ক্যাম্পাসপ্রেম,পর্ব২৩
হুমায়ূন কবীর
কোথা থেকে মাইকে গান ভেসে আসছে- কিছু কিছু মানুষের জীবনে ভালোবাসা চাওয়াটাই ভুল। সারাটি জীবন ধরে দিতে হয় শুধু সেই ভুলের মাশুল।
আমার তিনতলা রুমের পেছনে লম্বা লম্বা সেগুন গাছের বাগান। সেগুন গাছগুলি তিনতলার জানালা ছাড়িয়ে ছাদের উপরে উঠে গেছে লম্বা চিকন। যদি এই বিল্ডিং এর আড়াল আশ্রয় না থাকতো তবে কোন কালে বাতাসে সেগুলো পড়ে মাটির সাথে মিশে যেত। মিশে যেত কি, এভাবে তারা বেড়েই উঠতে পারতো না। কিন্তু এ কথা ভাবাও অবান্তর, কেননা- এই কাজগুলো বড় হবে, এক সময় কাটা পড়ে যাবে, পৃথিবী থেকে বিলীন হয়ে যাবে। কিন্তু এই বিল্ডিং থেকে যাবে। সুতরাং এখনো এই কাজগুলো যথেষ্ট নিরাপদ। কিন্তু আমার ভালোবাসা নিরাপদ না। যে ভালবাসা রাসমিনের নীরব সম্মতির আশ্রয়ে তরতর করে ঐ সেগুনগাছগুলির মত বেড়ে উঠেছিল, হঠাৎ ভোজবাজির মত সেই আশ্রয় উধাও হয়ে গেছে। শুরু হয়েছে তুমুল বিরহে কষ্টের কালবৈশাখী। আমি মূল শুদ্ধ উপড়ে পড়েছি।
সেগুন বাগানের ওপাশে স্টেডিয়ামের পাশ দিয়ে চলে গেছে একটা পিচ রাস্তা। আইসক্রিমওয়ালা মাইক বাজিয়ে সেই রাস্তায় আইসক্রিম বিক্রি করছে। তার মাইক থেকে ভেসে আসছে গান -
কিছু কিছু মানুষের জীবনে, ভালোবাসা চাওয়াটাই ভুল। সারাটি জীবন ধরে দিতে হয় শুধু সেই ভুলের মাশুল।
গানের সুর হৃদয় ছুঁয়ে যায়, ছুয়ে যায় তার কথাগুলোও।মিলে যায় কারো কারো জীবনের সাথে। না জানি কোন কবির হৃদয় চেরা রক্তে লেখা ওই গানের কথাগুলি। নাজানি কত কষ্ট মিশে আছে তার অন্তরে অন্তরে। আমার জীবন আর ওই গানের কথা গুলি আজ একে অপরের সাথী।
চোখের পানিতে বালিশ ভিজে চপচপ হয়ে গেছে।মাথায় তীব্র যন্ত্রণা হচ্ছে। জ্বরটা আবার বাড়লো নাকি? মাথা কিছুতেই তুলতে পারছি না। আবার বালিশেও রাখতে পারছি না। বাক্সের ভেতর থেকে বালিশের কাভার এর উপর দেওয়ার জন্য বালিশের চাদর বের করলাম।
নানান নকশার ছোট্ট একটা চাদর।দুটো পাখি মুখোমুখি বসে আছে। এই চাদর মা আমাকে দিয়েছে।মা আমাকে বলেনি ওই চাদরটি কে দিয়েছে। কিন্তু আমি জানি কে মাকে আমার জন্য চাদরটি দিয়েছে।
বালিশ চাদরটি বালিশের উপর বিছিয়ে মাথা রেখে শুয়ে পড়লাম। ড্রয়ারে নাপা ছিল খেয়ে নিলাম। আস্তে আস্তে মাথাটা হালকা হতে শুরু করলো। মনে পড়লো শিউলির কথা।
সুন্দর চটপটে একটা মেয়ে। তার কাজ হলো, আমি বাড়ি গেলে আমার পছন্দের তরকারি রান্না করে মাকে দিয়ে যাওয়া। সংসারের সমস্ত কাজে তার পারদর্শিতার অভাব নেই শুধু লেখাপড়া ছাড়া। পরপর দুই বছর এসএসসি ফেল করে, লেখাপড়া ছাড়ান দিয়ে বাড়ি বসে আছে।
আমি একদিন তাকে ডেকে বললাম, শিউলি, তুমি কি লেখাপড়া ছাড়ান দিয়েছো?
শিউলি একটু মন খারাপ করে,মাথা নিচু করে বলল- হ্যাঁ, ভাইজান।
-কেন, বড় হয়ে গেছ তাই?
- মানে?
- না দেখো না, গরুর বাছুর বড় হয়ে গেলে দুধ ছাড়ান দেয়?
সে কষ্টমিশ্রিত কন্ঠে বলল, আপনি আমাকে গরুর কথা বলছেন?
- ছি ছি আমি কি তাই বলেছি? না তুমি বড় হয়ে গেছো না। তোমার বাপ তোমার বিয়ের জন্য চিন্তা শুরু করে দিয়েছে।
সে রেগে বলল তাতে, আপনার কি? মানুষের এত অহংকার ভালো না। না হয় আপনি ভালো ছাত্র।
শিউলি প্রায় কাঁদতে কাঁদতে চলে গেল।বড় লোকের একমাত্র আদুরে মেয়ে। সাত ভাই চম্পা টাইপ।পাঁচ ভাইয়ের এক বোন। অতি আদরের সে একেবারে গোল্লায় গেছে। তাছাড়া তার গোষ্ঠীর সেই বড় মেয়ে। আমার বাপের সাথে শিউলির বাপের এমনিতেই সম্পর্ক খুব ভালো। আমার বাপ আর শিউলির বাপ আপন মামাতো ফুফাতো ভাই। অনেকদিন তাদের মনে বিয়াই হওয়ার শখ। ব্যাপারটা ওপেন সিক্রেট এর মত। আর শিউলি ধরে নিয়েছে আমি ওকে বিয়ে করব। কিন্তু আমি মাকে স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছি যে, শিউলি যত সুন্দরই হোক তার মত একটা অশিক্ষিত মেয়েকে বিয়ে করা আমার পক্ষে সম্ভব না।তবু শিউলি আশায় আশায় আছে। আমার বাপ ও কিছুটা স্বার্থপরের মত লেগে আছে। শিউলির পাঁচ ভাই পাঁচ লাঠি । আরো গোষ্লোঠির লোকজন তো আছে। আমিও জানি শিউলির সাথে আমার বিয়ে হলে গ্রামে আমাদের শক্তি সামর্থ্য বাড়বে।
আব্বার প্রভাব প্রতিপত্তি বাড়বে। তবু আমি কখনো তাকে মেনে নিতে পারিনি। আর পারবও না। কিন্তু শিউলি নাছোড়বান্দা। জানি তার এই চাওয়ার ভিতর কোন অন্যায় নেই। কিন্তু প্রশ্রয়ও তো নেই। সে আমাকে কিছুটা ভয় পাই। এই কারণে কোন কিছু আমাকে সরাসরি দেইনা দেই মায়ের মাধ্যমে। এই চাদরটিও সে রকম। ওটা আমি কখনো ব্যবহার করিনি। দীর্ঘদিন ধরে বাক্সের ভেতরে পড়েছিল। আজ কি করে জানি না হঠাৎ তারই প্রয়োজন হলো।