Posts

প্রবন্ধ

হুমায়ূন ফরীদি: দ্য মিথ

February 26, 2026

সুমন বৈদ্য

Original Author সুমন বৈদ্য

134
View
হুমায়ূন ফরীদি

আমাকে তুমি চিনো নাই? চিনবা চিনবা। আজকে না চিনলে কালকে চিনবা। কাল না চিনলে পরশু চিনবা।চিনতে আমারে হইবোই।সংলাপটি ছিল চরিত্রের। এই সংলাপটি অনেকটাই ব্যক্তিগতভাবে তার সাথে মিল। কারণ এই সংলাপটি যদি একবার ব্যক্তিগত জায়গা থেকে লক্ষ্য করা যায় তাহলে উচ্চারণটি ছিল এমন এক শিল্পীর, যিনি চরিত্রের গণ্ডি ছাড়িয়ে নিজের ভবিষ্যৎকেই যেন ঘোষণা করছিলেন। সেই শিল্পী হলেন হুমায়ূন ফরীদি।উথান পতন সিনেমায় রমজান আলী চরিত্রে হুমায়ূন ফরীদির এই সংলাপটি চরিত্রের থেকেও আমার কাছে কোথাও গিয়ে যেনো ব্যক্তিগত স্বীকারোক্তি মনে  হয়েছিলো।  

সাধারণত কোনো নাটক-সিনেমা সংলাপ নাটক কিংবা সিনেমাতেই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু কিছু উচ্চারণ সময়ের দেয়াল ভেঙে শিল্পীর ব্যক্তিত্বের সঙ্গে মিশে যায়। উথান পতন সিনেমায় রমজান আলীর সংলাপ তেমনই-যেখানে চরিত্রের আত্মবিশ্বাস ধীরে ধীরে অভিনেতার আত্মপ্রত্যয়ে রূপ নেয়। যেন তিনি জানতেন, আজ যাঁরা তাঁকে পুরোপুরি চিনে উঠতে পারেননি, কাল তাঁরা বাধ্য হবেন স্বীকার করতে-এই মানুষটিকে এড়িয়ে যাওয়া যায় না।এটি নিছক সংলাপ ছিল না; এটি ছিল অবস্থান। ফরীদির কণ্ঠে উচ্চারিত প্রতিটি শব্দে ছিল এক ধরনের শিল্প-দাবি-স্বীকৃতির দাবি নয়, প্রভাবের দাবি। তিনি যেন ঘোষণা করছিলেন, আগামী সময়ে নাটক ও সিনেমা-দুই মাধ্যমেই তাঁর উপস্থিতি হবে অনিবার্য। এবং বাস্তবতা প্রমাণ করেছে, সেই উচ্চারণ কোনো অতিরঞ্জন ছিল না।

হুমায়ুন ফরীদি আলো ছড়িয়েছেন তিন দশক। নায়ক-খলনায়ক দুই চরিত্রেই মাতিয়ে হয়ে উঠেছিলেন দেশের অন্যতম সেরা অভিনেতা।তিন দশক জুড়ে তিনি কেবল অভিনয় করেননি; ইন্ডাস্ট্রির অভিনয়ভাষাকেই বদলে দিয়েছেন।তাঁর আগে ও পরে ভিলেন, দার্শনিক চরিত্র কিংবা ধূসর মানুষদের উপস্থাপনা একরকম ছিল না। ফলে উথান পতন সিনেমার রমজান আলীর সেই সংলাপ আজ ফিরে তাকালে মনে হয়, এটি ছিল এক শিল্পীর স্বঘোষিত ম্যানিফেস্টো-এক নীরব ভবিষ্যদ্বাণী।হুমায়ূন ফরীদি, ব্যক্তি হিসেবে তার নাম। কিন্তু তিনি আরো একটি পরিচয় বহন করে চলেন, তাকে বলা হয় অভিনয়ের বিশ্ববিদ্যালয়। অভিনয়কে তিনি বরাবরই কাজ হিসেবে দেখেননি। অভিনয়কে তিনি সবসময় নিজের পরিচয় হিসেবে দেখেছেন। বুঝিয়েছেন একটা মানুষের জীবনে চরিত্র কতোটুকু গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, বুঝিয়েছেন চরিত্র কতোটুকু মৌলিক হতে পারে। অভিনয় শব্দটি যদিও তার জন্য অভিনয় বরং ন্যাচরাল অভিনয়। তাই তো বিভিন্ন সময় তাকে পর্দায় দেখে আনন্দ পেয়েছি কিংবা অস্বস্তিতে ভুগেছি কিংবা তার অভিনয় দেখে অশ্রুসিক্ত নয়নে আবদ্ধ হয়েছি। তিনি কেবল অভিনয়ের বিশ্ববিদ্যালয় নয় আমার দৃষ্টিতে বরং তিনি মিথ।

‘মিথ’ বললাম কেন? কারণ তিনি কেবল একজন অভিনেতা নন-তিনি এক অভিজ্ঞতা, এক আবহ, এক উপস্থিতি; যাকে ব্যাখ্যা করার চেয়ে অনুভব করা সহজ।সাধারণ ফিচারে আমরা বলি-তিনি শক্তিমান অভিনেতা, বহুমাত্রিক শিল্পী, চরিত্রনির্মাণে অনন্য। কিন্তু “মিথ” শব্দটি ব্যবহার করছি অন্য অর্থে। এখানে মিথ মানে অবাস্তব নয়; বরং এমন এক শিল্পীসত্তা, যিনি বাস্তবের সীমানা ছাড়িয়ে এক প্রতীকে পরিণত হন।হুমায়ূন ফরীদিকে আমি শুধু চরিত্রে দেখি না, চরিত্রের ভেতর দিয়ে সময়কে দেখি। চরিত্রের ভেতর নিজের এক বিকল্প বাস্তবতা নির্মাণ করেছেন। পর্দায় তাঁর আবির্ভাব মানেই ছিল এক ধরনের অনিবার্যতা; দর্শক জানতেন, কিছু ঘটতে চলেছে। তাঁর সংলাপ উচ্চারণ, চোখের দৃষ্টি, নীরবতার ভেতরের চাপ-সব মিলিয়ে তিনি চরিত্রকে ঘটনায় নয়, অভিজ্ঞতায় রূপ দিতেন।তাঁর ভিলেন চরিত্র কেবল ভয় তৈরি করেনি, তৈরি করেছে দার্শনিক অস্বস্তি। তাঁর সংলাপ শুধু উচ্চারণ ছিল না, ছিল ঘোষণা। তিনি পর্দায় এলে গল্প বদলাত। আবার তিনি প্রান্তিক মানুষ হলে তা নিছক সহানুভূতি নয়, বরং এক সামাজিক প্রতিবাদ।এটাই তাঁকে অভিনেতা থেকে ‘মিথ’-এ উন্নীত করেছে।

মিথ সেইসব মানুষকে বলা যায়, যাদের কাজ সময়ের সঙ্গে ফুরিয়ে যায় না; বরং সময়কে অতিক্রম করে নতুন অর্থ তৈরি করে। ফরীদি তেমনই-প্রজন্ম বদলায়, অভিনয়ের ধারা বদলায়, কিন্তু তাঁর উপস্থিতির শক্তি আজও আলোচনায় ফিরে আসে।'হুমায়ূন ফরীদি’ নামটার সাথে অনেক অভিনয়ের চরিত্র সংমিশ্রণ হয়ে মিশে আছে। অভিনয়ে নিজেকে সবসময় রেখেছেন অনন্য, করেছেন নিজেকে আলাদা সবার থেকে। এদেশে তার মতো মেধাবী অভিনেতা কমই এসেছেন। যিনি অভিনয়কে বাস্তব জীবনের সাথে অঙ্গাঅঙ্গীভাবে জড়িয়ে ফেলছেন।কিন্তু প্রশ্ন হলো কেন তার অভিনয়ের বড়ত্ব কোথায়! কোনো অভিনেতার সম্পর্ক জানতে হলে প্রথমেই আসে তার অভিনীত কোন সিনেমা নাম এবং সেই অভিনয়ের উক্ত আলোকপাত বা সমালোচনা। কিন্তু হুমায়ূন ফরীদিকে যদি জানতে চাওয়া হয় তাহলে তার অভিনীত কালজয়ী সিনেমা চোখের সামনে উঠে আসবে না। যদিও বিষয়টি অনেক দুঃখ ব্যতিত হতে পারে। তবে হুমায়ূন ফরীদি অভিনয়ের তালিম বা জন্ম কিংবা এককথায় পরিচয় জানতে চাওয়া হয় তাহলে আসবে টেলিভিশন নাটকের কথা। যা দিয়ে তিনি সবার কাছে পরিচিতি পান।

অভিনয়ের আলোয় আজও অমর হুমায়ুন ফরীদি
হুমায়ূন ফরীদি

নায়ক-খলনায়ক-হরর-কমেডি যে চরিত্রই করেছেন, সবসময় সব চরিত্রে’ই উৎড়ে গেছেন সমান পারদর্শিতার সাথে। জাত অভিনেতা বলতে যা বুঝায়, তিনি ছিলেন তাই। রক্তের শিড়ায়-উপশিড়ায় মিশে ছিলো তাঁর শুধুই অভিনয়। তিনি অভিনয়ে এতোটাই অনবদ্য ছিলেন যে, একসময় নায়কের চেয়ে ভিলেন হুমায়ূন ফরীদি বেশি প্রিয় হয়ে ওঠেন বাংলা সিনেমাপ্রেমী দর্শকদের কাছে । বাংলা সিনেমায় ভিলেনের সংজ্ঞাটাও পরিবর্তন হয়েগিয়েছিল তাঁর অভিনয় উৎকর্ষতার প্রভাবে। এক কথায় হুমায়ূন ফরীদি ছিলেন বাংলাদেশের অভিনয় জগতের বাদশা।বাকের ভাইয়ের ফাঁসি হবে সুনিশ্চিত। তার ফাঁসির খবর শুনে কান্নায় ভেঙে পড়লেন মুনা। তিনি তখন সাদা শার্ট, হাতে কায়দা করে ধরা সিগারেট নিয়ে বসে থাকা এক উকিলের সামনে। যার কথা বলার ধরণ কখনো গম্ভীর আবার কখনো চাপা। সেই উকিলটিই হলেন হুমায়ূন ফরীদি। অভিনয়ের প্রতি তীব্র আকাঙ্ক্ষা এবং চরিত্রের শিল্পায়ন করা ব্যক্তি হুমায়ূন ফরীদিকে চিনলাম।মঞ্চনাটকের মাধ্যমেই অভিনয়ের হাতেখড়ি হয় হুমায়ূন ফরীদির। কিন্তু আফসোসের বিষয় হলো তার এই মঞ্চনাটকের অভিনয় উপভোগ করার সৌভাগ্য আমার যেমন হয়নি, ঠিক তেমনি এই প্রজন্মের কারোরই হয়নি তা নিঃসন্দেহে বলা যেতেই পারে। জসীম কিংবা মান্না অভিনীত চলচ্চিত্রে নেতিবাচক চরিত্রে এবং জীবনধর্মী ধারার গল্প নিয়ে টেলিভিশন নাটকে অভিনয়ের মধ্যে দিয়ে চিনি।

যারা প্রাচীন ইতিহাসের পাতা উল্টে অভ্যস্ত, তাদের কাছে হুমায়ুননামা মানেই মোগল সম্রাট হুমায়ুন-এর জীবনকথা।আর যারা ডুব দেন আনন্দভুবনে, তাদের কাছে হুমায়ুননামা একেবারেই অন্য এক ইতিহাস-অভিনয়ের সম্রাট হুমায়ুন ফরীদি–র কিংবদন্তি।বাংলা অভিনয়ের পরিভাষায় তিনি কেবল একজন খলনায়ক নন; বরং একাই পুরো চলচ্চিত্রকে কাঁধে তুলে নেওয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন এক অদ্ভুত শক্তি। নায়ক-নায়িকা, গল্প, গ্ল্যামার-সবকিছুকে পাশ কাটিয়ে ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালেই দৃশ্যের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠতেন তিনি। যেন পর্দা নয়, পর্দার ভেতরের বাতাসও তার সংলাপের তালে তালে বদলে যেত।অভিনয় তার কাছে পেশা ছিল না-ধ্যান। চরিত্র তার কাছে স্ক্রিপ্টের লেখা নয়-বিশ্বাস। তিনি বারবার বলেছেন, শিল্পী সৃষ্টিকর্তার এক বিশেষ আশীর্বাদ; তাই অভিনয়ের দায়িত্বও একধরনের নৈতিক দায়। চরিত্র যাই হোক না কেনো, মনোযোগ যদি পূর্ণ হয়, তবে তাতেই জন্ম নিতে পারে সম্পূর্ণ এক জগৎ। সেই মনোযোগের কঠোর সাধনাই তাকে আলাদা করেছে সমসাময়িকদের ভিড় থেকে। কখনো দার্শনিক, কখনো ভয়ংকর, কখনো নির্মম হাস্যরসিক-একই শরীরে বহু মানুষের বাস যেন। আর এই বহুরূপী উপস্থিতিই তাকে বানিয়েছে “অভিনয়ের মাখলুকাত”-এর এক স্বতন্ত্র স্রষ্টা।তাই তার কাজগুলো আলাদা আলাদা চরিত্র নয়, বরং এক দীর্ঘ পাঠ্যক্রম-নিজের কাজ মনোযোগ দিয়ে করছে বলেই নিজেই তৈরি করে গিয়েছেন অভিনয়ের বিশ্ববিদ্যালয়। এই বিস্তৃত সৃষ্টিকেই আমরা আভিধানিক অর্থে বলতে পারি হুমায়ুননামা বা হুমায়ূন ফরীদি- দ্য মিথ।


ইরফান খান-নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকী-রাজীব-রাম গোপাল ভার্মা-মনোজ বাজপেয়ী-অনুরাগ কাশ্যপ-প্রসেনজিৎ- অমিতাভ বচ্চন-মোশাররফ করিম কিংবা চঞ্চল চৌধুরীর মতো অভিনেতা/পরিচালকের আউট অফ দ্যা বক্স কাজ সবসময় ছিলো আমার পছন্দের শীর্ষে। কিন্তু তাদের মধ্যে থেকেও একটু সময়ের স্রোতে ব্যতিক্রম ছিলেন হুমায়ূন ফরীদি। নিজগুণেই হুমায়ুন ফরীদি সর্বোচ্চ সাফল্য পেয়েছেন।তিনিই প্রথম চলচ্চিত্রে ভিলেনদের পারিশ্রমিক বাড়িয়ে দেন। ভিলেন স্ক্রিনে এলে দর্শক হাততালি দেয় এটা কেবল হুমায়ুন ফরীদির ক্ষেত্রেই ঘটেছে। ভিলেন নায়ককে মারলেও দর্শক খুশি হয়ে তালি দেয় এই অসম্ভব ব্যাপারটিও তার ক্ষেত্রেই ঘটেছে। শিল্পী হিসেবে তার তুলনা নেই। আমি যে চার-পাঁচ জন অভিনেতার কাজে সন্তুষ্ট থাকি এদের মধ্যে অন্যদের ক্ষেত্রে পঞ্চাশ থেকে আশি ভাগ হলে হুমায়ুন ফরীদির ক্ষেত্রে আমি একশত ভাগ সন্তুষ্ট থাকি। তিনি অভিনয় করলে পরিচালককে মারাত্মকভাবে বিরক্ত করেন, সারাক্ষণই বিভিন্ন প্রশ্ন করেন। চরিত্র সম্পর্কে জানতে চান।

Humayun Faridi _ (হুমায়ুন ফরীদি) Best actors in Bangladesh.
হুমায়ূন ফরীদি

এতে পরিচালকরা সাময়িকভাবে বিরক্ত হলেও মনে মনে ঠিকই খুশি হতো। তবে নিজের চরিত্র বাড়ানো নয় বরং কী করলে গল্প আরো জমাট হবে সেই পরামর্শ দেন। তিনি শুধু নিজের অভিনয় নিয়েই ভাবেন না, পুরো গল্পে ইনভলড থাকেন।হুমায়ূন ফরীদির ব্যাপক পড়াশোনা রয়েছে। অভিনয় তিনি চর্চা করেন। বলা যায় রাউন্ড দ্য ক্লক তিনি একজন অ্যাক্টর।কিন্তু হুমায়ুন ফরীদি যখন নিজেকে বর্ণনা করতেন, তখন শুরুটা ঠিক নায়কের মতো শোনাত না; বরং মনে হতো এ এক অদ্ভুত জীবনের গল্প। দুরন্ত শৈশব, বাউন্ডুলে যৌবন আর শেষমেশ জীবনকে আঁকড়ে ধরার তীব্র যাত্রার কথা থাকত তাঁর গল্পে।তবে হুমায়ূন ফরীদিকে নিয়ে সিনেমা করতে গিয়ে ঝক্কিঝামেলা পরিচালকদের ঠিকই পোহাতে হতো। একটা সময়ে খলনায়ক হয়েও জনপ্রিয়তায় নায়কদের পেরিয়ে গিয়েছিলেন। সাধারণ মানুষ হলে গিয়েছেন শুধু হুমায়ূন ফরীদি সিনেমায় আছেন বলে। বাংলা সিনেমার ইতিহাসে কোন খলনায়ক এতোখানি একক প্রভাব আর কেউই অর্জন করতে পারেননি। এমন জনপ্রিয় মানুষের শ্যুটিংয়ে জনগণের ভিড় সামলানোর হ্যাপা পরিচালককে সইতে তো হবেই।জনপ্রিয়তার সকল মাপকাঠি হুমায়ূন ফরীদি ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন ঠিকই, তবে যে লক্ষ্য নিয়ে সিনেমায় এসেছিলেন তা পূরণ হয়নি, বরং নিজেই এফডিসির বাঁধাধরা গল্পের সিনেমার চোরাবালিতে হারিয়ে গিয়েছিলেন। প্রতিভার গুণে দক্ষ অভিনয়শিল্পীর স্বকীয়তা তিনি সবকিছুতেই ধরে রেখেছেন, কিন্তু বদলে দেয়া হয়নি বাংলা সিনেমাকে। বদলে দেয়ার সামর্থ্য তার ছিল, এমন বিশ্বাস ছিল অনেকেরই।

হুমায়ূন ফরীদির উপর এমন বিশ্বাস ছিল আরেক প্রখ্যাত নাট্যব্যক্তিত্ব নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চুরও। হুমায়ূন ফরীদি সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে তিনি নিজেকে ফরীদির গুণমুগ্ধ ভক্ত যেমন দাবী করেন, একইভাবে সবচেয়ে বড় সমালোচক বলেও বিশেষায়িত করেন। এই মানুষটার হাত ধরেই একরকম অভিনয়ের ছোট পুকুর থেকে বড় নদীতে গিয়ে পড়েছিলেন ফরীদি।জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্য সংগঠকদের মধ্যে হুমায়ূন ফরীদি তখন অন্যতম। তেমনই কোন এক নাট্য উৎসবের অতিথি হয়ে এসেছিলেন বাংলাদেশী মঞ্চনাটক ও চলচ্চিত্র পরিচালক এবং মুক্তিযোদ্ধা নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু। যিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় ছিলেন ক্র্যাক প্লাটুনের গেরিলা।হুমায়ূন ফরীদির একইসাথে নাট্য নির্দেশনা ও অভিনয় দেখে রীতিমতো মুগ্ধ হয়েছিলেন সে রাতে। তারপরই ফরীদিকে ঢাকা থিয়েটারে কাজ করার সুযোগ করে দেন ইউসুফ বাচ্চু। সেলিম আল দীনের মতো নাট্য বটবৃক্ষের ছায়ায় জাহাঙ্গীরনগরে নাটক শুরু করা হুমায়ূন ফরীদি এভাবেই ঢাকা থিয়েটারে যুক্ত হন, আমৃত্যু সম্পর্ক ছিল ফরীদির ঢাকা থিয়েটারের সাথে। সেলিম আল দীনও হুমায়ূন ফরীদির প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন সবসময় কিন্তু বানিজ্যিক চলচ্চিত্রের বেড়াজালে আটকে পড়া ফরীদিকে পছন্দ করেননি তিনিও।

অন্ধভক্তের সংখ্যাও কিন্তু কম ছিল না। সাধারণ মানুষ তো বটেই, বিখ্যাত ব্যক্তিত্বরাও আকন্ঠ মুগ্ধতায় ডুবে ছিলেন ফরীদির অভিনয়ে। ওপার বাংলার বিখ্যাত চিত্র পরিচালক শিবপ্রসাদ ঘোষ ‘বেলাশেষে’ সিনেমার অভিনয় শিল্পীদের গ্রুমিং করতে গিয়ে টেনেছেন হুমায়ূন ফরীদির উদাহরণ, সে গ্রুমিং ক্লাসে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো অভিনেতাও ছিলেন। সবার প্রিয় অভিনেত্রী সুবর্ণা মোস্তফা যার সাথে হুমায়ূন ফরীদি বিচ্ছেদের পূর্বে বাইশ বছর সংসার করেছেন, তিনিও স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন,“বন্ধু, প্রেমিক হিসেবে ফরীদিকে মিস করি না, তবে  গল্পের কিছু কঠিন চরিত্রে তাকে সবাই মিস করে, কঠিন সব চরিত্র তুড়ি মেরে করে ফেলতে পারতো, নেই বলে সেই গল্পে আর কাজ করা হচ্ছে না, আর কেউ নেই তার মতন।”সুবর্ণা মোস্তফা বন্ধু হিসেবে মিস না করলেও মিস কিন্তু অনেকেই করেন। কিংবদন্তি নাট্যকার শম্ভু মিত্র প্রিয় মানুষ হুমায়ূন ফরীদি সম্পর্কে বলেছেন,

“ওর সাথে কথা বলতে আরাম, মানুষ আমাকে হয় ঈশ্বর বানায় নয় গালি দেয়, বন্ধু কেউ হয় না যার সাথে অবসর কাটানো যায়।”কথার নেশায় মানুষকে বিভোর করে দেয়ার অদ্ভুত ক্ষমতা ছিল হুমায়ূন ফরীদির। পর্দায় খলনায়কে অভিনয়ে বিখ্যাত হয়ে যাওয়া ফরীদি জাহাঙ্গীরনগরে সেলিম আল দীনের বাসার ছাদে ভুতের গল্প বলে সবাইকে ভয় পাইয়ে দিতে যেমন পারতেন, তেমনি কখনো কবিতার মতো মুগ্ধ করে রাখতেন আশেপাশের সবাইকে।আমাদের আরেক হুমায়ূন, লেখক হুমায়ূন আহমেদও তার আড্ডার প্রসঙ্গে বলেছেন। লেখক হুমায়ূন আহমেদ নিজেই তো আড্ডা জমানোর রাজা, সাহিত্য আর মিডিয়া জগতের অধিকাংশ মানুষ হুমায়ূন আহমেদের নুহাশ পল্লীর আড্ডায় গিয়ে বিভোর হয়ে বসে থাকতেন।সেই হুমায়ূন আহমেদও এক লেখায় ফরীদি সম্পর্কে লেখেন,“বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে বহু লোক একজনকে ঘিরে আছে, সবাই তার কথা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছে, হাসছে, হাত তালি দিচ্ছে। দেখে মনে হলো যেন শব্দের জাদুকর! কাছে গিয়ে দেখি ঝাকড়া চুলের এক তাগড়া যুবক, কথা বলার মাঝেই একটা আর্ট ছিলো। অন্য যেকোনো দশটা মানুষ থেকে সহজেই তাকে আলাদা চেনা যেতো। মানুষটা হুমায়ুন ফরীদি!”

কবি অবশ্য তিনি ছিলেনই। একখানা কবিতা বরং এখানে তুলেই দেয়া যাক৷ ‘ছায়া’ শিরোনামে কবিতাটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৭৮ সালে, গণসাহিত্য নামের একটি মাসিক সাহিত্য পত্রিকার কার্তিক সংখ্যায়।

“এই মাটি, মৃত্তিকার গান হঠাৎ হারিয়ে যায়

নিরাকার সন্ধ্যা বৃক্ষের ফোঁকরে বাঁধে বাসা

কুলবতী কালোবউ নদীজলে ধুয়ে ফেরে বাসন কোসন

হাওয়া কাঁপে হাওয়া, ঘাসের সান্নিধ্যে ঘুমোয়

বিন্দুজলে স্বচ্ছন্দ সংসার সুখ নীচে যত টুনীর পায়ের

একা একা কিশোরীর স্নেহ-ডোবা চোখে ভর করে

দুপুরের নির্জন ভীতি নিঃসহায় উনুনে পড়ে জল।

আমার ঘরের পাশে লম্বিত সুপুরীর গাছ

তবুও অপেক্ষা ক’রে মেঘে মেঘে ভিজে যায় বেলা

এই নদী ভেজে কাক ঘাটে বাঁধা নৌকোর

সুশীল পাটাতন, উচ্ছিষ্ট কচুরীর ফুল।”


বিশ্ববিদ্যালয়ের যে কোন আয়োজনে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল ফরীদির। নিজেকে প্রমাণ করার নেশা তার সবসময়ই ছিল। পরবর্তী জীবনে তাই বিচরণ করেছেন বহু ক্ষেত্রে, শুধু অভিনয় না, তিনি কবিতা লিখেছেন, গল্প লিখেছেন, বহু নাটক রচনা করে সেগুলোর মঞ্চায়ন করেছেন, নাট্য নির্দেশনা দিয়েছেন, পত্রিকায় কলাম লিখেছেন, সমালোচক হিসেবেও তিনি ছিলেন উচ্চদরের।

এতো সব কিছুর উপরে তার আরো একটি পরিচয় আছে, হুমায়ূন ফরিদী একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। ভারত থেকে ট্রেনিং নিয়ে এসে প্রথম দিকে চাঁদপুর এবং পরবর্তীতে নিজ এলাকা কালীগঞ্জে সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন, আমাদের উপহার দিয়েছেন স্বাধীন বাংলাদেশ। মুক্তিযোদ্ধা নিশ্চয়ই তার সবচেয়ে বড় পরিচয়। ফরীদি নিজেও তাই মনে করতেন। বিটিভির এক সাক্ষাৎকারে এসে বলেছিলেন, “এই আমি একজন খারাপ মানুষের চরিত্রে অভিনয় করা খাঁটি সিনেমার মানুষ, কিন্তু আমি নায়কদের মত জনপ্রিয়, মঞ্চে এককালে যা অভিনয় করেছি মানুষ তা মনে রেখেছে, আর টেলিভিশনের যেখানেই যাই, সে যত বড় ডিরেক্টরই হোক এখনো আমাকে দেখে চেয়ার ছেড়ে দেয়। এই এত অর্জন দেশ স্বাধীন না হলে কোথ্বেকে হতো!” সত্যিই তাই, মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়ের চেয়ে বড় পরিচয় আর কী বা হতে পারে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, হুমায়ূন ফরীদির যুদ্ধের গল্প নিয়ে কেন যেন তেমন ইতিহাস চর্চা করা হয়নি।

ঠিক ১৪ বছর আগেই তিনি আমাদের ছেড়ে মহাকালের পথে যাত্রা করেছেন, বড্ড তাড়াতাড়িই চলে গেছেন। জীবনের শেষ ক’টা দিন ফরীদি কষ্ট আর একাকিত্বে কাটিয়েছেন, নিজেও চাইতেন নিরবে নিভৃতে হুট করে চলে যেতে, মনে জমেছিল হয়তো অজানা অভিমান। মেঘদল ব্যান্ডের সদস্য শিবু কুমার শীলের নেয়া এক সাক্ষাৎকারে হুমায়ূন ফরীদি তখন অকপটে বলেছিলেন,“ভোরের শিশির আমি যার বেলা গড়িয়ে গেছে, টুপ করে হারিয়ে গেলে ক্ষতি নেই।”সত্যিই ‘টুপ’ করে একদিন হারিয়ে গেলেন হুমায়ূন ফরীদি, ছেড়ে গেলেন আমাদের মতো অসংখ্য গুণমুগ্ধকে। আর ক্ষতি আছে কি নেই, তা তো দর্শক থেকে নির্মাতা সবাই টের পাচ্ছি হাড়ে হাড়ে।নব্বইয়ের দশক। দেশীয় চলচ্চিত্রের অবস্থা বেশ নাজুক। এমন সময় তানভীর মোকাম্মেরের ‘হুলিয়া’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে অভিষেক হলো এক অভিনেতার। নাম ‘হুমায়ুন ফরীদি’। নিজের ব্যক্তিগত পরিচয় ভুলে কোনো প্লাস্টিক অভিনয় না ধরে চরিত্রকে নিজের পরিচয় বানিয়ে নেওয়াটাকে তখন সবাই সাধুবাদ জানিয়েছিলো।এরপর তাকে আরো ভিন্নরূপে দেখতে পায় দহন সিনেমায়। আউট অফ দ্যা বক্স সিনেমা দিয়ে নিজের সাবলীল অভিনয় প্রমাণ করলেও তার রুটিরুজির আয় সেইভাবে সক্ষম যেমন হচ্ছিলো না ঠিক তেমনি একজন শিল্পী যেভাবে সব অডিয়েন্সের কাছে দর্শক সমাদৃত হয় সেই সুযোগটাও হয়ে উঠছিলো না। তাই তিনি নাম লেখালেন ট্র্যাডিশনাল সিনেমায় অর্থাৎ বাংলা কর্মাশিয়াল সিনেমায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এমন একজন আউট-অফ-দ্য-বক্স অভিনেতা কেন শেষ পর্যন্ত বাণিজ্যিক ধারার সিনেমায় নাম লেখালেন?প্রথমত, অর্থনৈতিক বাস্তবতা। বিকল্প ধারার সিনেমা সম্মান এনে দিলেও আর্থিক নিরাপত্তা দেয়নি। নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশের আর্টহাউস বা সমান্তরাল ধারার চলচ্চিত্রের বাজার ছিল সীমিত। নিয়মিত কাজ, পারিশ্রমিক ও পরিবার চালানোর নিশ্চয়তা-এসবের জন্য মূলধারার সিনেমাই ছিল বাস্তবসম্মত পথ।দ্বিতীয়ত, দর্শক বিস্তার। সমান্তরাল সিনেমা বুদ্ধিবৃত্তিক দর্শকের কাছে গ্রহণযোগ্য হলেও গ্রামীণ ও প্রেক্ষাগৃহ-নির্ভর বৃহৎ দর্শকের কাছে পৌঁছাতে পারছিল না। ফরীদি বুঝেছিলেন-শিল্পী হিসেবে টিকে থাকতে হলে শুধু প্রশংসা নয়, জনপ্রিয়তাও দরকার।তৃতীয়ত, শিল্পীসত্তার আরেক রূপ। অনেকেই মনে করেন বাণিজ্যিক সিনেমায় যাওয়া মানেই আপস। কিন্তু ফরীদি সেটাকে বানালেন পরীক্ষাগার। তিনি ভিলেন চরিত্রকে একমাত্রিক রাখেননি; মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা, দার্শনিক টান, এমনকি কমিক রঙও যোগ করেছেন। ট্র্যাডিশনাল ফর্মুলার ভেতরেও তিনি নিজস্ব স্বাক্ষর রেখেছেন। ফলে বাণিজ্যিক সিনেমায় গিয়েও তিনি ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে যাননি-বরং আলাদা হয়ে উঠেছেন।

ফরীদির বাণিজ্যিক ধারায় যাত্রা ছিল কৌশলগত। এটি ছিল না শিল্পের প্রতি বিশ্বাস হারানো; বরং শিল্পকে বৃহত্তর পরিসরে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা। তিনি জানতেন-প্রেক্ষাগৃহে টিকে থাকতে হলে দর্শকের ভাষা বুঝতে হবে। তাই তিনি দর্শকের কাছে গেলেন, কিন্তু নিজের অভিনয়-দর্শন বদলালেন না।

ফলে দেখা গেল, তিনি যখন মূলধারার ছবিতে ভিলেন, তখনও চরিত্রের ভেতরে সমাজবাস্তবতার প্রতিফলন রাখছেন। কখনও ক্ষমতার প্রতীক, কখনও লোভের রূপক, কখনও ট্র্যাজিক অ্যান্টিহিরো-এভাবে বাণিজ্যিক কাঠামোর ভেতরেও তিনি আর্টহাউসের গভীরতা ঢুকিয়ে দিলেন।খোদ হুমায়ুন ফরীদি খুব স্পষ্টভাবে বলতেন, তিনি অভিনয় ছাড়া আর কিছুই পারেন না। তাই এটাকেই ধরে নিয়েছিলেন জীবনের একমাত্র পথ। তবে এই পথটাও ছিল দ্বিমুখী। একদিকে ছিল আত্মার টানে করা সিনেমা, যেমন ‘একাত্তরের যীশু’ বা ‘দহন’। আরেক দিকে ছিল মূলধারার সিনেমা, যেগুলো তিনি করেছিলেন অর্থ রোজগারের জন্য।

হুমায়ূন ফরীদি

ফরীদি কখনোই এই দুই ধারার পার্থক্য লুকানোর চেষ্টা করেননি। বরং খানিকটা আক্ষেপ করেই বলেছিলেন, ‘আমি মেইনস্ট্রিমে কাজ করেছি অর্থের জন্য। ওখানে কিছু ভালো কাজ করার চেষ্টাও করেছি কিন্তু হয় না আসলে। ইট ইজ নট পসিবল।’মূলধারার সিনেমায় কাজ করতে গিয়ে রুচির জায়গায় বারবার ধাক্কা খেয়েছেন ফরীদি। সাংস্কৃতিক দিক থেকেও পড়েছিলেন সংকটে। কারণ, যে শিল্পচেতনা তিনি লালন করেন, সেখানে এই সিনেমার চরিত্রগুলো ছিল খুবই মোটা দাগে আঁকা। কে ভালো, কে খারাপ সেটা শুরুতেই বলে দেওয়া হতো। টেকনিক্যাল দিকেও কাজ হতো থেমে থেমে। অভিনেতার শরীরী ভাষার তুলনায় ক্যামেরার ক্লোজআপকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতো।তবুও ফরীদি বিশ্বাস করতেন, সিনেমা হলো আমজনতার মাধ্যম। অর্থাৎ, সেটা মানুষের কাছে পৌঁছাতে না পারলে তার আবেদন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। উদাহরণ হিসেবে বলেছিলেন ‘মনপুরা’ সিনেমার কথা। যেটা দুই ধারার দর্শকের কাছেই জনপ্রিয় হয়েছিল। ফরীদির মতে, সিনেমা তো এমনটাই হওয়া উচিত।

এমনকি মূল্যবোধের জায়গা থেকেও বাণিজ্যিক সিনেমাকে পুরোপুরি অস্বীকার করেননি ফরীদি। কারণ, প্রায় সব সিনেমাতেই শেষ পর্যন্ত সত্যের জয় হয়, মন্দ হেরে যায়। এই ইতিবাচক বার্তাটাকেই তিনি ধরে নিয়েছিলেন সিনেমার এক বিশেষ শক্তি হিসেবে।দর্শকের রুচি যে জায়গায় নেমে গেছে বলে বাংলা সিনেমা নিয়ে যে প্রশ্ন জনপরিসরে ছিল, তার দায় কি শুধুই দর্শকের? এই প্রশ্নে ফরীদি মনে করতেন, জনরুচি তৈরির দায়িত্ব নির্মাতারা ঠিকভাবে পালন করেননি। কিন্তু অভিনেতা হিসেবে ফরীদিদের দায় নেই? তিনি সেই দায় নিজের কাঁধে নেননি। বরং অকপটে বলেছেন, তিনি শুধু বেঁচে থাকার জন্য কাজ করেছেন, কখনো প্রাণ দিয়ে আবার কখনো পেটের দায়ে। আর এই দ্বিধাময় বাস্তবতার মধ্য দিয়েই গড়ে উঠেছেন এক বিস্ময়কর ফরীদি। যিনি অভিনয়ের নেশা-নিরীক্ষা আর ব্যক্তিগত নানা শূন্যতায় নিজেই হয়ে উঠেছিলেন শিল্প ও জীবনের মধ্যবর্তী এক অনন্য চরিত্র।

পরবর্তীতে শহীদুল ইসলাম খোকনের পরিচালনায় বিশ্বপ্রেমিক, ঘাতক, ভন্ড, স্ত্রী হত্যা, সন্ত্রাস, দিনমজুর, বীরপুরুষ, লড়াকু, ঘৃণা, নামক বেশ কিছু বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করলেন। ঘটনাক্রমে সেসব চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন ‘খলনায়ক’ বেশে। তবে এই ঘটনাক্রমই তাকে অনন্য করে তুলেছে বলতে হয়।এরপরেই দেশীয় চলচ্চিত্রে খলনায়কের চরিত্র পায় এক অন্যমাত্রা। অবস্থা এমনই দাঁড়িয়েছিল যে, একসময় মানুষ নায়কের পরিবর্তে তাকে দেখার জন্যই প্রেক্ষাগৃহে যেতো।রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো করে বলতে হয়,ফিরিবার পথ নাহি; দূর হতে যদি দেখ চাহি; পারিবে না চিনিতে আমায়; হে বন্ধু বিদায়। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শেষের কবিতার এই লাইনগুলো কষ্ট, তীব্র বেদনার কথা মনে করিয়ে দেয়। এই পঙক্তি যেন অভিনয়ের বিশ্ববিদ্যালয় হুমায়ূন ফরীদির জীবনকেই ছুঁয়ে যায়। যবে থেকেই ফুসফুস জটিলতাসহ নানা সমস্যার কারণে ভুগছিলেন তিনি কি বুঝতে পেরেছিলেন সম্ভবত সময় খুব বেশি নেই? হয়তো বুঝেছিলেন।তখন থেকেই হয়তো অমোঘ যাত্রার সত্যটা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল তাঁর কাছে।২০১২ সালের (১৩ ফ্রেব্রুয়ারি) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই কবিতার মতোই সবাইকে তীব্র কষ্ট, বেদনায় নিমজ্জিত করে বিদায় নেন এক কিংবদন্তি।বেঁচে থাকলে হয়তো ৭৪ বৎসরে পা দিতেন। সেই সাথে বিশ্ববাসী পেতো আরও বৈচিত্র্যময় চরিত্র।এই অভিনেতার জন্ম ১৯৫২ সালের ২৯ মে, পুরান ঢাকার যোগীনগরে। শৈশবে কাটিয়েছেন বাংলাদেশের নানা জায়গায়।ছোটবেলায় ছন্নছাড়া  স্বভাবের জন্য ফরীদিকে ‘পাগলা’, ‘সম্রাট’, ‘গৌতম’-এমন নানা নামে ডাকা হতো। প্রাথমিক শিক্ষা নিজ গ্রাম কালীগঞ্জে।

পারিবারিক প্রয়োজনে ফরীদির শৈশব কেটেছে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায়, বিশেষ করে চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, যশোর, খুলনা, রাজশাহী এবং পরে ঢাকায়। ‘প্রত্যেকটা শহরের কিন্তু আলাদা একটা গন্ধ থাকে,’ বলেছিলেন ফরীদি। সেই গন্ধ তিনি শুঁকেছিলেন বাবার চাকরির বদলির সুবাদে নানা শহরে ঘুরে ঘুরে। সেটা কখনো ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় দাবার বোর্ডে বাবার পাশে দাঁড়িয়ে, আবার কখনো মাদারীপুর হাইস্কুলে ক্লাস করতে করতে।

নিজের শৈশবকে বলতেন, ‘নাথিং সিগনিফিকেন্ট’।ঘন ঘন স্থান পরিবর্তনের ফলে ছোটবেলাতেই তার ভেতর তৈরি হয় একটি পর্যবেক্ষণশীল মন এবং বিচিত্র মানুষের চরিত্র বোঝার দুর্দান্ত ক্ষমতা এবং সেখানেই তার মধ্যে তৈরি হতে থাকে ভবিষ্যৎ-অভিনেতার বীজ। অভিনয়ের নেশা তাঁর ছোটবেলা থেকেই। স্কুল-কলেজ আর পাড়ার নাটকে নাম না জানা কত চরিত্রে অভিনয় করেছেন! কিন্তু ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর শুরু হয় তাঁর জীবনের আসল ‘নাটক’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জৈব রসায়ন বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন। তবে মুক্তিযুদ্ধের সময় থেমে যায় তাঁর শিক্ষাজীবন। এরপর এ-পথ ও-পথ ঘুরে কীভাবে যে হাওয়া হয়ে গেল পাঁচটা বছর! সে এক উড়নচণ্ডী-জীবন। হুমায়ুন ফরীদির ভাষায়, ‘এ সময় ড্রাগস, ড্রিংকস, গাঁজা কোনোটাই বাদ দিইনি।’

কখনো শ্মশানে, কখনো-বা রেলস্টেশনে কাটে রাত। এই জীবনই তাঁকে হয়তো প্রস্তুত করছিল বড় কিছুর জন্য। একদিন হঠাৎই ফরীদির মনে হলো, ‘না, এবার ফিরতে হবে। লেখাপড়া শেষ করা দরকার।’জীবনভর শুধু অভিনয়ই করে গেছেন। অভিনয় চরিত্র জীবনের বাইরেও তিনি ভীষণ কৌতুকপ্রিয় মানুষ ছিলেন। নাটকের সেটে  নাকি সদা সবাইকে কৌতুকে মাতিয়ে রাখতেন। ‘এত কৌতুক মনে রাখেন কীভাবে’, প্রশ্নের উত্তরে একবার বলেছিলেন, ‘জীবনটাই তো কৌতুক, আমরা কেউ থাকব না, থাকবে শুধু কৌতুক।’ নিজের জীবনের সঙ্গে কৌতুক করতে করতে অস্তাচলে যাওয়া হুমায়ুন ফরীদির অভাব কখনোই পূরণ হওয়ার নয়। জানা যায়, অভিনয়জীবনের মতোই জীবনাচারেও ফরীদি ছিলেন সাবলীল-স্বতঃস্ফূর্ত।উত্তেজনার উত্তুঙ্গে নিয়ে দর্শক-শ্রোতাকে দিবা-নিশি মাতিয়ে রেখেছেন। অসম্ভব ইম্প্রোভাইজ করতে পারতেন। কখনোই স্ক্রিপ্টের গণ্ডিতে আটকা থাকেননি। টেলিভিশন নাটক কিংবা সিনেমা সব আঙ্গিক ভেঙে গড়ে তোলেন নতুন ধারা। এমনকি ব্যক্তি হুমায়ূন ফরীদি হিসেবেও ছিলেন অন্যরকম মতাদর্শের মানুষ। তার জীবনদর্শন মোটেও বাকিদের সাথে মেলানো যেমন যায় না এবং চিন্তাও করা যায় না। তাই ফরীদির চিন্তাধারার উপর প্রেমে পড়াটাও যে অন্যরকম অনুভূতি।

হুমায়ুন ফরিদী'র জন্ম | SUN NEWS BANGLADESH
হুমায়ূন ফরীদি

কিন্তু আমি এখন যে কাজটি করতে যাচ্ছি অভিনয়ের ভেতর চরিত্রকে আত্মস্থ করে নিজস্ব মানদণ্ড তৈরি করা বিরল ক্ষমতাসম্পন্ন  হুমায়ূন ফরীদিকে ঘিরে আমি কিছু ভিন্নধর্মী মতবাক্য তুলে ধরবো। হুমায়ূন ফরীদি যে বড়মাপের অভিনেতা, “দু-একটি বাক্যে তাঁর শিল্পমানকে সংজ্ঞায়িত করা প্রায় অসম্ভব-ফরীদির ব্যাপ্তি তার চেয়েও বহুদূর প্রসারিত।তাই দীর্ঘ সময় নিয়ে তার সম্বন্ধে নিজের ভিন্নধর্মী মতবাক্য তুলে ধরার সৎসাহস করেছি। জানিয়ে রাখি, এই দৃষ্টিকোণটি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত। বিষয়বস্তুর দিক দিয়ে পড়ার আগ্রহ নাও থাকতে পারে অনেকেরই। তার জন্য আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত।সিনেমাপ্রেমী ও গণমাধ্যমের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে হুমায়ূন ফরীদির সামনে বসে সাক্ষাৎকার নেওয়ার ইচ্ছা আমার বহুদিনের। তার জীবনের প্রতি দর্শন, চিন্তাচেতনা ও সিনেমার চরিত্রের প্রতি আনুগত্য বরাবরই আমাকে আকর্ষণ করে। কিন্তু তার অনুপস্থিতির কারণে তার সামনে বসে সাক্ষাৎকার নেওয়ার ইচ্ছা থাকলেও তা আমার পক্ষে কোনোদিন সম্ভব নয়।তাই এই লেখাটিই দূর থেকে রইল তার প্রতি আমার উৎসর্গ।

হুমায়ুন ফরীদি অভিনীত ছবিগুলোর মধ্যে কিছু ছবি আছে যেগুলো তাঁকে কেন্দ্র করে নির্মিত হয়েছে। তিনি সেন্ট্রাল ক্যারেক্টার মানে গল্পের মূলটা তাঁকে ঘিরেই এগিয়েছে। এ ছবিগুলোকে বলা যায় ‘ফরীদিকেন্দ্রিক ছবি।’হুমায়ূন ফরীদির চলচ্চিত্রে অভিনয় প্রসঙ্গে কথা যখন হচ্ছে তাহলে ফুটে আসবে ‘পালাবি কোথায়’ চলচ্চিত্রের কথা। ১৯৯৭ সালে নির্মাণ করেন নারীমুক্তির ফ্যান্টাসি নিয়ে সিনেমা পালাবি কোথায়। এটিই সম্ভবত প্রথাগত-নায়ক বিহীন বাংলাদেশের একমাত্র সিনেমা। হুমায়ুন ফরীদির জীবনে একমাত্র প্রযোজিত সিনেমাও এটি। ফরীদি-খোকন দুজনেরই ড্রিম প্রজেক্ট এই সিনেমাটি অবশ্য ব্যবসায়িকভাবে ব্যর্থ হয়।শহীদুল ইসলাম খোকন পরিচালিত এ ছবিটি মূলত কমেডি ছবি। কমেডির ভেতর পোশাক শ্রমিকদের বাস্তবতা, তাদের উপর হওয়া নির্যাতনের প্রতিবাদ, অসৎ মালিকের শাস্তি এসবই ছবির বিষয়ের মধ্যে আছে।এ ছবিটির কেন্দ্রবিন্দু হুমায়ুন ফরীদিই ছিলেন নেগেটিভ রোলে।'পালাবি কোথায়’ ছবির গল্প আবর্তিত হয় মিড লাইফ ক্রাইসিসে ভোগা একজন নারীলোভী গার্মেন্টস ম্যানেজার হাওলাদারের গল্প, যার একজন সুন্দরী স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও তাঁর লোলুপদৃষ্টি থেকে শাবানা, সুবর্ণা মুস্তাফা, চম্পা কেউ বাদ যায় না।সেইসাথে ছিলেন সুবিধাবাদী এবং অসৎ মালিক।মাত্রাটা এতোই তীব্র হয়ে উঠে তাকে রুখে দেওয়ার জন্য তিনজন নারী প্রতিবাদের আওয়াজ তোলে। গল্পে ম্যানেজার হাওলাদার প্রতিবাদী সেই তিন নারীর কাছে পরাজিত হয়। পরাজিত হয় শোষিত পুরুষ সমাজের।

Palabi Kothae (1997) - IMDb
‘পালাবি কোথায়’ সিনেমার পোষ্টার

বর্তমান সিনেমাগুলোতে একটা বিষয় খুব লক্ষ্য করা যায় তা হলো নেতিবাচক চরিত্রে অভিনেতার অভাব। যার ফলে অনেক সময় এই চরিত্রে সবাই নিজেকে মেলে ধরতে পারে না, তাই বর্তমান সময়ে হালের অনেক নায়কের চরিত্রে অভিনীত ব্যক্তিদের ভিলেনের চরিত্রেও অভিনয় করতে দেখা যায়। সেই সাথে দেখা যায় পাশ্ববর্তী দেশ ভারত থেকে অভিনেতাদের ভিলেনের চরিত্রে অভিনয় করতে।কিন্তু নব্বই দশকে ভিলেন চরিত্রে রীতিমতো প্রতিযোগিতা চলতো। রাজীব, নাসির খান, ডিপজল, আহমেদ শরীফ অভিনেতাদের মাঝে নিজের ম্যাজিক্যাল অভিনয় দিয়ে তিনি সবার শীর্ষে ছিলেন‌।অসংখ্য নেতিবাচক চরিত্রের মাঝেও নিজেকে হাস্যকরধর্মী নেতিবাচক চরিত্রে উপস্থাপন করা চারটে খানে কথা নয়। নারীর প্রতি তীব্র লালসা সেই সাথে কমিক টাইম মিলিয়ে হাস্যকর সংলাপ উপস্থাপনের সাথে জানান দেয় অভিনয়টা শুধু একটা চরিত্র নয়, ধরে নিতে হয় নিজের মৌলিক জীবন।

‘আনন্দ অশ্রু’ সিনেমায় হুমায়ূন ফরীদি

হুমায়ুন ফরীদির অভিনীত অনেক সিনেমায় রয়েছে। তার অভিনয়ের যে একটা সাবলীলতা এবং একটা যে সহজাত ব্যাপার, তা অনেক ক্ষেত্রেই প্রকাশ পায়। তার সিনেমার অভিনীত চরিত্র প্রসঙ্গে যদি আরো ব্যপ্তি করে কথা বলতে বলা হয় তাহলে আসবে ‘আনন্দ অশ্রু’ সিনেমায় অভিনীত দেওয়ান শরীফের চরিত্র। আগেই বলেছি হুমায়ূন ফরীদির বিশেষ গুণ তা হলো চরিত্রের সাথে শিল্পায়ন করা। তারেই একটি প্রমাণ হলো দেওয়ান শরীফ চরিত্র।নেতিবাচক চরিত্র বলতে আমরা শুধু মনে করি একজন খারাপ মানুষ, যে কি না সবকিছু ধ্বংস করতে চায়। কিন্তু নেতিবাচক চরিত্র যে নায়কের একটা অংশ তা হয়তো একটু নতুনভাবে বুঝিয়েছিলেন হুমায়ূন ফরীদি। খলনায়ক হয়েও পুরো সিনেমাতেই নিজের সহজাত অভিনয় দিয়ে স্ক্রিন ধরে রেখেছিলেন এই অভিনেতা । একজন নির্মম পাষাণ সম্পত্তির লোভে যে কতোটা নৃশংস হতে পারে সেই দৃশ্য তিনি পর্দায় এঁকেছিলেন।

তাই হুমায়ুন ফরীদি সবসময় সবার থেকে এগিয়ে ছিলেন অনেকখানি-সেটা অভিনয়ে হোক কিংবা ব্যক্তিত্বে।

Opohoron (অপহরণ) || Humayun Faridi | Subarna Mustafa | Rubel | Sohel Rana  || Superhit Bangla Movie
'অপহরণ' সিনেমার পোষ্টার

অপহরণ সিনেমা ছিলো ভয় আর হাসির মাঝখানে দাঁড়ানো এক খলনায়ক। বাংলা সিনেমার প্রচলিত ধারণা ছিল-খলনায়ক মানেই গম্ভীর মুখ, ভারী কণ্ঠ, আর নির্দয় নিষ্ঠুরতা। পরিচালক শহীদুল ইসলাম খোকন সেই ছকটাকেই উল্টে দিলেন। আর সেই উল্টে দেওয়ার সবচেয়ে বড় অস্ত্র হয়ে উঠলেন হুমায়ুন ফরীদি।এ ছবিতে তিনি ভয়ের মানুষ নন-ভয়ের মাঝেও হাসির মানুষ। ফরীদির খলনায়ক চরিত্রটি হয়ে উঠেছিল কমেডির সংমিশ্রণ ঘটিয়ে। তার চরিত্রটি অপহরণ করে, প্রতিশোধ নেয়, পরিকল্পনা করে-সবই করে। কিন্তু তিনি কখনো প্রচলিত ভিলেন হয়ে ওঠেন না। কারণ তিনি ভয় দেখান না, অস্বস্তি তৈরি করেন তাও আবারতিনি এমনভাবে কথা বলেন যেন নিজের কাজটাকেও খুব সিরিয়াসলি নিচ্ছেন না। চোখে এক ধরনের শিশুসুলভ দুষ্টুমি, মুখে অদ্ভুত নিশ্চিন্ত হাসি—যেন অপরাধ তার কাছে অপরাধ নয়, একটা খেলা। ফলে দর্শক একই সঙ্গে ভয়ও পায়, আবার হাসেও।তার বিখ্যাত সংলাপ “আই আই ও” শুধু শব্দ নয়, ছিল পারফরম্যান্স।কখনো আদেশ, কখনো মজা, কখনো হুমকি-একই শব্দ তিন রকম অর্থ পেত তার কণ্ঠে। সংলাপটি তিনি বলতেন ছন্দে, বিরতিতে, দৃষ্টিতে-ফলে সংলাপ নয়, এক ধরনের সিগনেচার আচরণে পরিণত হয়।এখানেই ফরীদির শক্তি-তিনি সংলাপ বলেন না, সংলাপের চরিত্র তৈরি করেন।তার হাঁটা ছিল সামান্য ঢিলা, বসা ছিল আরামপ্রিয়, আর প্রতিক্রিয়া ছিল দেরিতে-যেন ঘটনাগুলো আগে দর্শক বুঝছে, পরে তিনি বুঝছেন। এই দেরিতে প্রতিক্রিয়া দেওয়া থেকেই তৈরি হতো কমেডি। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই চোখের দৃষ্টি বদলে 

যেতো-দর্শক মনে করত, এই মানুষটি আসলে সাইকো।নায়ক-নায়িকার ট্র্যাক আলাদা, কিন্তু দর্শকের অপেক্ষা থাকত কখন আবার ফরীদি পর্দায় ফিরবেন। কারণ তার উপস্থিতি মানেই দৃশ্যের টোন বদলে যাওয়া। তিনি প্রমাণ করেছিলেন-খলনায়ক শুধু গল্পের বাধা নয়, গল্পের আনন্দও হতে পারে।

'সর্তক শয়তান‌' সিনেমায় হুমায়ূন ফরীদি

শহীদুল ইসলাম খোকন পরিচালিত ছবি সর্তক শয়তান‌। হুমায়ূন ফরীদির ভিলেন ক্যারিয়ারকে চমকপ্রদ করে তোলার পিছনে অনন্য কারিগর ছিলেন; শহীদুল ইসলাম খোকন। শহীদুল ইসলাম খোকন মানেই যে হুমায়ূন ফরীদির নতুন ভিলেনের দর্শন তা সেইসময়কার দর্শকরা রীতিমতো অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলেন।এ ছবিতে ফরীদির এন্ট্রিটাই ছিল ভয়ঙ্কর। খলিল তাঁকে পুষে রাখে। যখন প্রয়োজন পড়ে তখন ব্যবহার করে। একটা করে খুনের প্রয়োজন যখন পড়ে ঠিক তখনই ফরীদিকে স্মরণ করে খলিল। বিনিময়ে পায় নেশার পুরিয়া আর ফরীদির জন্য ওটাই ছিল অমৃত। খলিলের ভাষায় ফরীদি ছিল ‘ঘুমন্ত অজগর’। ফরীদি পুরিয়া পেত আর সোজা যেত খুন করতে। টার্গেট শেষ না করে ফিরত না। কিন্তু খলিলই যখন ফরীদিকে মেরে ফেলার ষড়যন্ত্র করে উল্টো দর্শককে অবাক করে দিয়ে জানিয়ে দেয় নেশার পুরিয়াগুলো একটাও খেত না এবং খলিলই শেষ হয় ফরীদির হাতে। এ ছবিতে প্রথমদিকে ফরীদির লুকটা ছিল ভয়ঙ্কর।বাংলা বাণিজ্যিক সিনেমায় ভিলেন মানেই সাধারণত শক্তির প্রদর্শন। কিন্তু পরিচালক শহীদুল ইসলাম খোকন এই ছবিতে ভিলেনকে শক্তি দিয়ে নয়, চালাকি দিয়ে নির্মাণ করেন। আর সেই চালাকির শরীর হয়ে ওঠেন হুমায়ুন ফরীদি। এই দুই জুটিই চেনা ছকটাই ভেঙে দিলেন।শুরুতে চরিত্রটি যেন নিয়ন্ত্রিত-অন্যের হাতে ব্যবহৃত এক মানুষ। নেশাগ্রস্ত, অস্থির, অনিয়ন্ত্রিত বলে মনে হয় তাকে। কিন্তু ফরীদি অভিনয়ে এমন কিছু সূক্ষ্ম ইঙ্গিত রাখেন, যা বুঝিয়ে দেয়—এ অস্থিরতা আসলে অভিনয়।চোখ পুরো নেশাগ্রস্ত নয়, মাঝে মাঝে স্থির হয়ে যায়। কথা জড়িয়ে গেলেও দৃষ্টি পরিষ্কার। শরীর কাঁপলেও মাথা কাজ করছে। দর্শক ধীরে ধীরে বুঝতে পারে-মানুষটি ভেঙে পড়েনি, সে অপেক্ষা করছে।এই চরিত্রের সবচেয়ে কঠিন জায়গা ছিল-একজন মানুষ, যে নিজেই অভিনয় করছে অন্য চরিত্র হওয়ার জন্য।ফরীদি এখানে দ্বৈত স্তরে অভিনয় করেন: বাইরের স্তর: নেশাগ্রস্ত, উন্মাদ, ব্যবহৃত মানুষ। ভেতরের স্তর: ঠান্ডা মাথার পরিকল্পনাকারী। তিনি সংলাপের আগে ছোট বিরতি রাখেন, যেন ভাবতে কষ্ট হচ্ছে-কিন্তু সেই বিরতিই আসলে হিসাবের সময়। ফলে দর্শক চরিত্রটিকে একসময় ভয় পেতে শুরু করে, কারণ সে বোঝে-এই মানুষটি যা দেখাচ্ছে, তা সে নয়।তার অদ্ভুত সংলাপ “ইয়া হিয়া হিয়া” ছিল শুধু ভয় ধরানোর শব্দ নয়, মানসিক খেলার অংশ।কখনো তা হাসি, কখনো হুমকি, কখনো সতর্কতা-একই উচ্চারণে তিন রকম আবহ তৈরি করতেন তিনি।এটি ছিল চরিত্রের পরিচয়, আবার বিভ্রান্তির অস্ত্রও।

'ঘাতক' সিনেমায় হুমায়ূন ফরীদি

 মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশের অস্থির বাস্তবতা নিয়ে হুমায়ূন ফরীদির নতুন ছবি মুক্তি পায় ঘাতক। এই ছবিতে পরিচালক শহীদুল ইসলাম খোকন বেছে নিয়েছিলেন ঝুঁকিপূর্ণ এক বিষয়-রাজাকারদের ছায়া, তাদের প্রভাববলয়, আর ক্ষমতার নোংরা রাজনীতি। এই ঝুঁকির সবচেয়ে ভারী বোঝাটা কাঁধে তুলে নেন হুমায়ুন ফরীদি। আর সেই বোঝাই তাকে করে তোলে ছবির কেন্দ্রবিন্দু।মস্ত বড় দাড়ি, মাথায় টুপি-এই গেটআপেই ফরীদি দর্শকের সামনে হাজির হন একেবারে নতুন মানুষ হয়ে। এখানে তিনি চিৎকার করেন না, হুংকার দেন না। বরং তার অন্যায়ের জন্ম নেয় সংযমে।চোখের দৃষ্টি স্থির, কণ্ঠ নিচু, সংলাপ ছোট-সবকিছু যেন “টু দ্য পয়েন্ট”। এই সংক্ষিপ্ততাই চরিত্রটিকে করে তোলে আরও ভীতিকর। দর্শক বুঝে যায়, এই মানুষটি কথা কম বলে, কিন্তু সিদ্ধান্ত নেয় দ্রুত।অন্যরা যখন আবেগে কথা বলে, তিনি সিদ্ধান্তে কথা বলেন। ফলে দৃশ্যের ভারসাম্য তার দিকে ঝুঁকে পড়ে।

তার চরিত্রটি সরাসরি গুলি চালায় না, হাতও খুব একটা নোংরা করে না। বরং তিনি বলয় তৈরি করেন-মানুষের মধ্যে বিভাজন, সন্দেহ, দ্বন্দ্ব ঢুকিয়ে দেন।মনে হয়, তিনি যা করছেন তা অপরাধ নয়, বরং তার কাছে ন্যায্য।এই চরিত্রায়ণে ফরীদি এমন এক মানসিক কাঠামো দাঁড় করান, যেখানে বাস্তব ইতিহাসের প্রতিধ্বনি শোনা যায়-বিশেষত গোলাম আযম-কে ঘিরে গড়ে ওঠা ক্ষমতার বলয়ের স্মৃতি।ফরীদি এখানে কাউকে আদেশ দেন না-ইঙ্গিত দেন। আর সেই ইঙ্গিতেই চরিত্ররা নিজেদের সর্বনাশ ডেকে আনে।শাবানা, আলমগীর, রুবেল-তিনজনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে তিনি যেন অদৃশ্য সুতো টানেন। কখনো এক পক্ষকে উসকে দেন, কখনো আরেক পক্ষকে শান্ত করেন।এই দ্বিমুখী খেলায় তার মুখভঙ্গি বদলায় না-বদলায় কেবল চোখের দৃষ্টি। এখানেই ফরীদির অভিনয়ের সূক্ষ্মতা: তিনি আবেগ দেখান না, আবেগ চালান।

ভয়ঙ্কর হুমায়ূন ফরীদি - বাংলা মুভি ডেটাবেজ
'স্ত্রী হত্যা ' সিনেমায় হুমায়ূন ফরীদি

কোনো অভিনেতার সাফল্যের সবচেয়ে বড় প্রমাণ কী?যখন দর্শক ভুলে যায় যে সে সিনেমা দেখছে।“স্ত্রী হত্যা” ছবিতে হুমায়ুন ফরীদি ঠিক সেই জায়গাটিতেই পৌঁছে গিয়েছিলেন। একজন দর্শক নাকি সিনেমা হলে বসেই চিৎকার করে উঠেছিলেন-মনে হয়েছিল, পর্দার ভেতরের মানুষটি যেন বাস্তবেই তার দিকে এগিয়ে আসছে। এই প্রতিক্রিয়াই বলে দেয়, ফরীদি শুধু অভিনয় করেননি, ভয়কে জীবন্ত করে তুলেছিলেন।সাপের বিষ খাওয়ার দৃশ্যটি ছবির অন্যতম ভয়ঙ্কর মুহূর্ত।“বিষে বিষক্ষয়”-এই সংলাপটি তিনি বলেন এমন এক স্থিরতায়, যা শিরদাঁড়া ঠান্ডা করে দেয়। মুখে অদ্ভুত প্রশান্তি, চোখে অস্বাভাবিক জেদ, আর কণ্ঠে নিচু কিন্তু কাঁপন তোলা ভার-এ যেন নিজের মৃত্যুকেও চ্যালেঞ্জ করা এক মানুষ।এখানে ফরীদি শরীর দিয়ে অভিনয় করেন। ঠোঁটের কোণে সামান্য টান, গলার শিরা ফুলে ওঠা, চোখের মণির স্থিরতা-সব মিলিয়ে দৃশ্যটি হয়ে ওঠে ভয় আর বিস্ময়ের মিশ্রণ। ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক সেই আতঙ্ককে আরও ঘনীভূত করে, কিন্তু তার উপস্থিতিই আসল সুর তৈরি করে।নায়ক জসিম-এর সঙ্গে বাকবিতণ্ডার দৃশ্যগুলোয় ফরীদি একেবারে অন্য মাত্রায় যান। সেখানে শক্তি বনাম শক্তির লড়াই নয়-মনস্তত্ত্ব বনাম শক্তির লড়াই।জসিম যেখানে শারীরিক উপস্থিতিতে প্রভাব ফেলেন, ফরীদি সেখানে মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি করেন।তার গেটআপ-চুল, চোখের অভিব্যক্তি, পোশাক-সব মিলিয়ে চরিত্রটিকে করে তোলে এক অস্বস্তিকর ছায়া।

'বিশ্বপ্রেমিক' সিনেমায় হুমায়ূন ফরীদি

এইবারও শহীদুল ইসলাম খোকন। বলা যায়, বিশ্বপ্রেমিক ছিলো বাংলাদেশের সিনেমা ইতিহাসের প্রথম সাইকোলজিক্যাল সিনেমা। হুমায়ুন ফরীদি এ ছবিতে একজন সাইকো চরিত্রের অভিনেতা। মেয়েদের তিল নিয়ে তাঁর একটা মানসিক সমস্যা কাজ করে। তিল কেটে ফেলে ভয়ঙ্করভাবে। এভাবে মৌসুমীর প্রেমে পড়ে যায় এবং মৌসুমীর প্রেমিক রুবেলের সাথে বন্ধু থেকে শত্রুতায় গড়ায়।খলনায়কের মধ্যে দেখানো হিরোইজম গোটা ঢালিউডে এ ধরণের ছবি খুব কম হয়েছে। এ ছবির ‘তোমরা কাউকে বোলো না’ গানটি পুরো ঢালিউডে মাইলফলক। এটা ছাড়াও ‘একই কথা শুনাইলি রে’ গানটিতেও তার রকিং পারফরম্যান্স ছিল। পুরো ছবিতেই তাঁর গেটআপে খলনায়কের হিরোইজম ছিল। এটাও কেন্দ্রীয় চরিত্রে মাস্টারপিস।

May be an image of text that says
'আজকের হিটলার' সিনেমার পোষ্টার

আজকের হিটলার- ছবিটিতে হুমায়ূন ফরীদি দেখিয়েছিলেন স্বার্থের কাছে রক্তও তুচ্ছ। পরিচালক এ জে রানা এই ছবিতে নির্মাণ করেছিলেন এক নির্মম ক্ষমতার প্রতিকৃতি-যেখানে মানুষ নয়, স্বার্থই শেষ কথা। আর সেই স্বার্থপর নিষ্ঠুরতার মুখ হয়ে ওঠেন হুমায়ুন ফরীদি।এখানে তিনি শুধু খলনায়ক নন, এক মানসিক শাসক। একজন মানুষ, যে নিজের ক্ষমতার জন্য নিজের রক্ত- ছেলে, পুত্রবধূ, এমনকি স্বার্থের পথে দাঁড়ানো কাউকেই তিনি রেহাই দেন না।এই নিষ্ঠুরতাকে তিনি উপস্থাপন করেন আবেগহীন মুখে-চোখে কোনো অনুশোচনা নেই, কণ্ঠে কোনো কাঁপন নেই। বরং সংলাপগুলো উচ্চারণ করেন এমন স্বাভাবিকতায়, যেন এটি তার কাছে খুব সাধারণ সিদ্ধান্ত।ছবির আরেকটি ইন্টারেস্টিং দিক ছিল দিলদার–এর সঙ্গে তার বন্ধুত্ব।এই বন্ধুত্বে ছিল কৌতুক, আবার অস্বস্তিও। ফরীদি এখানে কখনো মৃদু হাসেন, কখনো স্নেহ দেখান-কিন্তু সেই স্নেহের ভেতরেও থাকে নিয়ন্ত্রণের ছায়া।এই দ্বৈত রসায়নই চরিত্রটিকে একমাত্রিক হতে দেয়নি।তিনি শুধু পাষণ্ড নন, এক কৌশলী মানুষ-যিনি জানেন কাকে কখন ব্যবহার করতে হয়।

'ঘৃণা' সিনেমায় হুমায়ূন ফরীদি

ঘৃণা ছবিতে ফরীদির এন্ট্রি সিনই ছিল ভয়ঙ্কর। খলিলের ভাইকে মেরে ফেলে। রুবেলের পুরো পরিবারকে শেষ করে দেয়। রুবেল প্রতিশোধ নিতে ফরীদিকে কৌশলে জব্দ করে। এটিএম শামসুজ্জামান ছিল ফরীদির সবচেয়ে কাছের বুদ্ধিদাতা কোরবান চাচা। তাঁকে খুব বিশ্বাস করে। সেই তাকেই ভাতের সাথে বিষ মাখানোর মিথ্যা অজুহাতে ফরীদির হাতে খুন করায় রুবেল। এটিএমকে খুন করার সময় ফরীদি ছিল ভয়ঙ্কর।

'মাতৃত্ব' সিনেমায় হুমায়ূন ফরীদি ও মৌসুমী

অভাব যেন তাদের সংসারের চিরচেনা ছায়া। স্বামী চুরির সঙ্গে জড়িত, আর স্ত্রী অন্যের বাড়িতে কাজ করে কোনোরকমে চুলো জ্বালান। দারিদ্র্যই যেন ছিল একমাত্র নিয়তি-তার সঙ্গে যুক্ত হয় আরেক গভীর শূন্যতা, মাতৃত্বহীনতার দীর্ঘশ্বাস।তবু আশার প্রদীপ একদিন জ্বলে ওঠে। বহু প্রতীক্ষা আর প্রার্থনার পর তার গর্ভে আসে নতুন প্রাণের আভাস। অনাগত সন্তানকে ঘিরে দরিদ্র এই নারীর মনে বুনতে থাকে ছোট ছোট স্বপ্ন-অভাবের ভাঙা ঘরেও যেন একটু আলো নামবে, জীবনের মানে বদলে যাবে।কিন্তু সেই স্বপ্নও নিরাপদ থাকেনি। সন্তানের জন্য অতি কষ্টে জমানো সামান্য সঞ্চয়ে নজর পড়ে স্বামীর। অর্থ তুলে দিতে অস্বীকৃতি জানানোই যেন তার অপরাধ। ক্ষোভ ও লালসার অন্ধত্বে স্বামী যে নির্মম আঘাত হানে, তা কেবল একজন নারীর শরীরেই নয়-তার মাতৃত্বের স্বপ্নেও আঘাত করে।অভাবের গল্প এ দেশে নতুন নয়। কিন্তু যখন দারিদ্র্যের সঙ্গে সহিংসতা হাত মেলায়, তখন তা শুধু একটি পরিবারের নয়-সমাজের নৈতিক দেউলিয়াত্বের প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। এই ঘটনায় প্রশ্ন জাগে, অভাব কি মানুষকে নিষ্ঠুর করে তোলে, নাকি আমাদের সামাজিক নীরবতাই এমন নিষ্ঠুরতাকে প্রশ্রয় দেয়? আর এই চরিত্রেই হুমায়ূন ফরীদি অভিনয় করেন জাহিদ হোসেনের ‘মাতৃত্ব’ ছবিতে। অনবদ্য অভিনয়ে পুরো ছবিতে হুমায়ূন ফরীদিই হয়ে উঠেন প্রধান আকর্ষণ।এই গুনী অভিনেতার একমাত্র জাতীয় পুরস্কার অর্জন এই সিনেমা দিয়েই। এই সিনেমায় উনার স্ত্রীর ভূমিকায় ছিলেন মৌসুমী।

Dahan (1985) - IMDb
'দহন' সিনেমার পোষ্টার

এইবার ফরীদির আউট অফ দ্যা বক্স সিনেমা নিয়ে কথা বলা যাক। শেখ নিয়ামত আলীর চলচ্চিত্র দহন। এর আগে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে অভিনয় করলেও হুমায়ূন ফরীদির মূলধারার চলচ্চিত্রে এই সিনেমায় দিয়েই অভিষেক হয়।একজন বেকার যুবক,যার উপর পরিবারের দায়িত্ব এসে পড়ে, প্রেমে পড়েন এক ধনীর আদুরে কন্যার। নিজের বেকারত্ব, সংসার, ভালোবাসা নিয়ে মানসিক টানাপোড়নে পড়া এই চরিত্রে হুমায়ূন ফরীদির অনবদ্য অভিনয় এখনো দর্শকদের মনে গেঁথে আছে। প্রথম ছবিতেই অর্জন করেন বাচসাস পুরস্কার, ছবিটিও বিভিন্ন শাখায় জাতীয় পুরস্কার অর্জন করে। দর্শক-সমালোচক সবার কাছেই এই সিনেমা সমান প্রিয়। দহনে ফরীদির সহশিল্পী ছিলেন ববিতা, আসাদুজ্জামান নূর, আবুল খায়ের।

Ekattorer Jishu (1993) - IMDb
'একাত্তরের যীশু' সিনেমার পোষ্টার

একাত্তরের যীশু- অপরাধবোধের ভিতর দিয়ে জন্ম নেওয়া এক মানুষ।মুক্তিযুদ্ধের গল্পে আমরা সাধারণত বীরত্ব দেখি, ত্যাগ দেখি, আত্মদান দেখি। কিন্তু এই ছবিতে দেখা যায় মানুষের ভেতরের ভাঙন-ভয়, দুর্বলতা, এবং সেই দুর্বলতা থেকে জন্ম নেওয়া আজীবন অপরাধবোধ। পরিচালক নাসির উদ্দিন ইউসুফ যে জায়গায় গল্পটিকে দাঁড় করান, সেখানে যুদ্ধ শুধু ময়দানে নয়, মানুষের আত্মার ভেতরেও ঘটে।এই যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন হুমায়ুন ফরীদি।ফরীদি এখানে প্রচলিত নায়ক নন আবার কোনো চরিত্রও নয়; এই যেনো আশেপাশে থাকা আমজনতার ভাঙা মানুষের প্রতিকৃতি।

তিনি অস্ত্রধারী মুক্তিযোদ্ধা নন, আবার সরাসরি বিশ্বাসঘাতকও নন-তিনি একজন সাধারণ মানুষ, যিনি কঠিন বাস্তবতার কাছে পরাজিত। আর এই হার মানার মুহূর্তটিকেই ফরীদি অভিনয়ের সবচেয়ে কঠিন জায়গায় নিয়ে যান।যে দৃশ্যে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের পরিচয় বলে ফেলেন-সেখানে চিৎকার নেই, নাটকীয়তা নেই, অতিনাটকীয় মুখভঙ্গিও নেই। বরং আছে জমাট নীরবতা। ঠোঁট শুকিয়ে যাওয়া, চোখের দৃষ্টি এড়িয়ে যাওয়া, শরীরের অস্বস্তিকর স্থিরতা-এই সূক্ষ্ম পরিবর্তনগুলো দিয়ে তিনি বোঝান, মানুষটি ভেঙে পড়েছে ভেতরে ভেতরে, সিদ্ধান্তটা সে নেয়নি বরং কঠিন বাস্তবতা তাকে এই পথ বেছে নিতে বাধ্য করেছে।মুক্তিযোদ্ধাদের ক্রুশবিদ্ধ করার দৃশ্যে তার অভিনয় চূড়ায় পৌঁছায়। তিনি কাঁদেন না-বরং কাঁদতে পারেন না। এখানেই হুমায়ূন ফরীদি তার ভার্সেটাইল অভিনয় গুণে দর্শকদের দর্শক না বানিয়ে বরং সাক্ষী বানিয়ে ফেললেন। চোখ স্থির, কিন্তু দৃষ্টি পালাচ্ছে। মুখ শুকনো, কিন্তু ভেতরে প্রচণ্ড আর্তনাদ। শরীর স্থির, অথচ হাত কাঁপছে।এখানে ফরীদি সংলাপ দিয়ে নয়, নীরবতার স্থায়িত্ব দিয়ে অভিনয় করেন।তিনি দৃশ্য দেখেন না-দৃশ্য তাকে দেখে। এই দ্বৈত অবস্থাই দৃশ্যটিকে ভয়াবহ করে তোলে। দর্শক বুঝতে পারে-যন্ত্রণা শুধু যারা পেরেক খাচ্ছে তাদের নয়, এই মানুষটিও এক ধরনের মানসিক ক্রুশে ঝুলে গেছে।ছবির পরের অংশে তার চরিত্র বেঁচে থাকে, কিন্তু স্বাভাবিকভাবে নয়।তার হাঁটা ধীর হয়ে যায়, কথার আগে বিরতি বাড়ে, চোখ মানুষের দিকে স্থির থাকে না-যেন তিনি সারাক্ষণ নিজের ভেতরের আদালতে দাঁড়িয়ে আছেন।এই অপরাধবোধকে তিনি কোনো নাটকীয় অনুতাপে রূপ দেননি। তিনি ক্ষমা চান না, নিজেকে নির্দোষও প্রমাণ করেন না। বরং পুরো মানুষটিই হয়ে ওঠে এক জীবন্ত স্বীকারোক্তি। তাই নিঃসন্দেহে “একাত্তরের যীশু”তে হুমায়ুন ফরীদি অভিনয় করেননি- তিনি একটি বিবেকের জন্ম ও মৃত্যুকে বাঁচিয়ে রেখেছেন।

'ব্যাচেলর ' সিনেমায় হুমায়ূন ফরীদি ও ইলোরা গওহর

একজন অভিনেতার অভিনয় পাকাপোক্ত করতে হলে তাকে ম্যাজিশিয়ান হতে হয়। সেটি যেই চরিত্রেই হোক না কেন, অভিনয় দক্ষতা গুণে তা সবার কাছে নজির হয়ে উঠে। তেমনি আরো একটি মিড লাইফ ক্রাইসিসে ভোগা চরিত্রে করেছিলেন ‘ব্যাচেলর’ সিনেমায়। চরিত্রটি স্বল্প খানিকের হলেও তখনকার সময়ে দাঁড়ানো তরুণ নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ফরীদিকে উপস্থাপন করেন নতুন এক ফরীদিকে।আবরার ভাই, চিরকুমার সংঘের সভাপতি। নারী ঘেঁষা তার দুচোখের বিষ; নারীদের প্রতি চরম বিতৃষ্ণা থেকেই একবার বলে ফেলেছিলেন, 'আমি তো ভাবতেই পারি না যে আমার ফ্ল্যাটের বারান্দায় একজন মহিলার পেটিকোট ঝুলছে। উফ, ডিসগাস্টিং'।তিনি নিজে তো ব্যাচেলর, সেই সাথে আবার ব্যাচেলরদের ফ্ল্যাট ভাড়া দেন। কিন্তু তার একটাই দূর্বলতা, তা হলো সিনেমার আকর্ষণ‌‌। কিন্তু নারী বর্জিত আবরার ভাই সিনেমার সংলাপ বুঝাতে গিয়ে একদিন একজন নারীকে জড়িয়ে ধরলেন, সেই থেকে শুরু হয় তার বিচলিত পথহাঁটা। অনুভব করছেন মহাপাপ করে ফেলেছেন, জ্বর চলে আসে তার।এই চরিত্রে হুমায়ূন ফরীদি নিজের কমফোর্টজনের বাইরে গিয়ে নিজেকে যেইভাবে তুলে ধরেছেন তা তরুণ বয়সে প্রেমে পড়ার কথা মনে করিয়ে দেয়।

'অনেক দিনের আশা' সিনেমায় হুমায়ূন ফরীদি

খলচরিত্রে অভ্যস্ত দর্শকের কাছে হুমায়ূন ফরীদির উপস্থিতি মানেই ছিল অস্থিরতা-তিনি পর্দায় কী অঘটন ঘটাবেন, সেই উৎকণ্ঠা। নব্বইয়ের দশকে তাঁর ভিলেন-ইমেজ এতটাই প্রভাবশালী ছিল যে, চরিত্রের নৈতিক রঙ বদলালেই দর্শক প্রথমে যেমন একদিকে বিস্মিত হতো অন্যদিকে ভিলেন চরিত্রে দেখার জন্য উৎফুল্ল থাকতো। কিন্তু অনেক দিনের আশা সিনেমায় গরিব দারোয়ান, অবহেলিত ও লাঞ্ছিত পিতার ভূমিকায় তিনি যে অভিনয়ভাষা নির্মাণ করেছিলেন, সেটি ছিল তাঁর শিল্পীসত্তার এক মৌলিক পুনরাবিষ্কার।এই চরিত্রে তিনি সংলাপের উচ্চারণে নয়, নীরবতার ব্যবহারে শক্তি দেখিয়েছেন। চোখের ভেতরের ভাঙন, শরীরী ভঙ্গির সংকোচন, কথার আগে দীর্ঘ বিরতি-এসবের মাধ্যমে তিনি এক অসহায় পিতৃত্বকে বাস্তব ও স্পর্শযোগ্য করে তুলেছিলেন। সন্তানের জন্য সর্বস্ব উজাড় করা মানুষটির অপমান তিনি অতিনাটকীয় করে তোলেননি; বরং সংযত আবেগে উপস্থাপন করেছেন, যা দর্শককে চমকায় না, নিস্তব্ধ হতে বাধ্য করেছিলো।গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শক্তিশালী সহ-অভিনেতাদের উপস্থিতিতেও দৃশ্যের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠা। ববিতা, তারিক আনাম খান, ডলি জহুর কিংবা এটিএম শামসুজ্জামানের মতো প্রতিষ্ঠিত শিল্পীরা পর্দায় থাকলেও, ফরীদির অভিনয় এক অদৃশ্য চুম্বকের মতো দৃষ্টি টেনে নিয়েছে। এটি কোনো কৌশলী আধিপত্য নয়; বরং চরিত্রের গভীরে প্রবেশ করার ক্ষমতা থেকেই আসা এক অনিবার্য প্রভাব।

Durotto | দূরত্ব | Humayun Ahmed Movie | Humayun Faridi | Suborna Mustafa |  Jayanta Chattopadhyay
'দূরত্ব' সিনেমার পোষ্টার

হুমায়ূন ফরীদি অভিনীত 'দূরত্ব' (২০০৪) সিনেমাটি হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসের উপর ভিত্তি করে মোরশেদুল ইসলাম পরিচালিত একটি শিশুতোষ চলচ্চিত্র। এটি সমাজের ধনী-দরিদ্রের মধ্যে দূরত্ব এবং শিশুদের নিঃসঙ্গতা নিয়ে গল্প বলে।উচ্চবিত্ত পরিবারের একমাত্র সন্তান পুতুল (ফাহাদ অভিনীত) তার ব্যস্ত মা-বাবা-হুমায়ূন ফরীদি ও সুবর্ণা মুস্তাফা সময়ের  অভাবে একাকীত্বে জর্জরিত। একদিন বাড়ি থেকে পালিয়ে সে নিম্নবিত্ত শিশু অন্তু (অমল) ও মরিয়মের (মিথিলা) সঙ্গে মিলিত হয়, যারা বস্তির জীবনযাপন করে। এই বন্ধুত্বের মাধ্যমে পুতুল অনুভব করে সম্পদের অতিরিক্ততা কীভাবে আত্মীয়তার দূরত্ব সৃষ্টি করে, আর দারিদ্র্য কীভাবে মানবিক সংহতি জন্মায়।হুমায়ূন ফরীদির অভিনয়ে পুতুলের বাবা চরিত্রটি শুধু ধনী ব্যবসায়ী নয়, একজন অসহায় পিতা, যিনি ছেলের নিরুদ্দেশ্য হওয়ায় পুলিশ, মিডিয়ার ফোনকে মোকাবেলা করতে হয় হাজার কষ্ট উপেক্ষা করেও।

শিশুতোষ আখ্যা থাকলেও ‘দূরত্ব’ আসলে সম্পর্কের অনুপস্থিতি নিয়ে নির্মিত এক সামাজিক পাঠ। সেই পাঠের কেন্দ্রে উচ্চবিত্ত পিতার ভূমিকায় হুমায়ূন ফরীদি এমন এক অভিনয় নির্মাণ করেন, যা বাহ্যিক সাফল্য ও অন্তর্লীন শূন্যতার দ্বন্দ্বকে স্পষ্ট করে তোলে।প্রথমত, তাঁর চরিত্রটি একমাত্রিক ধনী ব্যবসায়ী সাফল্যনির্ভর এক ব্যস্ত মানুষ। শুরুতে তিনি নিয়ন্ত্রণে অভ্যস্ত এবং সময়ের অভাবে আবেগকে প্রায় অনিবার্যভাবে উপেক্ষা করা মানুষ। সংলাপের ভঙ্গি মাপা, শরীরী ভাষা সংযত-একজন কর্পোরেট অভিভাবকের স্বাভাবিক বহিঃপ্রকাশ। চোখে ক্লান্তির ছাপ, কথার ভেতরে অন্যমনস্কতা-এসবের মাধ্যমে তিনি বুঝিয়েছেন, অর্থনৈতিক সাফল্য কখনো কখনো ব্যক্তিগত সম্পর্কের ঘাটতি ঢাকতে পারে না।কিন্তু সন্তানের নিরুদ্দেশ হওয়ার পর অভিনয়ের রঙ পাল্টে যায়। পুলিশের সঙ্গে কথোপকথনে কণ্ঠের দৃঢ়তা থাকলেও, ভেতরে জমে থাকা উৎকণ্ঠা ধীরে ধীরে প্রকাশ পায় চোখের দৃষ্টিতে, হঠাৎ থেমে যাওয়া বাক্যে, অপ্রস্তুত নীরবতায়।মিডিয়ার ফোন সামলাতে গিয়ে অস্থিরতার আড়াল করা চেষ্টা-এই দৃশ্যগুলোতে তাঁর পরিচয় বদলে যায় যেখানে কেবল তিনি সফল ব্যবসায়ী নয়-ধনসম্পদের আড়াল সরে গিয়ে সামনে আসে এক দায়িত্বহীনতার ভারে নত, সাধারণ মানুষের সারিতে নেমে আনা অনুশোচনায় বিদ্ধ পিতৃত্ব।ফরীদি এখানে উচ্চস্বরে কান্না বা অতিরঞ্জিত আবেগে যাননি। বরং এক ধরনের চাপা আতঙ্ক তৈরি করেছেন-যা একজন বাবার সামাজিক অবস্থানকে অতিক্রম করে ব্যক্তিগত অসহায়তায় পৌঁছে দেয়। মিডিয়ার ফোন, প্রশাসনিক চাপ—সবকিছুর মাঝেও তাঁর শরীরী ভাষায় স্পষ্ট হয় এক ধরনের ভেঙে পড়া মানুষ, যিনি বুঝতে শুরু করেছেন অর্থের প্রাচুর্য সম্পর্কের শূন্যতা পূরণ করতে পারে না।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তিনি চরিত্রটিকে অনুশোচনার দিকে ধীরে ধীরে নিয়ে গেছেন।ফরীদি চরিত্রটির অপরাধবোধকে সরাসরি উচ্চারণ করেন না। বরং সন্তানের অনুপস্থিতির অপরাধবোধ তাঁর চোখে যেন আয়না হয়ে দাঁড়ায়। তাঁর নীরবতা ও দৃষ্টির ভেতর জমে থাকা অনুশোচনা চলচ্চিত্রটির সামাজিক বার্তাকে আরও শক্তিশালী করে। ‘দূরত্ব’-এ হুমায়ূন ফরীদি প্রমাণ করেন, পিতৃত্বের ব্যর্থতা ও বেদনাকে বড় সংলাপের প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন সঠিক মাত্রার নীরবতা।

আতিকুল হক চৌধুরীর প্রযোজনায় ‘নিখোঁজ সংবাদ’ ফরীদির অভিনীত প্রথম টিভি নাটক। আশির দশকের দর্শকদের নিশ্চয়ই বিটিভির ‘ভাঙ্গনের শব্দ শুনি’তে (১৯৮৩) সেরাজ তালুকদারের কথা মনে আছে। সেলিম আল দীনের রচনা ও নাসির উদ্দীন ইউসুফের পরিচালনায় এই নাটকে ফরীদিকে দেখা যায় টুপি-দাড়িওয়ালা শয়তানের এক জীবন্ত মূর্তিরূপে। ‘আরে, আমি তো জমি কিনি না, পানি কিনি, পানি’, ‘দুধ দিয়া খাইবা না পানি দিয়া খাইবা বাজান’, এই ডায়ালগ তখন তুমুল জনপ্রিয়। এরপর শহীদুল্লা কায়সারের ‘সংশপ্তক’-এ (১৯৮৭-৮৮) ‘কান কাটা রমজান’ চরিত্রে ফরীদির অনবদ্য অভিনয় কেউ ভোলেনি। ভোলা কি যায়! অসম্ভব! “সংশপ্তক” নাটকে ‘কান কাটা রমজান’ চরিত্রের অভিনয় যারা দেখেছেন তাঁরা হুমায়ূন ফরীদিকে স্থান দিয়েছেন পরাণের একেবারে গহীনে। ‘দুই ভুবনের দুই বাসিন্দা’, ‘একটি লাল শাড়ি’, ‘নীল নকশার সন্ধানে’ (১৯৮২), ‘দূরবীন দিয়ে দেখুন’ (১৯৮২),‘বকুলপুর কতদূর’ (১৯৮৫), ‘মহুয়ার মন’ (১৯৮৬), ‘সাত আসমানের সিঁড়ি’ (১৯৮৬) ‘একদিন হঠাৎ’ (১৯৮৬), ‘ও যাত্রা’ (১৯৮৬) ‘পাথর সময়’, ‘সমুদ্রে গাঙচিল’ (১৯৯৩), ‘চন্দ্রগ্রস্থ’ (২০০৬), ‘কাছের মানুষ’ (২০০৬), ‘কোথাও কেউ নাই’ (১৯৯০), ‘মোহনা’ (২০০৬), ‘ভবের হাট’ (২০০৭), ‘জহুরা’, ‘আবহাওয়ার পূর্বাভাস’, ‘প্রতিধ্বনি’, ‘শৃঙ্খল’(২০১০), ‘প্রিয়জন নিবাস’ (২০১১), ‘অক্টোপাস’, ‘আরমান ভাই দি  জেন্টেলম্যান’সহ (২০১১) আরও অনেক নাটকে বিরামহীনভাবে দর্শকদের হাসিয়েছেন, কাঁদিয়েছেন।

তিনি নাট্যদল আরণ্যক নাট্যদল-এ যোগ দেন এবং বিখ্যাত মঞ্চনাটক ‘শকুন্তলা’, ‘কেরামত মঙ্গ ‘, ‘ভাঙাচোরা’, ‘মুনতাসির ফ্যান্টাসি’- তে অভিনয় করেন। তার শরীরী ভাষা, কণ্ঠের গভীরতা এবং তীক্ষ্ণ চোখের এক্সপ্রেশন তাকে মঞ্চে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেয়।টিভি নাটকে হুমায়ুন ফরীদির অভিনয় ছিল অনন্য-অসাধরণ। যখন যে চরিত্রে ছিলেন মনে হতো এ চরিত্র শুধু যেনো তাঁর জন্যই সৃষ্টি। তিনি চরিত্রের মধ্যে প্রবেশ করতেন, না চরিত্র তাঁর মধ্যে তা বুঝা মুশকিলই ছিল। সব চরিত্রকেই তিনি ভিন্নমাত্রায়, ভিন্ন আঙ্গিকে রূপায়ন করেছেন তাঁর বহুমাত্রিক অভিনয় প্রতিভার মাধ্যমে। টিভি পর্দায় হুমায়ুন ফরিদীর নাটক মানেই দর্শক চাহিদার, অন্যরকম ভালো লাগার যোজনা। অভিনয়ের মায়াজালে টিভি’র সামনে দর্শক-শ্রোতাদের বসিয়ে রাখার এক যাদুকরি ঐন্দ্রজালিক ক্ষমতা ছিল তাঁর । হুমায়ূন ফরিদীর অভিনয় গুণে নাটকের চরিত্রগুলো এতো প্রানবন্ত, এতো জীবন্ত হয়ে উঠত, যেন আমাদের চারপাশের মানুষগুলোই দেখতে পাচ্ছি টিভি’র পর্দায়।

শীতের পাখি (১৯৯০) । হুমায়ুন ফরিদী, খালেদ খান, শম্পা রেজা । Shiter Pakhi |  Humayun Faridi | Natok
'শীতের পাখি' নাটকে হুমায়ূন ফরীদি

হুমায়ূন ফরীদির অভিনয় ‘শীতের পাখি’ নাটকে এক অসাধারণ মাপের সৃষ্টি ছিল, যা দর্শকের মনে গভীর দাগ ফেলেছে। ফেরদৌস হাসানের এই অনবদ্য রচনায় তিনি সেই যুবকের ভূমিকায় নিজেকে এতটাই মগ্ন করে তুলেছিলেন যে, মুক্তিযুদ্ধের পর দেশে ফিরে আত্মদহনে ভুগতে থাকা চরিত্রটির যন্ত্রণা যেন স্পর্শযোগ্য হয়ে উঠেছিল।মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ফিরে আসা এক মানুষের ভেতরকার বিচ্ছিন্নতা ও অপরাধবোধকে পর্দায় জীবন্ত করে তোলা সহজ কাজ নয়। এই জটিল মানসিক স্তরটিকেই নিজের অভিনয়ের কেন্দ্রে স্থাপন করেছিলেন হুমায়ূন ফরীদি। তিনি চরিত্রটি অভিনয় করেননি; বরং চরিত্রের অনুতাপ, অনিশ্চয়তা ও নীরব আত্মদহনকে আত্মস্থ করেছিলেন।নাটকে তাঁর অভিনয়ের প্রধান শক্তি ছিল সংযম। সংলাপের চেয়ে দৃষ্টির ভাষা, উচ্চারণের চেয়ে বিরতির গভীরতা-এসবের মধ্য দিয়েই তিনি বুঝিয়েছেন, এই মানুষটি নিজের দেশেই কেন অতিথি। যা নাটকের মূল সুরকে আরও গভীর করেছে। শরীরী ভঙ্গিতে ছিল এক ধরনের অস্বস্তি; যেন প্রতিটি পদক্ষেপে তিনি মাটি যাচাই করছেন। এই সূক্ষ্মতা চরিত্রটিকে একমাত্রিক অনুতাপের জায়গা থেকে তুলে এনে অস্তিত্বসংকটের স্তরে নিয়ে গেছে।তাঁর অভিনয়ে পরিবর্তিত দেশের প্রতি অতিথির মতো অনুভূতি এমনভাবে ফুটে উঠেছে যে, দর্শক নিজেরাই সেই দহনের অংশ হয়ে গিয়েছিলেন।

'ভাঙনের শব্দ শুনি' নাটকে হুমায়ূন ফরীদি

বাংলাদেশ টেলিভিশনের নাট্য ইতিহাসে গ্রাম্য ক্ষমতার রাজনীতি ও সামাজিক আধিপত্যের প্রতীকী উপস্থাপনা হিসেবে ‘ভাঙনের শব্দ শুনি’ একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্মাণ। এই নাটকে সেরাজ তালুকদার চরিত্রে হুমায়ূন ফরীদি-এর অভিনয় ছিল কেবল খলচরিত্রের উপস্থাপন নয়; বরং ক্ষমতার মনস্তত্ত্বকে পর্দায় দৃশ্যমান করার এক শিল্পভাষা।ফরীদির অভিনয়ের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর নীরব আধিপত্য। তিনি চিৎকার বা অতিনাটকীয় ভঙ্গির মাধ্যমে ভিলেনিয়তাকে প্রতিষ্ঠা করেননি; বরং শান্ত আত্মবিশ্বাসের মাধ্যমে চরিত্রটির ভয়াবহতাকে তুলে ধরেছেন। সেরাজ তালুকদার চরিত্রে তাঁর শরীরী ভাষা ছিল অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত-চোখের সূক্ষ্ম দৃষ্টি, ধীরগতির হাঁটা এবং সংলাপ উচ্চারণে এক ধরনের হুমকিসূচক স্থিরতা, যা চরিত্রটিকে বাস্তব ও ভীতিকর করে তুলেছিল।বিশেষভাবে লক্ষণীয় ছিল, তিনি গ্রাম্য মোড়লের ক্ষমতাকে শুধু দাপট হিসেবে দেখাননি; বরং সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস ও ক্ষমতার অসমতাকেও চরিত্রের ভেতর দিয়ে প্রকাশ করেছেন। ফলে এই ভিলেন শুধুই একজন ব্যক্তিগত প্রতিপক্ষ হয়ে থাকেনি, বরং একটি সামাজিক কাঠামোর প্রতীক হয়ে উঠেছে।

হুমায়ুন আহমেদ এর নাটক একদিন হঠাৎ - Humayun Ahmed | Humayun Faridi | Aruna  Biswas
'একদিন হঠাৎ' নাটকে হুমায়ূন ফরীদি

কমেডি চরিত্রে অভিনয় করা অনেক সময় সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি। কারণ এখানে অতিনাটকীয়তা নয়, বরং সূক্ষ্ম সময়জ্ঞান ও সংযত অভিব্যক্তিই মূল শক্তি হয়ে ওঠে। এই পরীক্ষায় দারুণভাবে সফল হয়েছিলেন হুমায়ূন ফরীদি-যিনি গৃহশিক্ষকের ভূমিকাকে কেবল হাসির উৎসে সীমাবদ্ধ রাখেননি, বরং মানবিক কোমলতায় ভরিয়ে তুলেছিলেন।‘একদিন হঠাৎ’ নাটকে তাঁর অভিনয়ের বড় শক্তি ছিল বোকাসোকা ভঙ্গির আড়ালে বুদ্ধিমত্তার সূক্ষ্ম উপস্থিতি। তিনি চরিত্রটিকে সরলতার প্রতীক বানাননি; বরং সরলতার ভেতরে থাকা আত্মবিশ্বাস ও আত্মমর্যাদার ছাপ রেখে গেছেন। ছাত্রকে নিয়ে তাঁর মজার কাণ্ডগুলো কখনো জোর করে হাসানোর চেষ্টা মনে হয়নি-বরং স্বাভাবিক পরিস্থিতি থেকেই হাস্যরস তৈরি হয়েছে।বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিল প্রেমের প্রসঙ্গে তাঁর অভিনয়ভঙ্গি। ফুফুর প্রতি চরিত্রটির আকর্ষণ প্রকাশ পেয়েছে লাজুকতা, অস্বস্তি এবং অপ্রকাশিত অনুভূতির মিশ্রণে। এই ধরনের সংযত রোমান্টিক কমেডি অভিনয় ফরীদির বহুমাত্রিক অভিনয়ক্ষমতার আরেকটি প্রমাণ।সহ-অভিনেতাদের শক্তিশালী উপস্থিতির মাঝেও তিনি দৃশ্যের ভারসাম্য বজায় রেখে নিজের চরিত্রের স্বাতন্ত্র্য ধরে রাখতে পেরেছিলেন। বিশেষ করে কমেডির সময় তিনি কখনো জোরে হাসাননি; বরং পরিস্থিতি ও সংলাপের ফাঁক দিয়ে হাস্যরস নির্মাণ করেছেন।এই নাটকে ফরীদি দেখিয়েছিলেন, কমেডি মানে কেবল হাসানো নয়-বরং চরিত্রের ভেতরের মানবিক দুর্বলতা ও আন্তরিকতাকে দর্শকের সামনে উন্মুক্ত করা। ‘একদিন হঠাৎ’ তাই তাঁর অভিনয় জীবনের সেই অধ্যায়, যেখানে তিনি প্রমাণ করেছেন, সূক্ষ্ম অভিনয়েই সত্যিকারের হাস্যরসের জন্ম হয়।পরবর্তীতে এটির সিক্যুয়েল ‘যার যা পছন্দ’ নির্মিত হয়।

'সংশপ্তক' নাটকে হুমায়ূন ফরীদি ও ফেরদৌসী মজুমদার

সংশপ্তক নাটকে হুমায়ুন ফরীদি সংলাপ ছিল ‘এসডিও সাহেবকে আমি সামলাব, আমার নাম হচ্ছে কাজী মোহাম্মদ রমজান’ এই সুচতুর উক্তিটির সঙ্গে পরিচয় আছে কি? নিশ্চয়ই এ মুহূর্তে ভাবনার বারান্দায় অতীতের চিরচেনা ‘কানকাটা রমজান’ চরিত্রের সেই কুটিল ব্যক্তির ছবি ভেসে বেড়াচ্ছে! এক সময় বিটিভিতে প্রচারিত ‘সংশপ্তক’ নাটকে ‘কানকাটা রমজান’ চরিত্রে অভিনয়ের জন্য বিখ্যাত হয়েছিলেন তিনি। যিনি কিনা সেই নাটকে নষ্টা ও সমাজচ্যুত হুরমতি চরিত্রের ফেরদৌসী মজুমদারের হাতে নাজেহাল হয়ে কান বিসর্জন দিয়েছিলেন! তিনি হুমায়ুন ফরীদি। এদেশের মঞ্চ, টিভিনাট্য কিংবা চলচ্চিত্র ইতিহাসে চিরভাস্বর এবং অবিসংবাদিত তিনি।ভয়ঙ্কর কুটিল এবং ধুরন্ধর এবং একই সঙ্গে কিছুটা কমেডি ধাঁচের রমজান চরিত্রটি ফরীদি যেভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন, তার কোনো তুলনা হতে পারে না। ব্লাক কমেডির সার্থক চিত্ররূপ বলা যেতে পারে নাটকে তার অংশটুকুকে। নাটকের অন্যসব জাঁদরেল অভিনেতা-অভিনেত্রীর প্রতি পূর্ণ সম্মান রেখেই বলছি, ফরীদির সামনে অসমমান মনে হতো সবাইকে। হুমায়ুন ফরীদির সব কাজ নিয়ে বললে শেষ হবে না।

'দ্বিতীয় জন' নাটকে হুমায়ূন ফরীদি ও সুবর্ণা মুস্তাফা

১৮ শ্রাবণের এক দুর্ঘটনা বদলে দেয় একটি পরিবারের ভাগ্যরেখা-বাড়ির কর্তা হারান তাঁর দুই পা, আর শুরু হয় হুইলচেয়ারে আবদ্ধ দীর্ঘ দশ বছর। কিন্তু শারীরিক অক্ষমতার চেয়েও গভীর হয়ে ওঠে মানসিক অনিশ্চয়তা; কারণ তাঁর স্ত্রী মাঝেমধ্যেই দেখেন, স্বামী যেন চেয়ার ছেড়ে স্বাভাবিকভাবে হাঁটছেন, কথা বলছেন। তাহলে প্রশ্ন জাগে-এই উপস্থিতি কার? যে মানুষটি বসে আছে, আর যে মানুষটি হাঁটছে-তাদের মধ্যে ‘দ্বিতীয় জন’ আসলে কে?নিজের ছোটোগল্পকে নতুন ব্যাখ্যায় রূপ দিয়ে কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ নির্মাণ করেছিলেন টেলিভিশন নাটক দ্বিতীয় জন। নব্বইয়ের দশকের শেষভাগে, যখন টেলিভিশনে অতিপ্রাকৃত বিষয় নিয়ে কাজ করা ছিল প্রায় সাহসের ব্যাপার, তখনই তিনি দর্শককে পরিচয় করিয়ে দেন মানসিক রহস্য ও অদৃশ্য বাস্তবতার এক নতুন ভাষার সঙ্গে। একই সময়ে সীমিত চ্যানেলের বাংলাদেশে তাঁর নির্মিত আট পর্বের সিরিজ অদেখা ভুবন প্রমাণ করেছিল-ভূতের গল্প কেবল ভয় নয়, বরং মনস্তত্ত্ব ও সম্পর্কের গভীর অনুসন্ধানও হতে পারে।অতিপ্রাকৃতের আবরণে নির্মিত হলেও ‘দ্বিতীয় জন’ মূলত এক মানসিক ভাঙনের গল্প। আর সেই ভাঙনের কেন্দ্রে বসে থাকা মানুষটি-হুইলচেয়ারে বন্দী এক পুরুষ-পর্দায় রক্তমাংসের বাস্তবতায় দাঁড় করিয়েছিলেন হুমায়ূন ফরীদি।এখানে তিনি চলাফেরার স্বাধীনতা পাননি; তাঁর প্রধান ভরসা ছিল একটি হুইলচেয়ার, কয়েকটি সংলাপ এবং চোখের ভাষা। কিন্তু এই সীমাবদ্ধতাকেই তিনি শক্তিতে পরিণত করেছেন।

'না, না। আমি সমস্যা বিশারদ নই। আমি যা হয়েছি তার নাম ভেজিটেবল। আমার হাঁটার শক্তি নেই। মানুষ জেলখানায় বন্দী থাকে। আর আমি দশ বছর ধরে... এই হুইলচেয়ারে বন্দী হয়ে আছি'।“আমি যা হয়েছি তার নাম ভেজিটেবল”-সংলাপটি উচ্চারণের সময় তাঁর কণ্ঠে যে ভাঙন, তা নিছক হতাশা নয়; বরং আত্মসম্মানহানির দীর্ঘ সঞ্চিত ক্ষত। মাঝপথে থেমে যাওয়া, চেয়ারের হাতলে আঘাত করা, হুইলচেয়ার ঘোরাতে ঘোরাতে কণ্ঠস্বরের ওঠানামা-সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক ক্লস্ট্রোফোবিক আবহ, যেখানে দর্শকও যেন বন্দিত্বের অংশ হয়ে পড়ে।প্রথমে নিরাসক্ত স্বীকারোক্তি, তারপর তীব্র ক্ষোভ, শেষে ক্লান্ত আত্মসমর্পণ-একই বাক্যে তিনটি মানসিক অবস্থা তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন। এই পরিবর্তন ছিল না নাটকীয় চিৎকারে; বরং ধীরে জমে ওঠা এক অন্তর্লীন বিস্ফোরণে।হুইলচেয়ার এখানে নিছক প্রপস নয়; ফরীদির অভিনয়ে সেটি চরিত্রের সম্প্রসারিত দেহ হয়ে উঠেছে। তিনি যখন চেয়ারের চাকা ঘোরান, দর্শক বোঝে সেটি কেবল অবস্থান বদলানো নয়-এটি অস্থিরতার প্রকাশ। তাঁর চোখের দৃষ্টি ও শরীরের সামান্য ঝুঁকে পড়া ভঙ্গি দৃশ্যকে এমন এক টানটান অবস্থায় নিয়ে যায়, যেখানে অতিপ্রাকৃতের রহস্য ও ব্যক্তিগত যন্ত্রণার সীমারেখা মুছে যায়।সহ-অভিনেত্রীর সঙ্গে তাঁর রসায়ন ছিল পরিমিত কিন্তু তীব্র। সংলাপের আদান-প্রদানে কোনো অতিরিক্ত আবেগ নয়; বরং দমবন্ধ করা নীরবতা। সেই নীরবতাই দৃশ্যকে ভারী করেছে।

'প্রেত' নাটকে হুমায়ূন ফরীদি

ইউরোপের ইতিহাসে ষোড়শ শতক ছিল ধর্মীয় দ্বন্দ্ব ও অন্ধ বিশ্বাসের এক অস্থির সময়-যেখানে ঈশ্বরকে অস্বীকার করে অশুভ শক্তির প্রতি বশ্যতা স্বীকারের প্রবণতা কিছু মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। সেই প্রেক্ষাপটেই ‘ব্ল্যাক ম্যাজিক’ শব্দটি এক ভীতিকর সাংস্কৃতিক প্রতীকে পরিণত হয়। এই অন্ধকার বিষয়টিকেই সাহিত্যে রূপ দিয়েছিলেন মুহম্মদ জাফর ইকবাল, তাঁর ১৯৯৪ সালে প্রকাশিত উপন্যাস প্রেত-এ।কয়েক বছর পর সেই উপন্যাস নতুন মাধ্যমের ভাষা পায়। নির্মাতা আহীর আলম উপন্যাসটি অবলম্বনে একই নামে ১১ পর্বের ধারাবাহিক নির্মাণ করেন, যা প্রচারিত হয় একুশে টেলিভিশন-এ। সাহিত্য থেকে টেলিভিশনে এই অভিযাত্রা কেবল রূপান্তর নয়; বরং এক অন্ধকার কল্পলোককে দৃশ্যমান বাস্তবতায় অনুবাদ করার প্রচেষ্টা।

বাংলাদেশেও ব্ল্যাক আর্ট বা প্রেত সাধনা নির্ভর যে কাজ হবে রোমান্টিক-কমেডি-পারিবারিক নাটকের বাইরে গিয়েও তা হয়তো পরিচালক কিংবা প্রযোজকের চিন্তার বাইরেই ছিলো। তবে বলে রাখা ভালো যে, মানসিক রহস্য ও অদৃশ্য বাস্তবতার প্যারালাল বিষয় নিয়ে এর আগেই কাজ করেছিলেন হুমায়ূন আহমেদ। ১৯৯৯ সালের তার 'অদেখা ভুবন' ধারাবাহিকের এক পর্বে দ্বিতীয় জন নাটকে হুমায়ূন ফরীদির আউট অফ দ্যা বক্স কাজ আমরা দেখতে পাই।প্যারালাল সংস্করণের দ্বিতীয় গল্পেও ব্ল্যাক আর্টভিত্তিক কাজে হুমায়ূন ফরীদির দর্শন আবার দেখতে পায়। ফরীদির এই দুইটি কাজ সমসাময়িক গল্পনির্ভর সৃষ্টির তুলনায় অনেক এগিয়ে ছিল।নাটকে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন আহমেদ রুবেল এবং এতে ফরীদি অভিনয় করেছিলেন তিনটি চরিত্রে। অতিপ্রাকৃত ও মনস্তাত্ত্বিক ভয়ের মিশেলে নির্মিত ‘প্রেত’ সিরিয়ালে হুমায়ূন ফরীদি যে অভিনয় উপস্থাপন করেছেন, তা কেবল একটি চরিত্রে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তিনটি পৃথক সত্তার মধ্য দিয়ে এক বহুমাত্রিক উপস্থিতি নির্মাণ। আঁতেল, সাধু ও জোয়ারদার-এই তিন ভিন্ন রূপে তাঁর আবির্ভাব সিরিয়ালটিকে অভিনয়গত দিক থেকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়।বিশেষত জোয়ারদার চরিত্রে ফরীদির অভিনয় ছিল শীতল ও হিসেবি। একজন তথাকথিত অ্যাস্ট্রোলজার ও প্রেতসাধক হিসেবে তাঁর কণ্ঠের মৃদু ওঠানামা, সংলাপের আগে দীর্ঘ বিরতি এবং স্থির দৃষ্টির ব্যবহার চরিত্রটিকে এক অস্বস্তিকর বিশ্বাসযোগ্যতা দেয়। তিনি চিৎকারে ভয় তৈরি করেননি; বরং শান্ত স্বরে উচ্চারিত বাক্যের ভেতরেই রেখেছেন বিপদের ইঙ্গিত। ফলে লুসিফারের মিডিয়াম তৈরির পরিকল্পনা যেন নাটকীয় কল্পনা নয়, এক মনস্তাত্ত্বিক প্ররোচনার প্রক্রিয়া হয়ে ওঠে।আঁতেল চরিত্রে তাঁর শরীরী ভাষা ছিল তীক্ষ্ণ ও সামান্য বিদ্রূপাত্মক; আর সাধুর ভূমিকায় তিনি নিয়েছিলেন সংযত, প্রায় বিমূর্ত এক উপস্থিতি। এই তিন রূপের মধ্যে কণ্ঠস্বর, চোখের দৃষ্টি ও চলনের সূক্ষ্ম পার্থক্য তৈরি করে ফরীদি দেখিয়েছেন, বহুরূপী চরিত্রায়ণ কেবল মেকআপ বা পোশাকের বিষয় নয়-এটি ভেতরের ছন্দ বদলে ফেলার শিল্প।‘প্রেত’-এ তাঁর অভিনয় সিরিয়ালের সামগ্রিক আবহকে ঘনীভূত করেছে। আবহসংগীত, আলোকসম্পাত ও ক্যামেরার ট্রিটমেন্টের সঙ্গে মিলিয়ে ফরীদির উপস্থিতি দৃশ্যগুলোকে এক ধরনের দমবন্ধ করা আবেশ দেয়। বিশেষ করে প্রেতসভায় তাঁর সংলাপ উচ্চারণ ও দৃষ্টির স্থিরতা দৃশ্যকে অতিপ্রাকৃতের সীমা ছাড়িয়ে মনস্তাত্ত্বিক ভয়ের স্তরে উন্নীত করে।তিনি অন্ধকারকে বড় করে দেখাননি-অন্ধকারের ভেতরে দাঁড়িয়েই তাকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছেন।আর সেই কারণেই ‘প্রেত’ আজও বিশেষ হয়ে থাকে।

Remembering Humayun Faridi | The Business Standard
হুমায়ূন ফরীদি

সিনেমা-নাটকের চরিত্রকে হুমায়ূন ফরীদি যেমন একদিকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন ঠিক তেমনি এই সিনেমাকে তিনি আয়রোজগারের মাপকাঠিতেও মাপতে ভুলেননি।সে প্রসঙ্গে একবার কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে কথা বলেছিলেন তিনি।জানিয়েছিলেন মূলধারার সিনেমায় তার সম্পৃক্ততার বিস্তারিত।সেই সাক্ষাৎকারে হুমায়ুন ফরীদি বলেছিলেন, ‘একটা পর্যায়ে গিয়ে দেখলাম আমার পক্ষে চাকরি করাও সম্ভব না, ব্যবসা করাও সম্ভব না। আমি অভিনয়টা মোটামুটি খারাপ করি না। এটাই আমি সবচেয়ে কম খারাপ পারি। আমি চিন্তা করলাম, এর উপর নির্ভর করে বাঁচতে পারি কি না দেখা যাক।তখন চিন্তা করে দেখলাম টেলিভিশনে কাজ করলে আমরা পেতাম ৪২০ টাকা বা ৪২৫ টাকা। সে দিয়ে তো সংসার চালানো সম্ভব না। একমাত্র যদি আমি ফিল্মে কাজ করি, তাহলে ওখানকার যে পারিশ্রমিক, সেটা দিয়ে সংসার চালানো যাবে। ওই উদ্দেশ্যে আমার ফিল্মে যাওয়া। ফিল্মে যে আমি খুব একটা বৈপ্লবিক পরিবর্তন বা শিল্পে সাধনা করতে গেছি, সেটা একবারেই ভুল।’ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগে কিছুদিন অতিথি শিক্ষক হিসেবেও পাঠদান করেন। সিনেমা সংশ্লিষ্ট বিষয়ের উপর থেকে যখন ধীরে ধীরে মনোনিবেশ হচ্ছিলো তখন থেকেই নব্বই দশকের সিনেমার প্রতি প্রবল আকর্ষণটা বাড়তে থাকে এবং নিজেকেও নব্বই দশকের সিনেমার একজন দর্শক হিসেবে নিজেকে জড়িয়ে নিয়েছিলাম, তবে নব্বই দশকের দর্শকদের মধ্যে একটা বিষয় উপলব্ধি করতে পেরেছিলাম তা হলো তাঁরা যেন ফরীদির একটু বেশিই ভক্ত ছিলেন।

তখনকার সময়ে রেডিওতে গাজী মাজহারুল আনোয়ারের কণ্ঠে  সদ্য মুক্তি পাওয়া সিনেমার কথা শুনা যেতো নিয়মিত; বলা চলে ট্রেন্ডিং সিনেমা বিজ্ঞাপন। সেইসময়ে মাঝেমধ্যে হুমায়ুন ফরীদির ডায়ালগ শোনানো হতো। রেডিওতে ফরীদির নাম শুনলেই দর্শকদের কান উৎকর্ণ হয়ে উঠত। নিকটবর্তী হলে দর্শকরা সেই সিনেমা এলেই হামলে পড়তো।  একটি সিনেমায় তার আরো একটি জনপ্রিয় সংলাপের কথা মনে পড়ছে; ফরীদির সংলাপ ছিল, ‘আরে মাফ দে রে মাফ দে, লাশের মাফ দে’। ভিলেন হিসেবে কোনো শত্রুর চেহারা মনে পড়লেই চোখ দুটি কাচের গুলির মতো ঘুরাতেন আর খ্যাঁক খ্যাঁক করে হাসতে হাসতে বলতেন, ‘আরে মাফ দে রে...।’ অসংখ্য সিনেমার ডায়ালগ মনে পড়ছে, কিন্তু তা লেখার মতো যথেষ্ট পরিসর কোথায়।

‘বাঁচো এবং বাঁচতে দাও’, প্রায়ই এমন একটা ফিলোসফিক্যাল কথা বলতেন ফরীদি। সহ-অভিনেতাদের কাছে তাঁর দরাজ দিলের কথা শোনা যায়। নাট্যাঙ্গনে নাকি একটি কথা প্রচলিত ছিল যে যদি টাকা লাগে, তবে হুমায়ুন ফরীদির কাছ থেকে ধার নাও। কারণ ফেরত দিতে হবে না। কাউকে টাকা দিলে তা নাকি বেমালুম ভুলে যেতেন। তাই কোনো দিন ফেরতও চাইতেন না। একবার সেটে নাকি চঞ্চল চৌধুরীকে দুপুরের খাবারে ভর্তা দিয়ে ভাত খেতে দেখেছিলেন। চঞ্চলের ভর্তা পছন্দের কথা শুনে একদিন বাসায় নানা রকমের ভর্তা বানিয়ে তাঁকে আসতে বলেন। চঞ্চল তখন পাবনাতে। রাত দুইটায় তিনি ঢাকা ফিরলে ওই রাতেই নাকি ফরীদির বাসায় যেতে হয় দাওয়াত রক্ষা করতে। গিয়ে দেখেন, প্রায় ৫০ রকমের ভর্তা সামনে করে বসে আছেন ফরীদি। আরেকবার নাকি হোতাপাড়া থেকে সুবর্ণার জরুরি ফোন পেয়ে রাত দুইটার পর ঢাকায় রওনা হন। হঠাৎ মনে পড়ে, প্রোডাকশন বয় ইসমাইলকে কোনো টিপস দেওয়া হয়নি। প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যে বহুদূর এসে নিজে গাড়ি চালিয়ে আবার সেটে ফিরে গিয়ে ওই রাতেই তাঁকে কিছু দিয়ে ঢাকায় ফেরেন। এমন বহু গল্প আছে, যা তাঁর হৃদয়ের বিশালতা প্রমাণ করে।

হুমায়ূন ফরীদির অভাব কি পূরণ হয়েছে?
হুমায়ূন ফরীদি

৬০তম জন্মদিনে শেক্সসপিয়ারের ‘কিং লিয়ার’-এ অভিনয়ের বাসনা ব্যক্ত করেছিলেন। হলো না। তার আগেই বহু অজানা অপূর্ণ বাসনা নিয়ে চলে গেলেন এই জাত অভিনেতা। দেশের সিনেমা-নাটক নির্মাণজগতের বোদ্ধারা কেউ কেউ দাবি করেন যে প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার আর নির্মাণের ক্যারিশমা দিয়ে যদি ফরীদিকে পরিপূর্ণভাবে ব্যবহার করা যেত, তবে উপমহাদেশের শীর্ষ সারির একজন অভিনেতা হিসেবে তাঁর স্বীকৃতি মিলত। একান্ত ব্যক্তিজীবনে অসম্ভব অভিমানী এই শিল্পী জীবনকে পিষে-ঘষে-পুড়িয়ে জীবন ধরার চেষ্টা  করে গেছেন। এখনো চোখ বুজলে তাঁর অট্টহাসিতে কাচ ভাঙার শব্দ শুনি।বিস্ময়জাগানিয়া অভিনেতা হুমায়ুন ফরীদি এখনো আমাদের ঘোরের মধ্যে নিয়ে যান। এমন ক্ষমতা কজনের আছে, কজনের থাকে।ফরীদি নেই। নেই হুমায়ুন ফরীদি। তিনি ঠাঁই নিয়েছেন কোটি ভক্তের হৃদয়ে, মগজে।

হুমায়ুন ফরীদি একজন আজন্ম অভিনেতা, আপাদমস্তক শিল্পী। এ দেশের যে কোনো ধরনের অভিনয়শিল্পীর কাছে এক আদর্শ, অনুকরণীয়, অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব। তিন দশকে চুটিয়ে অভিনয় করেছেন মঞ্চ, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রে। যেখানেই গিয়েছেন সাফল্যের বরপুত্র হয়েছেন। সব ক্ষেত্রেই যোগ করেছেন বহুমাত্রিক ব্যঞ্জনা। অভিনয়ের মাধ্যমে সব সময় ছড়িয়েছেন বাঁচার আলো, জীবনের আলো। সাদামাটা জীবনযাপনের চলাচলেই পথ হেঁটেছেন জীবনভর। অথচ মনে-প্রাণে ছিলেন দারুণ রঙে রঙিন এক উজ্জ্বল মানুষ, তিনি হুমায়ুন ফরীদি। অসাধারণ অভিনেতা। মঞ্চে, ক্যামেরার সামনে এমনকি দৈনন্দিন জীবনেও যার দাপুটে সাবলীলতা মুগ্ধতায় আচ্ছন্ন করতো যে কাউকে। সবার প্রিয় অভিনেতা হুমায়ুন ফরীদি দীর্ঘদিন ধরে অভিনয়শৈলী প্রদর্শন করে পর্দায় আবিষ্ট করে রেখেছিলেন কোটি কোটি দর্শককে। হুমায়ুন ফরীদি ছিলেন বাংলাদেশের অভিনয়জগতের এক উজ্জ্বল তারা। মঞ্চ, টেলিভিশন আর চলচ্চিত্রে ছিলো তাঁর অবাধ যাতায়াত। এই শিল্পী সম্পর্কে তাঁর অগ্রজ শিল্পী আল মনসুর বলেছিলেন, ‘এ মাটিতে জন্ম নেওয়া সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ চির উজ্জ্বল অভিনেতা হলো হুমায়ুন ফরীদি।’ এটি কোনো অতিমূল্যায়ন নয়। হুমায়ুন ফরীদির অভিনয় যাঁরা দেখেছেন, তাঁরা স্বীকার করবেন, এত বড় মাপের শিল্পী সত্যিই এ মাটিতে জন্ম নেওয়া শিল্পীদের মধ্যে বিরল।আমাদের জন্যে আনন্দের সংবাদ, দেরিতে হলেও ২০১৮ সালে অভিনয়ে হুমায়ুন ফরীদি (মরণোত্তর) একুশে পদক লাভ করেছেন। তিনি জীবিতকালে এই সম্মাননা পেলে আরো বেশি খুশি হতেন।তার মৃত্যুতে যেন থমকে গিয়েছিল পুরো দেশের শিল্প-সংস্কৃতি অঙ্গন। অসংখ্য ভক্ত, সহকর্মী, নাট্যজন, সাংবাদিক এবং সাধারণ দর্শকরা অনুভব করেছিলেন ‘একটা যুগের অবসান’।

দিন যায়, মাস যায়, পেরোয় বছর। মিডিয়ার জগৎ থেকে টেলিভিশন, সিনেমার পর্দা থেকে মঞ্চের রহস্যঘেরা দুনিয়া-সবখানেই তাঁর অনুপস্থিতি যেন দিন দিন তীব্র হয়ে উঠছে। জাহাঙ্গীরনগরের মুক্তমঞ্চ, বেইলি রোডের নাটকপাড়া, এফডিসির রংমহল-সব খাঁ খাঁ করে। সর্বত্রই বেদনার নীল পাখিদের ডানা ঝাপটানি শুনি। হুমায়ুন ফরীদি মানেই কোনো রকম ভাব নেই, বিরক্তি নেই, সাধারণ মানুষ রাস্তাঘাটে ঘিরে ধরলে সবার সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলতেন। কেবল কি একজন অভিনেতা হিসেবেই দুর্দান্ত ছিলেন? ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন মজার একজন মানুষ। শুটিংস্পটে রসিকতা করে সবাইকে হাসাতেন। তাঁর ‘চুটকি’ শুনে হাসেননি এমন কাউকেই বুঝি পাওয়া যাবে না। পছন্দ করতেন আড্ডা দিতে।বিচিত্রধর্মী নানা চরিত্রে তাঁর অসামান্য অভিনয় কৌশল থেকে বর্তমান প্রজন্মের অভিনেতাদের অনেক কিছু শেখার আছে। একজন অভিনয়শিল্পী সব মাধ্যমে দাপটের সঙ্গে অভিনয় করতে পারেন না। সবার সে ক্ষমতা নেই। সীমাবদ্ধতা থাকাটাও অস্বাভাবিক কিছু নয়। তবে হুমায়ুন ফরীদি পেরেছিলেন। কী মঞ্চে, কী টিভি নাটকে, কী চলচ্চিত্রে-একটা সময় ছিলো, তাঁর নামে নাটক চলতো, চলচ্চিত্র চলতো। এই শক্তিমান অভিনেতার প্রয়াণ বাংলাদেশের অভিনয় জগতের জন্য বড় একটা ক্ষতি।

হুমায়ূন ফরীদি কেন বরাবরই আলাদা ছিলেন- এই প্রশ্নটা আসলে শুধু একজন অভিনেতাকে ঘিরে নয়, পুরো অভিনয়-সংস্কৃতিকে ঘিরে। কারণ ফরীদিকে বুঝতে গেলে তার অভিনয় দক্ষতার পাশাপাশি আমাদের নাটক, সিনেমা, লেখালেখি এবং দর্শকের রুচির পরিবর্তন-সবকিছুকেই একসাথে দেখতে হয়।হুমায়ূন ফরীদি ছিলেন সেই বিরল অভিনেতাদের একজন, যিনি চরিত্রকে অভিনয় করতেন না-চরিত্রের ভেতরে বাস করতেন। তার অভিনয়ে “ভিলেন” মানেই একমাত্রিক নিষ্ঠুরতা ছিল না, বরং ছিল বুদ্ধি, দর্শন, অদ্ভুত রসবোধ, কখনও গভীর বিষণ্ণতা। তিনি খলচরিত্রে দাঁড়িয়ে থেকেও মানবিকতার একটা ঝলক দেখাতে পারতেন, একজন ভিলেন কেন ভিলেন-তার সামাজিক, মানসিক, অস্তিত্বগত ব্যাখ্যা তিনি শরীরী ভাষা, চোখের দৃষ্টি, সংলাপ বলার ছন্দে তুলে ধরতেন। আবার দার্শনিক চরিত্রে এসে যেন জীবনের ক্লান্ত, বিদ্রূপাত্মক সত্যগুলোকে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে উচ্চারণ করতেন। কমিক চরিত্রেও তিনি হাসাতেন, কিন্তু সেই হাসির আড়ালে থাকত এক ধরনের তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- এখন কেন তার মতো “আউট অফ দ্যা বক্স” চরিত্র লেখা হয় না?এর পেছনে কয়েকটা বাস্তবতা কাজ করে। একটা সময় ছিল যখন নাটক বা সিনেমার পর্দায় কিছু মুখ দেখা মানেই দর্শকের ভেতরে আলাদা এক প্রত্যাশা জন্ম নিত। শহীদুজ্জামান সেলিম, ফারুক আহমেদ, তারিক আনাম খান, ইন্তেখাব দিনার, আজিজুল হাকিম ড. এজাজুল ইসলাম কিংবা সালাউদ্দিন লাভলু এই নামগুলো শুধু অভিনেতা নয়, অভিনয়ের এক বিশেষ ভাষা, এক গভীরতা, এক বিশ্বাসযোগ্যতার প্রতীক। অথচ আজকের পর্দায় তাদের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে সীমিত, কখনো অনিয়মিত, কখনো প্রায় অনুপস্থিত। এই বাস্তবতা নিছক কাস্টিং সিদ্ধান্তের ফল নয়; বরং এটি একটি বৃহত্তর শিল্প-সংস্কৃতির পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে।

বর্তমান মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রির ভেতরে দৃশ্যমান এক বড় রূপান্তর হলো গতি এবং দৃশ্যমানতার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। কন্টেন্ট আজ অনেকাংশেই দ্রুত ভোগ্য পণ্য। এখানে চরিত্রের গভীরতার চেয়ে প্রায়শই অগ্রাধিকার পায় উপস্থিতির ঝলক, ফ্রেমে মানানসই চেহারা, সোশ্যাল মিডিয়ায় গ্রহণযোগ্যতা। অভিজ্ঞ, পরিণত অভিনেতারা যে অভিনয়ের ভেতর দিয়ে ধীর, স্তরবিন্যাসযুক্ত, মনস্তাত্ত্বিক নির্মাণ তৈরি করেন, সেটি এই দ্রুততার যুগে অনেক সময় ‘ভারী’ বলে বিবেচিত হয়। ফলে নির্মাতারা প্রায়শই সহজ, তাৎক্ষণিক প্রভাব তৈরির দিকে ঝুঁকে পড়েন, যেখানে চরিত্রের দীর্ঘমেয়াদি স্মরণযোগ্যতা ততটা জরুরি হয়ে ওঠে না।অন্যদিকে কাস্টিং প্রক্রিয়ার ভেতরেও পরিবর্তন এসেছে। একসময় চরিত্র অনুযায়ী অভিনেতা খোঁজার প্রবণতা ছিল স্পষ্ট; এখন অনেক ক্ষেত্রে অভিনেতা অনুযায়ী চরিত্র তৈরি বা সামঞ্জস্য করার প্রবণতা বাড়ছে। জনপ্রিয়তা, বাজারযোগ্যতা, পরিচিত মুখ—এই বিষয়গুলো সিদ্ধান্তে ক্রমেই বড় ভূমিকা রাখছে। এর ফলে দক্ষতা বা অভিনয়বোধের গভীরতা কখনো কখনো দ্বিতীয় সারিতে সরে যায়। শহীদুজ্জামান সেলিম বা তারিক আনাম খানের মতো অভিনেতারা যেসব চরিত্রকে প্রাণবন্ত করে তুলতে পারেন, সেসব চরিত্রই যদি পর্যাপ্তভাবে লেখা না হয়, তাহলে তাদের পর্দায় অনুপস্থিতি অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে।

তাছাড়া ফরীদির সময়ে নাটক ও সিনেমার কনটেন্ট অনেক বেশি শক্তিশালী ছিল। বিশেষ করে তার সময়ে ভিলেনের চরিত্রে যেভাবে লেখা হতো এখন সেইভাবে স্মরণীয় কোনো ভিলেন চরিত্র বেরিয়ে আসতে পারছে না। হালের অনেক জনপ্রিয় অভিনেতায় ভিলেন এবং নায়ক দুই ভূমিকাতেই অভিনয় করছেন কিন্তু তার চরিত্রের সম্পূর্ণ গভীরতা সবার সামনে ফুটে আসছে না।প্রথমত, লেখালেখির ধরণ বদলেছে। ঘাটতি তাই কেবল অভিনয়ে নয়, বরং লেখায় এবং নির্মাণের দৃষ্টিভঙ্গিতে। ভিলেনকে যখন কেবল প্লটের একটি ফাংশন হিসেবে দেখা হয়, তখন তার ভেতরে মনস্তত্ত্ব, দর্শন, অন্তর্দ্বন্দ্ব প্রবেশের সুযোগ পায় না।অথচ স্মরণীয় ভিলেন সবসময়ই গল্পের গভীরতম স্তরের প্রতিনিধিত্ব করে। সে সমাজের অন্ধকার, মানুষের লোভ, ভয়, ক্ষমতার বিকৃতি-এই সবকিছুর প্রতিচ্ছবি। ফরীদির চরিত্রগুলো এই জায়গাটিই ছুঁয়ে যেত।এখন অনেক কাজেই চরিত্রের জটিলতার চেয়ে প্লটের গতি, চমক, বা বাণিজ্যিক ফর্মুলা বেশি প্রাধান্য পায়। ফলে ভিলেন প্রায়ই হয়ে যায় স্টেরিওটাইপ-অত্যন্ত নিষ্ঠুর, অত্যন্ত চতুর, অথবা অত্যন্ত কার্টুনিশ। চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক স্তরগুলো খোঁজার ঝোঁক কমে গেছে।দ্বিতীয়ত, দর্শকের ভোগ-সংস্কৃতিও পরিবর্তিত হয়েছে। দ্রুতগতির কনটেন্টের যুগে সূক্ষ্ম অভিনয়, ধীর মনস্তাত্ত্বিক নির্মাণ, বা দার্শনিক সংলাপ সবসময় “মাস অ্যাপিল” পায় না। নির্মাতারা তাই নিরাপদ পথে হাঁটেন।তৃতীয়ত, ফরীদি ছিলেন এক বিশেষ প্রজন্মের প্রতিনিধি। তার মধ্যে ছিল মঞ্চ-অভিনয়ের শৃঙ্খলা, সাহিত্যপাঠের গভীরতা, এবং চরিত্র নিয়ে বৌদ্ধিক কাজ করার প্রবণতা। তিনি শুধু স্ক্রিপ্ট অনুসরণ করতেন না, স্ক্রিপ্টকে প্রসারিত করতেন। আজকের শিল্পে সেই ধরনের সময়, প্রস্তুতি এবং ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতা সবসময় দেখা যায় না।

No photo description available.
হুমায়ূন ফরীদি

আরেকটা বিষয় গুরুত্বপূর্ণ- ফরীদি ছিলেন এক ধরনের “চরিত্র-সংস্কৃতি”-র ফল। সেই সময়ের নাটকগুলোতে চরিত্রের ভাষা ছিল সাহিত্যঘন, সংলাপে ছিল দর্শন, ব্যঙ্গ, সামাজিক মন্তব্য। এখন সংলাপ অনেক সময় বেশি সরল, কার্যকরী, কিন্তু কম স্তরবিশিষ্ট।এই প্রসঙ্গটি সরাসরি এসে মিলে যায় আরেকটি বহুল আলোচিত প্রশ্নে-হুমায়ূন ফরীদির মতো নিখুঁতভাবে ভিলেন চরিত্র কেন আর দেখা যায় না? এই আক্ষেপের ভেতরে আসলে শুধু একজন অভিনেতার প্রতি নস্টালজিয়া নয়, বরং চরিত্র নির্মাণের একটি গভীর সংকটের ইঙ্গিত রয়েছে।ফরীদির অভিনয়ের শক্তি ছিল তার চরিত্রের ভেতরের মানুষটিকে খুঁজে বের করার ক্ষমতায়। তিনি ভিলেনকে কেবল খারাপ মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করেননি; তিনি তাকে চিন্তাশীল করেছেন, জটিল করেছেন, মানবিক করেছেন। তার চোখে, কণ্ঠে, নীরবতায় চরিত্রের অস্থিরতা, অহংকার, দর্শন, ক্ষত-সবকিছু একসাথে উপস্থিত থাকত। কিন্তু আজকের বহু ভিলেন চরিত্র প্রায়শই একমাত্রিক। তারা কাহিনির প্রয়োজনে উপস্থিত, কিন্তু গল্পের মানসিক কাঠামোর কেন্দ্রে নয়। তাদের কাজ সংঘাত তৈরি করা, কিন্তু দর্শকের মনে দীর্ঘস্থায়ী প্রশ্ন জাগানো নয়।আরও একটি সূক্ষ্ম পরিবর্তন লক্ষণীয়। বর্তমান কন্টেন্টে নৈতিক বিভাজন প্রায়শই অত্যন্ত সরলীকৃত। ভালো মানুষ স্পষ্ট ভালো, খারাপ মানুষ স্পষ্ট খারাপ। এই দ্বৈততার ভেতরে ধূসর অঞ্চল ক্রমেই সংকুচিত। ফলে ভিলেনের জটিলতা কমে যায়, আর অভিনয়ের ক্ষেত্রও সীমিত হয়ে পড়ে। ফরীদির অভিনয় যে ধূসর অঞ্চলে বিস্তৃত ছিল, সেই অঞ্চলই যেন গল্প বলার ভাষা থেকে ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে।দার্শনিক চরিত্র কেন কমে গেছে?কারণ দর্শন এখন প্রায়ই সাবটেক্সটে থাকে, প্রকাশ্যে কম আসে। নির্মাতারা ভাবেন, অতিরিক্ত চিন্তাশীল সংলাপ দর্শককে দূরে সরিয়ে দিতে পারে। অথচ ফরীদি প্রমাণ করেছিলেন, দর্শনও জনপ্রিয় হতে পারে-যদি তা অভিনয়ের ভেতর দিয়ে প্রাণ পায়।কমিক চরিত্র কেন আগের মতো লাগে না?কারণ কমেডির ভাষাও বদলেছে। আগে চরিত্র-ভিত্তিক কমেডি বেশি ছিল-যেখানে হাসি আসত পরিস্থিতি, ব্যক্তিত্ব, সংলাপের বুদ্ধিদীপ্ততা থেকে। এখন অনেক সময় কমেডি হয় গ্যাগ-নির্ভর বা অতিরঞ্জিত। মঞ্চ ও টেলিভিশন ছিল প্রধান মাধ্যম, যেখানে অভিনয়ের দক্ষতা বিকাশের সুযোগ ছিল। এখন ইউটিউব ট্রেন্ডিং ভিউ, শর্ট ফর্ম কনটেন্ট এবং টাকার পিছনে ছুটা, অভিনয়ের চেয়ে ক্যামেরার সামনে ভালো দেখানো বা জনপ্রিয় সংলাপ বলা বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। এই কারণেই পেশাগত অভিনেতা সৃষ্টি হচ্ছে না।

তবুও প্রশ্নটি থেকে যায়-এটি কি দর্শকের চাহিদার পরিবর্তন, নাকি নির্মাতাদের ধারণার পরিবর্তন? দর্শক কি সত্যিই গভীর চরিত্র চায় না, নাকি ধরে নেওয়া হয়েছে তারা চায় না? বাস্তবতা হয়তো এত সরল নয়। বরং বলা যায়, শিল্প যখন ঝুঁকি নিতে ভয় পায়, তখন চরিত্র সহজ হয়। চরিত্র সহজ হলে অভিনয়ের গভীরতাও সংকুচিত হয়।অভিজ্ঞ অভিনেতারা কখনোই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যান না; তারা কেবল প্রাসঙ্গিক চরিত্রের অপেক্ষায় থাকেন। একইভাবে শক্তিশালী ভিলেন কখনো বিলুপ্ত হয় না; তাকে কেবল লেখায় এবং নির্মাণে নতুন করে আবিষ্কার করতে হয়।

হুমায়ূন ফরীদি ছিলেন এক বিরল ঘটনা, কারণ তিনি চরিত্রকে অভিনয় করেননি, চরিত্রকে অস্তিত্ব দিয়েছিলেন। তার উপস্থিতি চরিত্রকে বড় করত, দৃশ্যকে অন্য মাত্রা দিত। তার মতো অভিনেতা খুব ঘন ঘন জন্মায় না। তাই তার মতো চরিত্রও খুব সহজে তৈরি হয় না।তার সমসাময়িক বা সমবয়সী সহশিল্পীরা আজও সেই ক্ষমতা ধারণ করেন। ঘাটতি হয়তো তাই প্রতিভায় নয়, বরং সেই প্রতিভাকে ধারণ করার মতো গল্প, চরিত্র এবং সাহসে। শিল্পের ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে—যখন লেখায় গভীরতা ফিরে আসে, চরিত্রে জটিলতা ফিরে আসে, তখনই অভিনয় আবার বিস্ময় সৃষ্টি করে।তাই বর্তমান সময়ের কিছু উঠতি তারকা শরীফুল রাজ, ইয়াশ রোশান, সিয়াম আহমেদ, নাসির উদ্দিন খান নিজেদের অভিনয়গুণে নিজেদের আলাদা জায়গা তৈরি করলেও তাদের একঘেয়ে বা টাইপকাস্ট চরিত্রে সীমাবদ্ধ না রেখে বিভিন্ন ঘরানার চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ দিতে হবে।সবশেষে একটা কথা বলতেই হয়-অপেক্ষা তাই শেষ পর্যন্ত চরিত্রেরই। কারণ শক্তিশালী অভিনেতা সবসময়ই আছেন, কিন্তু শক্তিশালী চরিত্র সবসময় লেখা হয় না।ভালো লেখা, সাহসী চরিত্র নির্মাণ, এবং গভীর অভিনয়ের চর্চা যদি বাড়ে, তাহলে আবারও আমরা বহুমাত্রিক ভিলেন, দার্শনিক চরিত্র, সূক্ষ্ম কমেডি দেখতে পারব। হয়তো ফরীদির মতো আর কেউ আসবেন না, কিন্তু তার প্রভাব থেকে নতুন ধারা জন্ম নিতে পারে।ফরীদি আছেন পৃথিবীর সব নাট্যমঞ্চের ড্রেসিংরুমে পাটাতনে,নতুন চরিত্রের জন্মক্ষণে, প্রতিটি সৃষ্টিশীল আড্ডায় অন্তরালে।”আছেন রুপালি পর্দার আড়ালে, থাকবেন অনন্তকাল।কারণ শিল্পে শূন্যতা কখনও স্থায়ী হয় না-সেটা একদিন নতুন ভাষায় পূরণ হয়।

লেখক: আমি সুমন বৈদ্য বর্তমানে ঢাকার স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে  সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম বিভাগ থেকে  স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের জন্য অধ্যয়ন করছি।পাশাপাশি একজন ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও লেখক হিসেবে কর্মরত অবস্থায় রয়েছি।

Comments

    Please login to post comment. Login