ঢাকায় নতুন আসছি। বাসায় থাকতে চেহারায় যত্ন ছিল। হলে থাকার ২ মাসে নিজের চেহারা আয়নায় চেনা যায় না। হলের পোলাপাইনের আবার খিদা বেশী লাগে। তো জীবনে এসেছে মাহে রমজান, আত্বশুদ্ধির চেয়ে সারাদিন কই কি খাওয়া যায় সে চিন্তা করতাম।
কারন কবি বলেছেন, ‘খাদ্যের চেয়ে উত্তম ইবাদত আর নেই’
প্রথম রোজা। রিকশায় উঠে গেলাম চকবাজার। ছোটকালে স্কুলে হাউ-মাউ করলে স্যারেরা বলতেন আমরা নাকি মাছের বাজার বসাইসি – ভুল কথা। চকবাজারের কাছে মাছ বাজার নস্যি। এখানে মানুষের মাথা মানুষ খায়। খাইতে মজা না লাগলে সস মাখায়ে খায় !
পত্রিকায় পড়েছি, চকবাজারের ইফতারের ঐতিহ্য হল ‘বড় বাপের পোলায় খায়, ঠোঙায় ভইরা লইয়া যায়’ – খাবারের আইটেমের নাম ক্যামনে এত অদ্ভুত হয় ? আরেকটা আছে ‘সুতা কাবাব।’ মোগলদের খাবারের এহেন নাম তো হওয়ার কথা না।
বাসার টাকায় ঢাকায় চলি। নিজের ইনকাম নাই। হেটে হেটে হল থেকে ক্লাসে যাই বলে, যাতায়াত ভাড়ার হিসাব নাই। দুইটাই কিনে ফেললাম। জ্যামে রিকশায় বসে থাকতে থাকতে মনে মনে মুয়াজ্জিন আংকেলকে বলি, ‘আংকেল, আযানটা দিয়া দেন ‘
চটপটির ডাল দেয়। গরুর মগজ মিশায়। মুরগীর মাংস নাকি কিমা করে দেয়, সত্য-মিথ্যা জানি না। শামি কাবার আর সিদ্ধ ডিমকে হাত দিয়ে কচলিয়ে দিতে দেখেছি। ছোট আলুকে ৪ টুকরা করা ভর্তা বানায়ে দেয়। আর মুড়ি মাখানোর জিনিসপাতি যা লাগে – বেরেস্তা, পিয়াজ,ধনিয়া পাতা, কাঁচা মরিচ, শুকনো মরিচ। কোন কোন দোকানে মুড়ির সাথে হালকা করে চিড়াও মিশায়। দোকানদার আপনাকে চিনলে মিষ্টি বুন্দিয়াও দিতে পারে। হাত মুঠ করে সরিষার তেল দেয়। এরপর কিডনি বিক্রি করে দিচ্ছে, এমন দুঃখে ২ চামচ ঘি মেশায়। দ্বিতীয় চামচ দিতে, নায়ক মান্নার মত খুব কষ্ট হয় উনাদের বুকে। সবশেষ দেয় গরম মশলা। ছোটকালে বাপ-মা যে বোলে বসায়ে গোসল করাইতো, ঐরকম এক বোলে চামচ দিয়ে দেয় একটা ঘুটা।
এই অদ্ভুত খাবারের নাম ‘বড় বাপের পোলায় খায়, ঠোঙায় ভইরে লইয়া যায় ! ’
খাবারের স্বাদ কেমন পরে বলি। চলেন একটা জোক শুনি।
এলাকায় ঈদের পরে লোকজন সাংকৃতিক সন্ধ্যার আয়োজন করেছে। কই থেকে কারে জানি ধরে আনসে, দেখতে মানুষের মত কিন্তু গান শুনে মনে হয় গাধারে হারমোনিয়ামের সামনে বসায়ে দিসে। সবাই চেয়ারে বসে ক্ষেপে, বিরক্তিতে পা নাচায় কিন্তু মুখে কিছু বলে না। আর সহ্য করতে না পেরে এক ভাই লাঠি হাতে স্টেজের পিছে উঠে গেল একসময়। ভয়ে শিল্পীর তো কলিজার পানি নাই অবস্থা।
-ভাই, আমাকে কি মারবেন ?
-না না, কি বলেন? আপনি আমাদের অতিথি। আপনারে মারুম না, যেটায় আপনারে গান গাইতে আনসে আমি তারে খুজতাসি … আপনি গান গাইতে থাকেন
প্রথম-আলোর যে সাংবাদিক পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ইফতার ‘বড় বাপের পোলায় খায়, ঠোঙায় ভইরা লইয়া যায়’ নিয়ে কাহিনী ফাদসিলো, আমি তারে আইজো খুজি।
আরো কিনেছি সুতা কাবাব। শিক কাবাব দেখে বড় হইসি, এই কাবারের চেহারা খারাপ না। চলে। ভেতরে যে সুতা আছে নিজের চোক্ষে দেখে এসেছি। সেদিক দিয়ে নামকরন ঠিকই আছে।
মন খারাপ করে দুই আঙ্গুলে চিমটি দিয়ে একটু কাবাব নিলাম। কি যে স্বাদ টের পাই না। হতেই পারে আমি একজন গ্রাম থেকে আসা গাইয়া ভূত – তাই চকবাজারের ঐতিহ্যবাহী কাবারের স্বাদ বুঝতে অক্ষম। আরেকটু খাইলে মনে হয় বুঝতে পারবো। চিমটি দিয়ে একটু একটু করে খাই। স্বাদের কোন হের-ফের নাই।
২ মিনিট পরে টের পাইলাম, দুনিয়াতে এরচেয়ে ফাযিল্লামী আর হইতেই পারে না। করাত দিয়ে কাঠ কাটলে যে কাঠের গুড়া নিচে জমে, ফাজিলের দল ঐ গুড়ার সাথে কাবারের মশলা মিক্স করে বেচা শুরু করসে।
সেই থেকে পত্রিকার লেখা পড়ে আমি কোথাও আর খেতে যাই না।
