রাজ্যে যেনো এলো সুখের চন্দ্রযান
রাজরাজরার আমলের কথা, সে-সময় আমলকী বন কেটেকুটে চন্দ্রমল্লিকা চাষ করা হচ্ছিল। রানির নাম চন্দ্রা, ইতিহাসের সব রোমান্টিক রাজার মতোই, রাজার কথা, রাজ্য উচ্ছন্নে যাক, আমার রানির জন্যেই তো এই রাজ্য।
রাজা দিনরাত তদারকি করে, মাঝে মাঝে কামলাদের নিজের হাতেই পেটায়। পিটিয়ে পিটিয়ে পিঠের ছাল উঠিয়ে দেয়। পিটাতে রাজার বড়োই ভালো লাগে, রক্তাক্ত পিঠে যখন কামলারা সপাত সপাত করে আমলকী কাঠে কুঠার বসায়, রাজার মনে পুলক জাগে, আহা, কী সুখের রাজ্য, সবাই ঘাম রক্ত করে কাজ করে!
রাজ্যের সব আমলকী বন ধ্বংস হতে চলেছে, চন্দ্রমল্লিকা একবার হয় মরে যায়। রানি ইতোমধ্যে অনেক অসুস্থ হয়ে পড়েছে। রাজ চিকিৎসক বলেছে, আমলকির তেল রানির কপালে প্রত্যেক সকালে মালিশ করতে হবে। এদিকে আমলকী ধরেনি গাছে। আবার গাছও প্রায় সব কাটা শেষ। রাজ চিকিৎসক অনেকবার মানা করেছিল রাজাকে এই কাজ করতে রাজা শুনেনি। আবেগে রাজা অন্ধ হয়ে গেছে, রাজা বুঝতে পেরেছিল, তবু কল্পনায় রাণীকে চন্দ্রমল্লিকার মধ্যে হাঁটতে দেখে আর পিছে থেকে পরম আদুরে গলায় চন্দ্রা বলে ডাকতে পারছে ভেবে চোখ বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিলো, 'আপনি কি বুঝবেন বৈদ্য সাহেব, ভালোবাসার কাছে রোগবালাই কিছুই না। আপনাকে বরং আমি কিছু ড্রাগন ফলের গাছ লাগিয়ে দেবো কুটিরের আঙিনায়।'
রাজবৈদ্য অবশ্য ড্রাগন ফলের গাছ পেয়ে পরম খুশি, মনে মনে ভেবেছিল, রাজা তো ঠিকই করছে আমলকী থাকলে তাকে অনেক খাটতে হতো অঝথা খেটে খেটে ঔষধ বানিয়ে বুড়ো বয়সে মরতে হবে।
রাজা পরমানন্দে তদারকি করে, অশেষ পুলোকে চাবুক চালায়। রাজা একদিন স্বপ্নে দেখে রানি মারা গেছে, প্রাসাদের মাথার উপরে মস্ত একটা আমলকী ভেসে বেড়াচ্ছে। আতঙ্কিত রাজা পরেরদিন বহি দেশ থেকে কমলা ভাড়া করে সবকয়টা আমলকীর গাছ কেটে চন্দ্রমল্লিকা লাগানোর ব্যবস্থা করে।
কিছুদিন পরে চন্দ্রমল্লিকা অনেকটা বড়ো হয়ে গেছে, রাজা রাণীকে একটা দস্তুর মতন রাজ কারিগরদের বানিয়ে দেওয়া গাড়িতে বসিয়ে ঠেলতে ঠেলতে মল্লিকা বাগানের মাঝে নিয়ে আসে। দেখতে দেখতে রানি ঘুমিয়ে পড়ে, রাজার আর রাণীকে ' চন্দ্রা' বলে ডাকা হয় না। অস্থিচর্মসার রানি হালকা বাতাসেই শিশুর শীতালু ঠোঁটের মতন কেঁপে উঠে।
রাজার বড়ো কষ্ট লাগে, রাজার সব চলে যাচ্ছে। রানি মারা যাচ্ছে, রাজ চিকিৎসক আমলকীর তেলের ব্যবস্থা অন্য দেশ থেকে করে দিয়েছিল, অযথা বুড়োর দ্বিগুন খাটনি হলো। খাটুনির ভয়ে যে সাঁই দিয়েছিল। যাক, তাতে কাজ হয়নি। রানির সব জীবনী শক্তি যেন এই মল্লিকা বাগান নিজেদের মধ্যে নিয়ে তুমুল আক্রোশে রং ছড়াচ্ছে। রাজার সেই কথা ভেবে আর দুঃখ হলো।
মনের দুঃখে রাজা রাজ বন বিশারদকে ডেকে পাঠালেন, বললেন ' আমার রাজ্যের আশেপাশে কোন গাছের জঙ্গল সবচেয়ে বেশি, আর কোথায় আছে?' বিশারদ চিন্তা করলো, এরপরে তড়িঘড়ি উত্তর দিলো। কিছুক্ষণ পরে রানির কপালে চুমু খেয়ে রাজা নিজের ভালোবাসার শেষ চিহ্ন রাণীকে উপহার দিলো। এরপরে নিজের কাঁধে একটা কুঠার নিয়ে, সবার চক্ষুর অগোচরে, প্রাসাদ থেকে নেতাজির (সুভাষ চন্দ্র বসু) মতন অন্তর্ধানে চলে গেলো।
বহুকাল পরে, পাশের একটা রাজ্যে হুইস্টেরিয়া ফুলগাছ কাটার দায়ে এক কাঠুরিয়াকে ধরা হয়। তার থলের মধ্যে কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের সাথে একটা শুকনা মল্লিকা ফুল দেখে নাক কুঁচকে দূরে ছুঁড়ে ফেলে রাজদারোয়ান।