বাল্মীকির মহাকাব্য রামায়ণের কেন্দ্রীয় চরিত্র রাম। কিন্তু মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত তাঁর মেঘনাদবধ কাব্যে মহান চরিত্র করে তুললেন সীতা অপহরণকারী রাবণকে। কৈ মাইকেলকে কেউ তো কবির খাতা থেকে নাম কেটে দেননি। ১৯৭৬ সালে গোপন সামরিক আদালতের সংক্ষিপ্ত বিচারে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া ১১ নাম্বার সেক্টর কমান্ডার কর্নেল তাহেরকে মহিমান্বিত করে কবি মোহন রায়হান যদি একখানা কবিতা লিখেই থাকেন তাতেই কি সকল চেতনা তিরোহিত হয়ে যায়? নাকি যাওয়া উচিত? আমরা আগের রেজিমে দেখতাম কেউ যদি শেখ মুজিবকে নিয়ে সামান্য সমালোচনাও করতেন তার জীবন জেরবার হয়ে যেত। যে কারণে সারজিস, হাসনাত, কায়েমদের মতো হাজারো মানুষ মেকি মুজিব বন্দনায় নিজেদের একান্ত গোপন এজেন্ডা বাস্তবায়ন করবার সুযোগ করে নিয়েছিলেন।
গত সোমবার বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ২০২৫ ঘোষণা করে। এতে কবিতায় মোহন রায়হানের মনোনীত হওয়ার তথ্য জানানো হয় বাংলা একাডেমির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে। এই আলোকে গতকাল এসএসএফের উপস্থিতিতে অন্যান্যদের সাথে পুরস্কার গ্রহণের মহড়াতেও অংশ নেন কবি মোহন রায়হান। আজ পুরস্কার গ্রহণের ঠিক আগ মুহূর্তে সেটি বাতিল করা হয়েছে বলে জানতে পারেন মিস্টার রায়হান।
আজ দুপুরে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ২০২৫ বিজয়ীদের হাতে তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
সোশ্যাল হ্যান্ডেলের পোস্টে মোহন রায়হান লিখেছেন, ‘আপনারা অবগত আছেন এবার ২০২৫ বাংলা একাডেমির সাহিত্য পুরস্কার (কবিতায়) আমাকে প্রদান করা হয়েছিল। এই পুরস্কার আমার একদমই প্রত্যাশা ছিল না। আমি একজনের কাছেও পুরস্কারের জন্য তদবির করিনি। পুরস্কার কমিটি স্বতঃস্ফূর্তভাবে আমাকে নির্বাচিত করে।’
৪১ বছর আগে লেখা কবিতার জন্য পুরস্কার বাতিল করার তথ্য উল্লেখ করে মোহন রায়হান বলেন, ‘গতকাল পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ডেকে এসএসএফ পুরস্কার গ্রহণের রিহার্সালও প্রদান করে। যথারীতি আজ পুরস্কার গ্রহণের জন্য এসে জানতে পারলাম, ৪১ বছর আগে কর্নেল তাহেরকে নিয়ে লেখা আমার ‘তাহেরের স্বপ্ন’ কবিতার জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দিয়ে একটি মহল আমার পুরস্কার বাতিল করিয়েছে।’
কবি মোহন রায়হান বর্তমানে জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি। নাম ঘোষণার পরেও তাঁকে পুরস্কার না দেওয়ার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক মোহাম্মদ আজম প্রথম আলোকে বলেছেন, ‘মোহন রায়হানের কবিতা ও লেখালেখি সম্পর্কে কিছু অভিযোগ ওঠায় কর্তৃপক্ষ সেই অভিযোগ খতিয়ে দেখার স্বার্থে সাময়িকভাবে পুরস্কার স্থগিত করেছে। এটা পরীক্ষা–নিরীক্ষা হয়ে গেলে আমরা অবিলম্বে এটা জানাব।'
মোহন রায়হান রচিত ‘তাহেরের স্বপ্ন’ কবিতাটি বাংলাদেশের অন্যতম বীর মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল আবু তাহেরের বিপ্লবী আদর্শ, শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা এবং মানুষের অধিকার আদায়ের স্বপ্নকে উপজীব্য করে লেখা।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পুরস্কারের ভাগ্যলিপি এটাই যে, প্রতিবছর কারো না কারো অর্জন বাতিলের মুখে পড়বেই। কেউ তো পুরস্কার চাইতে আসেন না। আপনারা দয়াপরবশ হয়ে যাকে দেবেন -তার ব্যাপারে আগেই কেন জেনে বুঝে নেবেন না? কাউকে ডেকে এনে অপমান করবার তো কোনো মানে থাকতে পারে না। বরং ঔচিত্য হলো যারা এমন ন্যাক্কারজনক পরিস্থিতির জন্য দায়ী সসম্মানে তারা পদত্যাগ করে বাড়ি চলে গিয়ে আপনভুবনে মন দেবেন।
একুশে পদক প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেই বলেছেন 'শিক্ষা গবেষণা ও শিল্পসাহিত্য চর্চায় রাজনীতিকীকরণ সভ্য সমাজের পরিচায়ক নয়'!
অপরদিকে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এমনি এমনি লিখেন নাই:
হে মোর দুর্ভাগা দেশ, যাদের করেছ অপমান,
অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান!
লেখক: সাংবাদিক
২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬