রেখেছে। তার ওপর এখন যোগ হয়েছে টনসিলের সেই দানবীয় যন্ত্রণা। গলা ফুলে এমন অবস্থা যে এক ঢোক পানি গিলাও যেন বিষ গেলার মতো কষ্টকর।
আমি যন্ত্রণায় ছটফট করেছি, কতবার প্রিয় মানুষদের ডাকলাম—মা, বোন! কিন্তু কারো কানে আমার সেই আর্তনাদ পৌঁছালো না। সবাই যখন নিজের দুনিয়া আর ঈদের শপিং নিয়ে ব্যস্ত, আমি তখন এক কোণে পড়ে নিজের অস্তিত্বের লড়াই করছি। অনেক কাকুতি-মিনতির পর মা যখন ডাক্তারকে দেখালেন, তখন জানা গেল শরীরের অবস্থা কতটা শোচনীয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, অসুস্থ অবস্থায় আমাকে ঔষধের চেয়েও বেশি নীল বিষ হজম করতে হলো আমার নিজের বড় বোনদের কথায়।
আমার সেজো বোন যখন টাকার বিনিময়ে আমাকে 'নাটকবাজ' উপাধি দিল, তখন মনে হলো আমার জ্বরের উত্তাপের চেয়েও তার কথার বিষ বেশি তীব্র। ১৬ বছরের একটা কিশোরী যখন তার বোনকে অসুস্থ অবস্থায় টাকার হিসাব করতে দেখে, তখন তার পৃথিবীটা ওলটপালট হয়ে যায়। তারা দামি দামি জামা আর জুতো কিনছে, আর আমি ৫৪ কেজি ওজনের এই মানুষটা ঘরের এক কোণে অবহেলিত হয়ে পড়ে আছি। ছোট বোনটা জামা কিনে দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেটাও মায়ার টানে নয়, বরং 'লোকে কী বলবে' সেই ভয়ে।
সবচেয়ে বড় যন্ত্রণা হলো আমার কাঁধের সেই পুরনো ইনজেকশনের জায়গাটা। ৬ মাস আগে দেওয়া সেই সুঁইয়ের খোঁচা আজও কেন জানি চাড়া দিয়ে ওঠে। জায়গাটা অবশ হয়ে থাকে, মাঝে মাঝে ব্যথায় কামড় দেয় আর চুলকায়। মনে হয়, আমার শরীরের প্রতিটি অংশই কোনো না কোনো পুরনো বা নতুন ক্ষতের সাক্ষী হয়ে আছে। আমার এক অদ্ভুত অভ্যাস আছে—কফ আসলে আমি গিলে ফেলি। হয়তো মনের দুঃখগুলো গিলতে গিলতে আমি আজ নিজের বর্জ্যগুলোকেও ভেতরে জমিয়ে রাখতে শিখেছি।
জানি না কেন আল্লাহ আমাকে মেয়ে করে পাঠালেন! চারপাশের মানুষগুলোকে দেখলে মনে হয়, ছেলেদের সম্মান বুঝি অনেক বেশি, আর আমার মতো মেয়েদের কদর শুধু অবহেলায়। তবুও আমার এই পোড়া মনটা কেন জানি অন্যের জন্য কাঁদে। আমার মেজো বোনের আর্থিক অবস্থা ভালো নয় বলে তাদের বাচ্চাদের জন্য আমার মায়া লাগে, অথচ সেই তারাই আমাকে অসুস্থ অবস্থায় একবার আদর করে বলেনি—'স্মৃতি, তুই সেরে উঠবি তো?'
আমি একাই লড়ছি। ১৬ বছর বয়সে এসে আমি কোনো উৎসবের রঙ দেখি না, দেখি শুধু একাকীত্বের অন্ধকার। আজ আমি শুধু এক গ্লাস কুসুম গরম পানি আর এই নিঃশব্দ ডায়েরিটা নিয়েই আমার যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছি।"